Profile Photo

তুলিOffline

  • TulTuli
  • Profile picture of তুলি

    তুলি

    2 years, 7 months ago

    রঙ
    অনুগল্প

    -কিরে? তুই এখানে? আর আমি পুরো ক্যাম্পাস তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছি! আজকের দিনেও তুই বইতে মুখ গুজে পড়ে আছিস? হ্যাঁরে তুই এতটা সেকেলে কেন বল ত?

    নিরার প্রশ্নে বইয়ের পাতার কোণাটা হালকা ভেঙে বইটা বন্ধ করল তরী। চশমার মোটা ফ্রেমটা নিকাবের উপর আরেকটু ঠিক করতে করতে মুচকি হেসে তাকালো তার দিকে।
    কি সুন্দর করে হিজাব পরেছে মেয়েটা। ফুলহাতা জামায় কব্জির অনেকটাই আবৃত। আচ্ছা, এই গরমে যে মানুষটা এত সুন্দর করে পর্দা করতে পারে, সে কেন পুরোটা দ্বীন মানেনা? তাকে কি কেউ কখনো খিলাফতের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়নি? আপনমনে প্রশ্নগুলো জড়ো করে মুখে জবাব দিল :
    -খুঁজছিলি কেন?

    নিরা:
    কেন আবার? নিচে তাকিয়ে দেখ! সবাই কত্ত মজা করছে, রঙ খেলছে! চল না নিচে। সারাক্ষণ কি একা একা থাকিস বল ত? তোর কি ইচ্ছা করেনা আনন্দ করতে?

    লাইব্রেরি রুমটা পাঁচতলায় হওয়াতে ক্যাম্পাসের গ্রাউন্ডটা বেশ ভালোই নজর যায়। তরী সেদিকে একবার তাকিয়ে নিরার দিকে তাকিয়ে কোমল গলায় পাল্টা প্রশ্ন করলো:
    -হায়ার অবমাননা করে, অশালীন পোশাক পরে, অপজিট জেন্ডারের গালে রঙ মাখালে আর রক গানে নাচলেই বুঝি আনন্দ করা হয়?
    নিরা ভ্রু কুচকে বলল,
    কি বলতে চাচ্ছিস তুই?
    তরী: নিচে তাকাতে বললি যে! তুই কি খেয়াল করেছিস নিচে কি হচ্ছে?
    (নিরা নিচে আরেকবার তাকিয়ে নিজেই চোখ সরিয়ে ফেললো। মুসলিম পরিবারে জন্ম হলেও সেভাবে ধর্মীয় অনুশাসন পেয়ে বড় হয়নি নিরা। ৫ বেলা নামায পড়লেও ইমানের আনাচে কানাচে অজানা তার। হারাম হালালে প্যাঁচ লাগে অহরহ। তথাকথিত মডারেট মুসলিম মনে করে নিজেকে। শুধু কালিমা পড়লেই জান্নাতে যাওয়া যাবে মন্ত্রে বিশ্বাস করে সে। পুরো দ্বীন না মানলেও শালীনতা রক্ষা করে চলার চেষ্টা করে। স্কুল কলেজের গন্ডি পেরিয়ে সদ্য ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হতে গিয়ে নিরার মনে হয় জীবনটা অনেক রঙিন। সেই রঙের সবটুকু যদি আস্বাদন করা না যায়, তাহলে আর বেঁচে থেকে কি লাভ!
    পাশাপাশি রোল হওয়াতে তরীর সাথে বেশ যোগাযোগ গড়ে উঠেছে তার। তরী সহজ বাংলায় গোড়া বা কট্টর মুসলিম। পড়াশোনায় হেল্প করলেও কোনো আড্ডা কিংবা হ্যাঙআউটে তরী অমাবস্যার চাঁদ। এ নিয়ে নিরার অভিযোগের শেষ নেই। সে নিজে ঘুরাঘুরি, আড্ডা পছন্দ করলেও এরকম অশালীনতা করতে শেখেনি। নিরার যেন নিজের কাছেই লজ্জা করছে যে এমন একটা অনুষ্ঠানে সে তরীকে যেতে বলছিল! মুখ থেকে কথা সরছে না তার।)

