Profile Photo

MD Mosaharof HosenOffline

  • mdmosaharofhosen
  • Profile picture of MD Mosaharof Hosen

    MD Mosaharof Hosen

    2 months, 3 weeks ago

    ওয়াহদাতুল ওজুদের মর্মকথা

    মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন

    ওয়াহদাতুল ওজুদ এমন এক দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক ধারণা, যা ইসলামী চিন্তাধারার ইতিহাসে বহু আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর মূল বক্তব্য হলো—আসল ও চিরন্তন সত্তা একমাত্র আল্লাহ, আর জগতের সবকিছুই সাপেক্ষ ও নির্ভরশীল অস্তিত্ব। মানুষ, প্রাণী, বস্তুজগত, আকাশ-পাতাল—সবই আল্লাহর ইচ্ছায় টিকে আছে। তাঁর ইচ্ছা মুহূর্তে রহিত হলে পুরো জগতই অস্তিত্ব হারাবে। তাই প্রকৃত, অনন্ত ও অনির্ভরশীল সত্তা কেবল আল্লাহ; বাকিগুলো তাঁর ইচ্ছার আলো বা বিকিরণমাত্র।
    ইমাম গাযালী এ বিষয়টি সূর্যের উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন—সূর্য থাকলেই আলো থাকে, সূর্য নিভলেই আলো বিলীন। একইভাবে সৃষ্টি আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। সাধকের আধ্যাত্মিক নিমগ্নতায় এমন মুহূর্ত আসে, যখন তিনি অনুভব করেন আল্লাহ ছাড়া আর কিছু নেই। তবে এই অভিজ্ঞতা সর্বজনীন বা স্থায়ী সত্য নয়, বরং সাময়িক আধ্যাত্মিক উপলব্ধি।
    প্রসঙ্গত, ওয়াহদাতুল ওজুদকে অনেক সময় সর্বেশ্বরবাদের (Pantheism) সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। সর্বেশ্বরবাদে বলা হয়—“সবই আল্লাহ”, যেখানে স্রষ্টা ও সৃষ্টির পার্থক্য নেই। অথচ ওয়াহদাতুল ওজুদ স্পষ্ট করে বলে—আল্লাহই আসল সত্তা, আর জগত তাঁর তুলনায় ভঙ্গুর ও নির্ভরশীল। এ বিভ্রান্তি দূর করতে মুজাদ্দিদে আলফে সানী “ওয়াহদাতুশ শুহূদ” ধারণা দেন, যা ব্যাখ্যা করে যে আল্লাহ ছাড়া সবকিছুকে অস্তিত্বহীন মনে হওয়া কেবল সাধকের সাময়িক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা।
    ১.ওয়াহদাতুল ওজুদের সংজ্ঞা ও মূল ধারণা
    ওয়াহদাতুল ওজুদ (وحدة الوجود), যার আক্ষরিক অর্থ ‘অস্তিত্বের ঐক্য’, এমন একটি দার্শনিক ধারণা যা সুফি দর্শনে বিশেষভাবে প্রচলিত। এটি বোঝায় যে প্রকৃত অস্তিত্ব একমাত্র আল্লাহর, যিনি নিরপেক্ষ, অনির্ভর এবং চিরন্তন। সৃষ্টিজগতের অস্তিত্ব তাঁর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল এবং স্বতন্ত্রভাবে এর কোনো প্রকৃত অস্তিত্ব নেই। ইমাম গাযালী তাঁর ইহইয়াউ উলূম আদ-দ্বীন গ্রন্থে এটিকে তাওহীদের সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একজন সাধক যখন আধ্যাত্মিক উপলব্ধির শিখরে পৌঁছান, তখন তিনি একমাত্র আল্লাহর অস্তিত্ব ছাড়া আর কিছুই প্রত্যক্ষ করেন না। তবে, এই উপলব্ধি সাময়িক এবং সাধকের আধ্যাত্মিক অবস্থার উপর নির্ভরশীল। এই ধারণার উৎস কুরআন ও হাদীসে পাওয়া যায়। কুরআনের সূরা ইখলাসে আল্লাহকে ‘আহাদ’ (এক) এবং ‘সামাদ’ (নিরপেক্ষ) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা ওয়াহদাতুল ওজুদের ভিত্তি প্রদান করে। এছাড়া, সূরা হাদীদের আয়াতে বলা হয়েছে: “সবকিছু ধ্বংসশীল, কেবল তাঁর মুখমণ্ডল অধ্বংসশীল” (৫৫:২৬-২৭)। এই আয়াত সৃষ্টির ক্ষণস্থায়ী ও নির্ভরশীল প্রকৃতি এবং স্রষ্টার চিরন্তন অস্তিত্বের ইঙ্গিত

