Profile Photo

রাহেনা বেগমOffline

  • Rahena-Begum
  • Profile picture of রাহেনা বেগম

    রাহেনা বেগম

    2 years, 4 months ago

    কর্মক্ষেত্রে কর্মজীবীদের মানসিক স্বাস্থ্য সেবাঃ
    জীবন ধারণের জন্য একটা নির্দিষ্ট বয়সে আমারা কর্মজীবনে প্রবেশ করি।
    আনুষ্ঠানিক ভাবে কর্মজীবন এ প্রবেশের সময়ে একজন নাগরিককে যে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে আসতে হয় তা মোটামুটি আমরা সবারই জানি। এই প্রতিযোগিতায় প্রত্যাশিত চাকরি না পাবার ফলে অনেকেরই হতাশা বাড়ে। ছাত্রজীবন থেকেই নানারকম মানসিক চাপ, দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সাথে লড়াই শুরু হয়।পরবর্তীতে দেখা যায় লড়াই এর ক্ষমতা হারিয়ে অনেকে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। জীবন সংগ্রামে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার তীব্র চাপ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, মাদক, সমস্যার কথা খুলে বলার জন্য বিশ্বাসযোগ্য মানুষের অভাবসহ নানাধরনের কারণ এর পেছনে রয়েছে।
    এরপর ছাত্রজীবন শেষ করে একজন যখন পেশাগত জীবনে প্রবেশ করে তখন নতুন পরিবেশের সাথে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয় তাকে।কর্মক্ষেত্রেও মানসিক স্বাস্থ্য উপেক্ষিত থাকে। যে ছেলে বা মেয়েটিঅনেকক্ষেত্রেই অগোছালো জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল তাকে এখন একটি রুটিনমাফিক জীবন পরিচালনা করতে হয়। এই খাপ খাইয়ে নিতে না পারায় অনেকেই কাজের মাঝে আনন্দ খুঁজে পায় না, ফলে তার উৎপাদনশক্তি কমতে থাকে।কাগজে কলমে একজন কর্মজীবীর কর্মঘন্টা ৮ ঘন্টা হলেও বাস্তবে এর চেয়ে বেশি সময় অফিস আদালতে কাটাতে হয় আমাদেরকে। কর্মজীবন শুরুর পর জীবনের এক তৃতীয়াংশ সময় যেখানে কাটতে হয় সেখানে নিয়মিত কাজের বাইরেও তার অনেক ধরণের কাজে যুক্ত হবার প্রয়োজন পড়ে। কখনো কখনো কোন প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত চাপ নেবার বিষয়টিকে তার দক্ষতা ভেবে কর্মীর উপর চাপ বাড়িয়ে দেয়। অতিরিক্ত চাপ একজন কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে যা তার উৎপাদনশীলতা, কমস্পৃহা এবং সৃজনশীলতাকে মারাত্মকভাবে বাঁধাগ্রস্ত করতে পারে।
    আমাদের দেশেরবাস্তবতায়পরশ্রীকাতরতা বিষয়টি কর্মক্ষেত্রে বুলিং, বডি-শেমিং এর মত অপরাধগুলো ঘটিয়ে থাকে। একজন কর্মী তার সহকর্মীদের দ্বারা বুলিংয়ের শিকার হলে তার মনোজগতে এক মারাত্মক পরিবর্তন আসতে পারে। সে নিজেকে গুটিয়ে নেয়, অন্যদের সাথে মিশতে পারে না, কর্মউদ্দীপনা হারিয়ে ফেলে। ফলে সে অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে পড়ে। অনেকক্ষেত্রে কর্মীর ভেতরে অপরাধবোধ জন্ম নেয় এবং সে হতাশ হয়ে পড়ে। এ অবস্থা তাকে বিষণ্ণতার দিকে ধাবিত করে।
    কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এক বড় অন্তরায় হলো হয়রানি বা নিপীড়ন। কখনো কখনো এটি যৌন নিপীড়ন পর্যন্ত গড়ায়। এর ফলে একজন কর্মী কর্মক্ষেত্রেই নিরাপত্তাহীনতা এবং হীনমন্যতায় ভুগে। সে তার সমস্যা কাউকে বলতে না পারায় ভেতরে ভেতরে অসহায়বোধ করে। এর ফলে তার মধ্যে এক ধরণের ট্রমা তৈরি হয় যা তার মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নষ্ট করে দেয়। সে তার সহকর্মীদের অবিশ্বাস করতে শুরু করে এবং তাদের দ্বারা তার ক্ষতি হতে পারে এমন ভাবনাও ভাবতে পারে।
