-
“আত্মকথন ”
আমি যখন বয়ঃসন্ধিতে, তখন আমার মুখে প্রচুর ব্রণ হতো।সেটাই স্বাভাবিক, কিন্তু আমার সমস্যা ছিলো আমি সেই ব্রণগুলো নখ দিয়ে টেপাটেপি করতাম।ফলে মুখ ভর্তি কালো কালো দাগ।কালো মুখে, কালো ছোপ ছোপ দাগ।
এই কারণে আমি কোথাও বের হতাম না, ছবিও তুলতাম না। আর হাতে সময় থাকলেই আয়না(আব্বার মটর সাইকেল এর রিজেক্ট আয়না) নিয়ে টেপাটেপি করতাম।
আমার কারণে বাসায় ড্রেসিং টেবিল এর আয়না ছাড়া আর কোন আয়না রাখা হতো না। বাসায় সবাই খুব বকাবকি করতো ব্রণ টেপার জন্য। সবচেয়ে বেশী বকা দিতো ছোট ভাই। বলতো- তুই তো রিক্সাওয়ালাদের মতো সুযোগ পেলেই ব্রণ টিপিস।(আমি অবশ্য কোন রিক্সাওয়ালাকে কখনও ব্রণ টিপতে দেখি নাই)
যেহেতু সেই বয়সটা ছিলো নিজেকে সুন্দর দেখেনোর, তাই এমন কিছু নাই যে ব্রণের জন্য করি নাই। যে যা বলতো সেটাই করতাম, তখনতো আর ইউটিউব ছিলো না।
আমার স্কিন ছিলো ওয়েলি, ঘুম থেকে ওঠার পরে মুখে এত্ত তেল বের হতো যে , চাইলে অনায়াসে একটা পরোটা সেই তেল দিয়ে বানানো যেত।
মুখে শ্বেত চন্দন ঘষে( খুব সুন্দর একটা পাথরের পাত্র ছিলো যেটাতে চন্দন ঘষা হতো) লাগাতাম।
আর একটা জিনিস লাগাতাম, আমি ১০০% শিয়র যে এটার নাম কেউ শুনে নাই। সেটা হলো- বেল গাছের কাঁটা। কেউ কি দেখেছেন ,বেল গাছের কাঁটা?
আব্বা দেশের বাড়ি থেকে বেলের কাঁটা নিয়ে আসতেন, আমি সেই কাঁটা পানি দিয়ে ঘষে ঘষে মুখে লাগাতাম।
আমার মনে হয় আমি সব বেলগাছের কাঁটা মুখে মেখেই গাছগুলোকে কাঁটা শূন্য করে ফেলেছিলাম 😀😆।
কি করবো? যেই দেখতো সেই বলতো- তোমার মুখে এত ব্রণ? কি যে কষ্ট পেতাম, সেই বয়সে সেটা কেউ বুঝতো না!
এবার আসি আমার চুলের গল্পে।
পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত আমাকে টাক্কু করে দিতেন আম্মা। কারণ আম্মার বক্তব্য হলো- চুল যত বড় হতো আমার রাগও ততো আকাশচুম্বি হতো। আমাকে বশে রাখার একটাই উপায় ছিলো মাথা নাড্ডু করে দেওয়া।
এরপর যখন থেকে চুল বড় রাখাতে আম্মা বাধ্য হলেন তখন থেকে আম্মা শুরু করলেন আমার কেশ চর্চা।
মাথায় আমলকি, মেথি , সিকাকাই বেটে লাগিয়ে দিতেন। তারপর কালো রংয়ের গোড়া কষা ফিতে দিয়ে টাইট করে টেনে বেনী করে দিতেন, বেনীর শেষে রংগীন ফিতা দিয়ে ফুল করে দিতেন। আর একটা মোটা ফিতে দিয়ে সেই বেনী মুড়িয়ে দিতেন, যেন বালিশে না লাগে, তেল , মসল্লা।
এভাবে টেনে বাঁধতে বাঁধতে আমার কপালটা বিশাল বড় হয়ে গেছে।
মাসে ২বার পিঁয়াজ বেঁটে ,সেই রস কাপড়ে ছেঁকে মাথায় দিয়ে দিতেন।