    ২. ইমাম গাযালী ও তাওহীদের সর্বোচ্চ স্তর

    ইমাম গাযালী (৪৫০-৫৫০ হি.) ইসলামী তাওহীদের অন্যতম ব্যাখ্যাকারী ও সুফি দার্শনিক। তাঁর ইহইয়াউ উলূম আদ-দ্বীন (إحياء علوم الدين) গ্রন্থে তিনি ওয়াহদাতুল ওজুদকে তাওহীদের চতুর্থ ও সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এখানে তিনি শুধু তাওহীদের মৌলিক নীতি ব্যাখ্যা করেন না, বরং সাধকের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা এবং সৃষ্টির ক্ষণস্থায়ী প্রকৃতি বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।
    গাযালী ব্যাখ্যা করেন যে, একজন আধ্যাত্মিক সাধক যখন নিজের চেতনা ও ধ্যানের মাধ্যমে সৃষ্টির গভীরে প্রবেশ করেন, তখন তিনি দেখেন যে সৃষ্টি আসলে কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ধারণ করে না। সমস্ত সত্তা কেবল আল্লাহর ইচ্ছা এবং শক্তির উপর নির্ভরশীল। এই উপলব্ধি এমন এক স্তর যেখানে সাধকের চোখে শুধু একমাত্র আল্লাহর অস্তিত্ব দৃশ্যমান হয়, এবং সমস্ত সৃষ্টি ‘নেই’ হিসেবে প্রতীয়মান হয়। এটি ওয়াহদাতুল ওজুদের মূল মর্ম।
    গাযালী এই উপলব্ধি বোঝানোর জন্য উদাহরণ হিসেবে সূর্যের আলো ব্যবহার করেছেন। সূর্য থাকলেই আলো বিদ্যমান, সূর্য নিভলেই আলোও বিলীন। অনুরূপভাবে, আল্লাহ ছাড়া সমস্ত সৃষ্টি টিকে থাকতে পারে না; সৃষ্টির অস্তিত্ব আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিফলন মাত্র।

    তিনি লিখেছেন—

    “إن التوحيد له مراتب، والمرتبة العليا هي أن يرى العبد أن لا موجود إلا الله”
    “তাওহীদের বিভিন্ন স্তর রয়েছে, এবং সর্বোচ্চ স্তর হলো যখন বান্দা দেখে যে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো অস্তিত্ব নেই।”
    (ইহইয়াউ উলূম আদ-দ্বীন, খণ্ড ৪, কিতাবুত তাওহীদ ওয়াত তাওয়াক্কুল)
    গাযালী মনসুর হাল্লাজের উদাহরণও উল্লেখ করেছেন, যিনি আধ্যাত্মিক মগ্নতায় বলেছিলেন: “أنا الحق” (আমি সত্য)। গাযালী ব্যাখ্যা করেন যে এটি সাধকের অন্তর্দৃষ্টির প্রকাশ, যেখানে তিনি সৃষ্টিকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর প্রতিফলন হিসেবে উপলব্ধি করেছেন। তবে তিনি সতর্ক করেছেন যে, এই ধরনের বক্তব্য সাধারণ মানুষের জন্য বিভ্রান্তিকর হতে পারে, কারণ তা যদি ভুলভাবে বোঝা হয়, তাহলে শিরক বা সর্বেশ্বরবাদের ধারণার সাথে মিলিয়ে ফেলা হতে পারে।
    গাযালীর শিক্ষায় স্পষ্ট যে, ওয়াহদাতুল ওজুদ শুধুমাত্র সাধকের আধ্যাত্মিক উপলব্ধি। এটি সার্বজনীন বা স্থায়ী বাস্তবতা নয়; বরং এটি একটি আন্তরিক অভিজ্ঞতা, যেখানে মানুষ আল্লাহর একক অস্তিত্বকে পুরোপুরি অনুভব করে। এই স্তর সাধককে সৃষ্টির ক্ষণস্থায়ী ও ভঙ্গুর প্রকৃতি এবং আল্লাহর চিরন্তন, নিরপেক্ষ এবং অনির্ভর অস্তিত্বের পার্থক্য গভীরভাবে উপলব্ধি করায়।

    ৩. ইবন আরাবী ও তাঁর দার্শনিক ব্যাখ্যা

    ইবন আরাবী (৫৬৮-৬৩৬ হি.) ইসলামী দার্শনিক ও সুফি চিন্তাধারার একজন বিশিষ্ট নক্ষত্র। তিনি ওয়াহদাতুল ওজুদের (وحدة الوجود) ধারণাকে শুধু দার্শনিক আলোচনার বিষয় হিসেবে নয়, বরং আধ্যাত্মিকভাবে এবং সৃষ্টিজগত ও স্রষ্টার সম্পর্কের গভীর ব্যাখ্যা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর প্রধান গ্রন্থ ফুসুস আল-হিকাম (فصوص الحكم) এবং আল-ফুতুহাত আল-মাক্কিয়া (الفتوحات المكية) – এই তত্ত্বের মৌলিক ভিত্তি এবং বিশদ ব্যাখ্যার জন্য ব্যবহৃত হয়।
    ইবন আরাবীর মতে, প্রকৃত অস্তিত্ব কেবল আল্লাহর। সবকিছুকে তিনি আল্লাহর “প্রকাশ” বা “তাজল্লী” (تجليات) হিসেবে দেখেছেন। অর্থাৎ, সৃষ্টিজগত আল্লাহর অস্তিত্ব, শক্তি এবং গুণাবলির একটি প্রতিফলন বা ছায়া মাত্র। তিনি লিখেছেন:

    “الوجود الحقيقي لله وحده، والمخلوقات ظلال أو مظاهر وجوده”
    “প্রকৃত অস্তিত্ব একমাত্র আল্লাহর, এবং সৃষ্টিগুলো তাঁর অস্তিত্বের ছায়া বা প্রকাশ।”
    (ফুসুস আল-হিকাম, অধ্যায়: فص آدمي)

    ইবন আরাবীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সৃষ্টির অস্তিত্ব স্বতন্ত্র নয়; এটি আল্লাহর ইচ্ছা ও শক্তির উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। যেমন সূর্য থেকে আলো বিকিরিত হয়, আলোর অস্তিত্ব শুধুমাত্র সূর্যের উপর নির্ভরশীল—আলোর নিজস্ব কোনো অস্তিত্ব নেই। অনুরূপভাবে, জগতের সমস্ত সত্তা আল্লাহর ইচ্ছার আলো বা বিকিরণ; আল্লাহ ছাড়া স্বতন্ত্রভাবে কোনো অস্তিত্ব নেই।
    তিনি এই ধারণাকে কুরআনের আয়াতের সঙ্গে সম্পর্কিত করেছেন—

    “كل شيء هالك إلا وجهه”
    “সবকিছু ধ্বংসশীল, কেবল তাঁর মুখমণ্ডল (অস্তিত্ব) অমর।” (সূরা কাসাস, ২৮:৮৮)

    ইবন আরাবীর তত্ত্ব অনুসারে, যখন একজন সাধক আধ্যাত্মিকভাবে উচ্চতর স্তরে পৌঁছান, তখন তিনি সৃষ্টির ক্ষণস্থায়ী ও ভঙ্গুর প্রকৃতিকে স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেন। সেই সময় তার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী সমস্ত সৃষ্টি একমাত্র আল্লাহর প্রকাশ—এবং এই উপলব্ধি সাধকের জন্য অন্তর্দৃষ্টিমূলক সত্য, যা সাধারণভাবে স্থায়ী বা সর্বজনীন নয়।
    ইবন আরাবীর ব্যাখ্যায় ওয়াহদাতুল ওজুদ কেবল দার্শনিক তত্ত্ব নয়, বরং এটি সৃষ্টির ভঙ্গুরতা এবং স্রষ্টার অনন্ত, নিরপেক্ষ অস্তিত্বের বাস্তব উপলব্ধি। এই ব্যাখ্যা আধ্যাত্মিক সাধককে আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা এবং সৃষ্টির ক্ষণস্থায়ী প্রকৃতিকে বোঝার পথ দেখায়।

