-
আধ্যাত্মিক সাধনা থেকে মানবিক কাব্যধারার অভিযাত্রা
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
বাংলা সাহিত্যধারার ইতিহাসে সুফিবাদ-প্রভাবিত রচনাগুলি একটি স্বতন্ত্র ও গভীর আধ্যাত্মিক শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। মধ্যযুগে বাংলার সামাজিক-ধর্মীয় রূপান্তরের সঙ্গে এই সাহিত্যধারা নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল। ইসলামের আগমন, বহিরাগত সুফি সাধকদের কার্যক্রম, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্মতাত্ত্বিক সংলাপ এবং ফারসি-আরবি সাহিত্যভাণ্ডারের অনুবাদপ্রবাহ—এই সব মিলিয়ে বাংলায় যে নতুন সাহিত্যভাষা ও ভাবধারা গড়ে ওঠে, তাকেই কালক্রমে বলা হয় সুফি সাহিত্য। এই সাহিত্য একদিকে মানুষের অন্তর্জগতের মুক্তি ও আত্মশুদ্ধির কথা বলে, অন্যদিকে প্রেম, ত্যাগ ও মানবিকতার রূপকে সমাজের হৃদয়ে আধ্যাত্মিকতার বীজ বপন করে।
বিশ্বব্যাপী সুফিসাহিত্যের ইতিহাসে তেরো শতকের ফারসি কবি জালালুদ্দিন রুমি এক অবিস্মরণীয় নাম। তাঁর কাব্য মানবাত্মার মুক্তি, ঈশ্বরপ্রেম ও আত্মদর্শনের অনুপম ব্যাখ্যা বহন করে। আধুনিক বিশ্বে তাঁর কবিতা ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছে, বিশেষত কলেম্যান বার্কসের অনুবাদ রুমিকে পশ্চিমা পাঠকের কাছে নতুন করে পরিচিত করে তোলে। ইরানি সাধক শামস তাবরিজির সঙ্গে রুমির আধ্যাত্মিক সম্পর্ককে ঘিরে এলিফ শাফাকের উপন্যাস দি ফর্টি রুলস অব লাভ আধুনিক সাহিত্যে সুফিবাদের পুনর্পাঠের এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। একইভাবে উর্দু ভাষার মহান কবি আল্লামা ইকবাল তাঁর ইংরেজি গ্রন্থ দি রিকনস্ট্রাকশন অব রিলিজিয়াস থট ইন ইসলাম-এ সুফিবাদ, দর্শন ও ইসলামী চিন্তার সমন্বয়ে আধুনিক বৌদ্ধিক আলোচনার পথ প্রশস্ত করেন। এসব বিশ্বপ্রেক্ষাপট বাংলার সুফিসাহিত্যকে বৃহত্তর ইসলামী-ফারসি সাহিত্যপরম্পরার সঙ্গে যুক্ত করে।
সুফিতত্ত্ব নিয়ে প্রথম বৃহৎ সাহিত্যচর্চা গড়ে ওঠে ইরানে। আবদুর রহমান জামী, নিজামী গঞ্জভী, ওমর খইয়াম, হাফিজ কিংবা ভারতীয় উপমহাদেশের আমীর খসরু ফারসি ভাষায় দিওয়ান, মসনভি, গজল, রুবাইয়াত ও খমসার মতো আঙ্গিকে আধ্যাত্মিক প্রেম ও তত্ত্বকে কাব্যের রূপ দেন। এই ঐতিহ্যই পরবর্তীকালে ভারতবর্ষে ও বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় ভাষায় অনুবাদ ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে নতুন সাহিত্যরূপ ধারণ করে। বাংলা সুফি সাহিত্য তাই কেবল অনুকরণ নয়; বরং বহিরাগত তত্ত্বের সঙ্গে দেশীয় সংস্কৃতির সংযোগস্থলে গড়ে ওঠা এক সৃজনশীল অভিযোজন।
বাংলায় সুফিসাহিত্যের বিকাশের পেছনে ছিল ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট। আরব-ইরান অঞ্চল থেকে সুফি সাধকেরা মুসলিম বিজয়ের আগেই বাংলায় আসতে শুরু করেছিলেন। তুর্কি সুলতান বখতিয়ার খলজীর বঙ্গবিজয়ের পর রাজপুরুষ, বণিক ও আলেমদের সঙ্গে পীর-দরবেশদের আগমন বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। ঢাকা, বগুড়া, পাবনা, চট্টগ্রাম কিংবা নেত্রকোনার মতো অঞ্চলে তাঁরা খানকাহ, মসজিদ, মাদ্রাসা ও মাজার স্থাপন করে ধর্মপ্রচার ও মানবসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। ইসলামের সাম্যবাদী দর্শন এবং সুফিদের উদারনীতি ও মানবপ্রেম সমাজের অবহেলিত শ্রেণিকে আকৃষ্ট করে। ফলে স্থানীয় ধর্মান্তরিত জনগোষ্ঠী ও বহিরাগত মুসলমানদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে এক নতুন সামাজিক বাস্তবতা, যার মানসিক ও আধ্যাত্মিক চাহিদা পূরণে বাংলা ভাষায় সুফি কাব্যের জন্ম হয়।
ভারতে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার অল্পকাল পরেই সংস্কৃত ভাষায় রচিত যোগতত্ত্বমূলক গ্রন্থ অমৃতকুন্ড আরবি ও ফারসিতে অনূদিত হয় এবং সুফিদের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই ধরনের মিশ্রধারার তাত্ত্বিক গ্রন্থ হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায় থেকে ইসলাম গ্রহণকারীদের কাছে সহজবোধ্য ও গ্রহণযোগ্য ছিল। বাংলার কবিরা ফারসি ও হিন্দি ভাষার সুফিগ্রন্থ বাংলায় রূপান্তর করতে গিয়ে কাহিনি ও রূপকের কাঠামো গ্রহণ করেন। শাহ মোহাম্মদ সগীরের ইউসুফ-জুলেখা, দৌলত উজির বাহরাম খাঁনের লায়লী-মজনু, কাজী দৌলতের সতীময়না-লোরচন্দ্রানী, আলাওলের পদ্মাবতী কিংবা নওয়াজিস খানের গুলে বকাওলী এই ধারার উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। যদিও এসব রচনায় মূল ফারসি কাব্যের দার্শনিক গভীরতা ও প্রতীকী রহস্য অনেক সময় পুরোপুরি সংরক্ষিত হয়নি, তবু মানবপ্রেম ও বেদনার কাব্যরূপে তারা বাংলা পাঠকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেয়। কোথাও কোথাও যোগসাধনা ও তত্ত্বের বিচ্ছিন্ন উল্লেখ এই সাহিত্যকে আধ্যাত্মিক মাত্রা দান করেছে।
বাংলা সুফি সাহিত্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা পদাবলি। ইতিহাসে প্রায় শতাধিক মুসলমান পদকর্তার নাম পাওয়া যায়, যাঁদের রচিত পদের সংখ্যা কয়েক শতাধিক। আইনুদ্দীন, আফজল, আলাওল, আলী রজা, নাসির মাহমুদ, মীর ফয়জুল্লাহ, শেখ কবির, শেখ চাঁদ, সৈয়দ মর্তুজা ও সৈয়দ সুলতান এই ধারার প্রধান কবি হিসেবে স্মরণীয়। তাঁদের অনেকেই তত্ত্বপ্রধান শাস্ত্রকাব্য রচনা করেছেন, যেখানে সুফি সাধনার দার্শনিক ব্যাখ্যা স্থান পেয়েছে। সৈয়দ মর্তুজার ষাটেরও বেশি সুফিপদ তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ভণিতাযুক্ত এসব পদে রাগতালের উল্লেখ থাকায় অনুমান করা যায় যে এগুলি গীতরূপে পরিবেশিত হতো, যদিও মুসলিম সমাজে কোন উপলক্ষে ও কীভাবে এই গান গাওয়া হতো তার সুস্পষ্ট বিবরণ আজ আর পাওয়া যায় না। তবু কবিদের ব্যক্তিগত অনুভূতি, ঈশ্বরপ্রেমের আকুলতা ও মানবিক বেদনাবোধ মিলিয়ে এই পদাবলি মধ্যযুগীয় বাংলার এক অন্তর্মুখী সাহিত্যধারা সৃষ্টি করে।
শাস্ত্রকাব্য ও পদাবলির সমন্বয়ে বাংলার সুফি সাহিত্য একটি দ্বিমুখী বৈশিষ্ট্য বহন করে। একদিকে রয়েছে ধর্মতত্ত্ব ও সাধনাপদ্ধতির আলোচনা, অন্যদিকে হৃদয়ের গভীর অনুভূতি ও প্রেমের ভাষা। এই সাহিত্য তাই কেবল ধর্মীয় প্রচারের মাধ্যম ছিল না; বরং মানুষের আত্মিক মুক্তি ও মানবিক মর্যাদার কাব্যিক উচ্চারণ হিসেবে কাজ করেছে। ওয়াকিল আহমদের মূল্যায়নে দেখা যায়, শাস্ত্রকাব্যে মুসলমান সমাজের তত্ত্বচিন্তা আর পদাবলিতে তার অন্তর্লোকের আকুলতা প্রতিফলিত হয়েছে—যা বাংলা সাহিত্যকে এক নতুন অনুভবের জগতে নিয়ে যায়।
আজকের দৃষ্টিতে বাংলা সুফি সাহিত্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ধর্ম, দর্শন ও শিল্প একে অপরের পরিপূরক হতে পারে। বহিরাগত তত্ত্ব স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে কীভাবে নতুন সৃজনশীল রূপ পায়, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই সাহিত্যধারা। আধুনিক যুগে যখন মানবিকতা ও সহনশীলতার প্রশ্ন নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে, তখন মধ্যযুগীয় সুফি কবিদের মানবপ্রেম, উদারতা ও আত্মশুদ্ধির আহ্বান আমাদের জন্য নতুন প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে হাজির হয়।
গ্রন্থপঞ্জি
মুহম্মদ এনামুল হক, মুসলিম বাংলা সাহিত্য, দ্বিতীয় সংস্করণ, ঢাকা, ১৯৬৫।
আহমদ শরীফ সম্পাদিত, বাঙলার সুফী সাহিত্য, ঢাকা, ১৯৬৯।
মুহম্মদ আবদুল হাই ও আহমদ শরীফ সম্পাদিত, মধ্যযুগের বাঙলা গীতিকবিতা, ঢাকা, ১৯৬৮।
Friends
ফরিদুল ইসলাম
@dailychandpursomoy
মানিকুল ইসলাম মানিক (কবি/সাহিত্যিক)
@manik123mmmgmail-com
Sol Nova
@tasnuvatamanna
মেহেদী মারুফ
@maruf1
Kazi Adam
@kaziadam
Syed Farah
@syedfarah
naznin shamim
@nazninshamim
Poly Alam
@butterflywords
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi