-
সবার ঈদ
মোহাম্মদ শাহজামান শুভরমজানের শেষ দশকের একটি বিকেল। শহরের আকাশে তখন এক ধরনের নরম আলো, যেন সূর্যও বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাশেদ বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূরের মিনারের দিকে তাকিয়ে ছিল। প্রতিদিনের মতো আজও তার হাতে বাজারের তালিকা, সামনে ঈদের কেনাকাটার হিসাব। নতুন পাঞ্জাবি, বাচ্চাদের জামা, স্ত্রীর শাড়ি—সবই প্রায় ঠিক করা। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার ভেতরে একটা অস্বস্তি কাজ করছিল। মনে হচ্ছিল, কিছু একটা বাদ পড়ে গেছে—যা এই তালিকার কোথাও নেই।
হঠাৎ তার মনে পড়ল, কয়েকদিন আগে মসজিদের ইমাম খুতবায় বলছিলেন—“ঈদের প্রস্তুতি শুধু নিজের জন্য নয়, আশপাশের মানুষের জন্যও।” কথাটা তখন তেমনভাবে মনে না ধরলেও আজ যেন তা গভীরভাবে নাড়া দিল। রাশেদ নিচে তাকিয়ে দেখল, তাদের বাসার পাশের গলিতে রিকশাওয়ালা করিম তার ভাঙা রিকশাটা মেরামত করার চেষ্টা করছে। রমজানজুড়ে সে খুব একটা আয় করতে পারেনি, আর ঈদ সামনে—তার মুখে কোনো আনন্দের ছাপ নেই।
রাশেদ হঠাৎ বুঝতে পারল, তার ঈদের প্রস্তুতি আসলে অসম্পূর্ণ। সে নিজের পরিবারের জন্য সবকিছু ঠিকঠাক করলেও, তার চারপাশে অনেক মানুষ আছে যারা ঈদের আনন্দ থেকে দূরে। এই উপলব্ধিটা তাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিল।
সেই রাতেই ইফতারের পর সে স্ত্রী মিতুকে বলল, “শোনো, আমরা কি একটু অন্যভাবে ঈদের প্রস্তুতি নিতে পারি?” মিতু অবাক হয়ে তাকাল। “কীভাবে?” রাশেদ ধীরে ধীরে বলল, “আমরা যত টাকা কেনাকাটায় খরচ করব, তার একটা অংশ দিয়ে আশপাশের কয়েকটা পরিবারকে সাহায্য করি। শুধু টাকা না, খাবার, কাপড়—যা পারি।” মিতু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর মৃদু হাসল। “তুমি যা ভাবছ, আমি অনেকদিন ধরেই সেটা বলতে চাইছিলাম।”
পরদিন থেকেই শুরু হলো তাদের নতুন ঈদ প্রস্তুতি। রাশেদ প্রথমেই করিমকে ডেকে নিল। করিম একটু সংকোচ নিয়ে বাসায় ঢুকল। রাশেদ তাকে বসিয়ে বলল, “ভাই, এই ঈদে আপনার পরিবার কীভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে?” করিম লজ্জায় মাথা নিচু করে বলল, “ভাই, কী আর বলব… বাচ্চাদের জন্য কিছুই করতে পারিনি।” কথাটা বলতেই তার চোখ ভিজে উঠল।
রাশেদ তার হাতে একটা খাম দিল। “এটা আপনার জন্য। আর কালকে আপনার বাচ্চাদের নিয়ে আসবেন, তাদের জন্য কিছু কাপড় কিনব।” করিম প্রথমে নিতে চাইল না, কিন্তু রাশেদের আন্তরিকতায় শেষ পর্যন্ত সে গ্রহণ করল। তার চোখে তখন এমন এক কৃতজ্ঞতা, যা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
এই একটি ঘটনার পর রাশেদের মনে যেন এক নতুন আলো জ্বলে উঠল। সে আশপাশের আরও কয়েকটি পরিবারের খোঁজ নিল। কেউ একজন বৃদ্ধা, যিনি একা থাকেন; কেউ একজন অসুস্থ, কাজ করতে পারেন না; কেউ আবার এতিম শিশুদের দেখাশোনা করেন। ধীরে ধীরে রাশেদ বুঝতে পারল, সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে যারা নিঃশব্দে কষ্ট সহ্য করে যাচ্ছে।
