Profile Photo

rukaiya rakhiOffline

  • rukaiyarakhi
  • Profile picture of rukaiya rakhi

    rukaiya rakhi

    3 weeks, 3 days ago

    উত্তরবঙ্গের একটি ছোট গ্রামে জন্ম নেয় মেয়েটি। গ্রামের নামটা বড় নয়, কিন্তু সেই গ্রামের আকাশ ছিল অদ্ভুত রকম বিশাল—যেন সেখানে দুঃখ আর নীরবতা দুটোই একসাথে ভেসে বেড়ায়।
    মেয়েটির নাম রাইসা।

    তার বাবার নাম আবু সাইফুল, আর মায়ের নাম রাশিদা বেগম। বাইরে থেকে দেখলে তারা একটি সাধারণ পরিবার—কিন্তু ঘরের ভেতরের বাতাসটা ছিল অন্যরকম। সেখানে শব্দ থাকত, কিন্তু শান্তি থাকত না।

    রাইসা তখন খুব ছোট। তার চোখ বড়, কিন্তু বোঝার ক্ষমতা ছিল তার বয়সের চেয়ে বেশি দ্রুত তম। সে তখনো “ভালোবাসা” শব্দটার মানে জানে না, কিন্তু “চিৎকার” শব্দটা তার খুব চেনা।
    রাতে কখনো কখনো ঘরের ভেতর হঠাৎ শব্দ বেড়ে যেত। দরজার ধাক্কা, গলা উঁচু হওয়া, আর তারপর মায়ের চুপ করে যাওয়া কান্না। রাইসা তখন বিছানার এক কোণে চুপ করে শুয়ে থাকত। সে কাঁদত না, শুধু শুনত।

    তার বড় বোন নুসরাত, তখন রাইসার চেয়ে অনেক বড়। সে মাঝেমধ্যে রাইসার হাত ধরে বলত,
    “চুপ করে থাক, কিছু দেখিস না।”
    কিন্তু ছোট চোখ তো সব দেখে ফেলে।

    একদিন সন্ধ্যায়, আকাশটা ছিল ভারী মেঘে ঢাকা। বাইরে গরুগুলো ঘরে ফিরছিল। ঘরের ভেতর সেই একই অস্থিরতা। আবু সাইফুলের গলা এবার একটু বেশি উঁচু,মেজাজ একটু বেশিইই চড়া। রাশিদা বেগমের বারবার আকুতি যেন আবু সাইফুলের কানে যাচ্ছে না , ”আর মেরো না , দোহায় লাগে তোমার”
    রাইসা দরজার আড়াল থেকে সব দেখছিল। তার ছোট হাত দরজার কাঠে শক্ত করে ধরা। সে বুঝতে পারছিল না, কেন তার বুকের ভেতর এমন একটা চাপ অনুভব হচ্ছে, যেন কেউ ভিতর থেকে তাকে চেপে ধরছে।

    সে তখনো জানে না—এই অনুভূতির নাম একদিন হবে “ভয়” আর আরেকদিন “একাকীত্ব”।
    গ্রামের মানুষজন বাইরে থেকে এই পরিবারকে সাধারণ ভাবত। কেউ বলত, “সব সংসারেই একটু ঝামেলা থাকে।” কিন্তু কেউ দেখত না, একটি ছোট মেয়ের চোখে কীভাবে প্রতিদিনের সেই “ঝামেলা” জমে জমে পাহাড় হয়ে উঠছে। কী পরিমাণ বিষাদ তার অন্তরে জমত!

    এভাবেই রাইসা বড় হতে লাগল । কিন্তু সে অন্য বাচ্চাদের মত দুরন্ত ছিল না ছিল অত্যন্ত নিশ্চুপ স্বভাবের।

    বাড়ির পেছনের মাঠে যখন অন্য বাচ্চারা দৌড়াত, রাইসা তখন একা বসে থাকত। সে আকাশ দেখত। আকাশটা তার কাছে ছিল এমন এক জায়গা, যেখানে কেউ চিৎকার করে না।
    কিন্তু ঘরে ফিরে এলেই আকাশটা ছোট হয়ে যেত।

    এক রাতে রাইসা ঘুম ভেঙে দেখে, মা বিছানায় বসে চুপ করে কাঁদছে। পাশে আবু সাইফুল নেই। ঘরের আলো নিভে আছে, শুধু জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসে মায়ের মুখে পড়েছে।
    রাইসা ধীরে ধীরে মায়ের পাশে গিয়ে বসে। সে কিছু বলে না। শুধু মায়ের হাতটা ধরে।
    রাশিদা বেগম তখন হঠাৎ করে মেয়ের দিকে তাকান। চোখে জল, কিন্তু সেই জলের ভেতরেও একটা কঠিন ক্লান্তি।
    তিনি আস্তে করে বলেন,
    “তুই বড় হ, রাইসা… খুব তাড়াতাড়ি বড় হ।”
    সেই রাতে রাইসা প্রথমবার বুঝতে পারে—বড় হওয়া মানে আনন্দ না, এটা একটা দায়িত্ব।
    তার ছোট চোখ তখন জানে না, সামনে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে। কিন্তু সে জানে, সে আর আগের মতো শিশু থাকবে না।
    গ্রামের ভোরে যখন পাখির ডাক শুরু হয়, রাইসা তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। সে ভাবে, “সবাই কি এমনভাবে বাঁচে?”
    কিন্তু তার ভেতরের নীরবতা কোনো উত্তর দেয় না।
    শুধু একটা দীর্ঘ, ধীরে ধীরে বড় হতে থাকা নিঃশ্বাস তার সাথে থেকে যায়।
    আর এভাবেই শুরু হয় রাইসার গল্প—একটি ছোট মেয়ের, যে ধীরে ধীরে শিখে যাবে, পৃথিবী সবসময় কোমল নয়, কিন্তু মানুষ তবুও বাঁচে।…

    চলবে…।

    গল্পের নামঃ ভাঙ্গা ঘড়ির কাঁটা
    লেখিকাঃ রুকাইয়া রাখি

    6
    1 Comment
    • কী ভীষণ মায়াবী, সংবেদনশীল আর নিদারুণ এক গল্পের সূচনা করলেন!

Skip to toolbar