-
স্বপ্নবৎ
“””””””
১
“সন্ধ্যা হয়ে আসে—
একা একা মাঠের বাতাসে
ঘুরি আমি—বসি আমি ঘাসে”
—জীবনানন্দ দাশশিমুল বলে, “আরেকটু বস।” আমি উঠে দাঁড়িয়ে ওর চওড়া ঘাড়ের ওপর হাত রেখে বলি, “নারে, ঢের তাড়া আছে। আজ উঠি।”
সেও গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। গোধূলির ম্লান আলোয় ওর মুখটা কেমন মায়াবী দেখায়। সে যাওয়ার সময় হাসিমুখে বলে, “ঠিক আছে। কাল দেখা হবে।”
এবার ছুটিটা বড় কম, মাত্র তিন দিন। তার একটি দিন অলরেডি ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে হারিয়ে গেছে। হাতে জমে আছে পাহাড়সমান কাজ। মাকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে, রুনুর বই কেনা লাগবে, আর আমিরের নতুন স্কুল ড্রেস। সবচেয়ে বড় কাজ বাড়ির পুরোনো বাঁশঝাড়ের গোড়ায় মাটি ফেলা। বাবা গত হয়েছেন অনেক দিন হলো। বাড়িতে ছোট ছোট ভাইবোন নিয়ে মা বড় একা। বয়স হয়েছে তাঁর, সব কাজ একা সামলাতে পারেন না। তাই বাড়িতে এলে এই ঘরোয়া ছোট ছোট কাজগুলো আমাকেই দেখতে হয়।
শিমুলের সঙ্গে স্কুল মাঠে ঘাসের ওপর বসে এতক্ষণ পুরনো বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলাম। কার বিয়ে হলো, কে প্রবাসে গেল—এই সব। এক ফাঁকে শিমুল হঠাৎ করেই আসল কথাটা পেড়ে বসেছিল, “সবার খবর তো হলো, তা তোর বিয়ের জটটা খুলছে কবে?”
আমি শুকনো হেসে বলেছিলাম, “দেখি না কী হয়।”
“দেখা তো হলো অনেক। তোরই তো কাউকে পছন্দ হয় না।” শিমুলের কণ্ঠে কিছুটা অনুযোগ ছিল। আমি মনে মনে বলি, পছন্দ হওয়া কি আর আমার হাতে? অভিভাবক বলতে মা আর মামা। ছুটিতে এলে তাঁরা দু-চারটি বিয়ের প্রস্তাব সামনে আনেন। দু-এক জায়গায় দেখাও হয়েছে, কিন্তু ঠিক মনের কোণে দোলা দিতে পারেনি কেউ। মামা একদিন বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, “তোর যদি কোনো পছন্দ থাকে তবে বল, না হলে এদের মধ্যে থেকে একজনকে পছন্দ করে আমাদের উদ্ধার কর।” আমি নিরুত্তাপ কণ্ঠে জানিয়েছিলাম, “মামা, তাড়াহুড়ার কিছু নেই। দেখতে থাকো, ঠিকই মনের মতো কাউকে পেয়ে যাব।”
২
স্কুল থেকে আমাদের বাড়ির দিকে একটি সংক্ষিপ্ত মেঠোপথ আছে। মাঠের বুক চিরে কোনাকুনি হেঁটে এসে বাঁশঝাড়ের অন্ধকার সুড়ঙ্গ দিয়ে ঢুকলে অনেকটা পথ বাঁচে। শুকনো মৌসুমে এই পথটাই ভরসা। শিমুলকে বিদায় দিয়ে সেই পথ ধরে দ্রুতপায়ে হাঁটছিলাম।
বাঁশঝাড়ের অন্ধকার ঘুপচির কাছে আসতেই আমি থমকে দাঁড়ালাম। সন্ধ্যার অস্পষ্ট আলো-আঁধারিতে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী। রূপ যেন উপচে পড়ছে তমসায়। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে বাঁশঝাড়ের উঁচুতে। ভয়ে আমার বুক দুরুদুরু করে ওঠে। লোককথার পেতনি নয় তো? আতঙ্কে মনে মনে জপ শুরু করলাম। তখনই মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসির দমকে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। ঠিক যেন বাঁশঝাড়ের পেতনি! কিন্তু পেতনি কি এত রূপবতী হয়? নাকি কোনো বনপরি?
