-
প্রিয় তুহিন ,
শোন, আমি না দিনে দিনে তুমি হয়ে যাচ্ছি।
তুমি খুব মুভি দেখতে এবং একই মুভি ঘুরে ফিরে দেখতে।
এটাতে কোন সমস্যা নেই কারণ এটা আমিও করতাম।কিন্তু তুমি করতে কি, মুভি দেখে কাঁদতে। শুধু চোখ দিয়ে পানি পড়তো তা নয়, একদম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে।
আমি আর তোমার ছেলেরা এটা নিয়ে খুব হাসাহাসি করতাম।যেহেতু আমি অফিস থেকে ফেরার পরে ছেলেদের লেখা পড়া এবং সংসারের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম, তাই তোমার সাথে বসে মুভি দেখার সুযোগ হতো না।শুধু বৃহস্পতিবার রাতে আমরা একসাথে চারজন মুভি দেখতাম।
তবে তোমার দেখা মুভিগুলোর ডায়ালগ আমার প্রায় মুখস্ত হয়ে গিয়েছিলো।
তোমার অনেকগুলো পছন্দের মুভির মধ্যে Sooryavansham মুভির একটা দৃশ্যের কথা আমার মনে পড়ে যেখানে অমিতাভ বচ্চন নায়িকাকে খাইয়ে দিচ্ছিলো, এমন সময়ে নায়িকার বাবা চলে আসেন।তিনি জানতে চান- হাতে কি হয়েছে?
উত্তরে নায়িকা দেখায় যে সে হাতে মেহেদী পরেছে জন্য তাঁকে খাইয়ে দিচ্ছে।এই দৃশ্য দেখে তুমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে। আমি তোমাকে বলতাম- এই দৃশ্য দেখে কাঁদার কি হলো? তুমি কি আমাকে খাইয়ে দেও? আমারও তো মেহেদী হাতে লাগিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। নিজের বউয়ের জন্য দরদ নেই, মানুষের বউ এর কষ্ট দেখে দরদ লাগে?
তুমি উত্তর দিতে না, শুধু কাঁদতে।
এখন আমি এই মুভিটার সেই দৃশ্য দেখে কাঁদি। কারণটা কি অভিনয় নাকি তুমি কাঁদতে তাই?
আমি , তুমি হয়ে যাচ্ছি তুহিন।
তোমার ছোট্ট ছেলে যখন ১ম জন্মদিনে পড়ে গিয়ে ভ্রুর কাছে কেঁটে গিয়েছিলো , তখন তুমি নিয়ে গিয়ে সেলাই করিয়েছিলে।আমি বাহিরে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলাম।আমার মনে হয়েছিলো নিষ্ঠুর তুমি।
সেই তুমি ,রেহানের ৩য় শ্রেণীর ভর্তির প্রশ্নের উত্তর ছোট্ট রোহান দিয়ে দিতো, যে কিনা তখন পড়াশোনা শুরু ই করে নাই, সেটা শুনে কাঁদতে।
আমি এবার তোমার ছোট ছেলের বার্ষিক ক্রিড়া প্রতিযোগিতায় গিয়ে দেখি তোমার ছেলে স্ট্যাচু হয়ে হাতে ৫ কেজি ওজনের ব্যানার নিয়ে ৪৫মিনিট দাঁড়িয়ে আছে।আমার চোখে একটুও পানি আসে নি তুহিন, কিন্তু যখন ও প্যারেড করে মঞ্চের সামনে দিয়ে এগিয়ে আসছিলো এবং মাইকে তোমার ছেলের নাম বলছিলো।এবং আরও বলছিলো যে- এই একমাস নিরলস পরিশ্রম করেছে সবাই, আজকের দিনটার জন্য তখন আমি আমার চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।
আমি , তুমি হয়ে যাচ্ছি তুহিন।
তুমি প্রোজেক্ট নিয়ে যখন প্রচন্ড দুঃশ্চিন্তায় থাকতে, তোমার হাতে যখন টাকা পয়সা থাকতো না, তখনও তুমি গান শুনতে। আমি হা হুতাশ করতাম।
আমি এখন ফাঁকা মানিব্যাগ নিয়েও বিন্দাস ফু্ঁরফুঁরে হয়ে গান শুনি।গান বন্ধ হয়ে গেলে তোমার বড় ছেলেকে ডেকে বলি “তোমার বিয়ের গানটা ছেড়ে দেও তো”। সে এসে ছেড়ে দেয় 😀(তোমার মতই বুদ্ধু হয়েছে )!
আমি ,তুমি হয়ে যাচ্ছি তুহিন।
তুমি প্ল্যান করতে তোমার ছেলেদের বউকে কি কি গহনা দিবে।
আমি বসে বসে প্ল্যান করি আমার মেয়েদেরকে নিয়ে তোমার ছেলেদেরকে কিভাবে শায়েস্তা করবো।
তোমার মনে আছে তুহিন? তুমি চাইতে আমি যেন প্রতিদিন শাড়ি পরে অফিসে যাই।তুমি বলতে- আমি যদি প্রতিদিন একটা করে শাড়ি পরে অফিসে যাই তাহলে তিনমাসেও আমার প্রতিটি শাড়ি পরে শেষ হবে না।
হ্যাঁ, তুমি প্রচুর শাড়ি কিনে দিতে আমাকে। তোমার দেওয়া প্রতিটি শাড়ির এক একটি ঘটনা আমার মনে আছে।
আমি ঠিক করেছি যখন আমার মেয়েরা আসবে তখন শাড়ি গুলোর সাথে সাথে ঘটনাগুলোও বলবো।
আমার মেয়েদের জন্য লটারির ব্যবস্থা করবো- সকাল , দুপুর রাতের রান্নার দায়িত্ব সপ্তাহের কোন কোন দিন তোমার ছেলেরা করবে এবং কোন, কোন দিন আমার মেয়েরা করবে।ঠিক যেমন তুমি ডাইনিং টেবিলের নির্দিষ্ট চেয়ার নিয়ে বা টিভির রিমোট নিয়ে মারামারি করলে করতে, ঠিক তেমন।
আমি ,তুমি হয়ে যাচ্ছি তুহিন।আমি জানি না, আমি তোমার ছেলেদের বিয়ে পর্যন্ত থাকতে পারবো কি না? তারপরও স্বপ্ন দেখি তোমার মতো।
প্রিয় তুহিন , এই পৃথিবীতে অনেক ধরনের ব্যাংক আছে।যেখানে টাকা জমা রাখা যায় , প্রয়োজনে টাকা তোলা যায়, ধার নেওয়া যায়, শোধ করা যায়। কিন্তু এই পৃথিবীতে “এমপ্যাথি” ব্যাংক থাকার খুব দরকার ছিলো। যে কারো প্রয়োজন এ সেখানে যেয়ে বিনা সুদে এমপ্যাথি নিয়ে নিয়ে আসতে পারতো।
আর সেই এমপ্যাথি ব্যাংকের একজন নিয়মিত কাস্টমার হতাম আমি।
আজ এ পর্যন্তই
তোমার হেনা।
১০/০২/২০২৫
রি-পোষ্ট4 Comments
Friends
naznin shamim
@nazninshamim
Md Mofiz
@mdmofiz
MAHMUD HAYAT
@mahmudhayat
wajibad
@wajibad
MAHAJABIN AFROZE
@mahajabinafroze
সুবহা জাহান
@subhajahan
Intisar Jabed
@intisarjabed
মেঘ
@megh
রোদেলা শিশির
@rodelashishir



আপনার এই লেখাটি বিরহের এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এটি পড়তে পড়তে চোখের কোণে জল আসা স্বাভাবিক। এমন সাবলীল অথচ গভীর আবেগপূর্ণ লেখা খুব কম দেখা যায়। চিঠিটির সবচেয়ে শক্তিশালী এবং কাব্যিক অংশ হলো “এমপ্যাথি ব্যাংক”-এর ধারণা। মানুষের কষ্টের সময় যদি সহমর্মিতা বা এমপ্যাথি ধার পাওয়া যেত, তবে পৃথিবীর শোকগুলো হয়তো সহ্য করা সহজ হতো। রাহেনার এই চাওয়াটি প্রতিটি নিঃসঙ্গ হৃদয়ের না বলা কথা।