-
ঘটনা-১
রেহান, রোহান তখন খুব ছোট। রোহান মনে হয় ৮/৯ মাসের। ঈদ করতে শ্বশুড় বাড়ি যাবো, বিয়ের পরে একটা ঈদ মনে হয় বাবার বাড়িতে করেছি, কারণ ঈদের ২ দিন ( রোজার ঈদের) আগে রেহানের জন্ম তাই।
আমার কোন অভিযোগ ছিলো না ঈদ বাবার বাড়িতে না করতে পারার। কারণ ঈদের পরের দিনই বাবার বাড়ি নিয়ে যেত তুহিন।
– ঈদ করতে যারা ঢাকা থেকে যান তাদের বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না যে সেটা কতটা কষ্টের! তুহিন সারারাত স্টেশনে বিছানা বিছিয়ে বসে থেকে তারপর টিকিট কাটতো। প্রতিবারই টেলিভিশনে ওর সাক্ষাৎকার দেখা যেত।
সে যাক- ঈদে বাড়ি যাওয়ার আমার বিচিত্র অভিজ্ঞতা আছে,অন্যকোনো দিন সেগুলো বলা যাবে। আজকে যে ঘটনাটা বলছি সেটা হলো- বিমানবন্দর স্টেশন থেকে আমরা ট্রেনে উঠবো। আমি তুহিন, দুই ছেলে আর সাথে আমাদের দুজন সাহায্যকারী। একজন ছোট ১০ বছর আর একজন ১৫/১৬ বছরের।আমার কোলে রোহান, হাতে রেহান, কাঁধে ব্যাগ, ব্যাগের ফিতে ধরে আছে ১০ বছরের রুমকি( সাহায্যকারী) যেন ভীড়ে হারিয়ে না যায়, আর রুমকির হাত ধরে আছে জেমি( অন্য সাহায্যকারী)। যেন কেউ হারিয়ে না যায় ভীড়ে তাই এই ব্যবস্থা।
তুহিন ল্যাগেজ নিয়ে আছে। বিশাল বড় ল্যাগেজ। আর একটা কথা না বলে পারছিনা- আমি অন্যদের কাছে শুনেছি যে – মহিলারা প্রচুর জিনিস পত্র নিয়ে ভ্রমন করে, কিন্তু আমি বিয়ের পরে কখনো আমার ল্যাগেজ প্যাক করিনি।তুহিন সব গোছাতো। আমি নওগাঁ, রাজশাহীতে যেয়ে কোন দিন কি পড়বো, ছেলেরা, সাহায্যকারীরা কি পড়বে সব গুছিয়ে নিতো। আমি রাগ করতাম- এত বড় ল্যাগেজ নেওয়ার কি দরকার? বাপের বাড়ি, শ্বশুড় বাড়িতে আমাকে সবাই চেনে, আমি যেটাই পড়ি না কেন সবাই জানবে যে আমি রুনাই, অন্য কেউ না। কিন্তু তুহিন সে কথায় কান দেয় না, বলে – আমি ল্যাগেজ টানবো,তোমার কি সমস্যা? আমার সমস্যাই তো- ওর কষ্ট হয়, আমার সেটা ভালো লাগেতো না, সেটাতো মুখে বলতাম না।
যাক, তুহিন আমাদেরকে ট্রেন আসামাত্র একটা কামরায় কোন রকমে উঠিয়ে দিলো, আর ও উঠতে পারলো না। ও আমাকে বলে দিলো “আমি যেকোন কামরায় উঠবো, তুমি আস্তে আস্তে যেয়ে সিটে বসো।” সিটে যাওয়াতো দূরের কথা, আমরা গেটের কাছেই চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে আছি। ছোট ছেলে চিৎকার করে কাঁদছে, বড়টাকে লোকজন ঠেলেঠুলে ধাক্কা দিতে দিতে নিয়ে যাচ্ছে, রুমকি আমার কাঁধের ব্যাগের ফিতে টেনে ধরে আছে জন্য আমি ব্যথা পাচ্ছি, জেমি রুমকির হাতধরে টানছে, আর আমি ছোট ছেলেকে নিয়ে ভারসাম্য রাখতে পারছিনা। এর মধ্যে ট্রেন ছেড়ে দিলো। যেই ট্রেন ছেড়ে দিলো বড় ছেলে তার আব্বুর জন্য চিৎকার করে কান্না শুরু করে দিলো,তার আব্বু উঠতে পারেনি ভেবে। বড়ছেলের কান্না দেখে রুমকি এবং জেমি ও কান্না শুরু করে দিলো। সেই মুহুর্তে আমিও যেন আমার চিন্তা শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমি জানি আমি আমার গন্তব্যে একা যেতে পারবো, তুহিন না উঠলেও। তবু আমার যেন মনে হচ্ছিলো আমি তুহিনকে হারিয়ে ফেললাম, আর পাবো না ওকে। অনেক কষ্ট করে ও যখন আমাদের কামরায় আসে, আমি তখন অনেক রাগারাগি করেছিলাম ওর সাথে। বলেছিলাম- আমাকে দুই ছেলে সহ ছেড়ে দিয়ে তুমি কিভাবে চলে গেলে?
ঠিক এই রকম অনুভূতি হয়েছিল আমার ছোট বেলায় আমার আব্বা আমাকে ট্রেনের জানালা দিয়ে উঠিয়ে দিয়ে নিজে দরজা দিয়ে আসছিলেন, ওই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিলো আমি আমার আব্বাকে হারিয়ে ফেলেছি, আমি আর পাবো না আব্বাকে।
ঘটনা -২
কলকাতায় গিয়েছিলাম ২০১৬ বা ২০১৭এর পহেলা বৈশাখ এ। যেয়ে দেখা গেলো কোন হোটেলে সিট নেই। অনেক খোঁজা খুঁজি করেও পাচ্ছি না। শেষে একজন বললেন ভালো হোটেল আছে যেখানে সিট পাওয়া যাবে।তুহিন আমাকে আর দুছেলেকে ল্যাগেজ সহ দোকানে বসিয়ে রেখে সেই লোকের সাথে হোটেল দেখতে গেলো। আমরা তিনজন বসে আছি, তুহিন আসে না। রাতের বেলা, অন্য দেশ, তাছাড়া আমাদের তিনজনের পাসপোর্ট ও তুহিনের কাছে।ছেলেরা অস্থির হয়ে যাচ্ছে- আব্বু আসে না কেন? আর আমার মধ্যে সেই অনুভূতি – আমি তুহিনকে হারিয়ে ফেললাম, এখন আমি কি করবো? আর কখনো তুহিনের সাথে আমার দেখা হবে না।
প্রায় ১ ঘন্টা পরে যখন ও এলো আমি তখন অনেক রাগারাগি করেছিলাম ওর সাথে। কেন আমাকে দুই ছেলে সহ রেখে গেলো? ওকে ছাড়া আমরা কি করবো?গতকাল রোহানের জন্মদিন ছিলো। গতমাস থেকেই ও আমাকে ওর জন্মদিন এর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলো।
আমি আমার সাধ্যমত রোহান এর জন্মদিন পালন করার চেষ্টা করেছি।
কিন্তু গতকাল সারাদিন যে কোন কাজের মধ্যেই মনে হচ্ছিলো – কি রান্না করবো? কিভাবে করবো?
আমার মনে হচ্ছিলো – তুহিন এত দেরি করছে কেন? আমি কি ভাবে একা একা এগুলো করবো?
ও আসলে অনেক রাগারাগি করবো।
ও আসলে বলবো- কেন আমাদেরকে রেখে গেলে? আমি একা একা কিভাবে এত কিছু করব?
আমি জানি এই চিন্তা থেকে কিভাবে বের হয়ে আসতে হয়, কিন্তু গতকাল যেন আমি কিছুতেই আমার ভিতরে যে ভিডিও চলছিলো তার “Stop button “চাপতে পারছিলাম না।
৩ জুলাই’২০২১5 Comments
Friends
naznin shamim
@nazninshamim
Md Mofiz
@mdmofiz
MAHMUD HAYAT
@mahmudhayat
wajibad
@wajibad
MAHAJABIN AFROZE
@mahajabinafroze
সুবহা জাহান
@subhajahan
Intisar Jabed
@intisarjabed
মেঘ
@megh
রোদেলা শিশির
@rodelashishir



প্রিয়জনের শূন্যতা বলে আসলে কিছু হয় না কারণ তখন সে আরো বেশী মন জুড়ে থাকে।ট্রেন জার্নির বাজে অভিজ্ঞতা আমার অনেক এবং একই রাজশাহীগামী ট্রেনের। কয়েকবারের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর আমি ইদ মৌসুমে এসির টিকেট না পেলে যাবো না ঘোষনা দিয়েছি।