-
দক্ষিণ এশিয়ার একটি স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু এই বাংলাদেশের ভূ প্রকৃতি বাংলাদেশের অবস্থান এবং বাংলাদেশের প্রকৃতি বৈচিত্র সম্পর্কে আমরা কজনই বা জানি!! তাই বাংলাদেশের প্রকৃতি এবং বাংলাদেশের ভৌগোলিক বিবরণ নিয়ে আবার আজকের লেখা।
বাংলাদেশ ২০°৩৪’ – ২৪°৩৮’ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮°০১’-৯২°৪১’ পূর্ব দ্রাঘিমা রেখার মধ্যে অবস্থিত একটি দেশ। বাংলাদেশের মাঝখান দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা অতিক্রম করেছে। কর্কটক্রান্তি দেখা হলো ২৩.৫° উত্তর অক্ষরেখা এবং এই রেখার অন্য নাম হলো টপিক অফ ক্যান্সার। আর ২৩.৫° দক্ষিণ অক্ষরেখা হলো মকরক্রান্তি রেখা বা টপিক ক্যাপিক্রন।বাংলাদেশের মোট আয়তন ১ লক্ষ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গ কিলোমিটার। ২০১৫ সালে ভারতের সাথে সিট মহল বিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের আয়তনে আরো ১০,০০০ একর জমি যোগ হয়। বাংলাদেশ পৃথিবীর একটি বৃহত্তম ব-দ্বীপ এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ পাশে একটি বিশাল সমুদ্র রয়েছে যেটি বঙ্গোপসাগর নামে পরিচিত।আন্তর্জাতিক সমুদ্র নীতি অনুসারে একটি দেশের সমুদ্র অঞ্চলের ওপর তাঁর রাজনৈতিক সীমা ১২ নটিক্যাল মাইল, অর্থনৈতিক সীমা ২০০ নটিক্যাল মাইল এবং মহীসোপান অঞ্চল ৩৫০ নটিক্যাল মাইল। তবে বাংলাদেশের মহীসোপান অঞ্চল ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত এবং মিয়ানমারের সমুদ্রের সংযোগ রয়েছে অর্থাৎ এই তিনটি দেশ একসঙ্গে এ কারণে সমুদ্র নিয়ে এই তিন দেশের ভেতরে একটি বিরোধ হয়েছিল। ২০০৯ সালের বাংলাদেশ মিয়ানমারের বিপক্ষে (ITLOS:হামবুর্ক, জার্মানি ) এবং ভারতের বিপক্ষে (PCA:হেগ, নেদারল্যান্ডস) এই দুই আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে। এবং ২০১২ সালে মায়ানমারের সঙ্গে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ মামলায় জয়লাভ করে।
স্থলভাগ সীমানার প্রসঙ্গ যদি আসে তবে সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারত দ্বারা বেষ্টিত একটি দেশ তবে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু অংশ রয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয় আসাম, পূর্বে আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং মিয়ানমার অবস্থিত। তবে বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর অবস্থিত। বাংলাদেশের সর্বমোট সীমারেখা ৪৭১১কিমি যার মধ্যে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমারেখা ৩৭১৫কিমি এবং মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমারেখা ২৮০ কিমি। বাংলাদেশ এবং বঙ্গোপসাগরের সীমানার দৈর্ঘ্য ৭১৬ কিলোমিটার।দক্ষিণ পশ্চিম দিকে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে হাড়িয়াভাঙ্গা নদী এবং পূর্ব দিকে মিয়ানমার এর সঙ্গে বাংলাদেশ নাফ নদী দ্বারা বিভক্ত।
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি অর্থাৎ বাংলাদেশের স্থলভাগের কথা যদি বলতে হয় তাহলে বাংলাদেশের স্থলভাগকে মোট তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়
১.টারশিয়ারি যুগের পাহাড় সমূহ: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব এবং এবং উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের কিছু জেলা বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, কক্সবাজার, সিলেট, ময়মনসিংহ এই অঞ্চলগুলোতে এই পাহাড়গুলো দেখা যায়। এই পাহাড়গুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা হয় অর্থাৎ বান্দরবান রাঙ্গামাটি কক্সবাজার এই তিন অঞ্চল মিলে এক ধরনের পাহাড় দেখা যায় এবং ময়মনসিংহ, সিলেট এই দুই অঞ্চল মিলে এক ধরনের পাহাড় দেখা যায়। অর্থাৎ দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এক ধরনের পাহাড় এবং উত্তর পূর্ব দিকে এক ধরনের পাহাড় দেখা যায় এই দুই ভাগেই মোটামুটি ভাগ করা হয় টারশিয়ার যুগের পাহাড় সমূহকে। দক্ষিণ পূর্ব দিকের পাহাড় গুলো সাধারণত ৮০০ মিটার উচ্চতা সম্পন্ন হয়ে থাকে এবং এই অঞ্চলের বৃহত্তম পাহাড়ের নাম তাজিংড ং পাহাড় যেটি ১২৮০ মিটার এবং এটি বান্দরবানে অবস্থিত। উত্তর পূর্ব দিকে পাহাড় গুলো সাধারণত ২৪৪ মিটার উচ্চতা সম্পন্ন হয়ে থাকে।