আমি যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়, তখন বাঁশঝাড়ের ভেতর থেকে পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “দুলুদি, উনি আমার ভাইয়া। আমাদের আনিস ভাইয়া।”
তনু কোঁচড়ভর্তি বেতফল নিয়ে নিচে নেমে এল। আমি একটু ধমকের সুরে বললাম, “এই অবেলায় গাছে উঠেছিস কেন?”
সে কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “আমি কী করব? দুলুদি বলেছে তাই।”
তখনই একটি মিষ্টি কণ্ঠস্বর আমার কানে মধু ঢেলে দিল, “রাগ করবেন না প্লিজ। আমিই ওকে বলেছি উঠতে। আসলে অনেক বছর বেতফল দেখি না তো…”
আমি ধাতস্থ হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “বেতফল কি আপনার খুব প্রিয়?”
দুলু স্মিতহাস্যে বললেন, “হ্যাঁ, এক অর্থে প্রিয়। খোসা ছাড়ানো ধবধবে বেতফলগুলো দেখতে ঠিক ঘুঘু পাখির চোখের মতো।”
মুহূর্তেই দুলুকে আমার ভালো লেগে যায়। মনের অগোচরেই বলে ফেলি—এই তো সেই মানুষ, যাকে আমি খুঁজছিলাম। তনু ওর কোঁচড়ের ফলগুলো দুলুর আঁচলে ঢেলে দিতেই তিনি কায়দা করে সেগুলো পাঁজরের সঙ্গে চেপে ধরলেন। অনিচ্ছাসত্ত্বেও এক পলক তাঁর উন্মুক্ত কোমরের দিকে নজর পড়ল। আমি দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলাম। দুলু সেটা খেয়াল করলেন। তাঁর তীক্ষ্ণ চোখের চাহনি যেন বলে দিল—’আপনি বড্ড দুষ্টু তো!’
তনু পরিচয় দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু দুলু তাকে থামিয়ে দিয়ে সপ্রতিভভাবে বললেন, “কেন, আমাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা যায় না আমি কে?”
আমি হাসলাম। “বেশ তো, বলুন আপনি কে?”
“আমি বানেছা পরি, এই বাঁশঝাড়েই থাকি।” মেয়েটার এই চপলতা আর কথা বলার ধরন আমার মনে গেঁথে গেল। আমি বললাম, “তাই হবে হয়তো।” সে ভ্রু নাচিয়ে পালটা প্রশ্ন করল, “কী হবে?” আমি রহস্য করে বললাম, “হবে আর কী! সময় হলে দেখা যাবে।”
ততক্ষণে মাগরিবের আজান ধ্বনিত হচ্ছে। আমরা তিনজন একসঙ্গে বাড়ির পথে পা বাড়ালাম। পথে আলাপ হলো। দুলুর ভালো নাম দিলারা জামান। তনুর দূরসম্পর্কের খালাতো বোন। আমাদের বাড়িতে আগেও এসেছেন একবার, তবে তখন হয়তো আমি ছিলাম না কিংবা আমার মনে নেই। এবার আসার কারণটা পারিবারিক। তাঁর বাবার হাড় ভেঙেছে, পাশের মিশনারি হাসপাতালে ভর্তি করার জন্যই তাঁদের এখানে আসা।
৩
আমাদের বাড়িটা দু-ভাগে বিভক্ত। এক অংশে আমরা আর তনুরা থাকি, অন্য অংশে হাসেম চাচারা। তনুর বাবা মোতালেব কাকা আমার বাবার চাচাতো ভাই। কাকা প্রবাসে থাকেন। তনুর একমাত্র ভাই রাতুল ঢাকায় পড়ে, আর তনু এবার ক্লাস ফোরে।
বাড়ি ফিরে হাত-মুখ ধুয়েই মাকে বললাম, “এক কাপ চা দাও মা।” আসলে আমার মনটা ছটফট করছে। আমার গন্তব্য এখন তনুদের ঘর। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, খুকি চাচিকে সরাসরি প্রস্তাবটা দেব। মা হাটে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিলে আমি বললাম, “আজ থাক মা, কাল যাব।” মা তখন বললেন, রুনুকে একটু অংক ধরিয়ে দিতে। বললাম, “চাচির সঙ্গে আমার একটা বিশেষ কাজ আছে। কাজ শেষ করে এসে রুনুকো অংক ধরব। এখন বাংলা পড়তে বলো”। এই বলে কোনোরকম গরম চা-টা গলাধঃকরণ করে দৌড় দিলাম তনুদের ঘরের উদ্দেশ্যে।
৪
খুকি চাচি মানুষ হিসেবে বড় উদার। আমার সরাসরি প্রস্তাব শুনে তিনি মুচকি হাসলেন। বললেন, “বেশ তো, দুলুর সঙ্গে কথা বলে দেখো। সে রাজি হলে ওর মা-বাবাকে রাজি করানোর দায়িত্ব আমার।” এই বলে তিনি দুলুর হাত ধরে টেনে এনে আমাদের ঘরের এক কামরায় বসিয়ে দিলেন। যাওয়ার সময় রসিকতা করে দুলুকে বললেন, “দেখো তো, এই পাগলটা কী বলে!”
ঘরজুড়ে এক অদ্ভুত নীরবতা। ফ্যানের বাতাসে দুলুর অবাধ্য চুলগুলো উড়ছে। ওর নাকের ডগায় সূক্ষ্ম স্বেদবিন্দু জমেছে। আমি যেন ডুলু নদীর প্রবল স্রোতে ভেসে যাচ্ছি। একসময় সেই নীরবতা ভেঙে দুলু প্রশ্ন করলেন, “আপনি নাকি কী একটা বলতে এসেছেন?”
আমি সাহসী হয়ে বললাম, “বলার তো অনেক কিছু আছে দুলু। আপনার কি সময় হবে?”
“সময় না থাকলেও সময় করে নেব।” দুলুর সাবলীল উত্তরে আমার আত্মবিশ্বাস বাড়ল। আমি বললাম, “তাহলে চলুন, অনন্তকাল ধরে কথা বলি।” দুলু রসিকতা করে বললেন, “সেটা সম্ভব নয় মশায়। সকালে বাবাকে দেখতে হাসপাতালে যেতে হবে।”
আমি সরাসরি প্রসঙ্গে এলাম। “দুলু, আপনাকে যদি এই বাড়িতে চিরদিনের জন্য রেখে দিতে চাই, আপনি কি রাজি হবেন?”
দুলু মাথা দুলিয়ে হাসলেন। সেই হাসিতে গালে গাঢ় টোল পড়ল। আমি সেদিকে অপলক তাকিয়ে রইলাম। দুলু আবার সেই কটমট চোখে তাকালেন। আমি বিনীতভাবে বললাম, “নির্দোষ চাহনি, দয়া করে অপরাধ নেবেন না।” দুলুর চোখের ভাষা এবার নরম হয়ে এল। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, “কিছু বলছেন না যে?”
দুলু নিচু স্বরে বললেন, “রেখে দিতে চাইলে রাখুন, বাধা দিচ্ছে কে?”
আমি আচ্ছন্ন হয়ে দুলুর হাত ধরলাম। আমরা বাইরে এলাম। আকাশে তখন এক ফালি চাঁদ উঠেছে। জোছনার আলোয় সারা পৃথিবী যেন স্বপ্নের রঙ মেখেছে। পুকুরপাড়ে বসে আমরা দুটি চাঁদ দেখতে লাগলাম। একটি আকাশের নিঃসঙ্গ চাঁদ, অন্যটি পুকুরের স্থির জলে কাঁপতে থাকা এক ছায়া-প্রতিবিম্ব। আমার হাতের মুঠোয় দুলুর হাত। আমার সমস্ত শরীর এক অজানা শিহরণে থরথর করে কাঁপছে।
“ওরে আনিস, উঠবি না? বেলা হয়ে গেল যে!”
মায়ের ডাকে তড়াক করে ঘুমটা ভেঙে গেল।
তখনও আমি কাঁপছি।3 Comments
Friends
মোহাম্মদ এরশাদ রিকাবদার
@ershad
তুহিন হায়দার
@past
বিলকিস খানম কাজল
@bilkiskhanam-kazal
আলমগীর খোরশেদ
@alamgirkhurshed
Swapan Kumar
@swapankumar
Anik Biswas
@anikbiswas
মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন
@delowar99gmail-com
Redoan Asif Risan
@redoanasifrisan
মোঃ শারুফ হুসাইন
@sharuf


দারুণ গল্প… শেষ লাইনটা পড়ে বুকটা ধক করে উঠল! পুরোটা পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল এ যেন আমারই গল্প, আর দুলুর চরিত্রটা এত জীবন্ত যে স্বপ্নটা ভাঙার পরেও মনে রয়ে যায়…💙