Profile Photo

ভীষ্মদেব সূত্রধরOffline

  • একটি কাকের আত্মকাহিনী

    গভীর রাত্রিরে বাঁশবাগানের ভেতর দিয়ে ফিরছি। অমাবস্যার সেই রাত, যদিও টর্চের আলোতে পথ পরিস্কার দেখতে পাই। পরিত্যক্ত শ্মশানের পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদীর কলকল ধ্বনি শুনি অদূরে। বাতাসের শিরশির শব্দ মন্ত্রমুগ্ধের মতো টানে। পৃথিবী ঘুমন্ত অবস্থায় পরিপাটিভাবে সাজানো। মাঝে মাঝে দু-একটা পেঁচা কিংবা নিশাচর শেয়াল হুক্কাহুয়া ডাকে থেমে থেমে।
    আরো কতগুলো শব্দে মোহিত হয়ে সেগুন গাছের তলায় দাঁড়াই। একটি কাক ঠোঁট গুঁজে বসে আছে, কিন্তু অনিদ্রায় তার চোখে স্পষ্ট । আমি ডাকলাম, সেও সাড়া দিল। আর্দ্র কণ্ঠে বলল—
    — কিছু বলবেন?
    — তুমি এখানে একা একা বসে আছো?
    কাক হেসে জবাব দিল— এমনি।
    — কিছু হয়েছে কী?
    — না। আপনি?
    — পথিক।
    বাতাস থেমে যায়। আরো গাঢ় অন্ধকারে আমি তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে জ্বলতে দেখি। আমি বলি—
    — পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়েছে, তুমি একা একা এখানে!
    — পৃথিবীতে একারাই সর্বোচ্চ অধিকারহীন।
    আমি অতো দর্শন বুঝিনা, কথাটি এড়িয়ে যেতে চাইলাম বলেই শুরু করলাম অন্য কথা,
    আমি জানতে চাইলাম তার আত্মকাহিনী। বহুদিন ধরে এমন একটা সুযোগ খুঁজছিলাম বটে। কাক আবারো হেসে বলল—
    — ওটা আপনাদের জন্য, আমাদের নয়।
    কিয়ৎক্ষন কি ভেবে
    উড়ে এসে কাছে বসল। সে বলতে শুরু করল—
    আমি জন্মেছিলাম কার্তিক মাসে, যখন এই গাঁয়ে নবান্নের উৎসবে চড়ুই-শালিকেরা নিমন্ত্রণ পেত। আমাদের বাসা ছিল একটা সুপারি গাছের আগায়, শুকনো ঘাস আর লতা-পাতায় ঘেরা চমৎকার আবাসস্থল। আমি এবং আমার ভাই ধীরে ধীরে মায়ের পাখার নিচে বড় হতে থাকি। বাবা-মা সকালে উঠেই প্রকৃতির বর্জ্য নিষ্কাশন করতে যেত, ঠোঁটে করে নিয়ে আসত খাবার। শুধু আমরা নই, সাথে ছিল কোকিল মশাইয়ের দুটো বাচ্চাও। আমরা তাদের সমগোত্রীয় ভেবেই আসছিলাম। মা সবাইকে সমান ভাগে ভাগ করে খাওয়াত।
    সেবার খুব মন্দা। খাবারের সংকট। মনুষ্য জগতে যাকে বলে দুর্ভিক্ষ। দেশীয় পরিস্থিতি আমাদেরও চরম প্রভাব ফেলে। যেহেতু আমরা নির্ভরশীল বাস্তুসংস্থানে মনুষ্যদের ওপর, যাদের হাত আছে। আমরা একটু একটু করে উড়তে শিখি— এক ডাল থেকে আরেক ডালে। কোকিলছানা দুটোও তাই। আমরা গল্প করি। ভাই ক্ষুধায় কান্না করলে ওকে সান্ত্বনা দিই। কোকিলছানা দুটো ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখে। বাবা-মা গভীর রাত্রিতে খাবারের সন্ধানে যায়, আসে খালি ঠোঁটে।
    হুট করে একদিন বাসা থেকে ভাইটি পড়ে যায় মর্ত্যে। একটা খাটাস ভাইকে মুখে তুলে নিয়ে হেঁটে চলে যায়। ভাইয়ের শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ধীরে ধীরে জঙ্গলে পৌঁছে যায়। বাবা-মা তাড়া করে খাটাসের পিছু নেয়, কিন্তু পায় না। তখন থেকে আমি একাই মায়ের বুকের ভেতর লেপ্টে থাকি। কোকিলছানা দুটো উড়ে চলে যায়, আর ফিরে আসে না। মা খুব শোক করে। সন্তান হারালে যা হয়!
    বাবা বলত দেশের অবস্থা ভালো নয়। মনুষ্য জাতির কোনো মহান নেত্রী একটানা হরতাল ডেকেছে। হরতালে হুহু করে বেড়ে চলে খাবারের দাম। দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় চারদিকে। বাসে-ট্রামে তখন আগুন আর আগুন। আমরা কাকেরা খাদ্যের জন্য শহরের ডাস্টবিনে ঠোকর মারি, কিন্তু সব পুড়ে ছাই।
    আমি উড়তে শিখেছি। মোটামুটি খাদ্য সংগ্রহ করতে পারি। কিন্তু খাদ্য কোথায়? ক্ষুধার জ্বালায় একবার মনুষ্য শিশুর হাতে থাকা রুটি ছিনিয়ে খেয়েছি। কষ্ট লেগেছিল, কিন্তু ক্ষুধা!
