Profile Photo

মোহাম্মদ শাহজামান শুভOffline

  • Mohammad-Shahzaman
  • ফেসবুকপুরের টুম্পা বউদি বনাম শুভ

    ফেসবুকপুর এক অদ্ভুত রাজ্য। এই রাজ্যের মানুষ শুধু বাস্তবের নয়, মনেরও বাসিন্দা। এখানে কেউ রাতের বেলা বিছানায় শুয়ে থাকে, অথচ মন পড়ে থাকে স্ক্রিনের ভেতরে। কেউ আবার নিজেকে খুব জ্ঞানী ভাবলেও, লাইক-কমেন্টের ভিক্ষা না পেয়ে হাপিত্যেশ করে।
    এই ফেসবুকপুরে ছিল দুই রকম মানুষ।
    একপাশে ছিল শুভ। কলেজের শিক্ষক। বই পড়াই তার নেশা, কবিতা লেখাই তার ভালবাসা। ছেলেমেয়েদের কাছে আইডল। সে ভাবতো, “ভাল কথা, ভাল চিন্তা, ভাল কনটেন্ট একদিন মানুষের মন ছুঁবেই।”
    রোজ সকালে শুভ ঘুম থেকে উঠে একটা সমাজ সচেতনতামূলক পোস্ট করত —
    “মানুষের ভিতর মানুষ হওয়াটাই সবচেয়ে জরুরি।”
    দুপুরে কবিতা —
    “ভালোবাসার ভাষা কখনো বিকৃত হয় না।”
    রাতে সমাজ বদলের বার্তা —
    “নারী মানে শুধু শরীর নয়, নারী মানে শক্তি, মেধা, সত্তা।”
    লাইক ১৫টা।
    কমেন্ট ২টা —
    ১। “দারুণ লিখেছেন, স্যার!”
    ২। “নাইটি পরে বললে ভিউ পেতেন!” (এইটা শুভর হৃদয়ে ছুরি চালিয়ে যেত)
    আর একদিকে ছিল ফেসবুকপুরের কুইন — টুম্পা বউদি। ওর পরিচিত নাম “এনজেল কুইন”। কাজ? কিছুই না! সকালে নাইটি পরে ছাদে দাঁড়িয়ে বলবে —
    “দেওর কি বলল জানেন?”
    ভিডিও শেষ হতেই আবার —
    “কালকে জানাব!”
    বাস, ভিউ ৩ মিলিয়ন।
    কমেন্ট ২৫ হাজার —
    “বউদি কালকের অপেক্ষায় রইলাম!”
    “দেওর কই?”
    “মনটা একদম নরম রে বউদি!”
    টুম্পা বউদি জানত, এই সমাজ কী চায়। শরীরের হালকা ইশারা, একটু ডায়লগ, ব্যাস… হয়ে গেল ইনকাম।
    শুভ মাঝে মাঝে বসে ভাবতো —
    “আমি কি ভুল সময়ে জন্মেছি? কন্টেন্ট কি শুধু শরীর আর অভিনয়ের হয়ে গেছে?”
    একদিন সে পোস্ট দিল —
    “নৈতিকতা আর জ্ঞান আজকের দিনে জিরো রিচ পায়।”
    ফেসবুকের এক ভাই কমেন্ট করল —
    “দাদা, একটা নাইটি কিনে ফেলুন। কাল সকালেই ভাইরাল।”
    শুভ চুপ করে গেল। মনে মনে কষ্ট পেলেও জানত — এটাকে সে পারবে না।
    এদিকে টুম্পা বউদি আবার নতুন ভিডিও দিয়েছে —
    “আজ দেওর যা চাইল…আমি অবাক!”
    লোকজন আবার হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
    এভাবেই চলছিল ফেসবুকপুর। শুভর মত লোকেরা কোণঠাসা, আর টুম্পা বউদিরা রাজত্ব করছে।
    কিন্তু দিন বদলাতে শুরু করল অদ্ভুতভাবে।
    একদিন টুম্পা বউদির দেওর — মানে যে ছেলেটা মাঝে মাঝে ভিডিওতে দেখা যেত — সে লাইভে এসে কাঁদতে কাঁদতে বলল —
    “আপনারা তো শুধু হাসছেন। জানেন আমার বৌ আমাকে ছেড়ে চলে গেছে এই ভিডিওর জন্য!”
    মানুষ হঠাৎ থমকে গেল।
    একটা ভাইরাল ভিডিওর পিছনের ট্র্যাজেডি দেখতে পেল সবাই।
    এরপর এক মেয়ে লাইভে এসে বলল —
    “আমি নাইটি পরে ভিডিও করতাম, কারণ সবাই তা-ই চায়। আজ বাড়ির লোক কথা বন্ধ করেছে। বন্ধু হারিয়েছি।”
    শুভ চুপচাপ এসব দেখছিল।
    তারপর একদিন সে একটা নতুন ভিডিও বানালো।
    কনটেন্ট ছিল —
    “ভাল থাকার সহজ ফর্মুলা। নিজেকে সম্মান করুন, নিজের পরিবারকে ভালবাসুন। শরীর বিক্রি করে পাওয়া ভিউ কখনো আত্মসম্মান ফিরিয়ে দেয় না।”
    অবিশ্বাস্যভাবে ভিডিও ভাইরাল হল।
    কমেন্ট এল হাজার হাজার —
    “এটাই সত্যি কথা, স্যার!”
    “এবার থেকে এইসব ভিডিওই চাই!”
    “বউদিরাও শিখুক কিছু!”
    টুম্পা বউদি সেই ভিডিও দেখে থমকে গেল। পরের দিন সে নিজেই লাইভে এসে বলল —
    “আজ থেকে নতুন আমি। আমি আর নাইটি পরে ‘দেওর কাহিনী’ শোনাব না। আমি আমার পরিচয়ে ফিরে যাব।”
    শুভ মুচকি হাসলো।
    এই ছিল ফেসবুকপুরের নতুন ইতিহাস।
    কারণ ভাল কনটেন্ট কখনও মরে না। হয়তো সময় লাগে, ধৈর্য লাগে, কিন্তু শেষ হাসি সেই মানুষটিই হাসে, যে নিজের আত্মসম্মানকে বিক্রি না করে লড়াই করে যায়।
    আজ ফেসবুকপুরে শুভর পোস্টে লাইক পড়ে হাজার হাজার।
    কারণ মানুষ বুঝে গেছে —
    “ভিউ নয়, আসল সৌন্দর্য সম্মানে।”

Skip to toolbar