২.প্লাইস্টোসিন কালের সোপানসমূহ: সাধারণত তিনটি অঞ্চলে পরিলক্ষিত হয়। বরেন্দ্র অঞ্চল, ভাওয়াল ও মধুপুর অঞ্চল এবং কুমিল্লার লালমাই অঞ্চল। অর্থাৎ রাজশাহী টাঙ্গাইল এবং কুমিল্লা এই তিন অঞ্চল।
৩.সাম্প্রতিক কালের প্লাবন সমভূমি:এছাড়া বাংলাদেশের যা আছে সবই সাম্প্রতিককালের প্লাবন সমভূমি নামেই পরিচিত। এই সমভূমি গুলোর উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে ক্রমশ নিম্ন এবং এখানকার মাটি খুবই উর্বর এবং গভীর। এ অঞ্চল পাঁচ ভাগে বিভক্ত
১ রংপুর ও দিনাজপুর নিয়ে একটি ভূমি (উত্তর)
২ ঢাকা টাঙ্গাইল জামালপুর পাবনা কুমিল্লা সিলেট বন্যা প্লাবন সমভূমি (মধ্য)
৩ কুষ্টিয়া খুলনা যশোর ফরিদপুর ঢাকার কিছু অঞ্চল নিয়ে বদ্বীপ সমভূমি (দক্ষিণপশ্চিম)
৪ নোয়াখালী আর ফেনী কক্সবাজার পর্যন্ত চট্টগ্রাম উপকূলীয় সমভূমি (দক্ষিণপূর্ব)
৫ খুলনা পটুয়াখালী বরগুনা নিয়ে স্রোতজ ভূমি অর্থাৎ সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চল। (দক্ষিণ)
এবার আসি বাংলাদেশের নদনদী বিষয়ে বাংলাদেশের মোট নদীর সংখ্যা ৭০০টি এবং একারনে নদীমাতৃক দেশ বলা হয় এবং আমরা মাছেভাতে বাঙালি। বাংলাদেশের প্রধান প্রধান নদী গুলো হল
পদ্মা :পদ্মা নদীর উৎপত্তি হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে। সেখান থেকে উৎপন্ন হয়ে এই নদীটি ভারতের উত্তরপ্রদেশ, বিহার দিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের রাজশাহী হয়ে বাংলাদেশের প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশের রাজশাহীতে প্রায় এটি বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে বরাবর ১৪৫ কিলোমিটার সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে পুরোপুরি প্রবেশ করেছে। এটি যমুনা নদীর সঙ্গে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে মিলিত হয়েছে এবং পরবর্তীতে পদ্মা নামে আবারো বঙ্গোপসাগরের দিকে এগিয়ে গিয়েছে।
ব্রহ্মপুত্র :এটি কৈলাশ শৃঙ্গের মানব সরোবরের উৎপন্ন হয়ে ভারতের আসাম হয়ে বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।অষ্টাদশ শতাব্দীতে সংঘটিত এক ভয়ঙ্কর ভূমিকম্পের কারণে এই নদী তার গতিপথ এবং যমুনা নদী সৃষ্টি হয় এখান থেকেই। এই যমুনা নদী পরে পদ্মা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে। আর ব্রহ্মপুত্র নদী চলছে তার মত এবং এই চলতে চলতে এক সময় কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব বাজারে মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়ে মেঘনা নাম নেয়।
যমুনা :যমুনা নিয়ে নতুন কিছু বলবার দরকার নেই যমুনার উৎপত্তি ১৭৮৭ সালে এবং এ ব্যাপারে ব্রহ্মপুত্র নদের ওখানে আলোচনা করা হয়েছে।
মেঘনা :মূলত আসামের বরাক নদী সুরমা আর কুশিয়ারা এ দুটি নামে বিভক্ত হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে এই দুটি নদী ও কালনী নামে একটি নদীর সঙ্গে মিলিত হয় হবিগঞ্জ জেলার আজমেরীগঞ্জ এ।তারপর থেকে এটি মেঘনা নামে এগিয়ে চলে। ব্রহ্মপুত্রের সাথে মেঘনা নদীর দেখা হয় কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব বাজারে এবং পদ্মার সঙ্গে দেখা হয় চাঁদপুরে। সেখানে মিলিত হয়ে মেঘনা নাম নিয়ে একদম বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়।
কর্ণফুলী :আসামে লুসাইপাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে কর্ণফুলী নদী রাঙ্গামাটি আর চট্টগ্রাম অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গপোসাগরের পতিত হয়েছে। এই নদীর দৈর্ঘ্য ২৭৪ কিলোমিটার।