    ৪. অন্যান্য সুফি দার্শনিক
    জুনাইদ বাগদাদী, রুমী এবং আবদুল কাদির জিলানী প্রমুখ সুফি সাধকগণ ইসলামী আধ্যাত্মিকতার ইতিহাসে ওয়াহদাতুল ওজুদ (وَحْدَةُ الوُجُود) ধারণার গুরুত্বপূর্ণ প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত। তাঁদের দৃষ্টিতে এই তত্ত্ব কেবলমাত্র দার্শনিক আলোচনার বিষয় নয়; বরং এটি মানুষ ও আল্লাহর সম্পর্ক বোঝার একটি গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি।
    জুনাইদ বাগদাদীকে বলা হয় “সাইয়্যিদুত-তাঈফাহ” (سيد الطائفة), অর্থাৎ সুফিদের দলপতি। তিনি ওয়াহদাতুল ওজুদের ব্যাখ্যায় সবকিছুকে আল্লাহর সত্তার প্রকাশ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, সৃষ্টি জগত আল্লাহর “তাজল্লী” (تجلّي) বা প্রকাশ ব্যতীত আর কিছুই নয়। তাই মানুষের আত্মা যদি পরিশুদ্ধ হয়, তবে সে সৃষ্টির ভেতর দিয়েই আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করতে পারে।
    রুমী এই তত্ত্বকে কাব্য ও উপমার মাধ্যমে গভীরভাবে প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ মসনবী মানভী (مثنوي معنوي)-তে তিনি সৃষ্টিকে সমুদ্রের ফেনার সাথে তুলনা করেছেন। যেমন সমুদ্রের ফেনা স্বতন্ত্র কোনো অস্তিত্ব বহন করে না, বরং সমুদ্রের উপর নির্ভরশীল—তেমনি সৃষ্টির সমস্ত অস্তিত্ব আল্লাহর সত্তার উপর নির্ভরশীল, নিজস্বভাবে স্বাধীন নয়। এভাবে তিনি দেখিয়েছেন, আল্লাহই প্রকৃত বাস্তব, আর সৃষ্ট জগত কেবল তাঁর অস্তিত্বের ছায়া বা প্রতিফলন।
    আবদুল কাদির জিলানী রহ. তাঁর আধ্যাত্মিক গ্রন্থ ও বক্তৃতাগুলোতে (বিশেষ করে ফুতুহুল গায়ব و الغنية لطالبي طريق الحق) ওয়াহদাতুল ওজুদের ধারণাকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি মানুষকে তাওহীদের প্রকৃত উপলব্ধি অর্জনের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন যে, সত্যিকার অর্থে কেবল আল্লাহই আছেন; সৃষ্টি জগত কেবল তাঁরই কুদরতের প্রতিফলন। যখন মানুষ ইবাদত, জিকির ও আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে আত্মাকে শুদ্ধ করে, তখন তার কাছে আল্লাহর সত্তাই একমাত্র সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়।
    অতএব, এই সুফি সাধকদের ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায় যে ওয়াহদাতুল ওজুদ কোনো বিচ্ছিন্ন দার্শনিক চিন্তা নয়; বরং এটি ইসলামী আধ্যাত্মিকতার এমন এক উপলব্ধি, যেখানে সৃষ্টি ও স্রষ্টার সম্পর্ককে গভীরতরভাবে বোঝানো হয়।

    ৫.ইবন তাইমিয়া ও তাঁর সমালোচনা

    ইবন তাইমিয়া (৬৬৫–৭৩২ হি.) ইসলামী তাওহীদবাদের এক নিষ্ঠাবান রক্ষক হিসেবে পরিচিত। তিনি ইসলামী চিন্তাধারায় ওয়াহদাতুল ওজুদের প্রভাব নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা করেছেন। তাঁর গ্রন্থ ফাতাওয়া ইবন তাইমিয়া (فتاوى ابن تيمية) এবং আল-রদ্দু আলা আল-মানতিকিয়্যিন (الرد على المنطقيين)-এ তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ওয়াহদাতুল ওজুদের ধারণা স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্যকে মুছে দেয় এবং এটি সর্বেশ্বরবাদের (Pantheism) দিকেই পরিচালিত করে।
    ইবন তাইমিয়া লিখেছেন—

    “وحدة الوجود تقود إلى نفي التفريق بين الخالق والمخلوق، وهذا يناقض أصل التوحيد”
    “ওয়াহদাতুল ওজুদ স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য অস্বীকারের দিকে নিয়ে যায়, যা তাওহীদের মূলনীতির পরিপন্থী।”

    তার মতে, ওয়াহদাতুল ওজুদের ভিত্তিতে যদি কেউ সৃষ্টিকে আল্লাহর অস্তিত্বের সঙ্গে অভিন্ন মনে করে, তবে এটি সরাসরি তাওহীদের মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করে। ইসলামের মূল আকীদা অনুযায়ী, আল্লাহ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, চিরন্তন, অনির্ভরশীল, এবং সৃষ্টি তার উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল। ওয়াহদাতুল ওজুদের ভুল ব্যাখ্যা করলে এই স্পষ্ট বিভাজন অস্পষ্ট হয়ে যায়।
    ইবন তাইমিয়া বিশেষভাবে ইবন আরাবীর ব্যাখ্যার সমালোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, ইবন আরাবীর মতে, সমস্ত সৃষ্টি আল্লাহর প্রতিফলন বা প্রকাশ (تجلّي) এবং স্বতন্ত্র অস্তিত্বহীন। ইবন তাইমিয়া মনে করতেন যে এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, কারণ এটি একটি দার্শনিক ধারণা যা সাধক বা সুফিদের অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে যায়। ফলে, সাধারণ মুসলিম যদি এটি ভুলভাবে গ্রহণ করে, তাহলে তারা সৃষ্টির সাথে আল্লাহকে অভিন্ন মনে করে শিরক বা তাওহীদের বিপরীত পথে চলতে পারে।
    ইবন তাইমিয়া আরও যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, ওয়াহদাতুল ওজুদের বর্ণনা যদি কুরআন ও হাদীসের বাস্তব নির্দেশের সঙ্গে মিলিয়ে না দেখা হয়, তবে এটি আধ্যাত্মিক বিভ্রান্তি ও ধর্মীয় ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করে। তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, এমন দার্শনিক ব্যাখ্যা শুধুমাত্র উচ্চতর আধ্যাত্মিক সাধকের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে, কিন্তু এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিলে শিরক বা মিথ্যাবাদিতা প্রসারিত হতে পারে।

    ৬. মুজাদ্দিদ আলফ-ই সানী ও ওয়াহদাতুশ শুহূদ

    মুজাদ্দিদ আলফ-ই সানী, অর্থাৎ শেখ আহমদ সিরহিন্দী (৯৫৬–১০৩৭ হি.), ইসলামী চিন্তাধারায় ওয়াহদাতুল ওজুদের ব্যাখ্যা ও সমালোচনায় বিশেষভাবে প্রখ্যাত। তিনি দেখিয়েছেন যে, ওয়াহদাতুল ওজুদ শুধুমাত্র সাধকের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার সাময়িক উপলব্ধি, যা সার্বজনীন বা স্থায়ী বাস্তবতা নয়। সাধারণ মুসলিমরা যদি এটি ভুলভাবে গ্রহণ করে, তাহলে এটি সৃষ্টির সঙ্গে স্রষ্টার অভিন্নতা মনে করার কারণে বিভ্রান্তি এবং শিরকের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
    ওয়াহদাতুশ শুহূদ (وحدة الشهود) ধারণাটি তিনি প্রবর্তন করেন। এর মাধ্যমে তিনি আল্লাহর একত্ব এবং সৃষ্টির স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। মাকতুবাত-ই ইমাম রাব্বানী-তে তিনি লিখেছেন—

    “وحدة الوجود إدراك مؤقت في حال الفناء، ولكن الحقيقة هي وحدة الشهود، أي إدراك الخالق وحده في الوجود”
    “ওয়াহদাতুল ওজুদ ফানা অবস্থায় একটি সাময়িক উপলব্ধি, কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো ওয়াহদাতুশ শুহূদ, অর্থাৎ একমাত্র স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রত্যক্ষণ।”
    (মাকতুবাত-ই ইমাম রাব্বানী, চিঠি নং ১.২৯০)
    শেখ আহমদ সিরহিন্দীর ব্যাখ্যা অনুসারে, ওয়াহদাতুল ওজুদ মূলত ফানা বা আত্মার আত্মবিসর্জনকালীন অভিজ্ঞতা। এ অবস্থায় সাধক মনে করতে পারেন যে আল্লাহ ছাড়া কিছু নেই। কিন্তু এটি সকল মানুষের জন্য বাস্তব বা স্থায়ী সত্য নয়। সৃষ্টির স্বতন্ত্রতা এই অবস্থায় মুছে যায়, কিন্তু বাস্তবে সৃষ্টিজগত আল্লাহর অধীনে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বহন করে।
    মুজাদ্দিদ আলফ-ই সানীর এই ব্যাখ্যা ইসলামী আধ্যাত্মিক চিন্তাধারায় সৃষ্টির স্বতন্ত্রতা এবং আল্লাহর একত্বের মধ্যে সুসমন্বয় স্থাপন করে। তিনি ওয়াহদাতুল ওজুদকে শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার সীমিত বাস্তবতা হিসেবে দেখিয়ে, ওয়াহদাতুশ শুহূদকে সার্বজনীন, বাস্তব এবং বিভ্রান্তি-মুক্ত তত্ত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

    ৭. আধুনিক সমালোচকদের মত
    আধুনিক যুগে ওয়াহদাতুল ওজুদ (وَحْدَةُ الوُجُود) ধারণাকে ঘিরে আলেম সমাজে প্রবল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষত সালাফি চিন্তাধারার অন্তর্ভুক্ত আলেমগণ একে ইসলামের মৌলিক আকীদাহ তথা তাওহীদের সাথে সাংঘর্ষিক হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তাঁদের মতে, আল্লাহ্‌র সত্তা ও গুণাবলী একান্তই অনন্য, আর সৃষ্ট জগত সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ দুইয়ের মধ্যে কোনো মিশ্রণ, একীভূতকরণ বা অভিন্নতা প্রতিষ্ঠা করা কুরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থী।
    শায়খ মুহাম্মদ বিন সালিহ আল-উসাইমিন (رحمه الله), যিনি সমসাময়িক যুগে অন্যতম বিশিষ্ট সালাফি আলেম, তাঁর শারহুল আকীদাতুল ওয়াসিতিয়্যাহ (شرح العقيدة الواسطية) গ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে ওয়াহদাতুল ওজুদ ইসলামের তাওহীদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর মতে, এই ধারণা স্রষ্টা (الخالق) ও সৃষ্টির (المخلوق) মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্যকে মুছে ফেলে। যখন বলা হয় যে সবকিছু একক সত্তা—তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, আল্লাহর সত্তা ও সৃষ্টির সত্তা অভিন্ন, যা সরাসরি সর্বেশ্বরবাদ (Pantheism)-এর দিকে নিয়ে যায়। তিনি এ প্রসঙ্গে সতর্ক করে বলেন, ইসলামের মৌলিক আকীদাহ হলো—
    “اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ”
    অর্থাৎ “আল্লাহই সবকিছুর স্রষ্টা” (সূরা আয-যুমার: ৬২)।
    এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আল্লাহ্‌ সৃষ্টির বাইরে এবং সৃষ্টি আল্লাহর সত্তার অংশ নয়। যদি কেউ স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে অভিন্ন মনে করে, তবে সে তাওহীদের মূল ভিত্তি নষ্ট করে ফেলে। আল-উসাইমিন আরও বলেন, ওয়াহদাতুল ওজুদকে সমর্থন করলে তা এমন এক চিন্তার দরজা খুলে দেয় যেখানে পাপ-পুণ্যের ভেদাভেদ অর্থহীন হয়ে যায়। কারণ যদি সবকিছুই আল্লাহর সত্তার প্রকাশ হয়, তবে মন্দ কাজ, কুফর কিংবা শিরককেও আল্লাহর অংশ হিসেবে গণ্য করতে হবে—যা সরাসরি বিদআত ও গোমরাহির অন্তর্ভুক্ত।
    সালাফি আলেমদের মতে ওয়াহদাতুল ওজুদ কেবল একটি দার্শনিক বা সুফি তত্ত্ব নয়, বরং এটি ইসলামের মৌলিক আকীদাহকে চ্যালেঞ্জ করে এমন এক ধারণা, যার প্রভাব মুসলিম সমাজের ঈমানের উপর ভয়াবহ হতে পারে।
    উপসংহার: ওয়াহদাতুল ওজুদের যথার্থতা
    ওয়াহদাতুল ওজুদ একটি গভীর দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক তত্ত্ব, যা আল্লাহর একক এবং চিরন্তন অস্তিত্বের উপর জোর দেয় এবং দেখায় যে, সৃষ্টির সমস্ত অস্তিত্ব আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল। এটি কেবল দার্শনিক চিন্তাভাবনা নয়, বরং আধ্যাত্মিক উপলব্ধি, যা একজন মুসলিমের অন্তর্দৃষ্টি ও তাওহীদ বোঝার গভীরতাকে প্রখর করে তোলে।
    ইমাম গাযালী, ইবন আরাবী, মুহাইমা শায়খ সুলেমান আলী, প্রমুখ ইসলামি চিন্তাবিদরা ওয়াহদাতুল ওজুদকে তাওহীদের একটি উচ্চতম স্তর হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তারা দেখিয়েছেন যে, আল্লাহর একত্ব এবং সৃষ্টির অস্থায়ী প্রকৃতির মধ্যে যে সম্পর্ক দেখা যায়, তা কেবল দার্শনিকভাবে নয়, আধ্যাত্মিকভাবেও উপলব্ধি করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ইবন আরাবী এই তত্ত্বকে ব্যাখ্যা করেছেন এমনভাবে যে, মানব অস্তিত্ব ও জগৎ—সবকিছু আল্লাহর অস্তিত্বের ছায়া বা প্রকাশ। তবে, এই তত্ত্বকে সবসময় সঠিকভাবে বোঝা প্রয়োজন। ইবন তাইমিয়া এবং মুজাদ্দিদ আলফ-ই সানী তাতে কিছু বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের সম্ভাবনা দেখিয়েছেন। তারা সতর্ক করেছেন, যদি কেউ ওয়াহদাতুল ওজুদের ধারণাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে বা ব্যক্তিগত মতামতের সাথে মিশিয়ে ফেলে, তবে তা কুফরি বা বিভ্রান্তিকর দিকের দিকে পরিচালিত করতে পারে। এই সমস্যা এড়াতে মুজাদ্দিদের ওয়াহদাতুশ শুহূদ তত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ। এটি ওয়াহদাতুল ওজুদকে আরও পরিশীলিত ও সংযমীভাবে উপস্থাপন করে, যেখানে আল্লাহর একত্ব এবং সৃষ্টির অস্তিত্বের স্বতন্ত্রতা—উভয়ই স্পষ্টভাবে বোঝানো হয়েছে। এতে ওয়াহদাতুল ওজুদের সঠিক ব্যাখ্যা ইসলামী তাওহীদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
    সুতরাং, ওয়াহদাতুল ওজুদকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘কুফরি আকীদা’ বলে প্রত্যাখ্যান করা অযৌক্তিক। এটি একটি আধ্যাত্মিক উপলব্ধি, যা সঠিক বোঝাপড়া এবং যুৎসই ব্যাখ্যার মাধ্যমে ইসলামী তাওহীদকে আরও গভীরভাবে প্রকাশ করে। এর যথার্থতা কুরআন, হাদীস এবং ইসলামি দার্শনিকদের ব্যাখ্যা দ্বারা প্রমাণিত। তবে, এর ব্যবহার ও ব্যাখ্যায় সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি, যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি না ছড়ায় এবং সৃষ্টির প্রকৃতি ও আল্লাহর একত্বের মধ্যকার সম্পর্ক সঠিকভাবে বোঝা যায়। ওয়াহদাতুল ওজুদ কেবল একটি দর্শন বা তত্ত্ব নয়, বরং এটি মুক্তচিন্তা ও আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টিকে উদ্দীপিত করার একটি মাধ্যম, যা ইসলামী তাওহীদের গভীরতা এবং বাস্তবিকতার উপলব্ধিকে আরও স্পষ্ট করে।
    রেফারেন্স
    ১. আল-গাযালী, ইহইয়াউ উলূম আদ-দ্বীন (إحياء علوم الدين), খণ্ড ৪।
    ২. ইবন আরাবী, ফুসুস আল-হিকাম (فصوص الحكم)।
    ৩. ইবন আরাবী, আল-ফুতুহাত আল-মাক্কিয়া (الفتوحات المكية)।
    ৪. ইবন তাইমিয়া, ফাতাওয়া ইবন তাইমিয়া (فتاوى ابن تيمية),খণ্ড ২।
    ৫. মুজাদ্দিদ আলফ-ই সানী, মাকতুবাত-ই ইমাম রাব্বানী (مكتوبات إمام رباني), চিঠি নং ১.২৯০।
    ৬. আল-উসাইমিন, শারহুল আকীদাতুল ওয়াসিতিয়া (شرح العقيدة الواسطية)।

    2
    1 Comment
    • ইসলামী দর্শনের একটি চমৎকার অ্যাকাডেমিক আলোচনা। অনেক অস্পষ্টতা দূর হলো। শুভকামনা রইল!

Skip to toolbar