Profile Photo

ভীষ্মদেব সূত্রধরOffline

  • রাহুগ্রস্থ বসন্ত

    দিনের আলো টুকু ক্রমশ ঔজ্জ্বল্য হারাচ্ছে, ফিনফিনে আলগা বাতাস ঠিক কোন পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বসন্তের সন্ধিক্ষণে শীতের মুখ রক্ষার ভার নিয়েছে বলেই শরীর একটু হলেও কেঁপে উঠছে, কিন্তু কাঁপার কথা ছিল না, একটা পায়া ভাঙা পুরোনো ইটের তৈরি বেঞ্চে বসে কতক্ষণ গল্প করে চলেছি- সময়ের ভ্রুক্ষেপ আমাদের নেই, দিন পড়ে আসা রুগ্ন রশ্মি, আর বাতাসে ভেসে আসছে অনেক দিনের বক্ষ বিদীর্ণ করা দুঃখ গুলো, ভালবাসার সোহাগি মলমে যতটুকু ক্ষত সারা যায় তারই উপযাচক হয়ে দুজনে মুখোমুখি বসে, মুখমণ্ডলের উপর পশ্চিমা আলো আরো সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছে ওর মুখশ্রী, সেই লাল-গোলাপি আভায় আমি বরাবর যা দেখে এসেছি তা-ই দেখছি দুচোখ ভরে, পাতলা ঠোঁটে স্পষ্ট কিন্তু দারুণ কায়দায় রাশি বলে চলেছে, এটাই হয়তো শেষ দেখা হতে পারে। তুমি একটুও কি কনসার্ন নও?
    ললাটের পাশ দিয়ে বাঁকানো এক গুচ্ছ চুল কানে গুঁজে দিয়ে বললাম, হুম। আমারও বুকের ভেতর সতর্ক সংকেত বলতে চাইছে, এবার দাঁড়াও।
    স্মিত হেসে বলল, হয়তো বলেছি। হবেই এমন নয়। কেন জানি খুব শঙ্কায় ঘিরে ধরছে চারপাশ। তুমি বোঝ।
    -কিন্তু আজ দেখো, শালের নতুন পাতায়, ফুলে আমাদের আমোদের দিন।
    -জানি। একদিন দেখবে ওই পাতায় সাজানো মণ্ডপে আমার বিয়ে গেছে। তখন!
    -আমি ছাড়া আর কেউ নিতে পারবে?
    -পারবে না।
    তারপর নিশ্চুপ হয়ে আমার পানে তাকিয়ে সামনের ডোবার দিকে চোখ ফেরালো রাশি, আমি কিছু বলতে চেয়ে কণ্ঠরোধ হল, আমার কাছে সেই মুহূর্ত গুলো যেগুলো বিগত অথচ সুন্দর, অত্যাশ্চর্য, নিবিষ্ট চিন্তার মধ্যে আমি তার কাছে নতজানু হই, ফিরে দেখতে গেলে শুরুর দিন গুলোর যে হৈ-হুল্লোড়, গোটা শহর রিকশায় চেপে আমাদের সন্ধ্যা ভ্রমণ, হুড তোলা রিকশার গতি জন-অরণ্যে ভালবাসার সুফল সমূহ, একে অপরের প্রতি স্নেহদান, অগ্নিকুণ্ডেও এতো সচ্ছলতা, আমি চিৎকার করে বলি, ভালবাসি প্রিয়। ছোট শাল গাছের ডালে হলুদ ফিঙ্গের আওয়াজে সম্বিৎ ফিরে এলে আরেকটু এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, কী ভাবছো?
    ক্ষীণ স্বরে জবাব দেয়, কিছুনা। তোমার খিদে পায়নি?
    -না।
    কিন্তু প্রশ্নের ছাতু গুড়িয়ে আমি আর কি বলব ভাবছিলাম। হাত ধরে বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলল, সত্যি, এমন করেই যদি কাটিয়ে দেয়া যায়, ক্ষতি নেই। তাহলে পিছু কেন টানে আমাদের!