এদিকে তার নিজের পরিবারেও পরিবর্তন আসতে শুরু করল। তার ছেলে আরিয়ান, যে এতদিন শুধু নিজের নতুন জামা নিয়ে উৎসাহী ছিল, এখন বাবার সঙ্গে গিয়ে অন্য বাচ্চাদের জন্য জামা বেছে দেয়। মেয়েটি, তৃষা, নিজের কিছু খেলনা আলাদা করে রাখে—যেন সেগুলো অন্য বাচ্চাদের দিতে পারে। মিতুও রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, অতিরিক্ত খাবার রান্না করে বিভিন্ন বাড়িতে পাঠানোর জন্য।
একদিন সন্ধ্যায় রাশেদ পুরনো এক বন্ধুকে ফোন করল—সাকিব। তাদের মধ্যে কয়েক বছর ধরে কোনো যোগাযোগ ছিল না, একটা ছোট ভুল বোঝাবুঝি থেকে সম্পর্কটা ভেঙে গিয়েছিল। ফোনটা অনেকক্ষণ বাজল, তারপর সাকিব রিসিভ করল। “হ্যালো?” রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “ভাই, আমি রাশেদ… যদি কোনো ভুল করে থাকি, আমাকে মাফ করে দিও।” ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা, তারপর সাকিবের কণ্ঠ ভেঙে এল, “আমিও তো তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে চেয়েছিলাম… ঈদের আগে তুমি ফোন করলে, মনে হচ্ছে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
এই একটি ফোনকল যেন রাশেদের হৃদয়কে আরও হালকা করে দিল। সে বুঝতে পারল, শুধু বস্তুগত সাহায্য নয়, সম্পর্কগুলো ঠিক করাও ঈদের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ঈদের আগের রাত। আকাশে চাঁদ উঠেছে। চারদিকে আনন্দের হাওয়া। কিন্তু রাশেদের মনে আজ এক অন্যরকম শান্তি। সে ছাদে দাঁড়িয়ে দেখছে, করিমের বাচ্চারা নতুন জামা পরে হাসছে, পাশের বৃদ্ধা তার দেওয়া খাবার নিয়ে দোয়া করছেন, আর তার নিজের পরিবারও এক অদ্ভুত তৃপ্তিতে ভরে উঠেছে।
ঈদের সকাল এলো। নামাজ শেষে সবাই যখন কোলাকুলি করছে, তখন রাশেদ অনুভব করল—এই আনন্দটা আগের যেকোনো ঈদের চেয়ে আলাদা। কারণ আজ তার আনন্দ শুধু তার নিজের নয়; এটি অনেক মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া আনন্দ।
করিম এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। “ভাই, এই ঈদ আমি কোনোদিন ভুলব না।” রাশেদ শুধু মৃদু হাসল। তার মনে হলো, আসল উপহার সে-ই পেয়েছে—একটি তৃপ্ত হৃদয়।
সন্ধ্যায় যখন সবাই মিলে বসে গল্প করছিল, রাশেদ ধীরে ধীরে বলল, “জানো, আগে ভাবতাম ঈদ মানে নিজের জন্য আনন্দ। এখন বুঝেছি, ঈদ মানে সবার জন্য আনন্দ তৈরি করা।” মিতু মাথা নেড়ে সম্মতি দিল, আর বাচ্চারাও যেন সেই কথার গভীরতা অনুভব করতে পারল।
রাশেদ জানত, এই অনুভূতিটা শুধু এক দিনের জন্য নয়। রমজান তাকে যে শিক্ষা দিয়েছে—সহমর্মিতা, সংযম, দায়িত্ববোধ—সেটা যদি সারা বছর ধরে রাখতে পারে, তবেই তার ঈদ সত্যিকারের অর্থ পাবে।
রাত গভীর হলে সে একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, আজকের ঈদটা যেন শুধু একটি উৎসব নয়—একটি প্রতিশ্রুতি। প্রতিশ্রুতি এই যে, নিজের সুখকে অন্যের সুখের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে হবে, নিজের আনন্দকে সবার আনন্দে রূপান্তর করতে হবে।
আর সেই মুহূর্তে, তার মনে এক গভীর উপলব্ধি জন্ম নিল—
সত্যিকারের ঈদ তখনই আসে, যখন কোনো মানুষ আর বঞ্চিত থাকে না।
Friends
ফরিদুল ইসলাম
@dailychandpursomoy
মানিকুল ইসলাম মানিক (কবি/সাহিত্যিক)
@manik123mmmgmail-com
Sol Nova
@tasnuvatamanna
মেহেদী মারুফ
@maruf1
Kazi Adam
@kaziadam
Syed Farah
@syedfarah
naznin shamim
@nazninshamim
Poly Alam
@butterflywords
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi

