Profile Photo

AlockOffline

  • alock
  • Profile picture of Alock

    Alock

    2 weeks, 4 days ago

    “শৈলীর প্রেমের আত্মকাহিনী”

    ✍️ পর্ব নয় : ( কলেজের কোন্দল )
    শৈলী তখন নবম শ্রেণির কিশোরী, আর রবিন সদ্য কলেজে পা রাখা ইন্টারমিডিয়েটের প্রথম বর্ষের ছাত্র। পড়াশোনার ক্রমবর্ধমান চাপ, দুটো ভিন্ন ক্যাম্পাস—সবকিছুর ব্যস্ততার মাঝেও তাদের ভালোবাসার নদীটি নীরবে, অবাধ্য গতিতে আপন মোহনায় ছুটে চলছিল। সময় তার নিজস্ব নিয়মে বয়ে যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের মনের গভীরে বেঁধে রাখা সেই অদৃশ্য রেশমি সুতোটা একচুলও আলগা হয়নি।

    তবে এই নিস্তরঙ্গ ভালোবাসার পথটা যে এতটা কণ্টকাকীর্ণ হয়ে উঠবে, তা কে জানত! একদিন হঠাৎ করেই শৈলীর কানে এমন এক খবর এল, যা তার পায়ের তলার মাটি কাঁপিয়ে দিল। কলেজের ত্রাস হাঞ্জা নাকি রবিনকে নির্মমভাবে মারধর করার জন্য বাইরে থেকে লোক ভাড়া করেছে। খবরটা শোনা মাত্রই শৈলীর বুকের ভেতরটা চড়কগাছের মতো ঘুরতে লাগল। সে আর এক মুহূর্তও দ্বিধা করল না। কাউকে কিছু না জানিয়ে, পরম বিশ্বস্ত বান্ধবী ফিয়ানাকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়েই ছুটে গেল নীরাদের বাড়ির দিকে—যেকোনো মূল্যে রবিনকে এই আসন্ন বিপদ থেকে সতর্ক করতেই হবে।

    ঠিক সেই মুহূর্তে রবিন তার সাইকেলটা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। দূর থেকে নীরা তাকে দেখেই প্রায় চিৎকার করে ডাকল, “এই রবিন, এদিকে আয়! জলদি আয়, খুব জরুরি কথা আছে।”

    রবিন কিছুটা অবাক হলো। সাইকেলটা স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে সে নীরাদের উঠোনে পা রাখল। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা শৈলী আর ফিয়ানাকে দেখে তার বিস্ময় আরও বাড়ল। বিশেষ করে শৈলীর ফ্যাকাশে মুখ আর চোখের কোণে জমে থাকা স্পষ্ট ভয়ের ছাপ দেখে রবিনের বুকের ভেতরটা খটকা লাগল।

    “কী হয়েছে শৈলী? এমন সময়ে তোমরা এখানে? কোনো সমস্যা?” — রবিন কিছুটা উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল।

    শৈলী বুক ভরে একটা শ্বাস নিয়ে, কাঁপানো গলায় একশ্বাসে বলে উঠল, “শোন রবিন, ওই শয়তান হাঞ্জা তোমাকে কাল কলেজে মারার জন্য গুন্ডা ঠিক করেছে। আমি খবরটা পাওয়া মাত্রই আর ঘরে থাকতে পারলাম না। দোহাই তোমার, কাল তুমি কলেজে যেয়ো না!”

    রবিন কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত গলায় বলল, “ঠিক আছে শৈলী, আমি বিষয়টা দেখছি। তোমরা এখন বাড়ি যাও, সন্ধ্যা হয়ে আসছে। রাস্তায় একা থাকা ঠিক হবে না।”

    মুখে শান্ত ও নির্বিকার ভাব ধরে রাখলেও, রবিনের ভেতরে তখন চিন্তার ঝড় বইছে। হাঞ্জা যে কতটা নিচে নামতে পারে, তা সে ভালো করেই জানে। তাই বিষয়টিকে সে মোটেও হালকাভাবে নিল না। সেদিন রাতেই সে তার কলেজের বিশ্বস্ত বন্ধুদের এক জায়গায় ডেকে পুরো ঘটনাটা খুলে বলল। বন্ধুরা সে কথা শুনেই রাগে ফেটে পড়ল। সবাই একবাক্যে সিদ্ধান্ত নিল—পরদিন ক্লাস থাকুক আর না থাকুক, তারা সবাই সকাল সকাল কলেজে হাজির হবে এবং ছায়ার মতো রবিনের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।

