-
অবশেষে
লিখবার কল্পনা-বাসনা ছিল না। মস্ত গপ্প লিখবো—তা কি করে হয় জানি-নে! কী করে প্লট সাজাতে হয়, চরিত্র বসাতে আমাকে ভীষণ কষ্ট লাগে। সংলাপে জড়তা, বর্ণনায় ক্লান্তি—নিথর তো আর গল্প হয় না।
যদিও জাত-লিখিয়ে নই, আমার পিতা ষোল আনা পড়াশোনা করেছিলেন। হাত হতে বেশ কিছু উৎকৃষ্ট ফসল তিনি ফলিয়েছিলেন, কিন্তু সাংসারিক ডামাডোলে সবটাই বৃথা গেছে। আমার পিতামহ কোনো রকমে বিদ্যে গিলে পিতৃশোকে তা বন্ধ করে ভবঘুরে হয়েছিলেন। সুর করে মহাভারত-রামায়ণ পড়তে পারতেন, দু-চার লাইন সাধুভাষায় চিঠি তো লিখতে পারতেন বেশ। যদিও রীতির কোনো ভাল-ভালাই নেই।
তাঁর পিতা, অর্থাৎ আমার প্রপিতামহ নাম-সইয়ের অনন্যতা জানতেন, যেহেতু উনি একজন শিল্পী ছিলেন।
বেশি বকেছি—এমন অভিযোগ তো নেই। একটি ফেরবার গল্প বলি। কিন্তু কী? থাক।
সকালে বৃষ্টি হয়েছিল। মাটি থেকে ভাপসা গন্ধ বেরোচ্ছে। আমার চোখে ভীষণ কাতর। চোখ ঘষে কোনো রকমে বিছানা ছেড়ে উঠি—বড্ড আলসেমি। দাঁতের উপর অত্যাচার চালিয়ে বেরোই। পেট চোঁ-চোঁ করছে।
ফুটপাত ফাঁকা। চায়ের দোকানি গালে হাত দিয়ে বসে আছে, কী যেন ভাবছে। জাগাবার ইচ্ছে নেই। কলা-পেটিস গিলে দাম চুকিয়ে দিলেই পারি। খিদে খুব অদ্ভুত!
অদ্ভুত সবই, সবাই। যেমন ধীরে ধীরে ধূসর হয়ে যাচ্ছে সমস্ত রঙিন।
আগবেলা সুপ্তি একরাশ হাসি দিয়ে বলল—
—“কাল যে ঘন ঘন বিড়ম্বনায় ফেলছে না!”
—“কেন, কী হলো?”
—“এইটুকু উপটান দাম কি জানো?”
—“না, কিনিনি কখনো।”
—“কিনবে কি!”
—“আর কী কিনলে?”
—“বলা যাবে না।”
—“কেন?”
—“এমনি।”
না, জানতে চাই না। কোল ঘেঁষে ব্যক্তি-পর্যায়ে চলে যায় এ হেন অপরাধ, তার উপর কৈফিয়ত!
তবুও জানি-না কী যেন বাঁধে। কলার বেয়ে ঘাম চুইয়ে পড়ছে, শার্ট ভিজে একাকার। ট্রান্সপারেন্ট মনে হচ্ছে। বুকের পশমগুলো কুঁকড়ে গেছে।
চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিতেই হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল। আমি থামাতে পারি-না। বললাম—
—“কোথায় যাচ্ছি?”
বলল—
—“যেখানে যেতে ইচ্ছে করে।”
তারপর নিঃশব্দে এগোচ্ছি। মাঝে মাঝে খুব রাজনৈতিক মনে হয়—শুধু সুবোধ বালকের মতো রীতি-অনুশাসন মেনে চল। এও কি হয়! আমি বোধহয় একে কখনো স্বাধীন বোধ করিনি।
ওর সাদা-কালো চৈত্র পোশাক ভয়ানক স্পৃহা জন্মায়। কোনোদিন গাল ছুঁয়ে দেখিনি। ঠোঁট কেঁপে উঠেছে। কিসের জন্মান্তর, কিসের বাকপ্রণালি, কিসের তৈলচিত্র! আমাকে সত্যি নির্বোধ মনে হয়।
রাস্তায় দাঁড়ানো মানুষগুলো কাণ্ড দেখছে, হাসছে, আরও কী বলছে—তাতে কিছু যায়-আসে না। পিতার অর্থভাণ্ডার শেষ হল বৈকি, আমি তবু হাত পেতে ভিখ মাঙি। মা বলতেন—
—“এখনে কি হাত চালাও?”
