-
একটি ব্রিটিশ যুগের উপকথা
সুরুজটা টপ কইরা হারায়া গেলো পাহাড়ের ভিত্রে। মগরেবের অক্তের খুনলাল রওশনি দেইখা মনে হয়- আসমানডা য্যান আমারেই গিল্লা খাইবার চায়। কব্বরের লাহান শীত নিয়া এই মাতোয়ালি হাওয়া আমারে ছিঁড়াখুঁইড়া ফেলতেসে। দূরে বরফে ছাওয়া গাছগুলান য্যান জান কবজ করতে খাড়ায়া আছে।
সামনে বিশাল এক জমুইন্না তালাব। তার একধারে কাইলচা সবুজ জঙ্গল।
সান্নিপাতিকের মতোন রুহের ভিত্রে কেমন একডা হাহাকার কইরা উঠলো। নাম। আমার নামডা য্যান কী?
শইলের ইঞ্চি ইঞ্চি ব্যাথা হৈয়া আছে ফিরিঙ্গি চৌকিদারগো ফাঁকি দিতে গিয়া। কিন্তু যার নামই নাইক্কা, তার শইলের কী? আমার ঘুড়াডাবি বেকুবের মতোন আমার দিকে চায়া আছে- য্যান কইবার চায়, “ওস্তাদ, থামলা ক্যালা?”
হারি সব্বোনাশ, উইডা কী?
ঘুড়া থিকা নাইমা, বরফের গুঁড়া সরাইতেই- নজরে পইড়লো এক ফিরিঙ্গি। হালায় মইরা শক্ত অইয়া আছে। গায়ে সাহেবগো লাহান লাল কোট। কইষ্যা একখান লাত্থি দিলাম। লড়ে না। ঘাঁডাঘাঁডি কইরা জঙ্গলের ধারে একখান ঘুড়াও পাইলাম। হেডাও মইরা শক্ত।
এহন সওয়ালডা হইলো, এই হালায় এইখানে, তালাবের বিচে মইরা শক্ত হৈয়া আছে কিল্লিগা?
আছি আফগানিস্তান-ইন্ডিয়া বর্ডারের ধারে। কুন আল্লাহর বান্দার এত্তো হিম্মত, বর্ডারের এত্তো কাছে ফিরিঙ্গি ফৌজদারের লাশ ফালায়া দিতে পারে?
নাহ, খাড়ায়া থাকলে চলবো না। ঘুড়াডার লাগাম ধইরা টান দিলাম। ব্যাটাবি আমার লগে হাঁটা ধরলো। নূরবক্স বড়ই জিম্মাদার ঘুড়া। কাজকাম দেখলে মনে অয়- আমি না, হেই আমারে পাহারা দিতেসে।
আন্ধার ঘনায়া আইতাসে। হুশ… হুশ… হুশ…
কে?
কোটের ভিত্রে একখান ম্যাচবাত্তি (পিস্তল) আছিলো। শক্ত কইরা চাইপা ধরলাম। হাতের মোঘল যুলফিক্বারডা বাগায়া ধরলাম। আগায়া যাইতে থাকলাম।
আচানক মনে হইলো, আন্ধারের মইদ্যে কীসব যেন লড়তেছে। আওয়াজের ঝিনঝিনানিতে বেহুঁশ হওনের দশা। নূরবক্স আচানক চিক্কুর মাইরা, উল্টা দৌড় পারলো। কিছু বুইঝা উঠনের আগে, লাগাম ছিঁড়া হালায় পগারপার। ঠিক তহনই…
আলিফ লায়লার জ্বিনের লাহান পালে পালে আমারে ঘিরা ফালাইলো একপাল জানোয়ার। সবডি দুই ঠ্যাঙে হাঁটতাসে। আমার দিকে কেমুন কইরা চায়া থাকলো। তারপর ঝাঁপায়া পড়লো।
টাশশ… টাশশ… টাশশ…
আচমকা বন্দুকের গুলির আওয়াজে দুনিয়াদারি কাঁপায়া, হাজির হইলো এক ঘোড়সওয়ার। সেই আওয়াজে ভাইগা গেলো জানোয়ারের দল। চান্দের আলোয় বুঝা পারলাম, এডি জানোয়ার না- মানুষ।
ঘোড়সওয়ার ঘোড়ারথে নামলো আর আমার দিকে আগায়া আইলো। গায়ে ব্রিটিশ সালতানাতের উর্দি, মনে লয় বড় কুনো অফিসার। আমার দিকে ম্যাচবাত্তি তাগ কইরা কইলো, “হোয়াট আর ইউ ডুয়িং হিয়ার? ইধার কিয়া কারতা?”
আমি সেলাম দিয়া কইলাম, “সেলাম সায়েব! মুসাফির আদমি।”
“মুসাফির? কাম উইথ মি। মেরে সাথ আও! আই অ্যাম কর্নেল ফ্রেজার্স, হিয়ার অন অফিসিয়াল বিজনেস অন বিহাফ অফ হার ম্যাজেস্টি। লজিং মিলেগা- লেকিন সিরেফ এক রাতকা।”
“শুকরিয়া, কর্নেল সায়েব।”
তার পিছেই হাঁটা ধরলাম। কোনদিকে যাইতাসি, খোদা জানেন। কিন্তু এই সায়েবের চেহারা কেমুন যানি… নাহ ভুল ভাবতাসি! আমি তো ওরে আগে দেখিই নাই! আর দ্যাখলেও কী? আমার তো কুছবি মনে নাই!
আচমকা বরফের মইদ্যে মাথা ঘুইরা পইড়া গেলাম। জ্ঞান ফিরলে, দ্যাখলাম একডা জেলমতুন জাগায় বইসা আছি। গায়ের জামাটামা সব খুইল্লা নিসে- লগে অস্ত্রপাতিও গেছে।
চোখ পিটপিট করিয়া দ্যাখলাম, কর্নেল সাব শকুনের মতো চাইয়া আছেন। তার পাশে একটা ইয়াব্বড় কিসের জানি কল। বড় আজিব কল। হারিকেনের মতো কাঁচের একখান ঢাকনাবি আছে। হের মইদ্যে কিসব জানি চরকিপাক খাইতেছে… নাম?… আমার নাম?… কিন্তু আমার নাম এইহানে ক্যান?…
“ব্যাক টু ইয়োর সেন্সেস, এঁহ? লুকিং ফর ইউর নেইম? ব্লাডি স্কাউন্ড্রেল! আমরা তোমাদিগকে সভ্য করিয়াছি! পশুরও অধম আছিলে তুমি! ভাবিয়াছিলুম, স্মৃতি মুছিয়া দিলে তোমাকে মনুষ্য করিতে পারিবো! কিন্তু ঈশ্বর বোধকরি তোমাকে অমানুষই রাখিতে ইচ্ছা করেন! এই বরফের রাজ্যে, মৃত্যুর মাঝে আসিয়া পশুর মতো কিলবিল করিতেছে তোমার স্বজাতিদিগ! আমরা, শ্বেতবর্ণ সাধু-আত্মাগণ, কতো ক্লেশ করিয়া সভ্যতাকে বহন করিয়া আসিতেছি- যেমতি অ্যাটলাস পৃথিবীর ভার বহিতেছে! আহা! মহর্ষি কিপলিং তাঁহার কবিতায় কি নামই না দিয়াছেন! হোয়াইট ম্যান’স বার্ডেন! ইট ট্রুলি ইজ উইথ ইউ ফিলথি মংগ্রেলস!”
কর্নেল সায়েবের মুখ দিয়া য্যান বিষ ঝরতিসে।
“আমি এখেনে ক্যান, সায়েব? আপনে কি আমারে চেনেন?”
