-
রাতের গোপন সমাবেশ
মোঃ নুরনবী ইসলাম সুমননূরনবী ধীরে ধীরে তার ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া হাত দুটো পকেটের আরও গভীরে ঢুকিয়ে দিল। এই শীতের রাতটি কেবল হাড়-কাঁপানো ছিল না, এর মধ্যে যেন মিশে ছিল এক চাপা ইতিহাস, যা এই শহরে দীর্ঘকাল ধরে লুকিয়ে আছে। গভীর শ্বাস নিতেই তার ফুসফুস শীতল, ধোঁয়াটে বাতাস টেনে নিলো— মনে হলো সেই বাতাস তার রুক্ষ গালগুলোকে কেবল স্পর্শ করছে না, বরং একটি চাপা ক্ষোভের মতো দংশন করছে। রাস্তার পিচেট ঢালা মাটিতে জমে থাকা জল হালকাভাবে চাঁদ-আলোর এক প্রতিচ্ছবি তৈরি করেছিল; কেউ হয়তো অল্পক্ষণ আগেই দ্রুত পায়ে হেঁটে গেছে, কিন্তু সেই ছায়ামূর্তি বা তার পায়ের শব্দ কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। নূরনবী চোখ ফেরানোর আগেই সেই জমে থাকা জল আর চারপাশের গভীর আঁধার এমনভাবে মিলেমিশে গেল, যেন প্রকৃতিও তাদের এই গোপন যাত্রাকে নিজের কাছে লুকিয়ে রাখছে।
তার প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল এক নিদারুণ সতর্কতা। সে এগিয়ে গেলো পুরনো ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের সেই জরাজীর্ণ পেছনের গেটটির দিকে। এই গেট বহু বছর ধরে বন্ধ, যেন প্রবেশ করার অনুমতি দিতে সে নারাজ। এই ফটকের পিছনেই ছিল সেই বহু পুরনো ভবনটি, যার জানালাগুলো দীর্ঘ দিন আগে ভেঙে ফেলা হয়েছিল। কক্ষগুলো তখন থেকেই ছিল তালাবন্ধ, ঘরগুলো তখন থেকে নির্জনতার এক অঘোষিত মন্দির। এই নির্জনতা কেবল মানুষের অনুপস্থিতির কারণে নয়, বরং এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক ভয়ংকর সত্যের নীরবতার কারণে।
ভেতরের জানালা দিয়ে ফিকে চাঁদের চুয়াশা আলো ভেন্টিলেটরের মরিচা ধরা জালে আটকে ফিল্টার হয়ে প্রবেশ করছিল। সেই দুর্বল, ভূতুরে আলোয় কক্ষের ভেতরের দেয়ালগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, যেখানে জমে থাকা শত যুগের ধুলা, ভাঙা পাথরের টুকরো আর স্যাঁতসেঁতে মরচে পড়ার এক অদ্ভুত গন্ধ মিশে ছিল— এ এক এমন গন্ধ যা শুধু সময়ের নয়, চাপা পড়া অপমানেরও। এই ভাঙা, পরিত্যক্ত ভবনের নীরবতার মাঝেই আজ এক গোপন সভার আয়োজন হয়েছে, যেখানে চারজন মানুষ তাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে একত্রিত হয়েছে।
কক্ষের ঠিক মাঝখানে মেঝেতে রাখা একটি মাত্র মোমের ক্যান থেকে হলদেটে, ভেজা আলো ছিটকে পড়ছিল। এই দুর্বল আলোর বৃত্তে ইতোমধ্যেই চারজন ছায়ামূর্তি অপেক্ষার প্রহর গুনছিল। তাদের নীরবতা এতটাই তীব্র ছিল যে মনে হচ্ছিল যেন তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসও বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছিল না। এক কোণায় ছিল একটি ভাঙা কাঠের চেয়ার, তার জীর্ণতা যেন এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক প্রতীকী ছবি। আরেক কোণায় পুরনো মেঝেতে পড়ে ছিল ছিঁড়ে যাওয়া স্মৃতির একটি ছবি— হয়তো কোনও ফেলে আসা দিনের হাসি-খুশির টুকরো, যা এখন এই অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থানে তাদের বর্তমান যন্ত্রণার বিপরীতে এক তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ। লাভাল আলোর কম্পন আর গাঢ় ছায়ার খেলাতে তাদের চোখ-মুখ এতটাই অস্পষ্ট ছিল যে তাদের ভিতরের ভাবনাগুলো কেবল অনুমিত হচ্ছিল, কিন্তু তা বোঝার সাধ্য ছিল না কারও। এই অস্পষ্টতা যেন তাদের নিরাপত্তার এক প্রতীক।
নূরনবী দরজাটা ধীরে ধীরে, প্রায় ইঞ্চি ইঞ্চির মাপে ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল। তার চামড়ার জুতো যখন ভেজা মেঝে স্পর্শ করল, তখন সেই সামান্য আওয়াজটুকুও যেন দেওয়ালে কানে টিপে ধরে থাকা গভীর নিস্তব্ধতাকে ভাঙতে পারল না, বরং তা নীরবে এই নতুন উপস্থিতিকে স্বীকার করে নিলো।
“আসছি,” সে ফিসফিস করে বলল। এই শব্দটি যেন তার নিজের অস্তিত্বের এক নিবেদন ছিল, এক শপথ ছিল।
চাপা নিস্তব্ধতার মধ্য থেকে এক কন্ঠস্বর উঠে এলো— সেই কন্ঠ ছিল চাপা, সতর্ক।
“সব ঠিক আছে, নূরনবী? কেউ পিছু নেয়নি তো?”