    কিছুটা অবাক চোখে মুখে ঠোঁট চেপে যেন কষ্ট ঢক করে গিলে নিল রাশি। স্পষ্টভাবে দেখতে পেলাম তার অবয়বে ফুটে উঠছে তেমন অনুজ্জ্বল অথচ রক্তাভ আলো। বহুবার বুকের ভেতর পিষে দিয়েছি অনেক অঙ্গিকার, সুখের আড়াল ভেদ করে কোনো দুঃখের সুড়ঙ্গপথে আমি প্রবেশ করিনি। কিন্তু সমাজের খিদে ওকে ক্লান্ত করছে, পরিবার ওকে বিপর্যয়ের হাতল ছেড়ে উঠে আসতে বলছে। আমি বিপর্যয়, আমি সমাজের মগজ-ঘিলু মেখে খাচ্ছি রোজ-রোজ। ভরা মজলিসে আমার দণ্ড অগ্রহণযোগ্য বলে রাখছি!
    মুখের কাছে মুখ রেখে বললাম, কাটবে। কাটাতেই তো চাই।
    শুকনো হাসল, মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জ্ঞাপন করে কাঁধের উপর কনুই রেখে বলল, শেষ অব্দি থাকবে তো?
    আমায় কেন আজ প্রশ্নগুলো বিড়ম্বনায় ফেলছে জানিনা, আমি কেন থাকবো না? পাগল। নির্ভয় ও দৃঢ় কণ্ঠে বললাম। ও শুনল, মাথায় হাত বুলিয়ে অস্ফুট শব্দে হু বলে আবার চুপ করে রইল, পার্কের ইটের রাস্তায় আজ ভিড় জমেছে, জোড়া জোড়া মানুষের মাঝে আজ বুড়ো-শিশুরাও এসেছে, কারো মাথায় ফুলের তোরা, কারো গায়ে দামি এসেন্সের গন্ধ বাতাসে ব্যাপনশীল , কারো নতুন শাড়ির ভাঁজে নতুন ভালবাসা কেবল বাড়ির বাইরে পা বাড়াল, ওই যে পাশের বেঞ্চিতে বসে দুজনে ভীষণ মাখামাখি করছে, আমাদের উচিত না তাদের কথায় আড়ি পাতা, দূরে তো নয়, যদি বলি গা ঘেঁষা আরো অসংখ্য প্রেম এখানে প্রসবের জন্য ছুটে এসেছে, এখানে সবাই মুক্তির স্বাদ নিচ্ছে নিঃশ্বাসে, একে অপরের সাথে লেপটে আছে অনেক অনেক ঐতিহাসিক তথ্য, গল্প, আমার ঠাকুরদা, তাঁর ঠাকুরদা- ভালবাসার গল্প। আজ মনের মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় আমিও ঠাহর করতে পারছিনা, আরেকটু পর সূর্য ডুবে যাবে দিগন্তে, ছেলে বেলায় সেই আমি দিগন্তে হারিয়ে যেতে চাইতাম, বাঁশের আগায় অদ্ভুত বাতাসের ঘূর্ণি দেখতাম একমনে , ডোবার ভেতরে পানকৌড়ির শিকারের আশ্চর্য অভিজ্ঞতা, ঠোঁটের ডগায় ঝাপটিয়ে শেষ বাঁচবার লড়াইয়ে মাছের সাথে মাছরাঙা’র খাদ্য যুদ্ধ। প্রেম ও প্রকৃতি একই। একই সুধার পাত্রে তবে গরল কোত্থেকে আসে?
    আরো কাছে এসে জড়িয়ে নিল রাশি, চিবুকের কাছে গরম নিঃশ্বাস ফেলছে ও, বলল, এই গায়ের গন্ধ টা আমি কখনো ভুলবো না, আমার সাথে মিশে আছে, থাকবে…আমি দূর থেকে বোধহয় বুঝতে পারবো তুমি এসেছ পাশে।
    -সিনেমাটিক বটে!
    -খিল্লি করছো?
    -নাতো।
    মুখভার করে মাথাটা সরিয়ে নিল, আমি হাত দিয়ে টেনে এনে বললাম, হয়তো ঠিকই। আমি যেন বুঝিনা!
    -তাহলে অমন করে বলো কেন?
    -এমনি।
    -তুমি হয়তো জানো না, তোমার জন্য ক্ষণে ক্ষণে উতলে ওঠে সব, কাল ডিউটিতে ইনজেকশন দিতেও ভেবেছিলাম তোমাকে।
    -ইনজেকশনের সাথে কেন?
    -জানিনা। হেহে- করে হেসে উঠলে আমার ভেতরেও শিশুর মতো হাসি বের হয় নির্মল সে হাসি। সূর্য নামছে…দূরের মাঠ হতে কৃষক কোদাল-কাস্তে হাতে বাড়ি ফিরছে কাজ শেষে, আমি প্রিয়তমার ঘাড়ের কাছে মুখ রেখে দেখছি… নদীর ওপাড়ে আম্রকাননে মুকুলের সমারোহ পূর্ণ ছবি, আমি দেখছি- সংকুচিত অরণ্যের পাশ দিয়ে বয়ে চলা শুকনো নদীটার শেষ জলে স্নান করছে ঘুঘু, তারপর আর কিছু দেখতে পাইনা, কাছের মানুষগুলো সরে যাচ্ছে, কারো জুতোর আওয়াজ, হাঁটার শব্দ, কথার তুবড়ি, অবাত্তি ছেলে মেয়েদের ঝাঁক দৌড়ে ঝাপটে বেরচ্ছে পার্ক হতে।
    পার্কের হলুদ বাতি একে একে জ্বলে উঠল, আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল বর্ষায় কিন্তু ঘোর লেগেছিল বসন্তে, উন্মাদনায় আমাদের সময়টা কেটে গেছে অল্প সময়ের ব্যবধানে,
    এবার উঠি?- জিজ্ঞেস করল রাশি।
    আমি বললাম, আরেকটু থাকা যায়?
    না, সত্যি এবার উঠতে হবে। উঠেই পেছন টুকু ঝেড়ে তারপর হাঁটতে শুরু করি, পাশাপাশি হেঁটে চলার যে অদ্ভুত অনুভূতি, ধ্যানমগ্ন ঋষিরাই জানতো উর্বশীর সঞ্চালনে শুধু কামনা নয় আরো বৃহৎ কিছু সৃজনের অপেক্ষায় আদিদেব ভস্ম করেছিল মদনদেবকে , সবের মাঝে ডারউইনের তত্ত্ব, ফ্রয়েডের প্রেম মিশ্রিত দর্শন হেঁটে চলে আমাদের সাথে, কথা হয়না, কিন্তু হয়, ভেতরে ভেতরে একে অপরের সাথে অবিরত চলছে, পথ যতই খাটো হচ্ছে, বুকের ভেতরে ঘূর্ণিপাকে হৃৎপিণ্ডটা ঢিপ ঢিপ শব্দে ব্যাকুল করছে, আবার কবে দেখা হবে, আসলেই শেষ দেখা নয়তো! যেন বিস্ময় আর ভয় নিয়ে পথ হাঁটি, এমন হাসিখুশি মুহূর্তে ম্রিয়মাণ হৃদয় সায় দেয়না অনেক কিছু তফাতে বাস্তব আমি স্বীকার করতে প্রস্তুত নই। হাত দুটো চেপে ধরে রাশি বলল, রুদ্র। ক’টা ছবি তুলে রাখো না। এবারের স্মৃতি।
    আমি একটু রেগে গিয়ে বললাম, তুলবো নিশ্চয়ই কিন্তু এমন করে স্মৃতির কথা কেন? হারাচ্ছি আমরা!
    চোখ দুটো সহসা ছলছল করে উঠল ওর কিন্তু কিছু বলল না, আমি বললাম, রাগ করলে? সরি।
    কাষ্ঠ হেসে বলল, সরি কেন?
    -এমনি।
    সন্ধ্যার অন্ধকার ও আলোর আবছা পরিবেশে আমি ওকে আরেকটু কাছে টেনে নিই, লোক ভয় বর্জন করে ফাঁকা চিকন রাস্তায় হেঁটেই যাচ্ছি, হাঁটতে হবে কিলো তিনেক, কতদূর এসেছি জানিনা, মেইন সড়কে পৌঁছাতে আমাদের আরো কতক্ষণ লাগবে তাও জানিনা। কিন্তু ভাল লাগছে আবার কষ্টও হচ্ছে, এবারের দেখা করাটা কেমন যেন গোলমেলে, রাশি। তুমি ঠিক আছো? আশ্বস্ত করি।
    রাশি আবারও একই মিষ্টতা নিয়ে বলল, হা সোনা।
    দুপাশে ইটের পুরনো ভবন গুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে বিছানায় শুয়ে আছে, এটাই এক সময়ের পুরনো এবং সমৃদ্ধ শহর ছিল, আজ তাকে অজ গাঁ বললেও অপমানিত করা হবে কিনা নিশ্চিত নই, মারোয়াড়ি ব্যবসায়ী দের ফেলে রাখা ছড়ানো ছিটানো বাড়ি, যারা যুদ্ধ কিংবা তার প্রাক্কালেই অত্যাচারিত হয়ে দেশ ত্যাগ করেছে, অনেকটাই দখলদারত্বের প্রভাবে আজ শুধু স্মৃতির ভস্ম টুকু গঙ্গায় প্রবাহিত হবার অপেক্ষায় তার অস্থি টুকু লাল সালুতে বাঁধা কাঁসা বা পেতলের কাটোরায় বন্দি, কিন্তু মুক্তি এর নেই!
    কথা বলতে বলতে মেইন সড়কে যখন পৌঁছাই তখন সারে সাতটা বাজে, কেউ ক্লান্ত হইনি বলতে পারি। বললাম, চলো, চা খেয়ে আসি।
    -চলো।
    সড়কের পাশে রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসলাম। চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে ওকে দেখছিলাম, অনিন্দ্য সুন্দর তার চোখ, সুডোল নিটোল দেহ পল্লবে সুসজ্জিত নারী, আমরা ভালবাসি, ভালবাসার তাগিদেই এমন আগুন ফাগুনের দিনে এক হয়ে গেছি, চায়ের পর্ব শেষ করে উঠলাম, বললাম, চলো এগিয়ে দিয়ে আসি বাড়ি অব্দি।
    বলল, না, মেডিকেলের গলির মোড় অব্দি হেঁটে যাই। ভেতরে দাদা অপেক্ষা করছে।
    -কোন দাদা? ঢ্যাপা মণ্ডল?
    -ছি! কি বল। দাদা না!
    আমিও তাকে অনুসরণ করলাম, চারপাশে গাড়ি মোটরের হর্ণ শব্দ, ভিড় আর ধুলোর সাগর পেরিয়ে দুজনে পৌঁছে যাই মেডিকেলের পেছনের সরু গলি টার কাছে, যেখান থেকে আরো কিছু দূর হাঁটলেই মেডিকেল কলেজের সমবায় ভবন কিন্তু ও বলল, এ পর্যন্তই, ভেতরের গলিতে কেউ চিনে ফেললে বিপদ। দাদা তো আছেই
    আচ্ছা বলে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি, সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আমার গাল দুটো চাপ দিয়ে প্রস্থান করল, সে হাঁটছে, আমি দেখছি, সে ঘুরে তাকাল, আমি দেখছি, আবার তাকাল, আমি দেখছি, আবার তাকাল, আমি দেখলাম…ভিড়ের মাঝে মিশে যাবার পরও আরও যতটুকু শেষ দেখা যায় আমি দেখলাম, ধীরে ধীরে ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল রাশি, আমি আরেকটু দাঁড়িয়ে ফুটপাত ধরে ব্যাগ কাঁধে হাটঁতে থাকি… এই ভেবে যে আবার দেখা হবে। ধীর পদে হাঁটি, সরু পথ ধীরে ধীরে প্রশস্ত হয়, বড় বড় অট্টালিকা দালানগুলোও আমার সাথে হাঁটে, তারা কি ভেবে হাঁটছে!

    1
    1 Comment
Skip to toolbar