-
“বিয়েপুরের বরবাজার ও খালাতো সাম্রাজ্যের মহাকাব্য”
অনেক দিন আগের কথা। মানচিত্রে যার অবস্থান নেই, অথচ প্রতিটি দেশের প্রতিটি শহরের অলিগলিতে যার ছায়া দেখা যায়—এমন এক অদ্ভুত নগরীর নাম ছিল “বিয়েপুর”। শহরটি ছিল খুবই আধুনিক। এখানে মানুষ প্রেম করত মোবাইলের আলোয়, প্রতিশ্রুতি দিত ইমোজির ভাষায়, আর বিশ্বাস করত স্ক্রিনশটের ওপর দাঁড়িয়ে। বিয়েপুরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—এখানে সত্য কথা বলার জন্য কোনো আলাদা বাজার ছিল না, কিন্তু মিথ্যার জন্য ছিল বিশাল শপিংমল।
শহরের মাঝখানে ছিল “বরবাজার”। সেখানে বিভিন্ন ধরনের বর পাওয়া যেত। কেউ ছিল সরকারি চাকরির বর, কেউ প্রবাসী বর, কেউ কবি বর, কেউ আবার “আবেগপ্রবণ সহজ-সরল বর”—যাদের দাম সবচেয়ে বেশি। কারণ এদের ঠকানো সহজ, আর কাঁদানো আরও সহজ। বাজারের একপাশে লেখা ছিল—
“এখানে স্বপ্ন বিক্রি হয়, বাস্তবতা আলাদা দামে।”
এই শহরেই বাস করত এক যুবক—নাম তার সরলেশ্বর। নামের মধ্যেই তার নিয়তি লেখা ছিল। সে এমন মানুষ, যে কাউকে “ভালো আছো?” জিজ্ঞেস করলে সত্যিই উত্তর শোনার জন্য অপেক্ষা করত। বন্ধুরা তাকে বহুবার সতর্ক করেছিল—
“এই যুগে বেশি সরল হওয়া বিপজ্জনক।”
কিন্তু সরলেশ্বর বিশ্বাস করত, পৃথিবী এখনও পুরোপুরি নষ্ট হয়নি।
একদিন তার পরিচয় হয় এক তরুণীর সঙ্গে। মেয়েটির নাম মায়াবতী। সে কথা বলত এমনভাবে, যেন প্রতিটি শব্দের সঙ্গে গোলাপের পাপড়ি ঝরে পড়ে। তার হাসি ছিল প্রশিক্ষিত, কান্না ছিল সময়মতো চালু হওয়া নাট্যযন্ত্রের মতো। সে যখন বলত,
“তুমি ছাড়া আমি বাঁচব না,”
তখন মনে হতো পৃথিবীর অক্সিজেন সরবরাহ হয়তো সত্যিই সরলেশ্বরের হাতে।
দেড় বছর ধরে তাদের প্রেম চলল। এই প্রেম ছিল আধুনিক যুগের প্রেম—যেখানে দেখা কম, স্ক্রিনশট বেশি; বাস্তবের চেয়ে স্ট্যাটাস গুরুত্বপূর্ণ; আর ভালোবাসার গভীরতা মাপা হয় “লাস্ট সিন” দিয়ে।
মায়াবতী মাঝে মাঝে গভীর রাতে বলত,
“তুমি কি আমাকে সত্যি বিয়ে করবে?”
সরলেশ্বর বুক ফুলিয়ে বলত,
“আমি তোমার জন্য সমুদ্রও পাড়ি দেব।”
মেয়েটি তখন মুচকি হাসত। কারণ সে জানত, সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার চেয়ে মানুষের পকেট পাড়ি দেওয়া সহজ।
বিয়েপুরে তখন নতুন এক সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়েছিল—“গোপন বিয়ে, প্রকাশ্য কান্না।” প্রেমিক-প্রেমিকারা পরিবারকে না জানিয়ে বিয়ে করত, পরে ফেসবুকে ছবি দিয়ে আত্মীয়স্বজনকে হার্ট অ্যাটাক দিত। সরলেশ্বরও ভাবল, সে ইতিহাস গড়বে। সে রাজধানী ঢাকানগর থেকে যাত্রা করল নদীর শহর বরিশালপুরে। উদ্দেশ্য—মায়াবতীকে বিয়ে করা।
ট্রেনে বসে সে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছিল। সংসার হবে, বারান্দায় মানিপ্ল্যান্ট থাকবে, সন্ধ্যায় দু’জনে চা খাবে। মাঝে মাঝে ঝগড়া হবে, পরে মিল হবে। সে জানত না, তার জন্য যে সংসার অপেক্ষা করছে, সেটি আসলে একটি নাট্যদলের মঞ্চ।
