-
প্রিয় রোহান,
শুভ জন্মদিন আব্বু।
আজ তুমি ১৪ বছরে পা দিলে। ২০০৯ সালের ১ লা জুলাই দুপুর ২ টার সময় তুমি জন্ম গ্রহণ করেছো। সেইদিন টা ছিলো মঙ্গলবার। কিন্তু আব্বু সেদিন তোমার পৃথিবীতে আসার কথা ছিলো না, আরও ২৩ দিন পরে তোমার আসার কথা ছিলো।
সেদিন কি হয়েছিলো শোন- আমার মনে নেই কি নিয়ে যেন আমি তোমার আব্বুর উপর খুব রেগে গিয়েছিলাম। খুব চিৎকার, চেঁচামেচি করছিলাম তোমার আব্বুর সাথে। তোমার নানি, বড়মামি, বড় মামা কেউ আমাকে থামাতে পারছিলো না।আসলে আব্বু, প্রেগন্যান্সিতে হঠাৎ করেই এস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টোরন হরমোন বেড়ে যায় তো, এই কারণেই হয়তো খুব সামান্য কারণে ই আমি রেগে গিয়েছিলাম।
তারপর আমার খুব ব্যথা শুরু হয়, বড় মামা তাড়াতাড়ি এম্বুলেন্স এর জন্য ফোন দেন। সেই সময়েও আমি তোমার আব্বুর সাথে কিছুতেই যাবো না বলে কান্নাকাটি করছিলাম। এরপর তোমার আব্বু, ভাইয়া, রুমকি( রুমকির কথা মনে আছে না তোমার? যে তোমাদের দুই ভাইয়ের সাথে খেলতো),বড় মামী আমাকে শারমিন নার্সিং হোমে নিয়ে যায়। তোমার ভাইয়া আর রুমকি না সারা রাস্তা কাঁদতে কাঁদতে গিয়েছিলো।আর তোমার আব্বু আমার হাত ধরে বসে ছিলো। এরপর তুমি পৃথিবীর আলো দেখলে, তোমার আব্বু আজান দিয়েছিলো। এত্ত ছোট তুমি হয়েছিলে যে! সোয়া দুই কেজি ওজন ছিলো তোমার। তুমি কি জানো – কে তোমাকে নার্সের কাছ থেকে প্রথম কোলে নিয়েছিলো? তোমার বড় মামি।তারপর তোমার আব্বু।
তোমার ভাই, তোমার থেকে মাত্র ২ বছর ৮ মাস ১৩ দিন এর বড়।
আমার আর তোমার আব্বুর জীবন পরিপূর্ণ হলো তোমাদের দুই ভাইকে পেয়ে।
তোমার আব্বু অফিসের কাজে বাহিরেই বেশী থাকতো,সিলেট, ময়মনসিংহ। আর আমার সময় কাটতো তোমাদেরকে নিয়ে। এত্ত কম ওজন ছিলো তোমাদের! তাই তোমাদের খাওয়া দাওয়া নিয়ে আমি খুব ব্যস্ত থাকতাম।
তোমার আম্মু টা খুব ভিতু ছিলো, তোমাদের অসুখ হলে অস্থির হয়ে যেতাম।
তোমার বয়স যখন ১ বছর ৭ মাস ২৩ দিন তখন আমি চাকরি শুরু করি।
খুব কষ্ট হতো আমার, তোমাদেরকে বাড়িতে রেখে অফিসে যেতে। বাহিরে কেউ কাঁদলেই আমার মনে হতো তুমি কাঁদছো।তাছাড়া প্রতিসপ্তাহে ভিক্টিম সাপোর্ট সেন্টার এ যেতাম, আর ছোট ছোট হারানো শিশু সেখানে আসতো। আমি কি কষ্ট পেতাম, সেই শিশু দের কে দেখে! আর শুধু মনে করতাম কেন তাদের আব্বু, আম্মু ঠিকানা শেখাই নাই? তাই, খুব ছোট বেলায় আমি তোমাদের দুই ভাইকে বাসার ঠিকানা, মোবাইল নাম্বার এবং আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে গেলে কি কি করবে, কিভাবে কার কাছে সাহায্য নিবে এগুলো শিখিয়েছিলাম।
তোমাদের দুইভাইকে পাসওয়ার্ড বলে দিয়েছিলাম, যেটা শুধু তোমরা এবং আমি আর তোমার আব্বু ই জানতাম।তোমার কোন ভাইরাই সেটা জানতো না, সেই ঘটনা কি তোমার মনে আছে আব্বু?
অফিস ট্যুরে যাওয়ার সময় মোবাইল তোমার ঘুমপাড়ানি গান রেকর্ড করে দিয়ে যেতাম। আয় আয় চাঁদ মামা.., চাঁদ উঠেছে, ফুল ফুটেছে…., রোহান যাবে শশুড় বাড়ি.. এমন আরো কত গান! যে গানগুলো শুনে, তোমার মাথার রেশমি চুলে হাত বুলিয়ে দিলে তুমি ঘুমাতে, তাই ট্যুরে যাওয়ার সময় তোমার আব্বুকে মাথায় হাত বুলিয়ে তোমাকে ঘুম দিতে বলতাম।
তুমি তখন আমাকে ছাড়া অনেক কষ্ট পেয়েছো জানি, কিন্তু এখন নিশ্চয় তুমি বুঝতে পেরেছো, চাকরিটা প্রতিটি মানুষের জন্যই প্রয়োজন। আমি বা অন্য আম্মুরা শুধু নিজের কারণে বা নিজের প্রয়োজনে চাকরি করেনা,পরিবার, সন্তানকে ভালো রাখা, বড় করার জন্যই আম্মুদের চাকরি করাটা জরুরি।
সেই কারণে আমি এবং তোমাদের আব্বু দুজনেই একমত হয়ে চাকরি শুরু করেছি।তোমার আব্বু তাঁর নিজের এনজিওগুলো দেখাশোনা করতো আর আমি অফিস করতাম।
প্রথম যেবার তোমাদের রেখে যশোর এ অফিসের কাজে গেলাম, তোমার আব্বু তোমাদের নিয়ে বাসে গিয়েছিলো, আর আমি অফিস কলিগদের সাথে অফিসের গাড়িতে।
তোমার আব্বু ই আমাকে ঠিক করে দিয়ে এসেছিলো, কোথায়,কোন হোটেলে থাকবো। আজও আমি যশোর এ গেলে সেখানেই থাকি।
আব্বু চিঠি টা অনেক বড় হয়ে গেছে কিন্তু আমার আরো অনেক কিছু লেখার ছিলো, অন্যকোনো দিন আবারও লেখবো, আচ্ছা?
তোমাদেরকে তো আমি এরিক বার্ন এর কথা বলেছি- Ego state, strokes, life position এগুলো তোমরা জানো। এরিক বার্ন life script সম্পর্কে তোমাদের বলা হয় নি।
আজ খুব সংক্ষিপ্ত ভাবে একটু বলি- একটা শিশু তার জীবনের প্রথম তিন থেকে চার বছরের মধ্যে অসচেতন ভাবে তার life script তৈরী করে, আর তাদের বাবা মা সেটা শক্তিশালী করে। অর্থাৎ আমাদের আচরণ, আমাদের ব্যবহার তোমার উপর কেমন ছিলো তার উপর ভিত্তি করেই তুমি তোমার life script বানিয়েছো। এরপর তোমার ৭ বছর বয়সে তুমি সেটাকে চেঞ্জ করছো, পলিশ করেছো। এবং এই ১৪ বছর বয়সে এসে তুমি আবারও সেটা চেঞ্জ, পলিশ করবে।
আসলে আব্বু, আমরা বাবা, মারা এখনো সঠিকভাবে সন্তানকে বুঝে লালন পালন করতে শিখিনি। তাই আমাদের ভুল ভ্রান্তির উপর নির্ভর করেই তোমরা তোমাদের life script তৈরি করো।
কিন্তু মজার বিষয় কি জানো? তুমিই যেহেতু পরিচালক তাই, তুমি যদি চাও তবে তোমার জীবন এর দৃশ্যপট পরিবর্তন করতে পারবে।
হ্যাঁ, আমি তোমার আম্মু হিসেবে দেখেছি – তুমি কিন্তু খুব সুন্দর ভাবে তোমার দৃশ্যপটগুলো সাজিয়ে নিচ্ছো।
ধন্যবাদ আব্বু।
আজ এ পর্যন্তই। আগামীতে তোমাকে আবারও লেখবো।
দেখেছো আব্বু! লেখতে লেখতে তো ২ তারিখ হয়ে গেলো!
অনেক অনেক আদর, ভালোবাসা শুভ কামনা তোমার জন্য।
ইতি
আম্মু০১/০৭/২০২২
7 Comments
Friends
Hasina Sultana Rima Rima
@hasinasultanarimarima
আনিকা মারজান ইরা
@anikamarjanera
Marketing Online
@marketingonline
Munmun Chakraborty
@munmunchakraborty
Md Babul Hossain
@mdbabulhossain
আনিকা ইসলাম হৃদিতা
@hridita
আয়মন সিদ্দিকা উর্মি
@asurmi85
Song For Peace
@songforpeace
Sahriar Rubaiat
@sahriarrubaiat


পুরনো চিঠি, কিন্তু আবেগটা এখনো টাটকা আছে! অভিনন্দন!