নূরনবী মাথা নাড়ল। এই মাথা নাড়া ছিল শুধু হ্যাঁ-সূচক নয়, ছিল তার ভেতরের সমস্ত সংকল্পের এক নীরব স্বীকৃতি। সে হাতে ধরে থাকা পুরনো, হলুদ হয়ে যাওয়া একটি মোটা দিয়ালোগ ফাইলের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। ফাইলটি সাবধানে মেঝেতে নামিয়ে রেখে বলল, “এইটা নিয়ে এসেছি। সব ভিডিও ফুটেজ, নথিপত্র আর স্মৃতি— সবকিছু এখানে সুরক্ষিত আছে, এক মিনিটের জন্যও আমার চোখের আড়াল হয়নি।”
সঙ্গে সঙ্গে অপেক্ষমাণ ছায়ামূর্তির মধ্যে থেকে একজন উঠে দাঁড়ালো। এই মানুষটির চিবুকে অবিন্যস্ত দাড়ি, যা দীর্ঘদিনের ঘুমহীন রাত ও মানসিক উদ্বেগের প্রতীক। তার চোখে ছিল গভীর ক্লান্তি ও সতর্কতার ছাপ। এ হলো সৌরভ, এই গোপন দলের নীরব নেতা।
“ঠিক আছে, সৌরভ,” সে বলল এক অদ্ভুত শান্ত, প্রায় ধীরভাবে। তার কন্ঠে যেন বহুদিনের জমে থাকা ঝড়ো মেঘের চাপা গর্জন ছিল। “সময় নষ্ট করা যাবে না। প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। চলো শুরু করি।”
দরজাটি সাবধানে, শব্দহীনভাবে বন্ধ হলো। জানালার ভাঙা ফাঁক দিয়ে চাঁদের মুখ যেন একটু ফিসফিস করে উঠলো, যেন সেও তাদের এই গোপন কথোপকথন শোনার জন্য উন্মুখ। মোমের আলো কমে যাওয়ায় ভেজা দেয়ালগুলো উষ্ণ হলো না, বরং সেই ঠাণ্ডা, ভেজা স্পর্শে ঘরটা থরথর করে কাঁপতে লাগলো— যেন এই দেয়ালগুলোও কেবল দর্শক নয়, তারা দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ সত্যের প্রথম সাক্ষী হতে প্রস্তুত হচ্ছিল।সৌরভ প্রথম তার নীরবতা ভাঙল। তার মুখটি এখন মোমের ক্ষীণ আলোয় আরও অচেনা লাগছিল, যেন বহুদিনের মানসিক যন্ত্রণায় তার পরিচিত রেখাগুলো মুছে গেছে। গলা ছিল ভেঙে যাওয়া, রুক্ষ— আবেগের ভারে থমকে যাওয়া এক নদী যেন। চোখে ছিল কৈফিয়ত দেওয়ার চাপা ভার আর ভয়, যা বহু কষ্টের পরে আজ মুক্তি পেতে চাইছে।
“সে দিন… মাঝরাতে আমাকে বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল,” সে এক গভীর, কষ্টকর নিশ্বাস টেনে বলল, যেন তার ফুসফুস থেকে দীর্ঘদিনের জমানো বাতাস বেরিয়ে যাচ্ছে। “চোখ বাঁধা, গলা বাঁধা, সমস্ত কিছুই ছিল কেঁদে ওঠার জন্য প্রস্তুত। এই বাঁধন শুধু শরীরের ছিল না, ছিল আমার কণ্ঠস্বরের। তারা আমার ওপর চরম মানসিক চাপ সৃষ্টি করছিল, জোর করছিল থানায় গিয়ে একটা মিথ্যা বয়ান দিতে। তারা জানতে চেয়েছিল কারা আছে আমার সাথে, কোথা থেকে আসা, আমাদের উদ্দেশ্য কী— আমি শুধু বলেছিলাম, আমি ছিলাম একা। এই একা থাকার দাবি ছিল আমাদের বাকিদের সুরক্ষার একমাত্র ঢাল।