বরিশালপুরে পৌঁছে সে মায়াবতীর সঙ্গে দেখা করল। মেয়েটির সঙ্গে ছিল এক ভদ্রলোক। মাথায় ভদ্রতার টুপি, মুখে আত্মীয়সুলভ হাসি। মায়াবতী পরিচয় করিয়ে দিল—
“এ আমার খালাতো ভাই, খুব বিশ্বাসের মানুষ।”
বিয়েপুরে “খালাতো ভাই” ছিল একটি বিশেষ সামাজিক পদবী। এই পরিচয়ের আড়ালে প্রেমিক লুকানো যায়, ব্যবসায়িক পার্টনার লুকানো যায়, এমনকি স্বামীও লুকানো যায়। সমাজ এ বিষয়ে প্রশ্ন করত না। কারণ প্রশ্ন করলে সম্পর্ক নষ্ট হয়, আর সম্পর্ক নষ্ট হলে নাটকের মজা কমে যায়।
সরলেশ্বর ভদ্রলোককে দেখে মুগ্ধ হলো। লোকটি এমন আন্তরিকভাবে কথা বলছিল, যেন জন্মের পর থেকেই সে সরলেশ্বরের সুখের জন্য অপেক্ষা করছে।
তারা তিনজনে মিলে শপিংয়ে গেল। বিয়ের কেনাকাটা হবে। মায়াবতী লাল শাড়ি দেখল, নীল শাড়ি দেখল, আবার আগের লাল শাড়িটাই কিনল। কারণ সিদ্ধান্তহীনতা ছিল তার শিল্পের অংশ। সরলেশ্বর আনন্দে সব কিনে দিল। এমনকি খালাতো ভাইয়ের জন্যও একটি দামি পাঞ্জাবি কিনে দিল। লোকটি আবেগে বলল—
“ভাই, আপনি তো একেবারে আপন মানুষ!”
বিয়েপুরে “আপন মানুষ” কথাটির অর্থ ছিল—“যাকে ঠকালে অপরাধবোধ কম হয়।”
শপিং শেষে মায়াবতী হঠাৎ বলল,
“আমি একটু পার্লারে যাব। বিয়ের কনে বলে কথা।”
তার কণ্ঠে এমন লজ্জা ছিল, যেন পৃথিবীর প্রথম কনে সে-ই।
সরলেশ্বর হাসিমুখে টাকা দিল। বিশ হাজার। কারণ সে বিশ্বাস করত, ভালোবাসার মানুষকে সুন্দর দেখানোর দায়িত্বও ভালোবাসার অংশ।
মায়াবতী বলল,
“আমি একটু পরেই ফিরছি।”
এই “একটু পর” কথাটি পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় বাক্য। রাজনীতিবিদ উন্নয়ন করবে “একটু পর”, অফিসার ফাইল ছাড়বে “একটু পর”, আর প্রেমিকারা ফিরবে “একটু পর”—কিন্তু সেই সময় ক্যালেন্ডারের কোনো পাতায় লেখা থাকে না।
সরলেশ্বর অপেক্ষা করতে লাগল। প্রথমে উত্তেজনা নিয়ে, পরে উদ্বেগ নিয়ে, তারপর আতঙ্ক নিয়ে। সময় যেতে লাগল। সন্ধ্যা নামল। চায়ের দোকানের কেটলি তিনবার ফুটল। রাস্তার কুকুরও তাকে চিনে ফেলল। কিন্তু মায়াবতী ফিরল না।
সে ফোন দিল।
“সুইচড অফ।”
বিয়েপুরে ফোন বন্ধ হয়ে যাওয়া মানেই সম্পর্কের জানাজা শুরু।
খালাতো ভাইও তখন অদৃশ্য। যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছে। সরলেশ্বর প্রথমবার বুঝতে পারল, মানুষ শুধু প্রেমে পড়ে না—ফাঁদেও পড়ে।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর সত্য বের হলো। যে মানুষটিকে খালাতো ভাই বলা হয়েছিল, সে আসলে মায়াবতীর স্বামী। স্বামী-স্ত্রী মিলে দেড় বছর ধরে “অপারেশন বরবোকা” পরিচালনা করেছে।
এই সংবাদ শুনে সরলেশ্বরের মনে হলো, পৃথিবীটা আসলে একটা সার্কাস। এখানে দর্শকই সবচেয়ে বড় কৌতুক।
বিয়েপুরের মানুষ ঘটনাটি শুনে খুব আনন্দ পেল। কেউ বলল,
“আহারে বেচারা!”
কেউ বলল,
“এত বোকা হলে এমন তো হবেই!”
আবার কেউ গোপনে নতুন আইডি খুলে নতুন শিকার খুঁজতে লাগল।
শহরের পত্রিকাগুলো শিরোনাম করল—
“খালাতো ভাইয়ের ঐতিহাসিক আত্মত্যাগ!”