    কর্মক্ষেত্রে আর ও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘অফিস পলিটিক্স’ যেখানে কর্মীকে তাদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তোষামোদ করতে হয়, কর্তার মন জুগিয়ে চলতে হয় তা না হলে যেকোনও সময় চাকরি হারানোর ভয় থাকে। এই পলিটিক্সে একই কর্মক্ষেত্রে অবস্থানরত কর্মী, কর্মকর্তা থেকে শুরু করে উর্ধ্বতন, অধিঃনস্ত পর্যন্ত এক ধরনের দলাদলি কাজ করে যা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ অপেক্ষা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে। সমস্যা তৈরি হয় যখন একপক্ষ তার স্বার্থ উদ্ধারের জন্য অন্য পক্ষের উপর দোষ চাপায়, অন্যের ক্ষতি করতে চেষ্টা করে। এই পলিটিক্সের কারণে একজন কর্মী তার কর্মক্ষেত্রে কাউকে যেমন বিশ্বাস করতে পারেনা ঠিক তেমনি কারও কাছে সে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠে না। ফলে কর্মীদের ভেতরে এক ধরনের অবিশ্বাসের জন্ম নেয়, ভীতি কাজ করে, কর্মী নিজেকে গুটিয়ে রাখতে চায়, সমস্যার সমাধানে অগ্রসর না হয়ে সমস্যাকে পুষতে থাকে। এক সময় সে হতাশায় ভুগে।
    বেতন কাঠামোগত কারণে, পারিবারিক প্রয়োজনে, কর্মক্ষেত্রের দূরত্ব বিবেচনায় অনেকেই পরিবার থেকে দূরে তার কর্ম এলাকায় অবস্থান করে থাকে। কর্মজীবনে অনেক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও এমন উদাহরণ দেখা যায়। ফলে পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হয়,এবং ব্যক্তি একাকী হয়ে পড়ে যা তাকে অবসাদগ্রস্ত ও বিষণ্ণ করে তোলে।
    তাই আমাদের এখন সময় হয়েছে
    কর্মজীবীদের এসব সমস্যাগুলো নিয়ে ভাবার। একজন কর্মীর কাজের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠান তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করে থাকে। আর তাই কাজে নিযুক্ত ব্যক্তিদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সুরক্ষা দান করাটি প্রতিষ্ঠানের উপরই বর্তায়।
    আমাদের দেশের অনেক শিক্ষিত ব্যক্তির মাঝেও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক অসচেতনতা রয়েছে। স্বাস্থ্য বা সুস্বাস্থ্যের সংজ্ঞায় মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি প্রধান বিষয় হলেও এ বিষয়টিকে আমরা সচেতন কিংবা অসচেতন ভাবে এড়িয়ে যেতে চাই।
    যে কোন ব্যক্তি কর্মজীবনের কোন না কোন সময় এসে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারেন। অনেকক্ষেত্রে কর্মী পারিবারিক জীবন ও কর্মজীবনের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হন। অফিসের কাজে মনোযোগ দিতে পারেননা, ফলে তার উৎপাদনশীলতা সর্বোপরি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা নষ্ট হয়। এ সময়টিতে তার মানসিক সাপোর্ট ভীষণ ভাবে প্রয়োজন পড়ে। তবে বেশিরভাগক্ষেত্রেই অফিসের সহকর্মীদের কাছে সমস্যাগুলো খুলে বলার ক্ষেত্রে কর্মীর ভেতরে সংকোচ কাজ করতে পারে। কারণ এক্ষেত্রে অতি গোপণীয় কিছু বিষয় রয়েছে যা তার আত্মমর্যাদা, চাকরির নিরাপত্তার সাথে জড়িত থাকে। তাই এক্ষেত্রে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। তবে কাউন্সেলিং যে এক ধরনের মনোসামাজিক সেবা, সেটি ভুলে আমরা যেকোন পেশার মানুষই কাউন্সেলর হয়ে উঠতে চাই। যেটা কিনা খুব ভয়ংকর। মনে রাখতে হবে, কাউকে স্বান্তনা দেওয়া কিন্তু কাউন্সেলিং না। সত্যিকার সহমর্মিতা প্রকাশ করাটা বড় চ্যালেঞ্জিং। পাশাপাশি কোন ব্যক্তি বা কর্মীর ক্যারিয়ারে প্রভাব ফেলতে পারে এমন গোপনীয় এবং সংবেদনশীল বিষয়গুলো গোপনীয় রাখাও সবার পক্ষে সম্ভবপর হয় না। তার উপর আমাদের আগে থেকেই জাজমেন্টাল থাকার প্রবণতা ব্যক্তির সমস্যা সমাধানে তার নিজেস্ব বুদ্ধিমত্তা হঠাৎ কাউন্সেলর হয়ে উঠা ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তার প্রভাব কাজ করতে পারে যা ব্যক্তির সমস্যা সমাধানের ভুল পদ্ধতি। তাই কর্মজীবীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যায় প্রতিষ্ঠানসমূহকে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

    এসব বিষয়ে তাই প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি। তাহলে প্রতিষ্ঠান ও কর্মী উভয়েই লাভবান হবে। কর্মীরা যথাযথভাবে মানসিক চাপ মোকাবেলা করে নিজের ও অন্যের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখতে পারবেন। উন্নত বিশ্বে কর্মজীবিদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়।

    সুপারিশমালাঃ

    # মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা তৈরি করা।

    # কর্মীদের উপর মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক জরিপ করা।

    # কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবি নিয়োগ দেওয়া ।

    # কর্মক্ষেত্রে বুলিং বন্ধ করা।(বুলিংয়ের শিকার ব্যক্তির মধ্যে যে সব সমস্যা দেখা দেয়, তা হলো- কাজের গতি কমে যাওয়া, ব্যর্থতার পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ভয় পাওয়া, বারবার ভুল করা, বিষণ্ন থাকা, কাজে অনীহা, সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হওয়া, নিজের যোগ্যতা নিয়ে অবিশ্বাস তৈরি হওয়া, প্রতিষ্ঠানের বা মালিক পক্ষের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলা, মাথা ব্যথা, পিঠ ব্যথা, ঘুমের সমস্যা হওয়া ইত্যাদি।)

    # সকল ধরনের নিপীড়ন বন্ধের জন্য প্রতিষ্ঠানকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

    # কর্মক্ষেত্রে একঘেয়ে জীবনের পরিবর্তে প্রয়োজন সাপেক্ষে হাসি, আনন্দ এবং বিনোদনের ব্যবস্থা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
    # সরকারি ভাবে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে।
    # রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব প্রদান করতে হবে।
    # কর্মস্থলে সুস্থ, স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখার ব্যবস্থা করা।
    # মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা দেয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেয়া স্বাস্থ্যের সংজ্ঞা সংবলিত পোস্টার অফিসের ভেতরে দেয়ালে টানিয়ে রাখা যেতে পারে, যাতে করে অফিসের সবাই প্রতিনিয়ত এ বিষয়ে সজাগ থাকতে পারেন। কারণ মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অজ্ঞতা যে কোন দুর্যোগের চেয়ে কম ভয়াবহ না।
    # মনোবিজ্ঞানীদের মাধ্যমে নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করা। এরফলে একজন কর্মী মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, রাগনিয়ন্ত্রণ, আত্মবিশ্বাস অর্জন,বুলিং প্রতিরোধ করতে পারবেন এবং সমস্যায় পড়লে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারবেন, কাজের প্রতি কর্মীদের মনোযোগ বৃদ্ধি পাবে ও মনোবল বাড়বে। কাজের পরিবেশ সুন্দর হবে, সহিংসতা, বৈষম্য ইত্যাদি কমে আসবে এবং প্রতিষ্ঠান সমৃদ্ধশালী হবে।

    কর্মক্ষেত্রে আমাদের দিনেরএক-তৃতীয়াংশ সময় কাটে, তাই কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ যদি কর্মীর অনুকূল না হয় তবে তার কাজ করার আগ্রহ কমে যেতে পারে। দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, হতাশা তাকে গ্রাস করতে পারে। এই কারণে ই কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

    3
    2 Comments
    • সুন্দর পর্যবেক্ষণ! বর্তমানে অবশ্য আইটি সেক্টরে কাজের পরিবেশ বেশ উন্নত, এছাড়া কর্মীরা যেন আরো স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করতে পারে তাই বিভিন্ন প্রণোদনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

      • ধন্যবাদ আপনাকে । শুধু ১টা ২টা সেক্টরে হলে হবে না , সব সেক্টরে ই এমন পরিবেশ কাম্য।

Friends

Profile Photo
naznin shamim
@nazninshamim
Profile Photo
Md Mofiz
@mdmofiz
Profile Photo
MAHMUD HAYAT
@mahmudhayat
Profile Photo
wajibad
@wajibad
Profile Photo
MAHAJABIN AFROZE
@mahajabinafroze
Profile Photo
Intisar Jabed
@intisarjabed
Profile Photo
মেঘ
@megh
Skip to toolbar