আপনারা কি ম্যাডোনা এগ শ্যাম্পু দেখেছেন? দেখার কথা না, কারণ সেটা ১৯৪৭ সালে পাওয়া যেত। কি সুন্দর কাঁচের বোতল, মাঝখানে চাঁপা। সেই শ্যাম্পু দিয়েই চুল ধুতাম।
কিন্তু আমি যখন ক্লাস এইট এ পড়ি, তখন দেখা গেলো আমার মাথার প্রায় অর্ধেক চুল পেঁকে গেছে। নাহ্ শ্যাম্পুর কারণে নাহ্। এটা জেনেটিক। আমার বড়ভাইয়েরও একই অবস্থা ছিলো।
তখন আমি যেটা করেছি এবং তার ফল ভোগ করছি এখনো। সারারাত রিঠা( একটা ফল) , আমলকি, সিকাকাই, পানিতে ভিজিয়ে রাখতাম, সকালে সেই পানি হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করলে ফেনা হতো। সেই ফেনা দিয়ে
চুল পরিষ্কার করতাম।
এটা একদম ম্যাজিকের মতো কাজ করেছে। এখন এই ৬৩ বছর বয়সেও আমার খুব অল্প কিছু ই চুল পাকা।
আমি আমার মাথায় আম্মা ছাড়া কাউকে হাত দিতে দিতাম না।এখনো কেউ আমার মাথায় হাত দিলে আমার খুব বিরক্ত লাগে।
আগেই তো বলেছি আমাকে সবাই এপি কেশ তেল বলে ডাকতো। সুন্দর কেশের জন্য বিভিন্নজন গিফটও দিতো, যেমন – মেজভাই এর বন্ধু যার বোন তখন দেশের বাহিরে থাকতেন,সেই ভাই দারুণ সুন্দর একবক্স চিরুনী গিফট করেছিলেন আমাকে। কি যে সুন্দর ছিলো সেই চিরুনীগুলো!
এরপর যখন ইউনিভার্সিটিতে উঠলাম তখন ছোট ভাই কেয়োকার্পিন নামে একটা ইন্ডিয়ান তেল নিয়ে আসতো আমার জন্য সেটা ব্যবহার করতাম।
এরও পরে জনসন বেবি ওয়েল ব্যবহার করতাম। নারিকেল তেল চিপচিপে হয় জন্য সেটা কখনো ব্যবহার করি নাই।
এইতো গেলো আমার ব্রণ এবং কেশ সমাচার।
এবার আসি আমি কিভাবে এই যাতাকল থেকে মুক্তি পেলাম।
বিয়ের পরে মুখে ব্রণের জন্য তুহিনের সাথে কোথাও বেড়াতে যেতে চাইতাম না। বিভিন্ন বাহানা দিতাম, ও নাছোড়বান্দা। তখন ওকে বলতাম- আমি যাবো না, আমার মুখ ভর্তি ব্রণ।
একটা কথা, তুহিন কিন্তু আমার ব্রণের জন্য কখনো কিছু বলে নাই। এটাও বলে নাই যে এত ব্রণ কেন, দেখতে খারাপ লাগে।
ও বলতো- ব্রণ হয়েছে তো কি হয়েছে? ব্রণ হলে বেড়াতে যাওয়া যাবে না?
এরপর আমি আর কখনো ব্রণ নিয়ে মন খারাপ করি নাই।
আর চুল? সেটা আমি নিজেই ছোট করে ফেলেছি রাগ কমানোর জন্য। আম্মাতো নেই যে, মাথায় তেল দিয়ে মাথা ঠাণ্ডা করবেন।2 Comments
Friends
নাঈম অরণ্য
@aronnonaim
Hafizur Rahman shakil
@shakilahamed72gmail-com
naznin shamim
@nazninshamim
Md Mofiz
@mdmofiz
MAHMUD HAYAT
@mahmudhayat
wajibad
@wajibad
MAHAJABIN AFROZE
@mahajabinafroze
সুবহা জাহান
@subhajahan
Intisar Jabed
@intisarjabed



বরাবরের মতই চমৎকার লেখা।