    নিরবতা ভেঙে তরী বলে উঠল:
    আচ্ছা, নিরা, আমরা কেন এমন হয়ে গেলাম? কিসের মোহ আমাদের এতটা আচ্ছন্ন করে নিল যে আমরা নিজেদেরকেই খেলনা বানিয়ে ফেললাম!
    তুই কি জানিস আমাদেরকে এই পৃথিবীতে কেন পাঠানো হয়েছিল?
    নিরা: বল শুনি।
    তরী: আজকে তোকে সেই প্রভুর কথা শোনাবো যিঁনি আমাদের এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন খলিফা হিসাবে। (সূরা আল বাকারা:৩০ নং আয়াত)
    মনে কর, আমাদের কালচার কমিটির প্রেসিডেন্ট তুই। এখন তুই যদি ঠিকমত দায়িত্ব পালন করিস তাহলে ফাংশন শেষে তোর তথাকথিত সুনাম হবে। আগামী বছরেও তোকে প্রেসিডেন্ট রাখা হবে। কিছু পুরস্কারও পেতে পারিস। আর তুই যদি দায়িত্বে অবহেলা করিস, দায়িত্ব অস্বীকার করিস, তখন কি তোকে পুরস্কার দিবে?
    তেমনি আল্লাহ রাব্বুল আল-আমীনও আমাদেরকে এই পৃথিবীতে তাঁর খলিফা বা প্রতিনিধি হিসাবে পাঠিয়েছেন। আমরা যদি দুনিয়াতে তাঁর আদেশ মানি, নিজেদের দায়িত্ব পালন করি, তাহলে তিঁনিও দুনিয়ার সফর শেষে আমাদেরকে জান্নাত দিয়ে পুরস্কৃত করবেন। কিন্তু আমরা যদি তারঁ হুকুম মানার বদলে প্রতিনিয়ত হুকুম ভাঙি কিংবা ফিতনা সৃষ্টি করি! তখন কি আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন না?
    যেখানে স্বয়ং আল্লাহ আমাদের হেফাজত করে যাচ্ছেন। আমাদের রহমত দান করে বাঁচিয়ে রাখছেন। রিযিকে বরকতে সুস্থ সাবলীল রেখেছেন। সেখানে আমরা কেন কৃতজ্ঞতা দেখাতে পারছি না?
    আমরা কি পারিনা আরেকবার জীবনটাকে গোছাতে? এইসব অশ্লীলতা বন্ধ করতে না পারি, নিজে এড়িয়ে চলতে পারিনা? পারিনা নিজে এতটা উত্তম হতে যেন আসহাবে সাহাবীদের দেখে যেমন অমুসলিমরা শান্তির ছায়ায় আসত, আমাদের দেখেও অনন্ত এই ধারনা তৈরি করাতে যে, ইসলাম কতটা সুন্দর? কেন আমাদের আচরণই আজ সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত? কেন আমরা দুনিয়ার লোভে অন্ধ হয়ে যাচ্ছি? দুনিয়া পেতে বিক্রি করে দিচ্ছি ইমান, আব্রু, শালীনতা, বিবেক, মনুষ্যত্ব?
    যেখানে ইসলামের রঙ আমাদের প্রতিরক্ষা দেয়, দেয় সম্মান, দেয় পুণ্য, সেখানে অন্য রঙের সত্যই কি জরুরত আছে বোন? সূরা বাকারার ১৩৮ নং আয়াতে আছে,
    “আমরা গ্রহণ করলাম আল্লাহর রঙ।
    আর রঙে আল্লাহ অপেক্ষা কে অধিকতর সুন্দর?””

    (মনের মধ্যে ঝড় বয়ে চলেছে নিরার। কেন এতদিন এভাবে ভাবেনি সে? দুনিয়ার প্রতি মোহ কি তার ইমান থেকে বড় হয়ে গেল? আস্তাগফিরুল্লাহ! না আর দেরি করা যাবেনা।)

    কোথায় যাচ্ছিস?
    হঠাৎ করে নিরাকে উঠে যেতে দেখে তরী প্রশ্ন ছুড়লো।

    নিরা চোখের পানি লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে মুচকি হেসে বলে উঠল:
    অশ্লীলতার রঙ মুছতে যাচ্ছি।
    তরী: মানে?
    নিরা: কালচারাল কমিটি থেকে অবসর নিতে আসি। ফিরে এসে আল্লাহর রঙে জীবন রাঙাবো ইনশাআল্লাহ।
    তরীর চোখ বেয়েও আনন্দের অশ্রু গড়ালো। সুবহানআল্লাহ! ইসলাম কতই না মধুর। যে একবার সেই মিষ্টতা অনুভব করতে পারে, তার কাছে দুনিয়া তুচ্ছ হয়ে যায়। কি করে কত বেশি মানুষকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া যায়, তাই ই হয়ে ওঠে তার একমাত্র লক্ষ্য।

    মাগরিবের আগে হোস্টেলে ফিরে নামায আদায় করে দুইজন। কিছুক্ষণ পড়াশোনা করে এশার নামায আদায় করে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে তরী। রাতের শেষভাগে রবের কাছে মনের আকুতি জানাতে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ে সে।

    নিরা কাঁদছে। তরী ঘুমের ঘোরেই না তাকিয়েও শুনতে পাচ্ছে তার ফুপানোর শব্দ। এক পশলা পবিত্রতার বাতাসে তরীর দুইচোখ ভার হয়ে এলো। না তরী চোখ খুলবেনা। আজ নিরাকে থামাবে না। কাঁদুক মন খুলে। কান্নার পানিতে ধুয়ে যাক সকল পাপের কালিমা। নিরা আজ কাঁদছে তাঁর প্রভুর কাছে। শুভ্র জায়নামায পেতে সিজদায় লুটিয়ে পড়েছে তওবার মওকুফি নিয়ে। একটা স্বস্তির হাসি হেসে তরী আরও শক্ত করে দুচোখ বুজল আগামীকাল একটা আলোর প্রভাত দেখার প্রত্যাশায়…

    5
    2 Comments
Skip to toolbar