”তিনদিন ধরে… তারা শুধু মিথ্যা কথা বললো, সেটাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় ভীতি। আমার সত্য ছিল তাদের ক্ষমতার বিপরীত, তাদের তৈরি করা মিথ্যা আখ্যানের ঠিক উল্টো। আমি ছিলাম আমার দেহের এক প্রহরী, আমার ভেতরের সত্যকে আগলে রাখা এক দুর্ভেদ্য দেয়াল, যার কোনো দুর্বলতা তারা খুঁজে পায়নি। তারা চেষ্টা করেছিল আমার ভেতরের মানুষটাকে ভেঙে দিতে, কিন্তু আমি জানতাম, আমার এই নীরবতা আরও বড় এক প্রতিবাদের জন্ম দেবে।
”তারপর এক রাতে… একটি ছলনায় তারা আমাকে ছেড়ে দেয়। শহরের বাইরে নদীর ধারে, যেখানে নীরবতা ছাড়া আর কিছু ছিল না। আমি বাঁচি— শুধু এই বাঁচা আর নিঃশ্বাসটুকুই আমার প্রাপ্তি ছিল, কিন্তু সেই বাঁচার ভেতরে কোনো শান্তি ছিল না। আমি আজ এখানে বসেছি, এই আলো-অন্ধকারে, এই স্মৃতির মাঝে, কারণ আমি জানি— আজ সেই ভয়কে জয় করে সত্য বলার সময় এসেছে। এই সত্য শুধু আমার একার নয়, এটি এই নীরব প্রজন্মের সত্য।”
কক্ষের ভেতরে চেপে বসা নীরবতা যেন আরও গাঢ় হলো। সবাই সৌরভের প্রতিটি শব্দকে যেন নিজেদের ভেতরে গ্রহণ করছিল।
মোমের শিখা একটি ক্ষীণ ফিসফিস শব্দ করল। দেয়ালগুলো যেন সেই শব্দ শুনে শিউরে উঠলো। সময় যেন সেই মুহূর্তে থমকে গিয়ে সমস্ত ক্যালেন্ডারের কাঁটা বন্ধ করে দিলো, যেন প্রকৃতিও এই কঠিন সত্য হজম করার জন্য সময় নিচ্ছিল।
এর পরে মোমের ক্যানটি নিজের হাতে তুলে ধরলো জাকিয়া। তার মুখে কালো স্কার্ফ শক্তভাবে বাঁধা ছিল, কেবল চোখ দুটি উন্মুক্ত। সেই চোখে ছিল লালচে রেশ, যা কেবল তীব্র ক্রোধ অথবা দীর্ঘস্থায়ী কান্নার পরেই দেখা যায়— এ যেন অবিচারের বিরুদ্ধে হৃদয়ের রক্তক্ষরণ।
“আমরা ছিলাম আটজন মেয়ে…” সে শুরু করলো। তার কণ্ঠস্বর প্রথমে নিচু হলেও ধীরে ধীরে দৃঢ় হয়ে উঠলো, যেন একটি চাপা আগুন জ্বলে উঠছে।
“ছাত্রাবাসের মেয়েদের ঘর। রাতটা ছিল শান্ত, প্রকৃতির কোনো কোলাহল ছিল না, চাঁদ উঠেছিল, বাতাস যেন একটা শান্ত গানের মতো বয়ে যাচ্ছিল। আমরা গল্প করছিলাম… হাসছিলাম, আমাদের ছোট ছোট স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা করছিলাম। সেই স্বপ্নগুলো ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। হঠাৎ করেই দরজায় একটা বিকট শব্দ হলো, আর ভাঙা দরজাটা খুলে গেল। তারা ঢুকে পড়ল। যারা এসেছিল, তারা নিজেদের ‘পুলিশ’ নামে পরিচয় দিয়েছিল, কিন্তু তাদের চোখে কোনো আইন বা মানবতা ছিল না, তারা ছিল ক্ষুধার্ত পশুর মতো। তাদের লক্ষ্য ছিল ভয় সৃষ্টি করা, স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া।
”কেমন ভয়, কী সাংঘাতিক আতঙ্ক! আমাদের কেউ ভয়ে চিৎকার করতে পারেনি। মুখ, গলার স্বর, চোখ, সব যেন এক অদৃশ্য দড়ি দিয়ে বাঁধা পড়ে গিয়েছিল।
