-
রহস্যময় পাণ্ডুলিপি
### # পঞ্চম পর্ব####
শবরেশ মিত্রের মনে এক অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছিল। Dover Street-এর সেই রাতের মিটিং তার মনে বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, কিন্তু উত্তর যেন ধরা দিচ্ছে না। তার ডায়রির পাতায় আজ একটি নতুন নাম জ্বলজ্বল করছে—অগ্নিবর্ণ সংঘ। এই নামটি সে শুনেছিল সেই লাল রত্নখচিত আংটির যুবকের মুখে, যখন সে কাউকে ইঙ্গিত করে বলেছিল, “তোমার গুরুর চিহ্ন ছাড়া সংঘে প্রবেশ অসম্ভব।”ঘরের ভেতর বসে শবরেশ সেই কাগজের টুকরোটি আবার খুলে দেখল, যা সে সাহা বুক স্টোরের পেছনের গলিতে পেয়েছিল। সেখানে ‘Dover Street, 7PM’ ছাড়াও একটি অদ্ভুত চিহ্ন আঁকা ছিল—একটি ত্রিভুজ, যার ভেতরে একটি চোখ, এবং তার চারদিকে চারটি রহস্যময় বর্ণমালা—𑀓𑀸𑀜𑁆𑀘, যা প্রাচীন ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা। শবরেশ জানতেন না এদের মানে, কিন্তু তার অনুমান ছিল, এই লিপি ও সংঘের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
ইতিহাস বিশারদ ডঃ নীলরঞ্জন কর-এর কাছে গিয়ে শবরেশ জানতে পারলেন, অগ্নিবর্ণ সংঘ ছিল এক প্রাচীন গোপন সমাজ, যার জন্ম সপ্তদশ শতাব্দীর কলকাতায়, ডাচ ও পর্তুগিজ ব্যবসায়ীদের ছায়ায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল প্রাচীন জ্ঞানের সুরক্ষা—বিশেষ করে সেইসব পাণ্ডুলিপি, যেগুলি মানুষের চেতনার সীমাকে অতিক্রম করতে পারে।
“তুমি কি জানো,” কর মৃদু কণ্ঠে বললেন, “এই সংঘের একটি কেন্দ্রীয় নীতি ছিল—‘গোপন জ্ঞান, যদি অযোগ্যের হাতে পড়ে, তবে তা ধ্বংস ডেকে আনে’। এই পাণ্ডুলিপি সম্ভবত সেই জ্ঞানের অংশ।”
তাদের কথোপকথনের শেষে কর একটি রোল করা চামড়ার মানচিত্র শবরেশের হাতে তুলে দিলেন। এটি ছিল ‘চতুর্বিন্দু মানচিত্র’, এক প্রাচীন হাতে আঁকা মানচিত্র, যার মধ্যে চারটি পয়েন্টে বিশেষ প্রতীক বসানো ছিল—একটি কালো বৃক্ষ, একটি মৃগশিরা, একটি মাটির পাত্রে আগুন, এবং একটি অর্ধ-খোলা চোখ। কর বললেন, এই প্রতীকগুলোই চাবি, যেগুলি খুলে দিতে পারে পাণ্ডুলিপির আসল অর্থ।
মানচিত্র অনুযায়ী, প্রথম প্রতীকটি ছিল কলকাতার উত্তরাংশে—চিৎপুরের শ্মশান ঘাট-এর কাছে এক প্রাচীন বটগাছ। শবরেশ রাতে সেখানে পৌঁছালেন, কুয়াশায় ঢেকে থাকা জায়গাটায় এক অদ্ভুত গন্ধ ছিল—ধূপ, ছাই ও কিছু পুরাতন পুঁথির। বটগাছের গুঁড়িতে খোদাই করা ছিল ব্রাহ্মী লিপির আরও একটি বাক্য—𑀧𑁄𑀢𑀺 𑀧𑀢𑁆𑀭𑁆𑀭𑀸 𑀰𑀺𑀢𑁆𑀢𑀸𑀢𑁆—যার নিচে একটি গর্ত ছিল, ভেতরে রাখা ছিল একটি ছোট, কপার-পাতার বাক্স।
শবরেশ যখন বাক্সটি খুললেন, তার মধ্যে ছিল একটি সাদা কাগজে আঁকা জ্যামিতিক নকশা—একটি চক্রের ভেতর তিনটি সমান্তরাল রেখা। তার নিচে লেখা ছিল:
“আলো যখন তিন দিক থেকে পড়ে, তখন ছায়া সত্য বলে ভুল হয়।”এটি নিছক ধাঁধা নয়, বরং শবরেশ বুঝলেন এটি ছিল একটি দিক-নির্দেশ—যে কোনও সত্যকে তিনটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা ছাড়া তার পূর্ণ রূপ ধরা যায় না।
এই নকশার সূত্র ধরে শবরেশ পৌঁছালেন কলকাতার পুরনো মেটকাফ হাউসে, যা এখন পরিত্যক্ত। এখানেই ছিল দ্বিতীয় চিহ্ন—অর্ধ-খোলা চোখ, একটি দরজার ওপরে খোদাই করা, যা শুধু তখনই খোলে যখন তিনটি ছায়া নির্দিষ্ট কোণে একত্র হয়।
শবরেশ জানতেন, এ ধরনের সংকেত খুলতে হলে দরজার সামনে নির্দিষ্ট সময়ে আলো ফেলতে হয়। সূর্যাস্তের মুহূর্তে, সেই চোখের উপরের পাথরের ছায়া নিচের চক্রের সঙ্গে মিলে তৈরি করল এক গোপন চাবির ফাঁক।
দরজা খুলতেই, ভিতরে পাওয়া গেল আরও তিনটি সংকেত—
১. একটি ব্রোঞ্জ প্লেট, যেখানে খোদাই করা—“সূত্র যা হারিয়ে যায়, তা ছায়ার সঙ্গে ফিরে আসে”
২. একটি মৃত পাখির কঙ্কাল, যার পায়ে বাঁধা ছিল রক্তমাখা কাপড়
৩. একটি ছড়ানো কালি-রঙা চিঠি, যার লেখাগুলি আংশিক মুছে গেছে—কিন্তু শেষের লাইনটি স্পষ্ট:“রক্তচিহ্ন ছাড়া পাণ্ডুলিপি জাগে না”
এই জটিলতার মধ্যেও শবরেশ অনুভব করলেন—এই সংঘ কেবলমাত্র ইতিহাস রক্ষা করছে না, বরং একটি বিকল্প বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডল গড়ে তুলছে, যেখানে সত্য, ছায়া এবং সংরক্ষণের মধ্যে এক অদ্ভুত সম্পর্ক বিদ্যমান। এই পাণ্ডুলিপি সেই বৃত্তের কেন্দ্রবিন্দু।
কিন্তু যেহেতু প্রতিটি সূত্র নিজেই একেকটি ধাঁধার স্তর, তাই শবরেশ এখন নিশ্চিত—এই রহস্য কোনও একক ব্যক্তি বা ঘটনা নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ছায়াময় জগৎ, যেখান থেকে একবার প্রবেশ করলে আর ফেরা যায় না।
“আয়নার ভেতর যেসব দৃশ্য কখনো দেখা যায় না…”ট্যাক্সি থেকে নেমে শবরেশ মিত্র ঢুকে পড়লেন এক পুরনো, ধুলিমাখা পাঠাগারে—যার নাম ‘জ্ঞানেশ্বর সংগ্রহশালা’। এই জায়গাটা শুধু বইয়ের জন্য নয়, বহু অদ্ভুত ও প্রাচীন দলিল, পাণ্ডুলিপি ও ম্যাপ সংরক্ষণের জন্য বিখ্যাত। এটি একসময় নিখিলবঙ্গ রহস্যপিপাসু সংঘের মূল ঘাঁটি ছিল—একটি গোপন সংগঠন, যাদের কাজ ছিল রহস্যময় বই ও দলিলকে জনসাধারণের চোখ থেকে আড়ালে রাখা।
পাঠাগারে ঢুকতেই এক বৃদ্ধ রক্ষক তাকে থামাল। চোখে ঘোলাটে চশমা, কানে শোনা যায় না ঠিকভাবে।
“আপনি কী চান?”
“একটা নাম… ‘কার্পাথিয়ান কোডেক্স।’ এই নাম শুনেছেন কখনও?” শবরেশ ধীরে বললেন।
বৃদ্ধের চোখ আচমকা চমকাল, তারপর যেন স্বর থেমে গেল। একটা পাণ্ডুলিপির নাম উচ্চারণ যেন কোনো মন্ত্র জপের মতো কাজ করল।
“আমার সঙ্গে চলুন,” ফিসফিসিয়ে বলল বৃদ্ধ।
তারা নামল পাঠাগারের নিচে, এক বিস্মৃত আর্কাইভ সেলে। ঘরে ঢুকতেই শবরেশের চোখে পড়ল—দেয়ালে টাঙানো একটি অদ্ভুত মানচিত্র, তার গায়ে অদ্ভুত প্রতীক, যেন ল্যাটিন ও প্রাচীন বাংলা লিপির এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। আর ঘরের ঠিক মাঝখানে রাখা ছিল একটি আয়না—যা নাকি ‘রিভার্স স্ক্রলিং গ্লাস’ নামে পরিচিত। বলা হয়, এই আয়নার মধ্যে এক ধরনের লিপি ফুটে ওঠে, যা শুধু রাতের দ্বিতীয় প্রহরে দেখা যায়, তাও নির্দিষ্ট কোণে দাঁড়িয়ে।
বৃদ্ধ বলল, “যদি আপনি সত্যিই জানতে চান পাণ্ডুলিপির উৎস, তবে আয়নার দিকে তাকান… কিন্তু সাবধান, এই আয়না শুধু চিত্র নয়, স্মৃতিও ফিরিয়ে আনে।”
শবরেশ আয়নার সামনে দাঁড়ালেন। সময় পেরিয়ে গেল। হঠাৎ আয়নার মধ্যে একটি ছায়াময় দৃশ্য ফুটে উঠল—একজন মানুষ কালো রেশমি পোশাকে, মাথায় টারব্যান, চোখে চশমা, হাতে পাণ্ডুলিপির ছেঁড়া পৃষ্ঠা। তার পেছনে এক অদ্ভুত প্রতীক—তিনটি সাপ নিজেদের গায়ে গুটিয়ে ‘৮’ এর মতো একটি চক্র গঠন করেছে।
ঠিক তখনই শবরেশের মনে পড়ল—Dover Street-এ লাল রত্নখচিত আংটি পরা যুবকটির গায়েও সেই একই প্রতীক ছিল, ট্যাটু হিসেবে।
হঠাৎ—ঘরের বাতি নিভে গেল।
আলো ফিরে এলে শবরেশ দেখতে পেল, আয়নার ওপারে একটি বাক্য ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে—
“মৃত্যুর মধ্যেও শব্দ থেকে যায়… তা শুধু শোনা যায় শুদ্ধ প্রতিধ্বনিতে।”বৃদ্ধ বলল, “এটা ধাঁধা। এর মানে আপনি খুঁজে বের করবেন… যদি পারেন।”
সেদিন রাতেই শবরেশ গিয়ে হাজির হলেন ‘এখানেই শেষ’ নামক এক পুরনো থিয়েটারে, যেটা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু তিনি জানতেন, এখানেই একসময় রহস্যপিপাসু সংঘ তাদের নাটকীয় আলোচনা করত। থিয়েটারের অডিটোরিয়ামের ঠিক নিচে একটি গোপন ঘর ছিল, যেখানে দেয়ালে বিশেষ প্রতিধ্বনি উৎপন্ন হতো। এই শব্দ প্রতিধ্বনি থেকেই নাকি একটি বিশেষ সংকেত পাওয়া যেত।
শবরেশ ঘরে প্রবেশ করলেন, এবং দেয়ালের গায়ে তিনটি ধাতব বোতাম দেখতে পেলেন—একটি নীল, একটি সবুজ, একটি ধূসর। তিনি কিছু না ভেবেই ধূসর বোতামটি টিপলেন। মুহূর্তে অন্ধকার ঘরে প্রতিধ্বনি বাজল—একটি সুর… এক অদ্ভুত লহরী… আর সেই সুরের মধ্যেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকল আরেকটি ধাঁধা:
“যে পাঠ করে, সে পায় না
যে শোনে, সে বুঝে না
যে দেখে না, সে জানে—
তাকে খুঁজে নাও নগরবিহীন মানচিত্রে।”শবরেশ থমকে গেলেন।
নগরবিহীন মানচিত্র? সেটাই কি তাহলে সেই পাণ্ডুলিপির চূড়ান্ত রূপ? যে মানচিত্রে কোনো শহর নেই, তবুও তার ভেতর গোপন থাকে কোনও কিছু?
তিনি বুঝলেন, এই ধাঁধার অর্থ বের করতে হলে তাঁকে আবার ফিরে যেতে হবে সেই প্রাচীন পাণ্ডুলিপির একটি ক্ষুদ্রাংশের কাছে—যেটা তাঁর বিশ্বাস, লুকিয়ে আছে এক গানের খামে। এক এমন গান, যেটা কোনওদিন বাজেনি রেডিওতে, কিন্তু বাজে পাতার শব্দে, বাতাসের চলনে।
পরবর্তী পর্বে:
🔍 শবরেশ মুখোমুখি হবেন এমন একজনের, যিনি নিজের নাম ভুলে গেছেন, কিন্তু মনে রেখেছেন একটি শব্দ—যেটা উচ্চারণ করলেই খুলে যায় পাণ্ডুলিপির অন্তিম চেম্বার…
🔒 এবং “নগরবিহীন মানচিত্র” কীভাবে এক মায়ার দরজা হয়ে উঠবে, তা তখনই জানা যাবে…3 Comments
Friends
Mahmuda Sultana
@mahmudamahi
মোঃ সাজ্জাদ হোসেন সিয়াম
@shiyam
Payel Akhter Jyoti Nur
@payel
রতন
@ratan92
মো দানিয়াল আরাফাত (প্রমিস)
@md-daniel-araphat-promice
Abu Said Vuia
@shahadatur-rahman-sohel
Ahmed Aryan
@aryan8989
Moniruzzaman Sarjil
@zaman2802
অনুভূতির ডাইরি
@onuvutir-dairi

গল্পের প্লট অসাধারন, প্রাচীন পান্ডুলিপি বিষয়ে কিছু চমৎকার আগ্রহদ্দীপক বর্ণানাও আছে। কিন্তু ঘটনা খুব দ্রুত ঘটছে। অনেক তথ্যের ভিরে গল্পটাকে মিস করছি। পরবর্তী পর্বে গল্পের দিকে একটু বিশেষ নজর দিবেন, সাধারন পাঠক হিসেবে এটা আমার দাবী।