-
ইলোরা
সাহেদ বিপ্লব
চাকরির সুবাদে বাবার সাথে ইলোরা অনেকগুলো জেলায় ঘুরেছে। আজ যে জেলাটায় এসেছে সে, তার কাছে ভাল লাগার মত একটা স্থান। পরিবারের সবাই সিদ্ধান্ত নিলো তারা এখানে থেকে যাবে। অনেক খোঁজা খুঁজি করে ভাল একটা জমি কিনে বাড়ি করেছে ইলোরার বাবা।
ইলোরা যে খুব সুন্দর তা নয়, কালোর ভেতর কেমন যেন মায়া জরানো রূপ, দেখলে মনে হবে যৌবন কেমন যেন লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে কাচা রসের মত। সে যে এত সুন্দর তা কখনও সে ভাবেনি। সে বোঝে লেখাপড়া। মানুষ হতে হলে লেখাপড়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। তার মাথার ভেতর লেখাপড়ার বাইরে আর কোনো চিন্তা নাই।
নতুন কলেজে ভর্তি হলো ইলোরা। পথে অনেক বখাটে ছেলেরা বিরক্ত করে। খারাপ ভাষার কথা বলে, প্রথম প্রথম এই শব্দ শুনে নিজের উপর খুব রাগ হতো তার। শরীরটা তার জন্য মহাপাপ। তা না হলে এমন করবে কেন বখাটে ছেলেরা। তাদের সামনে দিয়ে কতগুলো ছেলে হেঁটে গেল তাদের তো কিছু বলল না কিন্তু আমার বেলায় এমন হবে কেন? এই ভাবে হাজার প্রশ্ন তার মাথার ভেতর ঘুর পাক করছে।
সেই যে যৌবনে পা রাখার সাথে সাথে এই সব খারাপ কথা শুনতে শুনতে এখন আর সেদিকে কান দেয় না ইলোরা। একদিন তো একটা ছেলে দূর থেকে বলছে মাল তো ভালই, নতুন এসেছে আমাদের এখানে একদিন মাগিকে খেয়ে নেবো। আমাদের না খাওয়ায়ে যাবে কোথায়। কথা শুনে খুব রাগ হলো ইলোরার। ছেলেগুলোর সামনে গিয়ে বলল, তোমার আম্মু তো একদিন আমার মত মাল ছিল, তোমার আম্মু কলেজে যাবার পথে তোমার বাবারা তোমার আম্মুর সাথে এমন করত। তার ছেলেরা তোমরা, তোমাদের কাছে জাতি এর চেয়ে ভাল ব্যবহার কি ভাবে আশা করবে, একটু থেমে আবার বলল, তোমরা কি জানো আমি কার মেয়ে?
ছেলেগুলো ভয় পেয়ে কথা বলল না।
আমি পুলিশ সুপারের মেয়ে ইভটিজিং আর নয়। ভালো পথে ফিরে এসো। তোমাদের জন্য আলোর পথ অপেক্ষা করছে। ছেলেগুলো উত্তর না দিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। শোনো আর কোনো দিন এই খারাপ শব্দ বললে, বুঝো কি হবে তোমাদের কপালে, এই বলে ইলোরা চলে গেল কিন্তু তার মত কি সবার বাবা পুলিশ সুপার। যে এই ভাবে বলে পার পেয়ে যাবে বখাটেদের হাত থেকে।অনেক দিন ধরে দেখছে একটা ছেলে তার দিকে খুব মায়বী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিন্তু ইলোরা তাকালে ছেলেটা চোখটা লুকিয়ে রাখে, যাতে ইলোরা বুঝতে না পারে, যে ছেলেটা তাকে দেখে।
ইলোরা কিছুই বলে না। মনে করে বখাটে ছেলে আট দশ জনের মত সে। দুই দিনের জন্য আমাকে চায়। তারপরে আর নেই। এটা ছেলেদের মূল লক্ষ্য। ইলোরা কিছুই বলে না। এমনকি খুব একটা জানার প্রয়োজন মনে করে না।ইলোরা দেখে ছেলেটা তার দিকে এমন মায়াবী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, কোনো মেয়ের পক্ষে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। ইলোরা বোঝে কিন্তু না বুঝার ভান করে সরে থাকে বহুদূরে কিন্তু তার মায়ার টানে দূরে সরে থাকতে পারছে না। একদিন লোক বিহীন একটা স্থানে ছেলেটার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, আপনি কি জীবনে মেয়ে মানুষ দেখেননি।
ইলোরা দেখছে ছেলেটা কথা বলছে আর কাঁপছে শুধু দুই চারটি কথা বলে তাড়াতাড়ি সরে গেল। তার কথাগুলো মাতাল করার মত। এত রূপ নিয়ে জন্ম নিলেন কেন? যতবার দেখি আরও দেখতে ইচ্ছা করে এই সব শুনে খুব লজ্জা পেয়ে ছিল ইলোরা। আগে কখনও এই ভাবে বলেনি কেউ। এখন তার কথাগুলো কানের কাছে বারবার বাজছে। ছেলেটার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।
পরের দিন দেখা হলো। তখনও দেখলো ছেলেটা তাকে চায় খুব আপন করে। এমন একটা চোখের ভাষা সে বুঝাতে চায় ইলোরাকে। এমন ভাবে তাকিয়ে থাকে মনে হয় আমাকে ছাড়া আর চলবে না তার।ইলোরা কিছু বলল না, শুধু বুঝার চেষ্টা করতে লাগলো। ছেলেটা কি আমার দেহ চায়, না মন। মাঝে মাঝে দেখি আমাকে দেখার জন্য বাসার সামনে ঘুরাঘুরি করে। খবর নিয়ে দেখলাম ভাল ছাত্র। কোনো খারাপ কাজ সে করে না কিন্তু ধনী ঘরের ছেলে না। বাবা একটা সরকারি চাকরি করে তার উপর ভর করে সংসার চলে।
একদিন ছেলেটার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, আপনি আমাকে চেনেন?
ছেলেটা ভয়ে ভয়ে বলে জি।
কার মেয়ে আমি?
পুলিশ সুপার সাহেবের মেয়ে।
তাহলে কি ভয় করে না আপনার।
করে, কিন্তু আপনার মত এত সুন্দর কাউকে দেখি না।
সুন্দর বলে তাকাতে হবে?
আপনাকে দেখি আর ভাবি আমাকে এত ছোট ঘরে জন্ম দিলে কেন, যদি ধনীর ঘরে জন্ম নিয়ে পৃথিবীতে আসতাম তাহলে আমাকে আপনার জীবন থেকে আলাদা করতে পারত না কেউ।আমাকে কত ভালোবাস।
জি বলেই একটু থেমে বলল, মজনু যেমন লাইলীকে ভালবেসেছিল আমি ঠিক তেমনি ভাবে, বলতে পারেন আপনার জন্য মরতে পারি।
আমার বাবাকে আপনার কথা বলবো, আপনাকে পাগলে ধরেছে। বাবা সব ধরনের পাগল ভাল করতে পারে।
এই ধরনের কথা শুনার পর দেখলো ছেলেটার দুই চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো।
পুলিশের মার খেয়েছ কোনো দিন। খেলে সব ঠিক হয়ে যাবে, বলেই ইলোরা চলে গেল। অনেক দূরে গিয়ে এক বার ফিরে তাকালো, দেখলো ছেলেটা খুব মায়াভরা চোখে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে কি যেন হারিয়ে ফেলছে সে। তাকে ফিরে পাওয়ার জন্য এই ভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যদি দয়া করে ফিরে আসে সে।
তারপর থেকে ছেলেটা দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মন ভরে দেখতো ইলোরাকে কিন্তু মুখে অনেক কিছু বলার থাকলেও কিছু বলতো না, তবে সে ইলোরাকে বুঝাতে চাইতো সে আসলে ইলোরাকে চায়। এমনকি তাকে সে ভালোবাসে।
ইলোরার আর বুঝতে বাকি থাকলো না, তার কাছে গেলে আমি ঠকবো না। তার কাছে আমি নিরাপদ থাকবো। সে আসলেই আমাকে ভালোবাসে। একদিন ছেলেটার সামনে দাঁড়িয়ে ইলোরা বলল, তুমি সত্যিই আমাকে চাও?
জি, খুব চাই।
কবে চাই?
মৃত্যুর পরে।
কেন?এই পৃথিবীতে আপনাকে পাওয়ার মত কোনো ক্ষমতা আমার নেই। তাই দূরে দাঁড়িয়ে আপনাকে দেখে মনে শান্তি পাই।
এই সব করো কেন?
আপনাকে না দেখলে আমার ভাল লাগে না।
এই ভাবে কত দিন?
যত দিন এই পৃথিবী বেঁচে থাকবো।
এটা আপনার পাগলামী বিয়ে করলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
বিয়ে করবো না সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
বিয়ে না করলে চলবে কি করে?
বিয়ে যদি কোনো দিন করি তাহলে আপনাকে, এই বলে ছেলেটি লজ্জায় না দাঁড়িয়ে পা-টা বাড়িয়ে দিলো সামনের দিকে।
ইলোরা ছেলেটির হাত টেনে থামিয়ে বলল, লজ্জা পেলে তোমাকে খুব সুন্দর লাগে।
ছেলেটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো ইলোরার দিকে।
কি দেখছো অমন করে?
আপনাকে।
আর আপনি নয় আজ থেকে তুমি বলবে। মানুষ নামের কুকুরগুলোর হাত থেকে আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে, পারবে না ?
জি পারবো বলে, ছেলেটা দুই চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিলো ইলোরার দিকে।2 Comments
Friends
শাহাদাতুর রহমান সোহেল
@sr-sohel
abrar
@abrar
মোহাম্মদ এরশাদ রিকাবদার
@ershad
মো: হারুন-অর-রশীদ
@harun5849
Mohammad Obaidullah
@mohammadobaidullah
ফেরদৌস আহমেদ আকবর
@akbarhossen1
Abdul Malek
@abdulmalek
নির্বোধ সুদীপ্ত
@sajalbhowmick
Sahariar Islam
@sahariarislam

খুবই সুন্দর, ঝরঝরে লেখা। ধন্যবাদ শেয়ারের জন্য !
আপনার প্রকাশিত বইগুলির ছবি দেখলাম। চমৎকার। আপনার এই লেখক-অভিজ্ঞতা নিয়ে আশা করি অন্যান্য লেখক-লেখিকার পোস্টে মন্তব্য দিবেন, সাজেশন দিবেন … তাহলে অনেকেই উপকৃত হবে মনে হয়। শুভেচ্ছা ও স্বাগতম জানাই আমার পক্ষ থেকে…