থাক। আমি কুণ্ঠাবোধ করি-না। গর্ভের উপর ঋণী। আমার ঋণ খসাতেই বুক জ্বলে—মায়ের নয়, তার!
রিকশায় চেপে কোথায় পৌঁছে গেছি জানি-না। আমি তাকিয়ে ছিলাম তার চোখ-মুখে। অস্পষ্টতা গাঢ় হলো আমার হৃদয়পিঞ্জিরা।
বলল—
—“নামো…”
আমি সম্বিৎ ফিরে বললাম—
—“হুম।”
গাছের আগায় লাল আগুন। পাখি দুটি ঝগড়া করছে অবিরত। কী বলছে! হয়তো সংসার বলে তাদেরও অস্থিরতা। কী যেন মিনসের গলা নিভে যাচ্ছে—বুঝলাম না।
লোহার আরাম-কেদারা। বসে পা ছড়িয়ে দিই। সুপ্তি হাত ধরে আঙুল নাড়াচাড়া করছে। কিছুক্ষণ স্তব্ধ, নীরবে বয়ে চলছে স্রোত।
তারপর বলল—
—“তুমি জানো, আকাশে আজ তোমার-আমার নাম খোদাই করবো!”
অসীমে কী করে খোদাই করা যায়, তাই ভাবছি—মিথ্যে।
—“হুম।”
—“ছেলে হলে নাম রাখবো রুদ্রদেব।”
—“কার?”
—“আমাদের!”
আমি চমকে উঠলাম। আমি তো এমন কোনো কথা দিইনি। বরং চেয়েছি মুক্ত বিহঙ্গের মতো… উত্তর শুনে হয়তো কষ্ট পেল। আনত চোখে বলল—
—“আমি কি বেশি ভেবে নিয়েছি? তাহলে থাক।”
চায়ের পর সিগারেট টানবার অভ্যাস। মনোযোগী হতে হতে চাইছি। নিপাট ভদ্দর লোক। ম্যাগাজিনে পড়েছিলাম ভদ্দর লোক সম্পর্কিত আর্টিকেল।
ফুলের গন্ধ ভাসছে। নিশ্বাসে ভরে নিই যতটুকু পারা যায়। মডার্ন প্রোজে কিছু ভাল লাগার মতো লেখা ছিল—বারট্রান্ড রাসেল। তাঁর লেখাটি বেশ।
পাখি দুটো আর নেই। আধার খুঁজতে সয়ে রয়ে চলেছে। মানুষে বলে ওটা অভ্যাস। আমি বলি বদভ্যাস। আমি কী গুহাবাসী তরুণ? আমি কী নব্য রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করছি? সংবিধান?
সবটাই গোছানো মৃত্যু ফাঁদ। স্বৈরতা।
শহর ছেড়ে কিলো পাঁচ উত্তরে। তবুও বাস, ট্রাক, অটো বাইপাস রুট হিসেবে কাজ সারছে। গন্তব্যে পৌঁছানোই স্বার্থকতা নয়।
বাতাসের কোনো পাত্তা নেই। আমি ঘামছি। সুপ্তি বলল—
—“বাদাম খাই?”
—“হুম। চলে।”
বাদাম-ওলা চোখ টিপে বলল—
—“মামা, লন খাঁটি বাদাম। খাইবেন, মজা লইবেন।”
—“বাদামের খাঁটি কী? সোনা নাকি, যে খাদ মিশানো আছে?”