“অফ কোর্স আই ডু! আই হ্যাড দ্য ডিসপ্লেজার অব রিমেকিং ইয়োর ফিলথি এক্সিস্টেন্স! তোমার নাম মুছিয়া, তোমাকে সভ্য করিবার প্রচেষ্টা করিয়াছিলুম! কিন্তু দেখিতেছি, তোমার ন্যায় পশুর কপালে মৃত্যুর অধিক পুরষ্কার নাই! যাহারা তোমাকে ঝিলের ধারে ঘিরিয়া ধরিয়াছিলো- তাহাদেরও, তোমারই মতোন স্মৃতি মুছিয়া মনুষ্য করিবার চেষ্টা করিয়াছিলুম। কিন্তু তোমরা মনুষ্যেতর!” বলে সায়েব থামলেন। তারপর সেই আজব কোহকাফি কলের হাতলে চাপ দিলেন।
জেলের উপ্রে একটা সফেদ আলো জ্বইলা উঠলো। সেই আলোতে য্যান আবার ঢাকায় ফির্যা গেলাম- আহা! আমার ঢাকা!… উইডা কে? আরে! আমিই তো! আর উইডা… আব্বাজান?
মির্জা মোতাহার আখন্দ, আমার বাপ… আমারে লেবেনচুষ কিন্যা দিতেসে! আমি… মির্জা আতাহার আখন্দ… জ্বিনের লাহান ফাল পারতেসি! আহা! কতো… উইডা কি?
দেইখা মনে হইলো- কোনো জঙ্গের ময়দানে আইসা পড়ছি! দুইধারে মাইনসে সার ধইরা খারায়া কি জানি তামশা দ্যাখতাছে! দ্যাখলাম, কয়েকজন ফিরিঙ্গি সৈন্য কারে জানি বাইন্ধা নিয়া যাইতাসে! চিনা চিনা লাগে… ও খোদা! এ দেহি নবাব সিরাজুদ্দৌলা! মাগার আমি সতেরোশ সাতান্নতে আইলাম কেমনে?
মাথাডা য্যান ছিঁড়া যাইবো! দপদপ দপদপ করতাছে!
আবার সব সফেদ হইয়া গেছে… কে জানি কইতাছে… মুসাফির… ফিরতে হইবো… তুমি ওয়াদা করসিলা… ফ্রেজার্সের মুণ্ডুটা লগে লয়া আইবা… তুমি কইসিলা… বেনামিরে নাম ফিরত দিবা… তুমি কইসিলা… ইয়াদ রাইখো আমজাদরে… কলিমরে… বখত খাঁরে… জমাদার রইসদ্দিরে… ইনাম মিয়ারে… জব্বার শেখরে… পেয়ার আলি তরফদাররে…
এমন কইরা এক কুড়ি নাম খালি কইয়া যাইতে থাকলো। কেউ ফকির বিদ্রোহে মরসে। কেউ নীলচাষী আছিলো। কেউ সেপাই বিদ্রোহে মরসে। কত্তো কত্তো নাম! আচানক মাথাডা হালকা হইয়া গেলো! য্যান ফানা হইয়া গেসি। আমি মির্জা আতাহার আখন্দ… আর বেনামা না!
শক্ত হাতে জেলের গরাদগুলা চাইপা ধরলাম! টাইনা ভাইঙ্গা ফালাইলাম দরোজাখান- য্যান উইডা উঁইয়ে-কাটা কাগজ। তারপর বেমক্কা ফ্রেজার্স সায়েবের ঘেঁডিতে সওয়ার হইলাম। সায়েব কিছু বুইঝা উঠনের আগেই ঘুষাইয়া তার নাকশা ভাইঙ্গা ফালাইলাম, কবজি মুচড়ায়া হাত দুইখান ভাইঙ্গা ফালাইলাম।
সায়েবের গোঙ্গানিতে কান না দিয়া, তার ব্যাগডা ঘাঁটলাম। বাইর হইয়া আইলো একতাড়া কাগজ… আমার সামনের আজব কলডার নকশা! ইংরিজি হরফে লেখা। এইডা… এইডা… মাইনসের নাম মুইছা ফ্যালে… তারে ব্রিটিশগো গোলাম বানায়া ফ্যালে…
আমার জামাকাপড়ও খুঁইজা পাইলাম- লগে অস্ত্রপাতিও। জামাকাপড় পইরা, ম্যাচবাত্তিডা দিয়া একখান নিশানা লাগাইলাম কলডায়- হেইটার সবুজ আলোডা বরাবর।
টাশশ… টাশশ… টাশশ…
তিনখান গুলির মাইরে, চুরচুর হয়া গেলো সবুজ আলোডা… আর সেই হারিকেনের ঢাকনির মতোন জিনিসডা! যুলফিক্বার আর ম্যাচবাত্তি বাগায়া বাইর হইয়া আইলাম, ফিরিঙ্গি সেপাইগো ফাঁকি দিয়া, কিল্লার ঘুলঘুলি দিয়া বাইর হইয়া আসলাম। একখান দড়ি পাইসিলাম ফ্রেজার্স সায়েবের কয়েদখানায়- সেইডা শক্ত কইরা পেঁচাইলাম দেয়ালে আর তরতর কইরা গিরগিটির লাহান দেয়াল বাইয়া নাইমা গেলাম।
বাইর হইয়া দ্যাখলাম- ঐ দুপাইয়া জানোয়ারের দল এখনতারি দরজা ধাক্কাইতাসে। ওগোর দিকে চাইতেই, একে একে হগলের নাম ইয়াদ হইলো। এক এক কইরা সবার নাম ধইরা ডাক দিলাম। সবাই পয়লা ভড়কায়া গেলো- কিন্তু আমি ডাকাডাকি থামাইলাম না। এক এক কইরা তারা সাড়া দিলো।
হগলরে নিয়া কেল্লাডা মাডিতে মিশায়া দিলাম। ফিরিঙ্গি সেপাইগোরে মাইরা, লাম্বা লাম্বা গাছগুলায় ঝুলায়া দিলাম। মাথাডা হালকা লাগতেসে- য্যান আর কোনও ভার নাই। এহন খালি সামনে আগায়া যাইতে হইবো!
দলবল নিয়া যহন ফিরতেসি- হেই যমুইন্না তালাবের পাশে হেই জঙ্গলের ধারে থামলাম। জঙ্গলডারে আর আজদাহার লাহান মনে হইলো না- মনে হইলো বিলাইয়ের মতোন ওমে ঘুমাইতাসে। আমরা হগলডি খামোশ খারায়া দ্যাখবার লাগলাম।
আচানক পেয়ার আলি তরফদার, য্যায় আবার সেপাই বিদ্রোহে গেসিলো- বিড়বিড় কইরা কইতে থাকলো, “যাওন লাগবো দূরের রাহা নিদ যাওনের আগে, যাওন লাগবো দূরের রাহা নিদ যাওনের আগে…”
কইলজা চির্যা একখান শ্বাস উঠলো। হ, যাওন লাগবো দূরের রাহা নিদ যাওনের আগে… এক একডা ফিরিঙ্গির কইলজা দাঁতে টান দিয়া ছিঁড়ুম…
আমাগো দলডা সফেদ হাওয়ার চাদর ছিঁড়া আগাইতে থাকলো…ইমরাউল কায়েস
8 Comments -
Friends
মোঃ রাকিবুল হাসান
@rakibwriter
মোঃ জাহিদুল ইসলাম জীবন
@jibon
apu azad
@apuazad
নুসরাত শাইরিন কন্ঠি
@rafinrahnin
মোঃ মাজহারুল ইসলাম
@majharulislam1842003gmail-com
Rafi Shams
@rafishams
MD IKRAMUL HASSAN
@md-ikramul-hassan
rukaiya rakhi
@rukaiyarakhi
Syed Farah
@syedfarah



সুরুজটা টপ কইরা হারায়া গেলো পাহাড়ের ভিত্রে।