Profile Photo

বিষণ্ন সুমনOffline

  • logolabbd
  • Profile picture of বিষণ্ন সুমন

    বিষণ্ন সুমন

    3 months, 3 weeks ago

    আড়ালের ছায়া (ক্রাইম থ্রিলার)

    “এক”
    ঢাকার মোহাম্মদপুরের এক শান্ত নিবিড় গলি। ভেতরের শেষ মাথায় একটা তিনতলা বাড়ি। এরই প্রথম তলায় ছোট্ট একটা ফ্লাটে থাকেন মা সায়মা রহমান আর তার এমাত্র মেয়ে লিনা।

    সায়মা রহমান, হাউজওয়াইফ। বয়স ৪৫ এর কাছাকাছি। স্বামী মারা গেছেন আজ প্রায় সাত বছর। একমাত্র মেয়ে লিনাকে নিয়েই তার ছোট্ট সংসার। তার সকল ব্যস্ততা মেয়ে লিনাকে ঘিরেই।

    লিনা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। শান্ত, ভদ্র এবং পড়ুয়া স্বভাবের। স্কুলজীবন থেকেই তার তেমন কোন বন্ধু-বান্ধব নেই। মা-বাবা আর বই, এই নিয়েই ছিল তার জীবন। আজ হয়তো তার বাবা নেই। তারপরেও এই বয়সে তার সেরা বন্ধু বলতে কেবল মা সায়মা রহমান। পাশাপাশি ক্লাসের দু-একজন, যদিও কারো সঙ্গেই তার তেমন গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি কখনো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সে খুব একটা সক্রিয় না। আর সব ছেলে-মেয়ের মত তাকে ফোনেও খুব একটা কথা বলতে দেখা যায় না।

    সেদিন সকালটাও ছিল খুবই সাধারণ। মা সায়মা রান্নাঘরে নাস্তা রেডী করছিলেন। আর লিনা নিজের ঘরে কিছু নোটস্ লিখছিল। সকাল ৯টার দিকে তারা একসাথে নাস্তা করল।

    তারপর বাজারের ব্যগ হাতে সায়মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “মা লিনা, আমি বাজারে যাচ্ছি। তোর জন্য কিছু টাকা রেখে যাচ্ছি, তুই না নোটস প্রিন্ট করতে বাইরে যাবি বলেছিলি।”

    “হ্যাঁ মা, থিসিসের খসড়া আজ জমা দিতে হবে। তারপর লাইব্রেরি যাবো। ফিরতে একটু দেরি হতে পারে।” লিনা দরোজার হাতলে হাত রেখে বললো।

    “আচ্ছা মা। সাবধানে যাস।” সায়মা মেয়ের মুখে আদর দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। মেয়েকে দরজা বন্ধ করতে দেখে তিনি রিকশায় চড়লেন।

    বাজার করে প্রায় ঘন্টা দেড়েক পরে বাসায় ফিরলেন সায়মা। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন দারোয়ান ইউনুস। বয়স ষাটের কাছাকাছি। মুখে চিরচেনা ক্লান্তি আর কিছুটা কৌতূহল। সায়মা রহমান বিকশা ভাড়া মিটিয়ে গেটের দিকে ফিরতেই সে বলল, “আপা, মাইয়ারে তো আজকে বের হইতে দেখি নাই। আইজ কি হের ভার্সিটি বন্ধ?”

    সায়মা রহমান অবাক হলেন। “ না তো। ওর তো এতক্ষণে বের হয়ে যাবার কথা। বলেছিল আজ থিসিস জমা দেবে।”

    সায়মার মনে কেমন জানি খটকা লাগলো। তিনি দ্রুত পা চালালেন নিজের ফ্ল্যাটের দিকে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চাবি বের করে লক খুলতে গিয়ে আবিস্কার করলেন, ওটা খোলা।

    ঘরের ভেতরে ঢুকেই মেয়েকে ডাকলেন, “লিনা? মা… আমি এসেছি, তুই কই রে?” কিন্তু, কোন সাড়া পেলেন না।

    ডাইনিং রুম, রান্নাঘর সব খালি। টেবিলের উপর রাখা ভাত-তরকারি ছুঁয়েও দেখা হয়নি। ঘড়িতে তখন ১১টা ৩৫ মতন বাজে। ফ্যান ঘুরছে, বাতাসে হালকা একটা ঘামের গন্ধ, কিন্তু কোনোরকম সাড়া শব্দ নেই।

    লিনার ঘরের দরজাটা ভেজানো। হালকা ঠেলা দিলেন। আর তখনই তার চোখে যা পড়ল, সেটা কোন মা’ই সয্য করতে পারবে না।

    ঘরের মেঝেতে চিৎ হয়ে পড়ে আছে লিনা। চোখ দুটো নিথর, ছাদের দিকে ফেরানো। চুলগুলো এলোমেলো ছড়িয়ে আছে। একটা হাত পেটের উপর বিছানো। আর একটা হাত পাশেই মোবাইল ফোনটার উপর পড়ে আছে। তার ঘাড়ের পাশে কালচে দাগ। ঠোঁট হালকা ফোলা, যেন অভিমান করে আছে।

    মা এক ঝটকায় ছুটে গিয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন “লিনা মা, কি হয়েছে তোর? আমি এই তো এসেছি। উঠে বস মা।” শরীর ধরে ক্রমাগত ঝাঁকাতে লাগলেন।

    কিন্তু লিনা নড়ল না। কোনো সাড়া নেই। শরীরটা একদম ঠান্ডা, শক্ত হয়ে গেছে। অনেক আগেই মারা গেছে সে।

    প্রকৃত সত্যটা বুঝতে পেরে চিৎকার করে উঠলেন সায়মা রহমান। “না! লিনা, না! একি হলো আমার মেয়ের? আমার লিনারে কে মারলো? ”

    চিৎকার শুনে পাশের ফ্ল্যাটের লোকজন ছুটে এলো। তাদেরই কেউ ফোন করল পুলিশে। কেউ একজন ডাইনিং টেবিল থেকে পানির জগ নিয়ে এলো। লিনার মুখে পানি ছিটাল। বাড়িওয়ালার বউ এসে মা সায়মাকে ধরে উঠে বসাল।

    পুলিশ আসে এক ঘণ্টার মধ্যে। লোকাল থানার ইন্সপেক্টর শামীম ও তার সাথে একজন কনষ্টেবল। খুন হয়েছে, এটা নিশ্চিত। কিন্তু কোথা থেকে, কীভাবে বুঝতে পারলেন না? দরজা বাইরে থেকে বন্ধ ছিল। জানালার গ্রিলও অক্ষত। ঘরের কোনো কিছু এলোমেলো নয়।

    ইন্সপেক্টর শামীম জিজ্ঞেস করল, “ঘরে কি কেউ এসেছিল?”

    সায়মা কাঁপা গলায় বললেন, “আমি তো বের হইছি সকাল ১০টায়। তখন মেয়ে বাসায়ই ছিল। দরজা ভেতর থেকে লক করা ছিল। তারপর আমি বাজার করে মাত্রই ফিরলাম। এসেই দেখি মেয়ে আমার, “ বলেই আবার চিৎকার করে উঠলেন। “লিনা রে, একি হলো তোর মা? কে আমার এতো বড় সর্বনাশ করলো?”

    শামিম সাহেব চিন্তায় পড়ে গেলেন। তিনি দাঁড়োয়ানকে ডেকে আনতে বললেন। দারোয়ান ইউনুস আসলে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “এর মধ্যে আর কেউ কি বিল্ডিংয়ে এসেছিল?”

    “স্যার… আমি তো নিচেই ছিলাম… কাউরে দেখি নাই… কেউ ঢুকলে তো দেখতাম…” দাঁড়োয়ান শশব্যস্ত হয়ে উত্তর দিল।

    ইন্সপেক্টর শামীম চারপাশ ঘুরে তাকিয়ে বললেন, “এটা কোন সহজ খুন না। খুনির কোন চিহ্ন নাই, হাতের ছাপ নাই, দরজা ভাঙা না, জানালা ভাঙা না… তার মানে এটা প্রি-প্ল্যানড খুন, যা কেবল খুব ঠান্ডা মাথার লোকই করতে পারে।”

    তদন্ত শেষে বেরিয়ে যাচ্ছে পুলিশ, তখনই বাসার গেটের দঁড়োয়ান ইউনুস হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে, “স্যার, আমি একটা কথা ভাবছিলাম… ওইদিন দুপুরের একটু আগে উপরের ফ্ল্যাটের ছেলেটা, ওই যে কি যেন নাম, ও স্যার মনে পড়ছে … রাফি, ও তো অনেকদিন বাসায় ছিলনা। কিন্তু, হেদিন হঠাৎ আসছিল। তারপর কিছুক্ষণ বাদেই চইলা গেছে ।“ শেষে মাথা ঝাঁকিয়ে যোগ করলো, “ আর তো বাসায় আসে নাই।”

    শামিম সাহেব থেমে গেলেন। “ এই রাফিটা কে?” তার মনে হলো, ঘন অন্ধকারে একটু আলোর দেখা পেয়েছেন।

    সায়মা বললেন, “ছেলেটা উপরের ২এ ফ্লাটে থাকে। খুব কম কথা বলে। কারো সংগে তেমন মেশে না। আমার মেয়ের সাথে কখনো কথা বলতেও দেখি নাই।”

    ইন্সপেক্টর শামীম তাকালেন সিঁড়ির দিকে। পরমুহুর্তে হনহনিয়ে দু’তলায় উঠে এলেন। এগিয়ে গেলেন ২এ ফ্লাটের দিকে। কিন্তু আশাহত হলেন খুব। রাফির ফ্লাটের দরোজার দরোজার নবে হাত দিয়েই বুঝে গেলেন ওটা লক করা।
    (চলবে)

    4
    4 Comments
আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন

ডিজাইনার

স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

Skip to toolbar