    এরই মধ্যে বাবা ইলেকট্রিক তারে শক খেয়ে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বাবার মৃত্যুর জন্য আমি মনুষ্যজাতিকে দায়ী করি। দুর্ঘটনা নয়, ওটা একটা পরিকল্পিত হত্যা। তারা ইলেকট্রিক তার ছেঁড়া রেখেই ঘর উজ্জ্বল করে। নেগেটিভ-পজিটিভ কিছুই মানে না। প্রতিনিয়তই আমরা মরছি। খুব নিষ্ঠুর ওরা।
    বাবা মারা যাবার কিছুদিন পরেই মা দেশান্তরী হয় আরেকটি পুরুষ কাকের হাত ধরে। আমি একদম একা হয়ে পড়ি। অন্য কাকেদের সাথে মিশতে পারি না। আমাকে তারা দলে নেয় না। অথচ আমার খাদ্য চাই, জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে চাই, নতুন ঘর চাই। মনুষ্য জগতের মতো এখানেও বিরাট রাজনীতি চলে। প্রথা চলে, দলাদলি-দালালি চলে। আমি ছিন্ন করি সমস্ত সম্পর্ক। বেরোই মুক্ত আকাশে। অবিরল সূর্যের কিরণে উড়ে চলি। বসি টাওয়ারের প্লেটে।
    শহর তখন কাকেদের দখলে। খাদ্যের জন্য ডাস্টবিন একটি যুদ্ধের ময়দান— জোর যার, মূল্লুক তার। আমিও পারিনি। উচ্ছিষ্ট যা পেয়েছি, তা দিয়েই দিবারাত্রি কাটিয়েছি। ঘন ঘন বাস-ট্রাম এবং লাউড স্পিকার মাইকের বিরক্তিকর শব্দে ঘুম আসত না।
    সেখানেই মায়ের সাথে দেখা। মা, নব্য পুরুষটি এবং তার তরুণ ছানাগুলো নিয়ে এখানে বাসা বেঁধেছে। পরিচয় করিয়ে দিল। দুটো ছানাই মেয়ে এবং দুর্ধর্ষ। পটপট করে শহুরে ভাষায় কথা বলে। মাঝে মাঝে ওদের সাথে শহরের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যেতাম। গল্প করতাম। বেশ কাটছিল দিনগুলো। একদিন ওরাও পুরুষ বন্ধুর সাথে দিগন্তে মিলিয়ে যায়।
    আমার ভালো লাগছিল না এসবে, প্রথমে বেশ ফূর্তিই জেগেছিল কিন্তু কি বলুন তো পরের ঘরে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতো, ছোট্ট ঘুপছি বাসায় এতোগুলো পাখি অন্নাভাবে ধুঁকে ধুঁকে রয়েছে, আমি কামাই করলেও তাতে বিশেষ সুবিধের হলো না। মা আবার চলে যায়। এবার যে গেল, আর দেখা হয়নি। আমি ক্ষুধার চোটে দেশে ফিরে আসি। গাঁয়েও প্রচণ্ড খাদ্যাভাব। ফসলের হাহাকার। অর্থের কালো রূপ মনুষ্যজাতিকে আরো অমানবিক করে তোলে।
    আমি আমার আত্মীয়ের বাড়িতে উঠি। আত্মীয়রা তেমন একটা দেখতে পেত না। খেতে দিত না। ভাগাভাগিতে কর চাইত, আমিও দোষ দিতে চাইনা, এই অস্থিরতায় সকলেরই ত্রাহিত্রাহি অবস্থা । কিন্তু আমার একটিই ভালো লাগার বিষয় ছিল আত্মীয়ের- বড় মেয়ে কাকটির চাহুনি। উফ! সুযোগ পেলে ছুটে যেতাম দেখতে। ভাগ্য প্রসন্ন মনে করে আমি নিবেদনও করি। সে আমাকে কাকেদের চোখে কাক বলে ভর্ত্সনা করে তাড়িয়ে দেয়। কষ্ট একটা পেলাম কিন্তু অভাব অনটনে নিজেকে ভুলিয়ে রেখে শপথ করেছি- ব্রহ্মচারী হবো। আমি উদ্বাস্তুর মতো ঘুরে বেড়াই এখন, স্থায়ী নিবাস নেই, এটিও কারো ফেলে রাখা জীর্ণ আবাসে ঠাঁই নিয়েছি, এখানে দাঁড়কাক থাকতো, বিয়ে-থা করে নতুন সংসার করতে এদেশ পাড়ি দিয়ে চলে গেছে ভীনদেশে। তারপর প্রতিদিন এভাবেই চলছে।
    এই গাছটি আমার খুব প্রিয় একটি জায়গা। এখানেই বসে বর্তমান জীবন কাটছে।
    কাকটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চুপটি করে বসে থাকে। আমিও খানিক চুপ করে থাকি। পরে বলি—
    — আজ আসি, আমায় বহুদূরে যেতে হবে।
    — আপনি কিছু বললেন না যে!
    — তোমার মতো আমার কোনো ইতিহাস নেই। চলি…।

    3
    1 Comment
    • দারুণ একটা রূপক-গল্প! কাকের আত্মকাহিনী শেষপর্যন্ত সময়ের ইতিহাস, সামাজিক অস্থিরতা, অভাব-অনটন আর নিঃসঙ্গতার আখ্যান হয়ে উঠেছে।

Skip to toolbar