কেউ কেউ মায়াবতীকে আধুনিক অর্থনীতির প্রতীক বলল। কারণ সে “ইমোশনাল ইনভেস্টমেন্ট” থেকে দ্রুত লাভ তুলেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে এই ঘটনা নিয়ে গবেষণা শুরু হলো। গবেষণার বিষয়—
“প্রেম, প্রতারণা ও পাঞ্জাবির সমাজতাত্ত্বিক গুরুত্ব।”
একজন অধ্যাপক বললেন,
“এই ঘটনা প্রমাণ করে, আমাদের সমাজে খালাতো ভাই একটি বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান।”
বিয়েপুরের সাহিত্যিকরাও বসে থাকল না। কবিরা লিখল—
“তুমি গেলে পার্লারে, আমি গেলাম সর্বনাশে।”
নাট্যকাররা নাটক বানাল—
“স্বামী যখন খালাতো ভাই।”
এক ব্যবসায়ী তো নতুন দোকানই খুলে ফেলল—
“প্রতারিত বর ফ্যাশন হাউস।”
সেখানে বিশেষ ছাড়ে পাঞ্জাবি বিক্রি হতো।
সরলেশ্বর কিছুদিন মানুষের সামনে বের হতো না। কারণ আমাদের সমাজে প্রতারকের চেয়ে প্রতারিত মানুষই বেশি লজ্জিত হয়। চোরের মুখে কালো কাপড় না পড়লেও, ঠকে যাওয়া মানুষের মুখ নিজে থেকেই নিচু হয়ে যায়।
একদিন শহরের এক বৃদ্ধ দার্শনিক তাকে বললেন,
“তুমি কাঁদছ কেন?”
সরলেশ্বর বলল,
“আমি ভালোবেসেছিলাম।”
বৃদ্ধ হাসলেন।
“এই শহরে ভালোবাসা অপরাধ নয়। অপরাধ হলো প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাস করা।”
তারপর বৃদ্ধ তাকে নিয়ে গেলেন বরবাজারে। সেখানে অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কেউ প্রেম বিক্রি করছে, কেউ সহানুভূতি, কেউ ধর্ম, কেউ নৈতিকতা। বৃদ্ধ বললেন,
“দেখো, এখানে সবাই ব্যবসায়ী। কেউ টাকার ব্যবসা করে, কেউ আবেগের।”
সরলেশ্বর ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল। সে বুঝল, পৃথিবীতে সবচেয়ে দামি জিনিস হলো মানুষের সরলতা। আর সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা হলো সেই সরলতা বিক্রি করা।
কয়েক মাস পর খবর এল, মায়াবতী ও তার স্বামী আবার নতুন শহরে গেছে। সেখানে তারা নতুন নাটক শুরু করেছে। এবার নাকি স্বামী পরিচয় দেয় “বড় ভাই” হিসেবে। কারণ বিয়েপুরে সম্পর্কের নাম বদলায়, কিন্তু উদ্দেশ্য বদলায় না।
শহরের মানুষ আবার নতুন গল্প পেল। তারা হাসল, চা খেল, আলোচনা করল। তারপর নিজেদের জীবনে ফিরে গেল। কারণ এই সমাজে প্রতারণা কোনো দুর্ঘটনা নয়—এটি বিনোদন।
বিয়েপুরের কেন্দ্রীয় চত্বরে পরে একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়। সেখানে দেখা যায়—এক যুবক হাতে পাঞ্জাবি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর দূরে এক নারী পার্লারের দিকে হাঁটছে। ভাস্কর্যের নিচে লেখা ছিল—
“এখানে এক সরল হৃদয়ের সমাধি হয়েছে।”
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরলেশ্বরের কান্না শুকিয়ে গেল। মানুষ যখন খুব বেশি ঠকে যায়, তখন সে কাঁদে না—সে ব্যঙ্গ করতে শেখে। একদিন সে নিজেই একটি বই লিখল—
“খালাতো দর্শন ও প্রেমতত্ত্ব।”
বইটির প্রথম লাইন ছিল—
“এই দেশে প্রেম করার আগে জাতীয় পরিচয়পত্র নয়, পারিবারিক বৃক্ষ যাচাই করা জরুরি।”
বইটি খুব জনপ্রিয় হলো। কারণ মানুষ সত্যের চেয়ে ব্যঙ্গ বেশি পছন্দ করে। সত্য কষ্ট দেয়, ব্যঙ্গ হাসাতে হাসাতে কষ্টের জায়গায় আঙুল রাখে।
শেষ পর্যন্ত বিয়েপুর আগের মতোই চলতে থাকল। প্রেম হলো, প্রতারণা হলো, নতুন নতুন খালাতো ভাই জন্ম নিল। শুধু সরলেশ্বর মাঝে মাঝে শহরের মোড়ে দাঁড়িয়ে নতুন প্রেমিকদের দেখে মৃদু হাসত।
তার হাসির মধ্যে আর আগের সরলতা ছিল না। সেখানে ছিল অভিজ্ঞতার ধোঁয়া, ব্যঙ্গের আগুন, আর এক অদ্ভুত উপলব্ধি—
এই পৃথিবীতে মানুষ বিয়ে করতে যতটা আগ্রহী, তার চেয়ে বেশি আগ্রহী নাটক করতে।
আর সবচেয়ে বড় নাট্যমঞ্চের নাম—
“বিশ্বাস।”
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe

