-
আয়নানগরের নীতিমন্ত্রী ও হাস্যকর সভ্যতার কাহিনি
আয়নানগর নামের অদ্ভুত এক রাজ্য ছিল। সেই রাজ্যের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—সেখানে কেউ নিজের মুখ দেখত না, সবাই শুধু অন্যের মুখ দেখত। রাজ্যের প্রতিটি রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিশাল আয়না বসানো ছিল, কিন্তু সেগুলো এমনভাবে বানানো হয়েছিল যে মানুষ নিজের চেহারা দেখতে পেত না; বরং পাশের মানুষের মুখই বড় হয়ে ফুটে উঠত। ফলে রাজ্যের মানুষ সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে নিজের ভুল না দেখে প্রতিবেশীর নাকের বাঁক নিয়ে আলোচনা করত, দুপুরে অন্যের সততা নিয়ে বিচারসভা বসাত, আর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখত—“দেশটা শেষ হয়ে গেল!”
এই রাজ্যের শাসক ছিলেন মহামান্য সম্রাট প্রতিচ্ছবি চতুর্দশ। তিনি ছিলেন “জাতীয় নৈতিকতা উন্নয়ন কমিশন”-এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক। প্রতি সপ্তাহে তিনি বিশাল মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতেন,
—“নৈতিকতা ছাড়া জাতি ধ্বংস হয়ে যায়!”
বক্তৃতা শেষে তিনি জনগণের জন্য বরাদ্দকৃত চাল, ডাল আর ত্রাণের টাকাগুলো নিজের গোপন ভাণ্ডারে পাঠিয়ে দিতেন।
রাজ্যের মানুষ তাতে রাগ করত না। কারণ তারা অভ্যস্ত ছিল বক্তৃতা শুনতে, কাজ দেখতে নয়।
সম্রাটের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মন্ত্রী ছিলেন নীতিমন্ত্রী সৎচরণ লুটেপুটে। নামের সঙ্গে তার কাজের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তিনি প্রতিদিন সকালে “সততা ভবন”-এ গিয়ে সাংবাদিকদের সামনে ঘোষণা দিতেন,
—“দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স!”
তারপর বিকেলে দুর্নীতিবাজদের কাছ থেকে উপঢৌকন নিয়ে বলতেন,
—“আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া নৈতিকতা রক্ষা করা অসম্ভব।”
আয়নানগরের বিদ্যালয়গুলোর অবস্থাও ছিল বিচিত্র। সেখানে “নৈতিক শিক্ষা” নামে একটি বাধ্যতামূলক বিষয় ছিল। বইয়ের প্রথম পাতায় লেখা ছিল—
“মিথ্যা বলা মহাপাপ।”
কিন্তু পরীক্ষার হলে শিক্ষকরা নিজেরাই উত্তর বলে দিতেন।
“সততাই সর্বোত্তম নীতি”—এই লাইন মুখস্থ না বললে ছাত্র ফেল করত, অথচ যে ছাত্র সবচেয়ে সুন্দরভাবে নকল করতে পারত, সে-ই ক্লাস ক্যাপ্টেন হতো।
একদিন রাজ্যের সবচেয়ে বিখ্যাত বিদ্যালয় “আদর্শ অসততা উচ্চবিদ্যালয়”-এ বার্ষিক নৈতিকতা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হলো। প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল—“সততার গুরুত্ব”।
প্রথম পুরস্কার পেল ছাত্র রুবেল প্রতারণাবিদ। কারণ সে ইন্টারনেট থেকে পুরো বক্তৃতা চুরি করে এমন আবেগ দিয়ে পড়েছিল যে বিচারকরা কেঁদে ফেলেছিলেন।
দ্বিতীয় পুরস্কার পেল নিশাত মিথ্যাবাদী, যে বক্তৃতার মাঝখানে বলেছিল,
—“আমি জীবনে কখনো মিথ্যা বলিনি।”
এই কথা শুনে পুরো হলরুম দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়েছিল।
রাজ্যের শিক্ষক সমাজও ছিল খুব সম্মানিত। বিশেষ করে অধ্যাপক মহাজ্ঞানী সুবিধাবাদী ছিলেন সবচেয়ে জনপ্রিয়। তিনি প্রতিদিন ক্লাসে বলতেন,
—“মানুষের চরিত্রই আসল পরিচয়।”
তারপর পরীক্ষায় পাশ করানোর জন্য অভিভাবকদের কাছ থেকে হাঁস-মুরগি, গরু কিংবা মোটা খাম গ্রহণ করতেন।
তিনি একবার বলেছিলেন,
—“নৈতিকতা এমন এক জিনিস, যা অন্যকে শেখাতে খুব সহজ, কিন্তু নিজে পালন করলে সামাজিক মর্যাদা কমে যেতে পারে।”
আয়নানগরের পরিবারগুলোতেও নৈতিকতার বিশাল আয়োজন ছিল। বাবা-মায়েরা সন্তানদের বলতেন,
—“সত্য কথা বলবে।”
তারপর ফোন এলে সন্তানের কানে কানে বলতেন,
—“বল, বাবা বাসায় নেই।”
শিশুরা বিভ্রান্ত হয়ে যেত। তারা বুঝতে পারত না, সত্য কোনটা—বইয়ের, না ঘরের?
একদিন এক শিশু তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল,
—“বাবা, সততা কী?”
বাবা উত্তর দিলেন,
—“সততা হলো এমন এক জিনিস, যা অন্যের মধ্যে থাকলে খুব ভালো লাগে।”
আয়নানগরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল মানুষের দ্বিতীয় ধর্ম। সেখানে সবাই নৈতিকতার ফেরিওয়ালা।
একজন লোক সকালে বৃদ্ধ বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এসে বিকেলে লিখল—
“মানবিকতা হারিয়ে যাচ্ছে।”
হাজার হাজার মানুষ সেই পোস্টে হৃদয়ের ইমোজি দিল।
আরেকজন লোক ক্ষুধার্ত শিশুর পাশে দাঁড়িয়ে দশবার সেলফি তুলে লিখল—
“মানুষ মানুষের জন্য।”
শিশুটি খাবার পেল না, কিন্তু পোস্টটি ভাইরাল হলো।
রাজ্যের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতেও নৈতিকতার বিশাল আলোচনা হতো। ধর্মগুরু মহাপবিত্র ধনলোভী প্রতিদিন মানুষকে দয়া, সহনশীলতা ও আত্মসংযমের শিক্ষা দিতেন।
তারপর রাতে গোপনে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে বলতেন,
—“স্বর্গে যাওয়ার শর্টকাট প্যাকেজ আছে। ভিআইপি দান করলে সামনের সারির জায়গা নিশ্চিত।”
মানুষ ধর্ম শুনত, কিন্তু ধর্মের মর্ম বুঝত না। তারা দানের ছবি তুলত, কিন্তু ক্ষুধার্তের চোখের জল দেখত না।
এই রাজ্যে সবচেয়ে অবহেলিত মানুষ ছিল এক বৃদ্ধ—তার নাম বিবেক আলী। তিনি কোনো মন্ত্রী ছিলেন না, শিক্ষক ছিলেন না, বড়লোকও ছিলেন না। তিনি শুধু সত্য কথা বলতেন।
তাই মানুষ তাকে পাগল ভাবত।
বিবেক আলী প্রতিদিন বাজারে দাঁড়িয়ে বলতেন,
—“তোমরা সবাই নৈতিকতার গল্প বলো, কিন্তু কেউ নৈতিক হতে চাও না।”
লোকজন হাসত। কেউ বলত,
—“এই বুড়ো উন্নয়নের শত্রু!”
কেউ বলত,
—“এ নিশ্চয়ই বিদেশি এজেন্ট!”
একদিন সম্রাট সিদ্ধান্ত নিলেন—রাজ্যে নৈতিকতার অবস্থা যাচাই করতে হবে। তাই “মহা নৈতিকতা উৎসব” আয়োজন করা হলো। শহরের প্রতিটি দেয়ালে লেখা হলো—
“সততা আমাদের শক্তি।”
উৎসবে প্রবেশের টিকিট কিনতে ঘুষ দিতে হতো।
যারা বেশি ঘুষ দিল, তারা সামনের সারিতে বসার সুযোগ পেল।
মঞ্চে নীতিমন্ত্রী সৎচরণ লুটেপুটে উঠে বললেন,
—“আমাদের রাজ্যে নৈতিকতার জোয়ার বইছে!”