”আমি… আমি তখন… শুধু মাটিতে পড়েছিলাম, স্তব্ধ হয়ে, যেন আমি আর আমার শরীর এক নই।
আমি সবাইকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে সেই পশুতুল্য আক্রমণকে বাধা দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু…
”কেউ বাঁচেনি। আমাদের ভেতরের আত্মাটা কেউ বাঁচাতে পারেনি। তারা আমাদের কণ্ঠস্বর কেড়ে নিয়েছে, আমাদের সাহসকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আজ আমরা সেই নীরবতা ভেঙেছি।”
তার গলা এই কথাগুলো বলেই থেমে গেল, তীব্র আবেগে তার চোখ ছলছল করে উঠলো। মোমরশ্মিটা নড়ে উঠলো, যেন সেও জাকিয়ার সাথে সেই গভীর কান্নাকে অনুভব করতে চাইল।
বাতাস আবার একটু ঠাণ্ডা হয়ে উঠলো, যেন ভেতরের উষ্ণতাকেও গ্রাস করতে চাইল। ধুলো ভিজে যায়, কিন্তু মাঝখানে রাখা পুরনো পেনড্রাইভটা গলে যায় না, বরং সেই যন্ত্রের ভেতরেই একটি দাম্পত্যের মতো করে স্মৃতিগুলো সযত্নে সংরক্ষণ করা আছে, মুক্তির অপেক্ষায়।নূরনবী তখন উঠে দাঁড়ালো। তার হাত এক পুরনো কাঠের টেবিলের রুক্ষ পৃষ্ঠে রেখে সে বলল, তার কন্ঠস্বরে এখন আর ভয় নেই, আছে এক শীতল ইস্পাত-কঠিন সংকল্প।
“আজ রাত যা-ই হোক, এইখানে এই আঁধারে আমরা সত্যকে বাঁচাবো।
এই ভিডিও আর ডেটা ছাড়া অন্য কোনো জায়গায় কেউ জানতে পারবে না আসল ঘটনা। এই শহর, এই বিশ্ববিদ্যালয়, এই দেশ— সবার জানতে হবে, এমন কী হলে আমরা নীরব থাকি? কী কারণে আমরা মাথা নিচু করে নিজেদের বিবেককে বলি দিই? আমাদের নীরবতা তাদের অপরাধকে বৈধতা দেয়, আর আজ আমরা সেই বৈধতা ছিন্ন করব।”
এরপর সুমনা— হালকা ছায়ার প্লাস্টিক চেয়ারে বসে থাকা মেয়েটি তার নীরবতা ভেঙে দিল। তার কথাগুলো ছিল হাঁ করে ছুরি মারার মতো তীক্ষ্ণ, সরাসরি আঘাতকারী।
“এই পেনড্রাইভে… প্রায় সাতচল্লিশ মিনিটের ভিডিও আছে। চারুকলা অনুষদের সেই ল্যাব থেকে গোপনে তোলা। আমার যে বন্ধুরা ছিল, তারা ভয়ে আমাকে বারবার বলেছিল— ‘ভালো হয় নাকি না তোর! এ সব ছেড়ে দে!’ কিন্তু আমি বলেছিলাম, সত্য একটাই: তারা যা করেছে, তার বিবরণ দেব, আমি মুখ খুলব। ভিডিওতে স্পষ্ট আছে— ব্যারিকেড ভাঙার শব্দ, পা ধরে টেনে নিয়ে যাওয়ার আওয়াজ, চিৎকার, লাঠির আঘাত, রক্ত, কান্না, এবং সব শেষে নদীর আঁকাবাঁকা পথে তাদের পলায়ন, তাদের কাপুরুষতা। সবাই বলল— জীবন বাঁচুক।
”কিন্তু… আমি বাঁচতে চাই না এই মিথ্যা আর ভয়ের চাপে। এই জীবন মূল্যহীন যদি সত্য না থাকে। আমি চাই, যারা নিজেদের ক্ষমতার ছাপ ফেলেছে, তারা জানুক তাদের সেই ছায়া আর দেশ-প্রেমিকের নয়, তারা হয়েছে ‘মানুষ হত্যাকারী’, আর তাদের এই অপরাধের জন্য কোনো ক্ষমা নেই।”
মোমরশ্মি ক্ষণিকের জন্য ঝাপসা হলো, দেয়াল আরও ভিজে উঠলো, কক্ষটা যেন এখন পুরোপুরি বুঝতে পারল— স্মৃতি ফিসফিস করছে না, স্মৃতি চিৎকার করছে, ন্যায়বিচার চাইছে।
তখন তাকবীর ভাইয়া— যার মুখে ছাঁচ পড়া বিরক্তি, আর চোখে নিরাপত্তাহীনতার দুশ্চিন্তা— তিনি বললেন,
“সময়ের সামান্য ক্ষতি হলেই তারা এই ভিডিওর অস্তিত্ব মুছে দেবে, যেমন তারা আমাদের ইতিহাস মুছে দিতে চায়। তাই আজ রাতেই এই ভিডিও পাঠাতে হবে— বাইরে, এমন এক ঠিকানায় যেখানে এটি চিরকাল থেকে যাবে, যেখানে তাদের হাত পৌঁছাবে না।
আমরা তিনটি মাধ্যম বেছে নেব: একটি নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, একটি নির্লিপ্ত ব্লগার নেটওয়ার্ক, আর একটি শক্তিশালী সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট, যার মাধ্যমে একযোগে সব প্রকাশিত হবে।
সবকিছুতে FOIA-এর (Freedom of Information Act) মতো করে সমস্ত তথ্য প্রকাশিত হোক, যেন কেউ আর নীরব না থাকতে পারে, যেন সবাই শুনতে বাধ্য হয়।
আমাদের আত্মা মুক্ত হবে না, যতক্ষণ এই সত্য গোপন থাকবে, যতক্ষণ এই জঘন্য অপরাধের কোনো বিচার না হবে।”
দরজাটি একবার নড়ে উঠলো, সামান্য একটু ঠাণ্ডা বাতাস ভেতরে ঢুকলো। মোম জ্বলে উঠলো আবার, ধুলো নড়ে উঠলো, আর চাঁদের আলো ভেতরে আরও তীব্রভাবে প্রবেশ করলো।
কেউ আর কিছু বলল না।
ফিরে পাওয়া ফাইলগুলো সযত্নে টেবিলে রাখা হলো। পেনড্রাইভ, নথি, চাঁদের হালকা ছায়া, আর পুরনো মেঝে— এই সমস্ত কিছু মিলে যেন এক অদ্ভুত সুরক্ষা কম্বল তৈরি করেছিল, যার ভেতরে ছিল মুক্তির বীজ।
বাতাস যেন তখন এক নীরব সুর শোনালো। শান্ত, কিন্তু ভেজা। এক করুণ গানের মতো, নিঃশব্দ, কিন্তু গভীর আর্তনাদময়, যা কেবল আত্মার গভীরতম স্তরে শোনা যায়।
জাকিয়া গলা ভাঙা, কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল,
“আমরা যদি না বলি, কে বলবে? আমরাই তো শেষ সাক্ষী।
আমরা যদি ভয়ে চুপ থাকি, কে শোনাবে? আমাদের নীরবতা হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পাপ।
এই শহরের দুষ্কৃতীরা যদি আজ বাঁচে— কলঙ্ক শুধু আমাদের নয়, তাদেরই, যারা ভয়কে অস্ত্র বানিয়ে মানুষ হত্যা করে, এবং যারা জেনে-শুনে নীরব থাকে, যারা সত্যকে চাপা দিতে চায়।”
কেউ উত্তর দিল না। উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনও ছিল না।
নূরনবী, যার মুখে এখন শীতল দৃঢ়তা, আর চোখে প্রতিশোধের আগুন, সে হাত বাড়িয়ে মোমটা তুলে নিলো।
“চলো,” সে শান্তভাবে বলল। তার কন্ঠস্বর ছিল চূড়ান্ত আদেশের মতো।
