-
রহস্যময় পাণ্ডুলিপি
### #চতুর্থ পর্ব#####
সেই রাতে শবরেশ মিত্র ঘুমোতে পারলেন না। Dover Street-এর মিটিংয়ে যা দেখেছেন, তা যেন তার মাথায় বারবার ফিরে আসছিল। সেই যুবকটি, যার হাতে লাল রত্ন খচিত আংটি—সে যেন কোনো ছায়াময় গোষ্ঠীর সদস্য, যার অস্তিত্ব প্রকাশ্যে নেই, কিন্তু কলকাতার ইতিহাসের গভীরে তার শেকড়।
ভোরবেলা তন্ময় ফিরল তার তদন্ত থেকে। চোখে-মুখে ক্লান্তি, কিন্তু হাতে এক খুঁটিনাটি খোঁজ।
“স্যার,” তন্ময় বলল, “রাইটার্স বিল্ডিং-এর পুরোনো আর্কাইভে একটা কেস ফাইল খুঁজে পেয়েছি। ১৯৩২ সালে কলকাতার এক ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ডক্টর রবার্ট ইভানস লিখেছিলেন, ‘The Manuscript of Fire’—একটি রহস্যময় বাংলা পাণ্ডুলিপি নিয়ে, যা নাকি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দখল করতে চেয়েছিল। পাণ্ডুলিপিতে এক গুপ্ত সংগঠনের কথা ছিল, নাম—‘অগ্নিবিন্দু সভা’।”
“অগ্নিবিন্দু সভা?” শবরেশ চমকে উঠলেন। “এমন নাম তো কোথাও শুনিনি…”
“আমিও না, স্যার,” তন্ময় বলল। “কিন্তু আরও আজব ব্যাপার হলো, এই সংগঠনের প্রতীক ছিল রক্তলাল পাথর খচিত সোনার আংটি।”
শবরেশের চোখে এবার এক ঝলক বিদ্যুৎ খেলে গেল। এখন পরিষ্কার, যে যুবকটি সাহা বুক স্টোরে এসেছিল, সে এই সংগঠনেরই কেউ। তবে প্রশ্ন—এই সংগঠন এখনো কি জীবিত? তারা কি আসলে ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপি রক্ষা করছে, না সেটাকে ব্যবহার করে কিছু গোপন পরিকল্পনা চালাচ্ছে?শবরেশ সিদ্ধান্ত নিলেন, তাকে ডক্টর রবার্ট ইভানসের গবেষণার কপি খুঁজে বের করতে হবে। পুরনো বইয়ের সংগ্রহে এই বইটি পাওয়া গেল শহরের একটি পরিত্যক্ত রিডিং ক্লাবে—নবজাগরণ সাহিত্য পরিষদ নামে একটি সংগঠন, যা ১৯৬৫ সালে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়।
সেই ক্লাবের ভেতরে, ধুলো জমা কাঠের তাকের এক কোণে ছিল বইটি। কিন্তু বইয়ের একাধিক পৃষ্ঠা ছেঁড়া, কিছু পৃষ্ঠায় কালি মুছে ফেলা হয়েছে। একমাত্র বেঁচে থাকা অধ্যায়ে লেখা ছিল:
“যদি কেউ পাণ্ডুলিপির সত্যি সন্ধান পায়, তবে তার প্রথম বাধা হবে বিশ্বাস। কারণ, সত্য ছদ্মবেশে আসে, আর মিত্রদের মাঝেই বাস করে বিশ্বাসঘাতক।”
এই কথাটি পড়ে শবরেশ এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তার মানে, তার আশপাশে কেউ একজন মিত্র সেজে তার পথ আটকে দিচ্ছে? তন্ময় কি তবে…
না, শবরেশ এমন কিছু ভাবতে রাজি নন। তন্ময় তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহকারী। কিন্তু সন্দেহের বীজ এখন রোপিত হয়েছে।রাত্রি দশটা, প্রবল ঝড়ের মধ্যে শবরেশ এবং তন্ময় প্রবেশ করলেন সেই অন্ধকার রায়বাড়িতে। দেয়ালে ছোপ ছোপ ছাঁচ, মেঝেতে ধ্বংসাবশেষ। এক ঘরে তারা খুঁজে পেল এক ভাঙা মূর্তির পেছনে লুকানো খাঁজে পুরোনো চিঠির মতো একটি পার্চমেন্ট।
চিঠির পাতায় হাতের লেখা, যেন কারো দুঃস্বপ্ন থেকে উঠে এসেছে:
“চারটি শব্দে লুকিয়ে আছে পথ,
যে খোঁজে জ্ঞান, তার চোখে সত্য।
আগুনে পোড়া এক পুরোনো বই,
যেখানে লেখা ‘চাবি’—সে ছায়ার মধ্যে।”
তন্ময় অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “স্যার, এটা কবিতা না ধাঁধা?”
শবরেশ চুপ করে ভাবতে লাগলেন। পঙ্ক্তিগুলোর ইঙ্গিত অনুসারে, এটা একটা ধাঁধা—যা খুলবে সেই গোপন দরজা।
“আগুনে পোড়া পুরোনো বই… ছায়ার মধ্যে… চারটি শব্দে পথ…” শবরেশ ধীরে ধীরে চারপাশে খোঁজ করতে লাগলেন। হঠাৎ করেই দেয়ালের একটি পুরোনো বুকশেলফের পাশে, এক অদ্ভুত ছায়া পড়ে থাকতে দেখা গেল।
সেই ছায়ার ঠিক নিচে রাখা ছিল একটি জলন্ত প্যারাফিন ল্যাম্প। আর তার পাশে একটি বই—পুরোটাই পোড়া, শুধু মলাটের ওপর কিছু অক্ষর স্পষ্ট:
“জ্ঞান, আগুন, ছায়া, রক্ত” — চারটি শব্দ।
শবরেশ চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত ভাবলেন, তারপর গিয়ে পুরোনো দরজার পাথরের খাঁজে সেই চারটি শব্দ একে একে উচ্চারণ করলেন—“জ্ঞান… আগুন… ছায়া… রক্ত।”
এক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা।
তারপর, একটা কনকনে শব্দে ঘষা পাথর সরে গেল।
গোপন দরজা খুলে গেল।নিচে নেমে তারা পৌঁছালেন এক ভূগর্ভস্থ কক্ষে। চারদিক দেয়ালে লেখা সংস্কৃত শ্লোক, আর মাঝখানে রাখা একটি লোহার সিন্দুক। তার উপর খোদাই করা—
“সত্য জানার আগে আত্মত্যাগ দরকার।”
তন্ময় তখনই বলল, “স্যার, এটা খোলা ঠিক হবে না। যদি কোনো ফাঁদ থাকে?”
শবরেশের চোখ তন্ময়ের চোখের দিকে গেল। আজ প্রথমবারের মতো মনে হলো—তন্ময় ভয় পেয়েছে না কি বাধা দিতে চাইছে?
“তুমি কি জানো, এখানে কী আছে?” শবরেশ প্রশ্ন করলেন।
তন্ময় থমকে গেল, তারপর ধীরে ধীরে বলল—“স্যার… আমার আপন ভাই ছিল ‘অগ্নিবিন্দু সভা’র সদস্য। আমি এই কেসটা নিখোঁজ পাণ্ডুলিপির খোঁজে না, বরং ভাইয়ের খোঁজে শুরু করেছিলাম। আমি আপনাকে বলিনি, কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম না…”
শবরেশ চুপ করে রইলেন। বন্ধুরা মাঝে মাঝে নিজেরাই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।শবরেশ সিন্দুক খুললেন। ভিতরে ছিল আরেকটি পাণ্ডুলিপি—এবার ইংরেজিতে অনূদিত, হাতে লেখা একটি কপি।
শীর্ষে লেখা—
“The Fire Code – For eyes that can see, and a mind that dares to question.”
আর পেছনের কভারে লাল রঙে আঁকা এক প্রতীক—দুটি হাতের মাঝে জ্বলন্ত রক্তবিন্দু।
শবরেশ মিত্র বুঝলেন, এটা শুধু একটা চুরি নয়।
এটা এক দার্শনিক যুদ্ধ—জ্ঞান ও শক্তির, ইতিহাস ও লুকনোর, বিশ্বাস ও প্রতারণার।2 Comments
Friends
Mahmuda Sultana
@mahmudamahi
মোঃ সাজ্জাদ হোসেন সিয়াম
@shiyam
Payel Akhter Jyoti Nur
@payel
রতন
@ratan92
মো দানিয়াল আরাফাত (প্রমিস)
@md-daniel-araphat-promice
Abu Said Vuia
@shahadatur-rahman-sohel
Ahmed Aryan
@aryan8989
Moniruzzaman Sarjil
@zaman2802
অনুভূতির ডাইরি
@onuvutir-dairi

ঘটনার পরম্পরা একটু ছাড়া ছাড়া লাগছে, আরো বিস্তারিত বর্ণনার আশাবাদ থাকলো।