বাংলাদেশ জলবায়ু: বাংলাদেশের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বাংলাদেশের গড় বৃষ্টিপাত ২০৩ সেন্টিমিটার অর্থাৎ ২ মিটার। বাংলাদেশের প্রধান প্রধান ঋতু ছয়টি যা গ্রীষ্ম বর্ষা ও শীতকাল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে
গ্রীষ্মকাল:মার্চ এপ্রিল ও মে এই তিন মাস গ্রীষ্মকাল। এ সময় তাপমাত্রা ২১° থেকে ৩৪° পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং গড় তাপমাত্রা ২৮° সেলসিয়াস। এপ্রিল মাস সবচেয়ে উষ্ণতম মাস। এ সময় কালবৈশাখী ঝড় পরিলক্ষিত হয়। গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ দিক থেকে আগত উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু আর উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আগত শীতল শুষ্ক বায়ুর মাঝে সংঘর্ষ হয় এবং এ কারণে বজ্র বৃষ্টিপাত হয়।বাংলাদেশের বৃষ্টিপাতের ২০ ভাগ গ্রীষ্মকালেই হয় এবং এ সময়কার ঝড় বৃষ্টিপাত থাকে ৫১ সেন্টিমিটার। গ্রীষ্মকালের সময় সূর্য কর্কটক্রান্তি রেখার উপরে থাকে এবং বাংলাদেশের ওপরে লম্বভাবে কিরণ দেয়।
বর্ষাকাল :জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত সময় কালকে বর্ষাকাল বলা হয়। বর্ষাকালের সময় সূর্য কর্কটক্রান্তি রেখা থেকে ধীরে ধীরে মকরক্রান্তি রেখার দিকে যাওয়া শুরু করে। এই অবস্থায়ও সূর্য লম্বভাবে কিরণ দিলেও আকাশে মেঘ থাকার কারণে সূর্যের তাপ অনুভূত হয় কম। গড় তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেট। বাংলাদেশের বৃষ্টিপাতের ৮০ ভাগ বর্ষা কালে হয়ে থাকে এবং এই সময়ে শিলাবৃষ্টি দেখা যায়। তবে বর্ষাকাল সম্পর্কে ভালোভাবে বুঝতে গেলে আমেরিকার আবহাওয়া বিজ্ঞানী ফেরেলের একটি মতবাদ আমাদের জানা জরুরী। মতবাদটি হল পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধ এবং দক্ষিণ গোলার্ধ নিয়ে। সমুদ্রস্রোত আর বায়ুপ্রবাহ পৃথিবীর আবর্তনের ফলে পরিবর্তিত হয়। উত্তর গোলার্ধে এটি উত্তর-পূর্ব দিকে এবং এটি দক্ষিণ পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়। তাহলে ফেরেলের সূত্রমতে সেই সে উত্তর-পূর্ব বায়ু বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম আয়ন বায়ু হিসেবে পরিচিত হয়ে বাংলাদেশের প্রবেশ করে এবং বর্ষাকালের সূচনা ঘটে।জলীয় বাষ্পপূর্ণ এই বায়ু হিমালয়ে বাধা পেয়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়।এবং জলীয় বাষ্প সম্পূর্ণ বায়ু থাকার কারণেই কিন্তু এ সময়ে শিলা বৃষ্টি পরিলক্ষিত হয়।
শীতকাল :নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত এই সময় শীতকাল। তাপমাত্রা অত্যন্ত কম থাকে শৈত্যপ্রবাহ হয়। তাপমাত্রা ১১° সেন্টিগ্রেড – ২৯ ° সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত হতে পারে।জানুয়ারি বাংলাদেশের সবচেয়ে শীতলতম মাস এবং গড় তাপমাত্রা ১৭.৭°সেন্টিগ্রেড।১৯০৫ সালে দিনাজপুরে সর্বনিম্ন এক ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত তাপমাত্রাতেও নেমেছিল।এ সময় উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয় অর্থাৎ হিমালয়ের সেই হিম ঠান্ডা বায়ু। উত্তর-পূর্ব কিন্তু ঈশান কোন বা ঈশান দিক নামে পরিচিত এবং হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে ইশান অর্থাৎ পবিত্র দিকে শিব অবস্থান করেন। এ সময় বায়ুর আর্দ্রতা অত্যন্ত কম থাকে আর বৃষ্টিপাত এতই কম যে ১০ সেন্টিমিটার এরও বেশি হয় না। আর উপকূলীয় বা পাহাড়ি এলাকায় এই বৃষ্টিপাত হয় যেটাই এই ১০ সেন্টিমিটার কে বুঝিয়েছে।
ধন্যবাদ সবাইকে।
Friends
শ.ম.ওয়াহিদুজ্জামান
@sharifmuhammadwahiduzzaman
Abul Hasan Tuhen
@abulhasantuhen
Rejwana Khan
@rejwana-khan
abrar
@abrar
রবিউল আলম মাজেদ
@majed1997
ছন্নছাড়া মহাপ্রান
@mihirmilton
শ ম ফরীদ আহম্মেদ
@sfahmed749gmail-com
সা দি য়া (নন্দিনী)
@nandini
AdabenTatali
@adabentatali