ঠিক তখনই তার পকেট থেকে একটি সোনার ঘড়ি পড়ে গেল, যার ওপর খোদাই করা ছিল—
“জনগণের ত্রাণ প্রকল্প স্মারক।”
সবাই দেখল, কিন্তু কেউ কিছু বলল না। কারণ আয়নানগরের মানুষ সত্য দেখলেও সেটাকে “শোভনতার খাতিরে” এড়িয়ে যেতে শিখেছিল।
হঠাৎ সেই অনুষ্ঠানে বিবেক আলী প্রবেশ করলেন। তার হাতে ছিল একটি অদ্ভুত আয়না।
তিনি বললেন,
—“এই আয়নায় মানুষ নিজের মুখ দেখতে পায়।”
রাজ্যের মানুষ ভিড় করে এগিয়ে এল। প্রথমে সম্রাট আয়নায় তাকালেন। তিনি দেখলেন তার মুকুটের নিচে এক ভয়ঙ্কর মুখ—লোভ, ভণ্ডামি আর ভয় মিশে আছে সেখানে।
নীতিমন্ত্রী তাকিয়ে দেখলেন তার জিহ্বা দুই ভাগ হয়ে গেছে—এক ভাগ বক্তৃতা দেয়, আরেক ভাগ ঘুষ খায়।
শিক্ষকরা দেখলেন তাদের খাতার ভেতর টাকা লুকানো।
অভিভাবকেরা দেখলেন সন্তানের সামনে তারা নিজেরাই মিথ্যার অভিনয় করছে।
ধর্মগুরুরা দেখলেন তাদের প্রার্থনার চেয়ে দানের বাক্স বড় হয়ে গেছে।
পুরো রাজ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।
মানুষ চিৎকার করতে লাগল,
—“এই আয়না নিষিদ্ধ করো!”
কারণ তারা অন্যের মুখ দেখতে অভ্যস্ত ছিল, নিজের মুখ নয়।
সম্রাট দ্রুত আদেশ দিলেন,
—“এই আয়না রাষ্ট্রবিরোধী!”
নীতিমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন,
—“এটি নৈতিকতার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র!”
শিক্ষকরা ছাত্রদের বললেন,
—“এই আয়না পরীক্ষায় আসবে না, তাই গুরুত্ব দেওয়ার দরকার নেই।”
শেষ পর্যন্ত বিবেক আলীকে গ্রেপ্তার করা হলো। অভিযোগ—তিনি জনগণের মানসিক শান্তি নষ্ট করেছেন।
আদালতে বিচারক জিজ্ঞেস করলেন,
—“তুমি কেন মানুষকে নিজের মুখ দেখাতে চেয়েছিলে?”
বিবেক আলী হেসে বললেন,
—“কারণ যে জাতি নিজের মুখ দেখতে ভয় পায়, সে কখনো সভ্য হতে পারে না।”
তারপর তাকে নির্বাসনে পাঠানো হলো।
বছর কেটে গেল। আয়নানগরে আবার আগের মতো জীবন চলতে লাগল।
মানুষ প্রতিদিন নৈতিকতার বক্তৃতা শুনত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানবতার পোস্ট দিত, বিদ্যালয়ে সততার রচনা লিখত, ধর্মীয় সভায় দয়ার কথা বলত—কিন্তু বাস্তবে কেউ কাউকে বিশ্বাস করত না।
একদিন ভয়াবহ দুর্যোগ এলো। খাদ্যসংকট দেখা দিল। মানুষ সাহায্যের জন্য সরকারের কাছে ছুটল।
কিন্তু দেখা গেল ত্রাণের গুদাম খালি।
নীতিমন্ত্রী পালিয়ে গেছেন।
সম্রাট বিদেশে।
ধর্মগুরু বলছেন, “ধৈর্য ধরো।”
শিক্ষকেরা অনলাইনে নৈতিকতার ক্লাস নিচ্ছেন।
ক্ষুধার্ত মানুষ তখন প্রথমবারের মতো বুঝতে পারল—নৈতিকতা শুধু বক্তৃতা নয়; এটি মানুষের অস্তিত্বের ভিত্তি।
সততা ছাড়া প্রতিষ্ঠান টিকে না, মানবিকতা ছাড়া সমাজ বাঁচে না, দায়িত্ববোধ ছাড়া রাষ্ট্র দাঁড়ায় না।
সেই সময় এক শিশু পুরোনো ধুলোমাখা ঘরে বিবেক আলীর রেখে যাওয়া আয়নাটি খুঁজে পেল।
সে আয়নায় নিজের মুখ দেখল।
তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“মা, আমি বড় হয়ে মানুষ হতে চাই।”
মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
—“মানুষ? তুমি কি এখন মানুষ নও?”
শিশুটি শান্ত গলায় বলল,
—“না মা, আমরা এখনো শুধু অভিনয় শিখেছি।”
সেদিন প্রথমবার আয়নানগরের আকাশে কোনো বক্তৃতা শোনা গেল না।
কোনো স্লোগান উঠল না।
কোনো পোস্ট ভাইরাল হলো না।
শুধু কিছু মানুষ নীরবে নিজেদের মুখ দেখতে শুরু করল।
আর সেখান থেকেই হয়তো সত্যিকারের নৈতিক শিক্ষার শুরু।
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe

