-
প্রিয় তুহিন,
শুনো, এই রমজানে তোমার বড় ছেলে প্রতিদিন সেহেরিতে খাবার রেডি করে আমাকে ডেকে তুলেছে। আমি উঠে সেহেরি খেয়ে নামাজ পড়ে ঘুমিয়েছি। আর তোমার পুত্র আমার প্লেট সহ সব কিছু পরিষ্কার করে রেখে দিয়েছে।
প্রথম প্রথম আমার একটু লজ্জা , লজ্জা লাগতো।পরে লজ্জা বাদ দিয়ে এটাকে ই অভ্যাস করেছি।
বরং ডিম পোজ করার সময় যেন ডিমের কুসুম আস্ত থাকে সেই বিষয় এ সর্তক করে দিয়েছি, আমাকে ডাকার সময় যেন ধীরে ধীরে ডাকে সেই বিষয় এ ও সর্তক করে দিয়েছি।( প্রথম দিকে এমন ভাবে আমাকে সেহেরিতে ডাকতো, যেন ভূমিকম্প হচ্ছে)
বুঝুক ঠ্যালা, হুম। ওদের ডিম পোজ করে দিলে ডিমের কুসুম ভেঙে গেলে খেতো না। দোয়া ,দরুদ পড়ে ওদের জন্য রান্না করতে হয় আমার।
তুহিন জানো, রমজান মাস আসলেই আমি অনেক আতঙ্কে থাকি। আমি এর থেকে বের হতে পারি না বা হয়তো আমি বের হতে চাই না।
এই রমজানেও আমি এত বিপদে পড়েছি, যার থেকে উদ্ধার পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিলো।
কিন্তু , আল্লাহ তালা আমাকে অকল্পনীয় ভাবে প্রতিটি বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ।
না পেরেছি কাউকে সেই বিপদের কথা বলতে , না পেরেছি সাহায্য নিতে। কিন্তু রাব্বুল আলামিন , তাঁর এই অধম বান্দাকে প্রতিটি ক্ষেত্রেই উদ্ধার করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ।
অফিস করে , অফিস ,বাসার হেন, তেন, জটিল সমস্যায় জর্জরিত হয়ে যখন মেজাজ সপ্তম আকাশে তখন একদিন টুং করে ম্যাসেজ আসলো। ম্যাসেজ খুলে দেখি, ছোট পুত্রের উদ্ভাস থেকে রেজাল্ট। পরীক্ষা চলছে , আর প্রতিটি পরীক্ষার রেজাল্ট আমাকে ম্যাসেজে দিয়ে দেয়।এটাই উদ্ভাসের নিয়ম। বরাবরের মতো ই আমি ওদের রেজাল্ট নিয়ে হাউকাউ করি না।আগে যাওবা করতাম এখন আর সেটাও করি না। ওদের বকাবকি করলে ওদের পক্ষে পরে কথা বলার জন্য তুমি ছিলে, এখন যে কেউ নেই।
তাই পড়াশোনা করলে কি কি সুবিধা আর না করলে কি কি অসুবিধা সেগুলো তোতাপাখির মতো বুঝিয়ে দিয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করেছি।
লেখা পড়া না করে কি করবে, সেই সিদ্ধান্ত টাও, বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি, সেটাও ওদেরকেই নিতে হবে।
ভুল সিদ্ধান্ত বা সঠিক সিদ্ধান্ত তাদেরকেই নিতে হবে। পরবর্তীতে আমাকে দোষ দিয়ে কোন লাভ নাই।
যাক, যেটা বলছিলাম। ম্যাসেজে দেখলাম তোমার ছোট ছেলে বায়োলজিতে ফুল মার্কস পেয়েছে এবং প্রথম স্থান পেয়েছে। তোমাকে বলি যে, উদ্ভাসের সব ব্যাচ মিলে ও প্রথম হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহ। ঠিক ইফতারের আগে ম্যাসেজ টা আসে, খুশিতে আমি মুখ দিয়ে শুধু আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে লাগলাম। আমার হৃদয় পূর্ণ হয়ে গিয়েছিলো, রোহানের রেজাল্টে। শুধু মনে হচ্ছিলো- আমার রব আমাকে কত সুন্দর ভাবে আনন্দিত করলেন! আমি যেন, আল্লাহ শুকরিয়া আদায় করা থেকে কিছুতেই থামতে পারছিলাম না। যেন – আমাকে আমার রব, উজাড় করে দিয়েছেন এই সুখ।
হয়তো অনেকের কাছে এটা কিছুই না, তাছাড়া এটা তো বোর্ড পরীক্ষার রেজাল্ট ও না।কিন্তু আমি তোমাকে বোঝাতে পারবোনা , আমার যে কি ভালো লেগেছে।
এর কয়দিন পরে অফিস থেকে ফিরে দেখি টেবিলের উপরে উদ্ভাসের খাম। ছোট পুত্রকে জিজ্ঞেস করলাম কি আছে খামে?( মনে মনে ভাবছিলাম- আমিতো উদ্ভাসে ফুল পেমেন্ট করেই ভর্তি করেছি, আবার কেন টাকা চায়? মাথায় শুধু টাকা পয়সার , সংসার চালানোর চিন্তাই ঘুরে তো, তাই 😆)
তোমার স্বল্প ভাষী পুত্র ধীরে করে উত্তর দিলো- আমার পুরষ্কার , প্রথম হয়েছি তাই।
আলহামদুলিল্লাহ। আমার চোখে পানি চলে এসেছিলো।
আমার রবের কাছে শুকরিয়া আদায় করেছিলাম, অনবরত।তুহিন জানো, ঈদের ছুটি শুরু হয়েছে।
আর আমি রান্না করতে করতে শুধু স্বপ্ন যাবে বাড়ি এই গানটি শুনছি। এই গানটা শুনলে বুকের ভিতর কেমন যেন করে! যে কষ্ট টা বুঝানোর মতো কোন ভাষা আমি খুঁজে পাই না।
এই গানটা শুনলে আমি তোমাকে দেখতে পাই।যে কিনা- ইফতার করে বিছানার চাদর নিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে চলে যেতে ঈদের টিকিট কাটতে।সারারাত জেগে পরের দিন দুপুরে ফিরে আসতো টিকিট কেটে নিয়ে , যেন বিশ্ব জয় করে ঘরে ফিরে আসতে।
প্রতিবার টেলিভিশনে তোমার ইন্টারভিউ দেখাতো, ঈদের টিকিট কাটতে যারা স্টেশন এ থাকতো তাদের মধ্যে।
আমার স্বপ্ন আর বাড়ি যায় না তুহিন।আমার স্বপ্নপুরের স্বপ্নরা আমার জন্য আর অপেক্ষা করে থাকে না। আব্বা থাকলে বাঁধের উপর দাঁড়িয়ে থাকতেন তাঁর মা-মনির বাসের অপেক্ষায় , আম্মা দরজায় বসে থাকতেন- তাঁর লায়লা কখন আসবে তাই।আর আমার যে স্বপ্ন আমাকে সাথে করে স্বপ্ন পুরে নিয়ে যেত, সেইতো নেই।
আমি আমার স্বপ্নদেরকে ওভাবে দেখতে চাই না, যেভাবে তারা আছে, আমি অচিনপুরে যেতে চাই না তুহিন।
২০২০ সালের ২৩ শে মে ২৯ রমজান, তুমি চলে গেলে , সাথে করে নিয়ে গেলে আমার সব স্বপ্ন গুলো।
আজ ২০২৬ এর ১৯ শে মার্চ,২৯ রমজান।
এখন গভীর রাত। আমি তোমাকে এই চিঠি লেখার পরে সংগোপনে অঝোরে কাঁদবো।
তুহিন, আমার কান্না থামাবার, মাথায় হাত রাখার জন্য আব্বা, আম্মা বা তুমি কেউ আসবে না জানি, কিন্তু তোমরা কি আমার কষ্টগুলো বুঝতে পারবে? জানি না, কারণ তোমরা যেখানে চলে গেছো, তার সম্পর্কে কেউ বলতে পারে না। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া।
তবু আমি এই চিঠিটা ঈদের পরেই তোমাকে দিতে চাই, যেন আমার কষ্টের কথা জেনে তুমি কষ্ট না পাও।
ইতি,
তোমার হেনা
১৯/০৩/২০২৬5 Comments-
“আমার স্বপ্নপুরের স্বপ্নরা আমার জন্য অপেক্ষা ক’রে থাকে না। আব্বা থাকলে বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতেন তাঁর মা-মণির বাসের অপেক্ষায়, আম্মা দরজায় ব’সে থাকতেন___ তাঁর লায়লা কখন আসবে তাই ” খুবই সুন্দর বর্ণনা! চোখের সামনে দৃশ্যটা ভেসে ওঠে,হু হু ক’রে ওঠে বুকের ভেতর।অভিনন্দন, আপনাকে! ভালো থাকবেন।
Friends
naznin shamim
@nazninshamim
Md Mofiz
@mdmofiz
MAHMUD HAYAT
@mahmudhayat
wajibad
@wajibad
MAHAJABIN AFROZE
@mahajabinafroze
সুবহা জাহান
@subhajahan
Intisar Jabed
@intisarjabed
মেঘ
@megh
রোদেলা শিশির
@rodelashishir


“আমার স্বপ্ন আর বাড়ি যায় না তুহিন।”…………………… এই একটি বাক্যেই যেন পৃথিবীর সব বিষাদ জমা হয়েছে। আপনার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।