Profile Photo

শাহাদাতুর রহমান সোহেলOffline

  • sr.sohel
  • প্রযুক্তি, বুদ্ধিমত্তা ও কবিতা
    – উমাপদ কর May 8, 2024

    একটা মাটির কলসি হাতে ধরে ওপর থেকে মাটিতে ফেলে দেওয়া হলো। একটা ঘটনা। ফলশ্রুতিতে অসংখ্য টুকরোয় বিভাজিত হয়ে গেল কলসিটি। একটা পরিণাম। টুকরোর সংখ্যা কত অনেক ঝামেলা না-পোয়ালে কেউ বলতে পারবে না। তবে দুই থেকে অনেক, এটুকু বলা যায়, এমনকি গুঁড়ো পর্যন্ত। যে-কোনো সংখ্যা বললে, সেটা শুধু সম্ভাবনা। আরো কয়েকটা ব্যাপারও সংশ্লিষ্ট। যেমন, নাম ছিল কলসি, যা একটা কারিগরিতে নির্মিত হয়েছিল, এবং যার উপাদান মূলত মাটি। টুকরো হয়ে যাওয়ার পর উপাদান এক থাকলেও নাম গেল বদলে, খোলামকুচি বা খোলাকুচি। বদলে গেল শেপ বা আকৃতি। ছিল এক হয়ে গেল বহু এবং ভিন্ন। কলসটি হয়ে গেল স্মৃতি। বস্তু-গুণেও ঘটে গেল পরিবর্তন। এখন এই গোটা বিষয়টা কবিতার সঙ্গে রিলেট করতে চাইলে আমরা কী-কী অনুধাবনে সক্ষম হতে পারি? প্রথমত ঘটনাটি কবিতা নয়, তার পরিণামটিও কবিতা হতে পারে না। কিন্তু এই যে এক থেকে বহু হলো, সংখ্যা-গুণতিতে সম্ভাবনা দ্যাখা দিল, এবং বস্তুগুণে পরিবর্তন সূচিত হলো, তার সঙ্গে কবিতার একটা সূক্ষ্ম সম্পৃক্ততা কি আমাদের নজর এড়িয়ে যাবে? যাওয়া উচিৎ নয়। কলসি নির্মাণের কারিগরি কলসিকে করেছিল একটা নির্দিষ্ট আকৃতির তথা দৃশ্যতার। তার ছিল এক বিশেষ বস্তুগুণ, তরল ধরতে সক্ষম, জল ঠাণ্ডা রাখতে কুশলী, ঠুনকো, ভেঙে গেলে অকর্মক ইত্যাদি। খোলাকুচি তুচ্ছ, তার বস্তুগুণ নেই বললেই চলে, কিন্তু কুচির সংখ্যা-সম্ভাবনায় সে প্রাসঙ্গিক। সম্ভাবনা ও বস্তুগুণ কবিতা সৃষ্টি ও নির্মাণে একটা বড়ো ভূমিকা রাখে।

    কারিগরিতে জড়িয়ে থাকে মানুষের অনুসন্ধান ও আবিষ্কার। মানুষ তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে লব্ধ জ্ঞানের প্রয়োগ বাস্তবিক জীবনে ঘটান মানুষেরই নানা প্রয়োজন মেটাতে এবং ক্রমঅগ্রস্রমানতার উদ্দেশ্যে। ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন পড়ে বুদ্ধিমত্তার। নিয়ত সেই বুদ্ধিমত্তায় শান দেওয়া মানুষ তার প্রাথমিক প্রয়োগকৌশলে বারবার বিবর্তন ঘটান। অর্থাৎ ভাবনা ও উদ্দেশ্য এক থাকলেও প্রয়োগকৌশলের বিবর্তনে সৃষ্ট বস্তু নানা বিচিত্রতায় ভরে ওঠে। যেমন, মাটির কলসিটির আজ যে বিভিন্ন রূপ ও আকৃতি, প্রথমদিকে তা হয়তো ছিল না। এখানেও প্রয়োজন বুদ্ধিমত্তার।