বাদাম-ওলা চলে গেল। সুপ্তি ফিক করে হাসল। আকাশে সূর্যের রীতিমতো দুর্ব্যবহার। গাছের তলায় বসে পারতাম, জাহির করলে।
বলল—
—“লোকে খারাপ ভাববে, আড়ালে-আবডালে… হুম।”
—“অ্যাঁ।”
সেদিন চূড়ান্ত অভিনয় কাটিয়েছি মিথ্যের মধ্য দিয়ে। পৃথিবীতে এটাও প্রথা। ওসব শুধু কামদায়ক। মনকষ্ট বলতে যা থাকে তা আপনার ব্যর্থতায়—প্রেমে নয়।
একটি পরাধীন এবং সাজানো কৌতুক। তবে হাসির বদলে বিড়ম্বনাই সইতে হয় বেশি।
তারপর এক সন্ধ্যায় বেলকোনিতে দাঁড়িয়ে বাতাসের সাথে সঙ্গম করছি। ম্যাজিক-বস্তুটিতে ‘স্মরণ’ নামক অনুভূতি মানসিকতার সাথে জুড়ে দেওয়া আছে। তাই বোতাম টিপে কণ্ঠ পৌঁছানোর পায়তারা করছি বারবার। ডুবে গেছি।
বিকেলে গেটের সামনে দাঁড় করিয়ে আর ফিরে আসেনি। বলতে পারতে—আমি বেরোচ্ছি না। কিংকর্তব্যবিমূঢ়! তবু অপেক্ষায় থাকতে থাকতে চলে এলাম। বস্তুটি বন্ধ ঘোষণা করলো।
আমি একটু ঢেলে সাজিয়ে বলতে পারি—ভালবাসার বিস্তর অর্থ আছে: কাম আছে, বেদনা আছে—যদি সেটি ভালবাসা হয়। কেমন?
একটু খোঁজ, একটু আদর-যত্ন, একটু অধিকার, একটু সমর্পণ, একটু… হায়! সব অবশেষে বিষ পান।
আমি রাজপথে হাঁটলে বুঝি—মানুষ কত অসুখে ভুগছে। ক্যান্সার, এইডস, গোঁদ ইত্যাদি কিছু নয়—মানসিক অসুস্থতাই চরম বিপাকে ফেলে দেয়। তখন বাঁচবার মানে মৃত্যু গ্রহণ করি।
পিতা সাবধান-বার্তা দিলেন—
—“অর্থভাণ্ডারে যে ক’টি টাকা আছে, তা দিয়ে সংসার চলবে। অন্য কিছুর উপায় দেখিনা।”
আমি বলদা! কাগজে-কলমে হিতৈষিপণা দেখিয়েছি। আপন পকেটে যৎসামান্য ঢোকে। ছাত্রের মাথায়-গলায় পাড়া দিয়ে চলে। চলবেই বা না কেন! আমি বাউন্ডুলে বলে আরসবেরা চলছে না!
আবার সেই কল্পিত কথা। বাস্তবে সব কড়ায়-গণ্ডায় হিসেব লয়।
একমাস চলে গেছে। সেদিন আর সেদিন নেই। সে রঙের ঘুড়িতে আকাশ ফুঁড়ে চলেছে। এটা তার স্বপ্ন। আমি স্বপ্নকে স্বাগত জানাই।
আমি কিছুই জানি-না। এখন সন্তানটির নামকরণে ‘দেব’ টুকু ছেঁটে ফেললে ভাল লাগে। নইলে ঐ ইতিহাস পেঁচিয়ে ধরে।
আমি সিগারেট জ্বালাই সময়ের বর্তমানে…2 Comments
Friends
নীলিদ্রিমা তন্বী (রোদেলা )
@marzia-mahabub
সঞ্জিত তির্কী কাব্যিক
@sonjittirkypronob
অনিন্দিতা দেব
@aninditadebanibd-6122021
আর্য
@arjo
পরিমল রায়
@parimal-roy
Kanej-Roksana
@kanej-roksana
সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী
@shakawat83
Mizan Rahman, Editor: Dainik Journal Asia
@mizan-rahman
Jannatun Nur
@jannatun-nur


আপনার গল্প পড়তে গিয়ে মনে হলো, গল্প সরলরেখায় এগোনোর চেষ্টা নয়—বরং খণ্ড খণ্ড স্মৃতি, অতীত-বর্তমান, প্রেম-অপ্রেম, পারিবারিক ইতিহাস আর ব্যক্তিগত মানসিক অস্থিরতার মিশ্রণ। সবমিলিয়ে অনবদ্য এক আত্মকথনধর্মী গদ্য।