-
নিখোঁজ আত্মা, ছিন্ন মস্তক
___ পি কে সরকারনয়ন—নামটির মধ্যেই যেন ছিল এক অদ্ভুত দীপ্তি, এক অমলিন চাঞ্চল্য।
আমাদের ক্লাসে সে ছিল এক ব্যতিক্রমী উপস্থিতি—যাকে এড়িয়ে যাওয়া যেত না, যাকে ভুলে থাকা যেত না।
জন্ম থেকেই তার ডান হাতটি ছিল অকেজো। কিন্তু আশ্চর্য এই যে, নয়নের জীবনে এই সীমাবদ্ধতা কোনোদিন প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারেনি—অন্তত সে নিজে তা হতে দেয়নি।
তার এক হাতেই ছিল অদ্ভুত দক্ষতা।
সেই এক হাতেই সে দ্রুত লিখতে পারতো, সাইকেল চালাতে পারতো, এমনকি ক্রিকেটের মাঠেও তার উপস্থিতি ছিল ঈর্ষণীয়।
কিন্তু তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল—তার হাসি।
সে কথা বলতো কম, কিন্তু এমনভাবে বলতো—যে আশেপাশের সবাই যেন এক অদৃশ্য আনন্দের বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে যেত।২০০০ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষার পর, জীবন তার স্বাভাবিক নিয়মেই আমাদের ছড়িয়ে দিল ভিন্ন ভিন্ন গন্তব্যে।
কেউ শহরে পাড়ি জমালো উচ্চমাধ্যমিকের খোঁজে, কেউ থেকে গেল গ্রামের কলেজে, কেউবা ব্যর্থতার ভার কাঁধে নিয়ে নেমে পড়লো জীবিকার সংগ্রামে।
নয়ন গেল পাশের শহরের একটি সরকারি কলেজে।
তারপর ধীরে ধীরে, দৃঢ় পায়ে এগিয়ে গিয়ে ভর্তি হলো রাজশাহী কলেজে অনার্সে।পঞ্চবটীর সেই ছাত্রাবাস—যেখানে গোপাল মামার স্নেহময় উপস্থিতি ছিল—ছিল আমাদের যৌবনের এক নির্লোভ আশ্রয়।
সেই দিনগুলোতে অর্থ ছিল না, কিন্তু অভাব ছিল না স্বপ্নের।
ভাতের সাথে ডাল, কখনো একটু ভর্তা—তবুও সেই খাবারেই ছিল অদ্ভুত তৃপ্তি।
রাত জেগে গল্প, হাসি, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে জীবন তখন ছিল এক নির্মল উচ্ছ্বাস।
কিন্তু সময়, তার নিজস্ব নিয়মে, ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে ওঠে।মাস্টার্স শেষ হওয়ার পর, যখন কর্মজীবনের দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করলো নয়ন, তখনই সে প্রথমবারের মতো অনুভব করলো—
এই সমাজ তাকে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়।
বারবার ইন্টারভিউ, বারবার প্রত্যাখ্যান।
প্রতিটি ব্যর্থতা যেন তার ভেতরের আত্মবিশ্বাসকে একটু একটু করে ক্ষয় করে দিচ্ছিল।
অবশেষে বহু চেষ্টার পর সে রেলওয়ের সহকারী স্টেশন মাস্টার হিসেবে নিয়োগ পেল।সেই দিনটি ছিল তার জীবনের এক বিরল প্রাপ্তি—
সে ভেবেছিল, এবার হয়তো সবকিছু বদলে যাবে।
কিন্তু বাস্তবতা, কখনো কখনো, স্বপ্নের চেয়েও নির্মম হয়।
পরিবার থেকে যখন বিয়ের কথা উঠলো, তখন আবারও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি তাকে আঘাত করলো।
“ছেলেটা ভালো, কিন্তু…”—এই ‘কিন্তু’ শব্দটিই যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ালো।
অবশেষে অনেক চেষ্টার পর সে একটি ছোট্ট সংসার গড়ে তোলে।কিন্তু সুখ, তার জীবনে, যেন স্থায়ী হওয়ার আগেই বিদায় নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল।
রাজশাহীতে ছাত্রজীবনের এক ভুল সম্পর্ক, বহু বছর পর ফিরে এলো এক ভয়ংকর বাস্তবতা হয়ে।
অভিযোগ, মামলা, অপমান—সবকিছু মিলিয়ে তার জীবন যেন এক অদৃশ্য শিকলে বাঁধা পড়ে গেল।
কর্মক্ষেত্র থেকে সাময়িক বহিষ্কার—
পরিবারের চোখে সন্দেহ—
সমাজের চোখে প্রশ্ন—
সব মিলিয়ে নয়ন বুঝতে পারলো—
একটি ভুল, কখনো কখনো পুরো জীবনকে গ্রাস করে নিতে পারে।বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরে, অবশেষে অর্থের বিনিময়ে সেই মামলা নিষ্পত্তি হলো।
সে আবার কাজে ফিরে গেল—
কিন্তু সে আর আগের সেই নয়ন ছিল না।
তার ভেতরে তখন জমে উঠেছে ক্লান্তি, হতাশা, আর এক অদৃশ্য শূন্যতা।
পরিবারের ভেতরেও শুরু হলো নতুন এক দ্বন্দ্ব।
মা-বাবা একদিকে, স্ত্রী অন্যদিকে।
দুই পক্ষের চাওয়া-পাওয়া, অভিমান আর অভিযোগ—সবকিছু মিলিয়ে নয়নের জীবন হয়ে উঠলো এক অন্তহীন টানাপোড়েন।
সে চেয়েছিল—সবাইকে নিয়েই বাঁচতে।
কিন্তু বাস্তবতা তাকে সেই সুযোগ দেয়নি।
এই মানসিক যন্ত্রণার ভার সহ্য করতে না পেরে, সে খুঁজতে লাগলো সাময়িক মুক্তি—
যা ধীরে ধীরে তাকে টেনে নিয়ে গেল আরও গভীর অন্ধকারে।একদিন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছালো—
তার স্ত্রী তাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বললো।
“আমাকে বেছে নাও, অথবা তোমার মা-বাবাকে।”
এই এক প্রশ্ন—
যার কোনো উত্তর নেই।
নয়ন, যে সবসময় সবাইকে একসাথে রাখতে চেয়েছিল, সেই নয়নই হয়ে উঠলো সবচেয়ে একা।
শেষ দিনটি ছিল অদ্ভুত শান্ত।
সে তার ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে সারাদিন ঘুরলো।
খেলনা, খাবার, হাসি—সবকিছুতে ভরিয়ে দিল তার ছোট্ট পৃথিবী।কিন্তু তার নিজের ভেতরে তখন চলছিল এক নিঃশব্দ বিদায় আয়োজন।
সন্ধ্যার দিকে ছেলেকে মায়ের কাছে পৌঁছে দিয়ে, শুধু একবার তাকিয়েছিল তার দিকে।
তার চোখে ছিল অদ্ভুত এক কোমলতা—
যেন সে কিছু বলতে চায়, কিন্তু শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না।
শুধু বলেছিল—
“বাবা, আমি হয়তো একটু দূরে চলে যাবো…”তারপর—
সে হারিয়ে গেল।
পরদিন ভোরে, শহরের এক পরিত্যক্ত প্রান্তে, রেললাইনের পাশে মানুষের ভিড় জমেছিল।
কেউ ফিসফিস করে বলছিল,
কেউ চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল—
কারণ তারা বুঝতে পারছিল—
এটি কেবল একটি মৃত্যুর ঘটনা নয়।
এটি এক নিখোঁজ আত্মার গল্প—
যে ধীরে ধীরে হারিয়ে গিয়েছিল আমাদের চোখের সামনেই।নয়ন আজ নেই—
কিন্তু তার গল্প রয়ে গেছে।
একটি প্রশ্ন হয়ে—
আমরা কি সত্যিই মানুষকে তার মতো করে গ্রহণ করতে শিখেছি?
নাকি আমরা এখনও খুঁজে বেড়াই—
তার অসম্পূর্ণতাকে?1 Comment
পি কে সরকার
“পি.কে. সরকার — শব্দের ভেতর মানবতা ও সমাজের গভীরতম সত্য খুঁজে চলা এক সমকালীন বাংলা লেখক।”
Friends
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
Kazi Fahim hossin
@fahim6542
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নাদিম হোসাইন
@nadim-hossain
Latifur-rahman-Pramanik
@latifur-rahman-pramanik
afrida-jahar
@afrida-jahar
আমীর হামজা (লাম)
@amit
Md-Akadullah
@md-akadullah
Md. Omar Faruk
@mofaruk

শেষের প্রশ্ন টা বেশ ভাবার। সত্যি বোধহয় অসম্পূর্ণতা গুলো চোখ ফাঁকি দেয় না কারো 😢