“একদম রাত ৩:৩৩ মিনিটে, এই ভিডিও ছাপিয়ে, URL, HASH, PASSWORD— সব গোপনভাবে পাঠানো হবে। আমরা এমন এক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করব, যা তাদের প্রযুক্তির নাগালের বাইরে।
কেউ যদি এক ফাইল ডিলিট করে দেয়— অন্য ফাইল আছে, দশটা কপি আছে, মেঘের আড়ালে লুকিয়ে আছে।
কেউ যদি জানালা ভেঙে তোলে— অন্য জানালা আছে, শত চোখ জেগে আছে, আমাদের পক্ষ থেকে পুরো পৃথিবী দেখবে।
কেউ যদি চেয়েও ধোঁয়া জমায়— আমরা ব্যাকআপ রাখবো, যুগের পর যুগ ধরে, এই সত্য কখনোই পুরোনো হবে না।
”আমাদের এই কাজ ভয় নিয়ে নয়, আমাদের ভালবাসা নিয়ে। ভালোবাসা সত্যের, আর সত্য কখনো মুছে যায় না, তা চিরন্তন। আজকের এই রাত হবে নীরবতার বিরুদ্ধে আমাদের প্রথম জয়।”
একেকটা প্রতিশ্রুতি, একেকটা সংকল্প যেন তাদের মনের গভীরে বাজতে লাগলো। তারা একে অপরের দিকে তাকালো, চোখে ছিল গভীর এক আস্থা।
মোম একবার flicker করল, বাতাস ভেঙে গেলো, ধুলো ভিজে পড়ল।
তাদের নীরবতা এক পাগল নীরবতা। সকলের চোখ জলের মতো ঝাপসা, কিন্তু সেই চোখেই এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এক নতুন যুদ্ধের সংকল্প। কেউ আর বেশি কথা বলতে চাইল না, কারণ কথা শেষ হয়ে গেছে, এবার কাজের পালা।
কিন্তু রাত আর অপেক্ষা করতে চায় না।
তাই তারা মিলল চুপচাপ, এক গভীর কমটেড়ানো ঘুমের মতো, কিন্তু তাদের ভেতরের চেতনা ছিল পুরোপুরি সজাগ।
ফিরে যাওয়ার পথে নূরনবী হাঁটে— হেঁটে মাটির নিচে কখনো পানি, কখনো কুয়াশা, যা তার জুতোকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। তার পায়ে পড়েছে গাছের শুকনো পাতা, যা প্রতি পদক্ষেপে মৃদু শব্দ করছিল। কোনো কণা অচেনা ধুলোর সাথে মিশে গেছে। সে অনুভব করে এই পথের ধুলো আর জল যেন তার ভেতরের ভয়ের সাথে বাইরের পৃথিবীর এক গভীর সংযোগ স্থাপন করছে।
চন্দ্র যখন তার গায়ে শীতল, কিন্তু দৃঢ় আলো ফেলল, সে অনুভব করল— ভয় আর বিশ্বাস একসঙ্গে কাজ করছে, একে অপরের হাত ধরে। ভয় আছে, কারণ এই পথ বিপদসঙ্কুল; কিন্তু বিশ্বাস আছে, কারণ তারা সত্যের পথে হাঁটছে। তার মনে হলো, সে শুধু হাঁটছে না, সে ইতিহাসের এক নতুন পাতায় স্বাক্ষর রাখছে।
আর আমি, লিখি না, বলি না— শুধু হেঁটে চলি। এই পথ, এই রাত, এই সমাবেশ— সবই এক বৃহত্তর সত্যের অংশ।
রাত শেষ হয়নি।
সমাবেশও হয়নি শেষ।
আর সত্য— মোল্লাপড়া আঁধার নয়, আলো খুঁজে পেয়েছে, এবং সেই আলো এখন ছড়িয়ে পড়বে সারা বিশ্বে।
Friends
তিতা ফুল
@nadia1
নূপুর
@jahanjhumongmail-com
রেদোয়ান শাকিল
@readean
অথই মিষ্টি
@atiymistyn48
mmh mukul
@mmhmukul
Shimul Shek
@shimulshek
সালমা শিমু
@salmashimu74gmail-com
সাইফুর রহমান
@saadalqalam
কাজী এহসানুল হক জিহাদ
@jihad01
