Profile Photo

Kazee Hosneara BegumOffline

  • KAZEEaRenu
  • Profile picture of Kazee Hosneara Begum

    Kazee Hosneara Begum

    3 months, 4 weeks ago

    – *গোলকধাঁধা*
    – কাজী হোসনেআরা বেগম

    বাড়ীর পাশে লাগোয়া পুকুর। এর পরই এক চিলতে ধানি জমি।জমির কোল ঘেষে কবরস্থান, তারপরই একটি বড় পুকুর। পুকুরটি স্কুলের পুকুর নামেই পরিচিত ।কবরস্থানটি ছিলো মূলত পুকুরের পাড়েই। পুকুরের অন্য পাড়ে আমাদের স্কুল। তখন ষষ্ঠ কিংবা সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি।টিফিন ছুটির(দুপুর ছুটি) ঘন্টা ঢং ঢং ঢং করে বেজে উঠতেই তড়িৎ গতিতে প্রস্তুত হয়ে ছুট দিতাম বাড়ী অভিমূখে।নির্দ্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবার ফিরতে হবে,তাই এতো তাড়া।স্কুলের পাশে বাড়ী হওয়ায় এ সুবিধাটি বরাবরই ভোগ করেছি। একদিন চাচাতো বোনসহ স্কুল হতে বাড়ী যাচ্ছিলাম টিফিনের সময়।ঠিক সেই সময় রাস্তায় পাশাপাশি যাচ্ছিলেন বয়সের ভারে ন্যুজ্ব এক ভিখারী বৃদ্ধা। এক হাতে লাঠি এবং অন্য হাতে ভিক্ষার চালসহ বেতের ঝুড়ি। ঝুড়িটি কোমরের সাথে লাগিয়ে ধীরে ধীরে লাঠিতে ভর দিয়ে হাটঁছিলেন। আমাদেরকে দেখতে পেয়ে অস্পষ্ট সুরে কি যেনো বলতে চাইলেন।উৎসুক হয়ে কাছে যেতেই বললেন ,” মাগো,আমার ঝুড়িটা কি একটু নিবে?আমি এটা নিয়ে হাটঁতে পারছি না।”পাশের গ্রাম হতে প্রায়ই ভিক্ষা করতে আমাদের গ্রামে আসতো। তাই ওনাকে চিনতে সমস্যা না হলেও, সমস্যা তৈরী হলো ভিক্ষার ঝুড়ি নিয়ে।এ ঝুড়ি নিয়ে স্কুলের পথে হাঁটবো কিভাবে?অল্প বয়সের অগভীর চিন্তা। মান-ইজ্জত সব আজ ধূলিসাৎ হবেই!! আমার আমিত্ব,আমার ইগো প্রচন্ডভাবে বাধাঁর সৃষ্টি করলেও সেদিন মানবতার কাছে ইগোর পরাজয় ঘটেছিলো । আমরা দুজন পরস্পরের দিকে তাকালাম।আপা বললো,চল্ দুজনে ভাগাভাগি করে এগিয়ে দিই।
    —ঘটনাটা মনে পড়লেই ভাবি ছোটবেলায় একটা মানুষের কষ্ট দেখলে কতই না ব্যথিত হতাম!কতই না কষ্ট পেতাম!ভাবতাম,আমার যদি আলাদীনের চেরাগ থাকতো,তবে দৈত্যকে ডেকে এনে এ মানুষগুলোর কষ্ট লাঘব করে দিতে বলতাম।আবার ভাবতাম, আমার হাতে টাকা থাকতো, আমি শুধু গরীব অসহায়দের দান করতাম।
    –সত্যি সত্যি একদিন বাবা এক টাকা দিলো। শুনতে পেলাম আইসক্রিমওয়ালার ডাক।ভাবনায় ছেদ পড়লো। ছুটে গেলাম,,,,।
    পরেরবার ফুফু দিলো পাঁচ টাকা।এবার আইসক্রিমের সাথে যোগ হলো চুলের ফিতা কিংবা অন্য কিছু।
    এভাবে দশ টাকা, বিশ টাকা………….লাখ টাকা,কোটি টাকার বলয়ে তথা চাহিদা নামক গোলকধাঁধার পদতলে পিষ্ট হতে থাকে সেই মানবতা,সেই ভালোবাসা । আমার অন্তরের মানবতা, সহমর্মিতা, ভালোবাসা আমার অন্তরেই চুপটি মেরে সযতনে ঘুমিয়ে থাকে। কিন্তু এ গোলকধাঁধার আবর্তনে পড়ে তারা আর জেগে উঠতে পারে না কিংবা আমরা জাগানোর চেষ্টা করি না।মাঝে মাঝে ভীষণ অসহায় লাগে।চোখ বন্ধ করে ফিরে যাই সেই অতীতে,যেখানে অসহায় মা বায়না ধরা সন্তানের বায়না মেটাতে না পেরে সন্তানকে মেরে আবার নিজেই কাদঁতে বসতো কিংবা অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসা সহায়তার জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতো অথবা বাবা সন্তানের হাতের বই ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নিয়ে যেতো তার কাজের সাহায্যে……………… আরও কত কি?
    ——যারা চাহিদার গোলকধাঁধা হতে সাহসিকতার সাথে নিজেকে বের করে আনতে পারে তারাই সত্যিকারের বীর। মানবতার উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে তারাই ধরনীকে করে তোলে আলোকোজ্বল ।সকলের অন্তরে ভালোবাসা আছে,মানবতা আছে, সহমর্মিতা আছে।কিন্তু অন্তরের এ গুণাবলীসমূহের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো কতজনের পক্ষেই বা সম্ভব!এ বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে প্রয়োজন হিম্মত বা সাহস।আধুনিকতা আর বিলাসিতা নামক রোগে আক্রান্ত হয়ে আজ এ গুণটি আমরা হারিয়ে ফেলতে বসেছি।ইদানিং তাই আমরা শুধুই ভালোবাসার কথা বলে যাই,কিন্তু ভালোবাসতে পারিনা।মানবতার কথা বলে যাই,কিন্তু মানবতা দেখাতে পারি না।দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা করি, কিন্তু এগিয়ে নিতে পারি না।
    স্বপ্ন দেখি, একদিন লক্ষকোটি সত্যিকারের বীরদের পদধ্বনিতে হারিয়ে যাবে অসহায় মায়ের কান্না,অসহায় বাবার নির্লিপ্ত চাহনি।সেইদিন হয়তো খুব বেশী দূরে নয়।

    3
    2 Comments
Skip to toolbar