Profile Photo

বিষণ্ন সুমনOffline

  • logolabbd
  • Profile picture of বিষণ্ন সুমন

    বিষণ্ন সুমন

    3 months, 3 weeks ago

    আড়ালের ছায়া (ক্রাইম থ্রিলার)

    “তিন”
    রাত হয়ে এসেছে। ঘড়ির কাঁটা প্রায় ৯টা ছুঁই ছুঁই।

    মোহাম্মদপুরের খুন হওয়া বাড়িটায় এক অদ্ভুত নিরবতা বিরাজ করছে।

    একতলার সিড়ি ঘরের মাঝখানে অনেকগুলো চেয়ার পাতা। তার মাঝে বসে আছেন সায়মা রহমান। চারপাশে পুলিশ, তদন্তকারী অফিসার আর আশে-পাশের ফ্লাটের ক’জন প্রতিবেশীও যোগ দিয়েছে ।

    তদন্ত চলছে। ইন্সপেক্টর শামিমের মাথা খারাপ হবার যোগার। সব কিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। দাঁড়োয়ান ইউনুস বলছে, রাফি বেশ কিছুদিন বাসায় ছিল না। আজই সে বাসায় ফিরেছে এবং কিছুক্ষণ পর চলেও গেছে। আবার রাফির ফ্লাটের উল্টোদিকের বাসিন্দা বলছে, রাফি গত টানা এক সপ্তাহ ধরে এই ফ্ল্যাটেই ছিল।

    দুজনের কথায় প্রচন্ড অমিল। তার মানে কেউ একজন মিথ্যে বলছে। কিন্তু, মিথ্যে বলে তাদের কি লাভ? এমন হতে পারে কেউ একজন ভুল দেখেছে। সামনের ফ্লাটের বাসিন্দার ভুল দেখার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। মহিলার আচরনেই বলে দিচ্ছে, ভীষন কৌতুহলী স্বভাবের মানুষ। ওদিকে দারোয়ান ইউনুস সাড়াক্ষণ গেটেই থাকে। কাজেই তার চোখ এড়িয়ে ফ্লাটের বাসিন্দাদের কারো পক্ষেই দীর্ঘদিন ঘরের বাইরে না যাওয়াটা একেবারেই অসম্ভব। যেহেতু, কে আসলো আর কে গেল- পুরো ব্যাপারটাই তার চোখের সামনে ঘটেছে।

    তাহলে এখন প্রশ্ন হলো ভুলটা দেখেছে কে?

    রাফির ফ্ল্যাট থেকে পাওয়া লিনার চুড়ি, ডায়েরির লেখা, সবকিছু ঘিরে এক ব্যাপক জট পাকানো রহস্য তৈরি হয়েছে । কেউ জানে না রাফি এখন কোথায়। তার ফোন বন্ধ। ফ্ল্যাটও তালাবদ্ধ ছিল।

    পুলিশ এখন পুরো বিল্ডিংয়ের সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করছে। একটা একটা করে সময়ের হিসাব মেলাচ্ছে।

    ফুটেজে দেখা গেল দুপুর ১১টা ০৫ মিনিটে রাফি গেট দিয়ে ঢুকছে। তার হাতে মোবাইল, কানে হেডফোন। খুব সাধারণ ভঙ্গিতে উঠে যাচ্ছে দোতলার দিকে। কোনো রকম তাড়াহুড়ো বা সন্দেহজনক আচরণ নেই।

    এরপর ক্যামেরার ফ্রেমে আবার নাড়াচড়া ধরা পরে একেবারে ১১টা ২৭ মিনিটে। সে সময় রাফিকে আবার বেড়িয়ে যেতে দেখা যায়। এবারও তার আচরণ আগের মতই। কোন তাড়াহুড়া নেই।

    ঠিক এই সময়েই দারোয়ান ইউনুসকে দেখা গেল গেটের বাইরে, পাশের রাস্তার মাথায় দাঁড়িয়ে কথা বলছে একজন মহিলার সঙ্গে। পরের মিনিটে সে আবার হেঁটে গেটের দিকে ফিরছে।

    তদন্তকারী অফিসার বললেন, “এই সময়টায় ইউনুসও বাইরে ছিল। কাজেই বাড়িতে কেউ ঢুকলে বা বের হলে তার জানার কথা না। তার মানে, ঠিক এই ফাঁকে কেউ ঢুকেও যেতে পারে।”

    কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেউ ঢুকেছিল কি? না কি খুন আগেই হয়ে গিয়েছিল? যদি তাই হয়ে থাকে। তাহলে খুনী নিশ্চয়ই ভেতরের কেউ।

    লিনার ফোন এখন পুলিশের হাতে। তাদের টেক টিম লাস্ট কল, মেসেজ, লোকেশন, সব চেক করে। সকাল ১০টা ১৮ মিনিটে রাফির নাম্বার থেকে একটা কল এসেছিল। ডিউরেশন খুব ছোট, মাত্র ৩১ সেকেন্ড।

    পাশে বসা ইনস্পেক্টর শামীম বললেন, “৩১ সেকেন্ডে কী এমন কথা হলো, যে তা শেষ পর্যন্ত খুনের দিকে গড়ালো?” কোন উত্তর নেই।

    আরেকটা তথ্য উঠে আসে, লিনার ফোনে রাফির নম্বর সেভ করা ছিল না। তার মানে, পরিচয় থাকলেও তাদের মধ্যে তেমন ঘনিষ্ঠতা ছিল না। তাই লিনা রাফির নাম্বারটা সেভ করার প্রয়োজন বোধ করেনি।

    সামনের ফ্ল্যাটের রুখসানা ভাবী বলেন, “আমি দেখি, ছেলেটা মাঝে মাঝে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা কইত। কারো জন্য যেন অপেক্ষা করত। একদিন ওর চোখে পানিও দেখছিলাম।”

    “লিনারে কি একতরফা ভালোবাসত?” ইন্সরপক্টর শামীম নিচের ঠোঁটে চিমটি কাঁটলেন।

    “কে জানে! ছেলেটা তো খুব চুপচাপ ছিল। কোন কিছুই বুঝা যেত না।” জবাবে রোকসানা মাথা নাড়লেন।

    মনে হচ্ছে ইউনুস কিছু লুকোচ্ছে। ইনস্পেক্টর নিচে গিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলেন দারোয়ান ইউনুসকে। প্রশ্ন করলেন, “তুমি বলছো, দুপুরে গেটের সামনে ছিলে। কিন্তু ক্যামেরায় দেখা গেল তুমি মোড়ে গেছিলে।”

    ইউনুস কাঁপা গলায় বলল, “হ্যাঁ স্যার, আমি চা আনতে গেছিলাম। আর এক মহিলা রাস্তায় দাঁড়ায়া রাস্তা জিজ্ঞেস করছিল, ওর জন্য রিকশা ডাইকা দিছিলাম। আমি তো জানতাম না এমন কিছু হইবো?”

    “তাহলে গেট কি খোলা ছিল?”

    “জি স্যার। আমি বদ্ধ করি নাই।”

    এই তথ্যটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ লিনার খুন হওয়ার সময় গেট খোলা, দারোয়ান গেটের বাইরে। এতে বোঝা যাচ্ছে, কেউ চাইলে অনায়াসে এসময় ভিতরে ঢুকতে পারত। এটা অবশ্যই একটা নতুন দিক যা তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে।

    লিনাদের পাশের ফ্ল্যাটের বুয়া, রহিমা, হঠাৎ বলল, “স্যার, আমি একটা কথা বলি? আমি জানি না আপনাগো কাজে লাগবো কিনা।”

    “বলো।”

    “সেদিন দুপুরে, মানে ওই সময়টায়, আমি ছাদে গেছিলাম কাপড় নাড়তে। তখন দেখি ছাদের কিনারে কেউ একজন দেয়াল ঘেইসা দাঁড়ায়া আছে। হেয় পিছন ফিইরা সিগারেট টানতাছিল। সিগারেটের গন্ধে আমার বমি আসে, তাই আমি তাড়াতাাড়ি চইলা আসি।

    ইনস্পেক্টর একটু চমকে গেলেন। “তুমি কি তার মুখ দেখছো?”

    “না স্যার। কইলাম তো, হেয় পিছন ফিইরা আছিল। একবারো মুখ ঘুরায় নাই।”

    এই তথ্য কেউই আগে দেয়নি। কেউ ছাদে গিয়েছিল, কিন্তু, কে সে? কেন গিয়েছিল? এতে সম্ভাবনা থেকে যায়, কেউ নিশ্চয়ই বিল্ডিংয়ে ঢুকেছিল। আবার সে এই ভবনেরও কেউ হতে পারে। তার মানে এই লোকটারও খুনী হবার সুযোগ আছে। সেক্ষেত্রে রাফি নিশ্চয়ই লিনাকে খুন করেনি। তার খুনী হবার জোড়ালো কোন কারণও নেই। কিন্ত, ডায়েরীতে লেখা তার সেদিনের নোটটা, “ ও যদি আমার নাই হবে। তবে কখনোই আর কারো হবে না।”

    আবারও সব তালগোল পাকিয়ে গেছে। ইন্সপেক্টর শামিম আলগোছে মাথার চুল ধরে টানতে লাগলেন।
    (চলবে)

    3
    8 Comments
আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন

ডিজাইনার

স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

Skip to toolbar