    বিজ্ঞান আজ আমাদের জীবনে এক অবিসংবাদী উপস্থিতি। বিজ্ঞানের কাজ হাইপোথিকেশন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ফলানুসারে সিদ্ধান্ত নেওয়া। এই বিজ্ঞানের প্রায়োগিক দিক হচ্ছে প্রযুক্তি। যাকে কারিগরি বিদ্যা বললে ভুল হবে না। বিজ্ঞান ও মনুষ্য-সভ্যতা হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলেছে যুগ-যুগ ধরে। আর বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সুফল-কুফল পেতে হাত ধরতে হয় প্রযুক্তির। আবিষ্কারকে প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্ত করতে চাই বুদ্ধিমত্তা, সেও হয়ে ওঠে বিজ্ঞানরই একটা বিশেষ শাখা। এসব কথা আমরা সবাই জানি, মানি, নিত্যনতুনে অভ্যস্ত হই। এখন এর সঙ্গে কবিতার যোগ কোথায় এবং সেই যোগে প্রযুক্তি ও বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা কেমন, প্রভাবই বা কেমন তা নিয়ে আমরা ফিরে দেখতে পারি।

    শিল্প ও বিজ্ঞান বিভাগ হিসেবে দুটি হলেও এর মধ্যে কোনো দ্বৈরথ বা বৈরিতা নেই। দুটোই মানুষের প্রয়োজনে মনুষ্যসৃষ্ট। শিল্পের বিভিন্ন বিভাগ; যেমন সাহিত্য, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, সিনেমা ইত্যাদি। চিত্রকলার সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগ আছে; যেমন চিত্রকলার বিভিন্ন উপাদানই প্রযুক্তির উৎপাদন। কিন্তু তাতে তো চিত্রকলাটা হয় না। চিত্রকলা সম্পন্ন হতে পারে এক চিত্রশিল্পীর চিন্তা-চেতনা-ভাবনা-ইনিসিয়েশন-ড্রাইভ ইত্যাদির মিলিত স্পিরিটে। সেই শিল্পী যে জীবনযাপনটা করেন, তা ইত্যাকার প্রযুক্তি-সমৃদ্ধ সমাজে। ফলে তার প্রভাব সেখানে কিছু-না-কিছু থাকেই। যেমন, পাবলো পিকাসোর ‘গুয়ের্নিকা’ এই সমাজ ও সমাজচিন্তার সঙ্গে ওতপ্রোত এক শিল্প, যা যুদ্ধের ভয়াভয়তা যেমন তুলে ধরে একইসঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের বিরোধিতা করে। তা একদিকে শিল্প অন্যদিকে মানবতাবাদীদের জয়গান। ভাস্কর্যে প্রযুক্তির ভূমিকা ও প্রভাব আরও বেশি। কারণ প্রত্যেকেরই জানা। মাটি-পাথর-বিভিন্ন ধাতু-মোম একদিকে, অন্যদিকে ছেনি-হাতুড়ি-বাটালি-রাঁদাযন্ত্র-ড্রিলিং মেশিন ইত্যাদি-ইত্যাদি আর এই দুইয়ের মাঝে ভাস্কর্যশিল্পীসত্তা। যেমন, অগাস্টে রদিন (Auguste Rodin) এর ‘দ্য থিংকার’ (The Thinker) ভাস্কর্যটি ব্রোঞ্জ ধাতুতে নির্মিত। বসানো আছে এক পাথরখণ্ডের ওপর। নগ্ন পুরুষ প্রমাণ সাইজের। ডানদিকের কনুই বাঁ-দিকের থাইয়ের ওপর রাখা, সেই হাতটির উল্টোপিঠ থুঁতনিতে রাখা। যেন ভার বইছে মাথার। এই নির্মাণে প্রযুক্তির প্রয়োগ প্রত্যক্ষ এবং ভাবনাকেও সংহত করতে হয়েছে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখে, যেটা এক ভাস্কর্যশিল্পীর কাজের মধ্যে পড়ে। তো, এই থিংকার তো গোটা বিশ্বের চিন্তাভার মাথায় নিয়েই শিল্প। আর সে নিশ্চয়ই অনিষ্ট ভাবছে না, ভাবছে মানুষের কথা; তীব্র মানবিক আবেগ প্রকাশ পাচ্ছে তার প্রেম-উচ্ছ্বাস-বেদনা-দুঃখ আর উপশমের কথা মাথায় রেখেই। সেলুলয়েড ও সিনেমা দাঁড়িয়েই আছে প্রযুক্তির বিবর্তন, উন্নয়ন, ও দানের ওপর। এক শিল্পীর প্রকৃতি-মানুষ-সমাজ-লড়াই-বাঁচা আর তার টানাপোড়েনের চিন্তা-ভাবনার প্রায়োগিক দিকটাই আমরা দেখতে পাই পর্দায়। যেমন শিল্পী চার্লি চ্যাপলিন-এর ‘মডার্ন টাইমস’ ফিল্মটি। চার্লি চ্যাপলিন লিখিত ও পরিচালিত ১৯৩৬ সালের একটা পার্ট-টকি সোশ্যাল কমেডি চলচ্চিত্র এটি, যেখানে আইকনিক লিটল ট্রাম্প চরিত্রটির আধুনিক, শিল্পোন্নত বিশ্বে টিকে থাকার জন্য লড়াই-ই মুখ্য ভাবনা। আধুনিক, যান্ত্রিক বিশ্বে বিচ্ছিন্নতা পরিহার এবং মানবতা সংরক্ষণের সংগ্রাম; যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এখানে কিন্তু প্রযুক্তির শুধু গুণগানই নয়, তার কুফল থেকে মানুষের বেঁচে থাকার সমন্বয়তার কথাও বলা আছে।

    প্রযুক্তি-বুদ্ধিমত্তা ও শিল্প নিয়ে কিছু কথা হলো। শিল্পেরই আর একটা ভাগ সাহিত্য, যার আবার কয়েকটি উপভাগ রয়েছে, কবিতা যার একটি। আমাদের উদ্দেশ্য মূলত কবিতায় যাওয়া। সাহিত্য মূলত ভাষাশিল্প। ভাষাই এখানে শিল্পীর চিন্তা-ভাবনা-চেতনা-কল্পনা ইত্যাদির প্রয়োগ হাতিয়ার। গল্প-উপন্যাসের ক্ষেত্রে তো বলাই হয় ‘কথা সাহিত্য। কথা যা ভাষা থেকে জন্ম নেয়। এই ভাষা-সৃষ্টিতে প্রযুক্তির কোনো ভূমিকা নেই। মনুষ্য-ভাবনা ও তারই শরীরগত মাধ্যমে এবং প্রয়োজনে সৃষ্ট। ভাষা-সৃষ্টিতে বুদ্ধিমত্তার যথেষ্ট প্রয়োগ নিশ্চিতই আছে, এবং অভিজ্ঞতাজাত বুদ্ধির প্রয়োগে তার বিবর্তনও হয়ে চলেছে, কিন্তু প্রযুক্তির সেভাবে কোনো উপস্থিতি লক্ষ করা যায় না। উলটে সাহিত্যে প্রযুক্তির প্রভাব আমরা লক্ষ করে চলেছি। এখানে বুদ্ধিমত্তা বা মেধার প্রয়োজন পড়ছে প্রযুক্তি নিয়ে মনুষ্য-ভাবনা, তার নিরন্তর বিবর্তনে মনুষ্য-অবস্থান, তার প্রায়োগিক দিক নিয়ে সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থান, মনুষ্য-যাপনে নিরন্তর পরিবর্তন ইত্যাদি কীভাবে, কী উদ্দেশ্যে এবং দৃষ্টিভঙ্গিতে সাহিত্যে আসছে এবং আসবে তা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা, দক্ষতা আর মুনশিয়ানার জন্য। সর্বোপরি সেই ভাবনাকে শিল্পিত করার প্রয়োজনে।

    এবারে সরাসরি চলে আসব কবিতায়। (বাংলা কবিতা নিয়েই আমার আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখব) এর দুটি দিককে প্রথমে তুলে ধরি। (এক) কবিতা নির্মাণ নিজেই এক প্রযুক্তি। শব্দ ও ধ্বনি যার মৌলিক উপাদান। সেই উপাদানে সৃষ্ট ভাষা ভাবনাকে কীভাবে বয়ে নিয়ে যেতে পারে, সেটাই তার প্রযুক্তি। (দুই) প্রযুক্তির প্রভাব এবং সেই প্রভাব যাপন থেকে শিল্পী বেয়ে কীভাবে আসছে কবিতার মতো এক সুকুমার শিল্পে! এবং সেই প্রভাব-প্রয়োগ কেমন বুদ্ধিমত্তা তথা মেধাসঙ্গী হয়ে কবিতায় প্রতিভাত হচ্ছে! এর বিস্তৃত পর্যালোচনা জরুরি।

    উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগের পর কবি বিহারীলাল লিখেছিলেন— “সর্বদাই হুহু করে মন,/ বিশ্ব যেন মরুর মতন/ চারিদিকে ঝালাপালা/ উঃ কি জ্বলন্ত জ্বালা/ অগ্নিকুণ্ডে পতঙ্গ পতন।” সময়কাল বিচারে এই কবিতার সঙ্গে প্রযুক্তির কোনো যোগ নেই। কবিতা নির্মাণেই যা প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো হয়েছে। সবক্ষেত্রেই এই ব্যাপারটা কিন্তু আমাদের কনসিডারেশনে আনতে হবে। ১, প্রযুক্তির প্রভাব ও প্রয়োগ, ভাবনায়-অনুষঙ্গে-শব্দে-কৌশলে ইত্যাদি। ২, কবিতাটি রচিত হওয়ার প্রযুক্তি বা ভাবনার প্রয়োগসংক্রান্ত চিন্তাচেতনা। আজকের কোনো নাগরিক যাপনে অভ্যস্ত কবিরও মানসিক অবস্থান এমনই হতে পারে। মন হুহু করা, মরুবিশ্ব হিসেবে ভুবন দ্যাখা, জ্বালাযন্ত্রণায় বিদ্ধ হওয়ার মানসিক অবস্থান। বিহারীলাল যে উপমায় সেই অবস্থানকে বোঝাতে ‘অগ্নিকুণ্ড’এনেছেন; নাগরিক জীবনের আজকের সময়ের কবি এই ‘অগ্নিকুণ্ড’-টি বদলে দিতে বাধ্য হবেন, তার দ্যাখায়, অভিজ্ঞতায়। তিনি হয়তো প্রয়োগ করলেন— ‘ভেপারল্যাম্পে পতঙ্গ পতন, বা এই ধরনের কিছু। উপাদানটি বদলে দিল আমাদের জীবনে প্রযুক্তির প্রয়োগ।

    আবার বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে রবীন্দ্রনাথের ‘হঠাৎ দেখা’কবিতাটা শুরু হচ্ছে “রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা, ভাবিনি সম্ভব হবে কোনোদিন। ভারতবর্ষে রেলগাড়ির পত্তন হয়ে গেছে সেইসময়ে, যা বিজ্ঞানের প্রযুক্তিগত দিক থেকে এক বিপ্লব বলা যায়। আর সেই প্রযুক্তির সামান্য প্রয়োগ এই কবিতায়। আমি জানি, কবিতার ভাবগত অবস্থানে দর্শনে এই রেলগাড়ির কামরা একটা পরিসর মাত্র। কিন্তু প্রযুক্ত হলো। পার্ক, রাস্তা এসব জায়গাতেও দ্যাখা হতে পারত। কিন্তু কবি রেলগাড়িকেই সাব্যস্ত করেছেন, হয়তো চলমানতার কথা ভেবে, হয়তো সেই অমোঘ বক্তব্যটি রাখার পর একা হয়ে যেতে। কারণ, যাই থাক প্রযুক্ত হলো, অনুষঙ্গ হিসেবে। সুতরাং কবিতায় প্রযুক্তির প্রয়োগ ও প্রভাব কালানুসারে। প্রযুক্তির নিত্যনতুনতায়।

    কবি বিনয় মজুমদারের কবিতায় গণিত-ভাবনা একটি বৈশিষ্ট্য। বাংলা কবিতায় বিজ্ঞান-বিভাগের গাণিতিক ও জ্যামিতিক নানা তত্ত্বের এমন প্রয়োগ তাঁর আগে আর তেমন দ্যাখা যায়নি। সেক্ষেত্রে তিনি এর পাইয়োনিয়ার বলা যায়। গণিত ও জ্যামিতি দুই-ই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। গণিত-জ্যামিতির যে বিচিত্রতা, বৈভব ও তত্ত্ব তা কবিতায় প্রযুক্ত হয়ে তাকে কাঠখোট্টা যুক্তির জালে ফেলছে কিনা, তার কাব্যরসকে বিনষ্ট করছে কিনা, সেটা লক্ষ করার বিষয় অবশ্যই। সেক্ষেত্রে এই কবি একটা মাত্রা ছুঁয়েছেন। লিখছেন—

    “X=0
    এবং Y=0
    বা X=0=Y
    বা X=Y
    শূন্য 0 থেকে প্রাণী X ও Y সৃষ্টি হলো
    এই ভাবে বিশ্ব সৃষ্টি শুরু হয়েছিল”। (‘একটি গান’/ এখন দ্বিতীয় শৈশবে)

    জ্যামিতি নিয়েও তাঁর কাজ রয়েছে। জ্যামিতির উপপাদ্য, সম্পাদ্য ও বিভিন্ন আকৃতি এবং তাদের গঠন-বিগঠন সংকেতধর্মী আবার রূপকও। সংকেত ও রূপক সৃষ্টির দৃষ্টিভঙ্গিতে দ্যাখা সমাজ-মানুষ ও সর্বোপরি প্রকৃতি আর তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও টানাপোড়েন তুলে ধরে কবিতাকরণ প্রযুক্তিরই ব্যবহার এবং কবিতায় তারই প্রভাব। পরবর্তীকালে আমাদের বন্ধু কবি রতন দাসও কিছু জ্যামিতিক কবিতা লিখেছেন। তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থের নাম ‘পিরামিড ও অন্যান্য কবিতা, পিরামিড প্রাচীন প্রযুক্তিনির্ভর এক স্থাপত্যকে রেফার করে। রতন লেখে— “শহরের নতুন নাম হয়/ পিরামিড—/ আমরা সকলে মমি হয়ে শুয়ে থাকি পিরামিডের ভেতর…/ ভীষণ শান্ত/ ভীষণ ঠাণ্ডা…”।

    বিংশ শতাব্দীর শেষ পাদ থেকে আজ অবধি (প্রায় পঞ্চাশ বছর) ভারতে ক্রমাগত প্রযুক্তির যে বাড়-বাড়ন্ত, কখনো-কখনো যা গ্যালপিং, তাতেই অভ্যস্ত হয়েছে মানুষ, প্রযুক্তির সুফল-কুফল দুই-ই তাকে আচ্ছন্ন করেছে। একদিকে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং তার প্রতি মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতা; অন্যদিকে ব্যক্তি-চাওয়া নির্বিশেষে সমাজে-অর্থনীতিতে সেঁধিয়ে যাওয়া উপভোগ্যতা; আর এর মধ্যেই প্রথম-জীবনের যাপনের অভ্যাস, তার মননেও প্রভাব ফেলতে বাধ্য। তাই প্রযুক্তির নানাদিক, বিচিত্রতা, ভালো-মন্দ, সুবিধা-অসুবিধা সবই ভাবনায় স্থান পাচ্ছে, যা কবিতায় প্রতিফলিত হচ্ছে শিল্পীতভাবে। কখনো-সখনো বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কবিতায় প্রযুক্ত হচ্ছে প্রযুক্তিবিজ্ঞানের নানা নাম, ক্রিয়াকলাপ, অনুষঙ্গ হিসেবে। জীবনে-যাপনে থাকবে অস্তিত্বময় হয়ে, কবিতায় থাকবে না তার প্রভাব, এমনটা হতে পারে না, হয়ওনি। খুব সামান্য কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা আবশ্যক। কিন্তু এখানে এসে থমকে দাঁড়াতেই হবে। এতসব কবি এই সমস্ত ক্রাইটেরিয়া পূরণ করে কবিতা লিখেছেন এবং লিখে চলেছেন যার সব আমি পড়িনি। যা পড়েছি, তাও কম নয়, কিন্তু সবাইকে উদ্ধৃত করা সম্ভব নয়, করছিও না। সামান্য কয়েকজনের—

    ক) কবি সুশীল ভৌমিকের এক পঙক্তির একটি কবিতা— “টাইপ-রাইটার তার কাছে মা-বাবা, ভাই-বোন…। প্রযুক্তির উৎপাদন ‘টাইপ-রাইটার’ কবিতায় মুখ্যভাবে প্রযুক্ত হয়ে কত বহুমুখ খুলে ধরছে। সমাজের একটা বিশেষ শ্রেণি-অবস্থানের নানা সম্ভাবনাকে চিহ্নিত করছে। আর একটি কবিতার প্রথম চার পঙক্তিও বড়ো ব্যঞ্জনাময়— “সমস্ত কথা বেরিয়ে আসছে/ ট্রেডল মেশিন থেকে—/ সর্পিল রাস্তা— সিঁড়ি— ঘরে একাকীত্ব/ কথার আলো ও আঁধার ক্রমাগত দীর্ঘ হচ্ছে উত্তর-দক্ষিণে”।

    খ) কবি বারীন ঘোষাল তাঁর একটা কবিতার বইয়ের নাম রেখেছেন ‘মাউসনামা’। আমরা ‘আকবর নামা’ শুনেছি; মাউসনামা এই প্রথম। বোঝাই যাচ্ছে প্রযুক্তির দুনিয়ায় মাউস একটি চরিত্র হয়ে উঠেছে। লিখছেন—“সত্যিই তো কার কী যদি মাউস নামে/ যদি সঙ্গমে সোনার গম খুলু খুলু যায়”। অসাধারণ এক প্রয়োগ। কে না-জানে এই মাউসেই নিয়ন্ত্রিত আজকের সমাজ ও অর্থনীতি।

    গ) কবি প্রবীর রায় তাঁর ‘সুর্মাচোখ কবিতায় লিখছেন— “রাস্তা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে ছালওঠা রক্তখন্দ গুটিয়ে যাচ্ছে পথ/ এখানে কি রানওয়ে হবে কোনদিকে উড়ে যাবে আমাদের চোখ/#/ স্বপ্নকামুকতার এই ছবি এই প্লাস্টিক-ছবি। প্লাস্টিক-ছবি শুধু কোনো প্রতীক নয়, সমস্ত সামাজিক আয়োজনের প্রতিভূ যেন, যা যুগান্তকারী এক প্রযুক্তির দান।

    ঘ) কবি সৌমিত্র সেনগুপ্ত তাঁর কবিতার বই ‘পেসমেকার-এ পেসমেকারপ্রাপ্ত (চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রযুক্তির প্রাণদায়ী এক উৎপাদন) এক মানুষের নানা অভিজ্ঞতার অনুভব ও অভিব্যক্তি তুলে ধরেছেন। “সেলাম হে রাত পোশাক/ পেসমেকার রীমে যতদূর/ বিটস্/ টাচ্উড/ তোমাতেই শুধু।

    অনেক হলো। এবারে পাততাড়ি গুটোনোর পালা। মোদ্দা কথাগুলি এমনই— কবিতা নির্মাণে নিজস্ব প্রযুক্তি বিদ্যমান বিভিন্ন ধারায় এবং পন্থায়। বিজ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তি মানুষের আবিষ্কার ও প্রাত্যহিক জীবনের অঙ্গ ও অংশ। কবিতা যাপন ও যাপনের সম্ভাবনা-জাত; তাই তার উপস্থিতি ও প্রভাব কবিতায় থাকা স্বাভাবিকত্বের মধ্যে পড়ে। এই প্রয়োগ ব্যক্তিনির্ভর, যেখানে বুদ্ধিমত্তা তথা মেধার একটা ভূমিকা রয়েছে। তবে এ-ও ঠিক, কবিতা ইনফরমেশন নয়, নয় পণ্ডিতি দ্যাখানোর জায়গা। বুদ্ধি নয় বুদ্ধির দীপ্তি থাকুক কবিতায়। উইট থাকুক বহমানতায়, আরোপিত হয়ে নয়। সুষম মজা থাক। বুদ্ধির যুক্তিতর্ক নয়, নিষ্পত্তি নয়, শুধু কবিতা থাকুক কবিতা হয়ে।
    Source:

    তুলট অক্টোবর ২০২৪

    7
    3 Comments
    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন! আপনার এই লেখাটি আজ 20 October 2024 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

Skip to toolbar