Profile Photo

রাহেনা বেগমOffline

  • Rahena-Begum
  • Profile picture of রাহেনা বেগম

    রাহেনা বেগম

    1 year, 7 months ago

    আমি বিয়ের পরে যখন পতিদেবের হাত ধরে রাজশাহী থেকে ঢাকা আসলাম, তখন সাথে করে এক বিশাল ট্রাংক নিয়ে এসেছিলাম। যা ভর্তি ছিলো গল্পের বই। বেচারা পতিদেব বহু কষ্ট করে সেই বই ভর্তি ট্রাংক নিচ থেকে পাঁচ তলায় তুলেছিল। জানিনা তখন তাঁর মনে কি ইচ্ছে হচ্ছিল? অনুমান করতে তো দোষ নেই, হয়তো ভাবছিল “যদি এই ট্রাংক ভর্তি হিরা জহরত থাকতো, তাও কথা ছিল, কিন্তু আছেতো শুধুই বই! তাঁর জন্য এত কষ্ট?”

    কিন্তু এগুলো যে আমার কাছে হিরা, যহরতের চেয়েও বেশি দামি। আমাদের বাসায় বিশাল ডাকাতি হয়েছিল – ডাকাতির পর আমি ছড়ানো ছিটানো ঘরের জিনিস পত্র দেখে ছুটে গেছি বই এর শেলফ্ দেখতে, এবং চিৎকার করে বলেছি- আমার একটা বই পাচ্ছিনা। তখন আমার বড় ছেলে বললো – আম্মু চোর কেন বই চুরি করবে? বই পড়লে তো চোর আর চুরি করতো না।” একদম খাঁটি কথা। পরে অবশ্য বইটা পেয়েছি, আমার ভাগ্নে নিয়ে গিয়েছিল।

    আমি লাইব্রেরী সাইন্স-এ ও ডিপ্লোমা করেছিলাম। তাই বইয়ের কিভাবে যত্ন নিতে হয় আর বই কিভাবে সাজাতে হয়, ইত্যাদি বিষয়গুলো জানতাম। জানতাম বলছি কারণ আমি এখন সবই ভুলে গেছি। আমি অনেক আগে থেকেই “দেবী”র লিখকের বই পড়ি। শুধু পড়ি না মুখস্ত করে ফেলি। একই বই যে কতবার পড়ি তার হিসেব নেই। এখন অবশ্য মনে থাকে না, বয়সের দোষ আর কি।

    বই মেলায় লিখকের বই বের হতো আর আমি আম্মার কাছে ঘ্যান ঘ্যান করতে থাকতাম টাকার জন্য। রাজশাহীর “বুকস প্যালেস” থেকেই বেশি বই
    কিনতাম। ওহ্ মামার দোকান থেকেও বই কিনতাম, তবে মামার দোকানের নাম মনে নেই, ভুলে গেছি।
    রাতে পড়াশুনা শেষ হলে রাত ২ টা ৩ টার দিকে গল্পের বই পড়তাম। নতুন বই কিনে কতবার যে বইয়ের গন্ধ নিতাম! অল্প অল্প করে সেই বই পড়তাম। পড়ে ফেললেইতো শেষ! তাই অল্প অল্প করে পড়তাম। রাত দুপুরে বই পড়ে জোরে জোরে হাসতেই থাকতাম, পাশের রুম থেকে আম্মা চলে আসতেন। বলতেন এত রাতে কি পড়ে হাসছিস্? কি লিখা আছে বই-এ?
    বই পড়ে আমার গুড়ের চা খাওয়ার ইচ্ছা দেখা দিল, মনে হলো এই রাতেই আমার গুড়ের চা খেতেই হবে, না হলে আমার জীবন বৃথা।

    বই-এর প্রভাব বিয়ের পরে খুব বেশি করে পড়েছে। আমি আমার পতিদেবের মুখ থেকে জানতে চাইতাম সে যেন বলে এই পৃথিবীতে যদি ১০ জন ভালো মেয়ের নামের তালিকা তৈরি করা হয় তবে তার মধ্যে তোমার নাম থাকবে। কিন্তু সে আজ পর্যন্ত এ কথা বললোনা। অথবা জোছনা রাতে দু’জন জেগে গল্প করে কাঁটাবো, না তাও হয়নি, একথা শুনে তিনি বলেছিলেন – বিশেষ এক শ্রেণীর প্রাণীরা রাত জেগে থাকে, আমি কেন শুধু শুধু রাত জাগতে যাবো? অথবা ছায়াবীথির নায়লার মত পতিদেবের অফিসে চলে যেতাম খাওয়ার নিয়ে, ইচ্ছে করতো তাঁকে নিয়ে তাঁর অফিসে খাবো। কিন্তু আমার পতিদেব নায়লারটার চেয়েও এককাঁদি উপরে, তিনি খাওয়ার নিয়ে রেখে দিয়ে আমাকে রিক্সায় করে বাসায় পাঠিয়ে দিতেন।

    এই অফিসে যখন ঢুকলাম তখন এক কলিগ পেলাম, যার নাম লেখকের বই এ পড়েছি, সে একটা বাচ্চা মেয়ে, প্রথম থেকেই আমার সাথে তার ভাব হয়ে গেল। এত মজা করে কথা বলতো, আমি মনে মনে বলতাম, এর মা – বাবা মনে হয় লেখকের ভক্ত, তাই ওর নাম রেখেছে লেখকের বই থেকে। পরে জানতে পারলাম সে লেখকের নিজের ভাগ্নি। যেহেতু, তখন লেখক অন্য রকম জীবন যাপন করছিলেন তাই, সে পরিচয় দিতোনা। তাঁর মামা বেঁচে থাকা অবস্থায় তার মামা সম্পর্কে কখনো কোন কথা হয়নি আমাদের মধ্যে। আমি প্রায় ওর হাত ধরে থাকতাম, মনে হতো এই হাত তাঁর মামা কত আদর, মমতায় ধরতেন! লেখকের সাথে দেখা, তাঁর অটোগ্রাফ নেওয়া এগুলোর কোনো ইচ্ছা আমার কখনোই হয়না। লেখকের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমার কখনও কোন মাথা ব্যাথা নেই।

    লেখকের স্বার্থকতা হলো সেখানেই যেখানে তিনি তাঁর চরিত্র গুলোকে পাঠকের হৃদয়ে বসিয়ে দিতে পারেন।এবং তিনি তা পেরেছেন। আমি “অপেক্ষার” সুপ্রভার মৃত্যুতে কষ্ট পেয়েছি এবং এখনও পাই, বাকের ভাই-এর ফাঁসি মেনে নিতে পারিনা, এই রকম সব চরিত্র গুলো যেন আমার আপন কেউ! এখানেই লেখকের স্বার্থকতা। এখানেই তাঁরা অমর। তাঁরা চিরজীবন বেঁচে থাকেন তাঁদের গল্পের চরিত্রের মাঝে। লেখকের “কৃষ্ণপক্ষ” আমার খুবই পছন্দের। এখানে অরু একটা দুঃস্বপ্ন দেখে- পাঞ্জাবিতে সুতার কাজ করছে, সূচ বার বার আঙ্গুলে ফুঁটে যাচ্ছে, রক্ত বের হচ্ছে, সেই রক্তে পাঞ্জাবি মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে। আমি যতবারই পড়ি এখানে আসলেই আমার মন খারাপ হয়ে যায়। আমি যখন জানতে পারলাম এটা নিয়ে মুভি হচ্ছে তখন এই জায়গার অপেক্ষায় থাকলাম। আমার মনে আছে মুভিটা দেখে আমি হতাশ। আমার পছন্দ হয়নি, আমার কল্পনার সাথে মিলেনি। এটাই লেখকের স্বার্থকতা। তিনি তার গল্পে পাঠক কে স্বাধিনতা দিয়েছেন কল্পনার। ঠিক তেমনি আমি ‘দেবী’ দেখার ইচ্ছাও রাখিনা, কারণ আমার কল্পনার সাথে তার মিল পাবোনা। পাত্র-পাত্রীই আমার কল্পনার সাথে মিলেনি, মুভি আর কি মিলবে? আমার চোখে ‘মিসির আলী’ জনাব আবুল হায়াত। ‘রানু’ আফসানা মিমি, ‘নিলু’ তারানা হালিম, ‘সাবেত’ মাহফুজ আনাম, রানুর স্বামী জাহিদ হাসান। মানি এদের বয়সের সাথে চরিত্র গুলোর বয়স মেলে না, তবুও আমি তাদেরই কল্পনায় দেখি। আমার কাছে হিমু হলো – জনাব আসাদুজ্জামান নূর।

    এটা আমার কল্পনা, আমার স্বাধিনতা। আমি আমার কল্পনার ব্যবচ্ছেদ দেখতে চাইনা। আমি কোনো সিনেমা বোদ্ধা নই, আমি একজন অতি সাধারণ পাঠক। যারা সিনেপ্লেক্সে বসে দেবী দেখছে, তাঁদের ক’জন লেখকের বইটা কল্পনার চোখে পড়েছেন আমি জানিনা।
    বিঃদ্রঃ এটা সম্পূর্ণ আমার মতামত। আমার কল্পনার সাথে অন্যেরা কল্পনা করে মন্তব্য করবেন না। আপনার কল্পনার ঘুড়ি আপনি উড়ান।

    4
    1 Comment
    • একটি উপন্যাস থেকে ছবি করা কষ্টসাধ্য বিষয়। যথেষ্ট পরিশ্রমের বিষয়। আমি যখন সত্যজিৎ রায়ের গল্প পরেছি তখন দেখেছি তিনি প্রতিটি দৃশ্য কল্প চিন্তা করতেন তাঁর আঁকা স্কেচে তা ফুটে উঠত নিখুঁত ভাবে। কিন্তু তাঁর মানের আরেকজন খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। আমার নিজেরও উপন্যাস পড়ার পর দেখা সিনেমা গুলো ভালো লাগে না। কল্পনার সাথে মেলে না। এক্ষেত্রে সত্যজিৎ ব্যাতিক্রম। বিভূতিভূষণের মতো সাহিত্যের কালপুরুষের উপন্যাস নিয়ে কাজ করার সাহস সবার হবে না। তবে দেবী উপন্যাসের আদলে যে সিনেমাটি করেছে জয়া আহসান তা আমার পছন্দ হয়েছে। অনেকেরই মতামত হয়ত ভিন্ন হবে। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে শব্দের নিরীক্ষা ভিত্তিক কাজ। আমি বলব আধুনিক সময়ের প্রেক্ষাপটে দেবী সিনেমাটি উপন্যাসের মুল ভাব বিকৃত করে নি। সত্যি বলতে আমার ভালোও লেগেছে। তবে উপন্যাসে পাঠকের একটা কল্পনার জগত থাকে, সিনেমায় সেটি সীমাবদ্ধ।
      আমার ব্যক্তিগত মতামত।
      বরাবরের মতোই আপনার লেখা পরে ভালো লাগলো। শুভ কামনা।

Skip to toolbar