    পরদিন কলেজের বাতাস যেন এক অদ্ভুত থমথমে ও চেনা উত্তেজনায় ভারী হয়ে ছিল। দোতলার বারান্দার এক কোণে বন্ধুদের শক্ত বেষ্টনীতে বসে ছিল রবিন। হঠাৎ করেই সেই স্তব্ধতা ভেঙে, হাতে একটা চকচকে হকিস্টিক নিয়ে ‘শাহিন’ নামে কলেজের এক পরিচিত ছেলে তাদের সামনে এসে রুখে দাঁড়াল। শাহিনের চোখ-মুখে তখন মারকুটে ভাব। সে গম্ভীর, কর্কশ গলায় জিজ্ঞেস করল, “অরুনকে খুঁজছি। তোরা কেউ চিনিস ওরে?”

    রবিনের বন্ধুরা একে অপরের দিকে তাকাল। রবিনকে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা ছদ্মনামে ‘অরুন’ বলেও ডাকত, যা বাইরের অনেকেই জানত না। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এক বন্ধু চেয়ার ছেড়ে উঠে একটু এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন ভাই? ওরে দিয়া কী কাম আপনার?”

    শাহিন হাতের হকিস্টিকে আলতো করে হাত বোলাতে বোলাতে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “ওকে একটু ভালোমতো শিক্ষা দিতে হবে। আমার এক বড় ভাইয়ের পছন্দের তালিকায় নাকি হাত দিয়েছে ও। বড্ড বাড় বেড়েছে ছোঁড়ার!”

    “তা তোর সেই বড় ভাইয়ের নামটা কী জানা যাবে?” — অন্য এক বন্ধু শান্ত গলায় প্রশ্ন করল।

    “হাঞ্জা।”

    নামটা উচ্চারণ হওয়া মাত্রই বারান্দার পরিবেশ মুহূর্তের মধ্যে বরফের মতো জমে গেল। তবে রবিনের বন্ধুরা ভয় পাওয়ার বদলে একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। এবার এক বন্ধু শাহিনের ঠিক মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল। তার কাঁধে হাত রেখে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু ধারালো গলায় বলল, “শাহিন, তুই যার খাতা দেখে ১ম সেশনের পরীক্ষাটা পাস করেছিলি, তোর ঠিক সামনে বসা যে ছেলেটা তোকে প্রতিটা উত্তরের জন্য সাহায্য করেছিল—সে-ই অরুন। আর ওর আসল নাম রবিন।”

    শাহিন যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে কিছুক্ষণ পাথরের মতো স্থির হয়ে রবিনের দিকে তাকিয়ে রইল। রবিনের মুখের দিকে তাকাতেই পুরোনো সেই পরীক্ষার হলের স্মৃতি, রবিনের সেই নিঃস্বার্থ সাহায্যের কথা তড়িৎবেগে তার মনে পড়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে যেন জাদুর মতো সবকিছু বদলে গেল। শাহিনের ভেতরের সমস্ত রাগ আর হিংস্রতা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে হাতের হকিস্টিকটা একপাশে ছুড়ে ফেলে দিয়ে, দু-পা এগিয়ে এসে রবিনকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল।

    “তুই-ই অরুন! ধুর ব্যাটা, বন্ধু আগে বলবি না!” — শাহিনের কণ্ঠে তখন আর কোনো হুমকি ছিল না, বরং সেখানে উপচে পড়ছিল পুরোনো বন্ধুত্বের উষ্ণতা আর কৃতজ্ঞতা।

    এদিকে দূরে দাঁড়িয়ে হাঞ্জা আর তার প্রধান সহযোগী মোয়াইজ অধীর আগ্রহে সব দেখছিল। তাদের হাতে ছিল একটা বড় মিষ্টির বাক্স—পরিকল্পনা ছিল রবিন মার খাওয়ার পর তারা দলবল নিয়ে মিষ্টি মুখ করে উদযাপন করবে। কিন্তু চোখের পলকে পাশার দান এভাবে উল্টে যাবে, তা তারা স্বপ্নেও ভাবেনি।

    শাহিন রবিনকে ছেড়ে সোজা হাঞ্জাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তাদের মিষ্টির বাক্সের দিকে তাকিয়ে আঙুল উঁচিয়ে বজ্রকণ্ঠে বলল, “আমি অরুন বা রবিন—কাউকেই ছোঁব না। ও আমার বন্ধু, অত্যন্ত ভালো এবং মেধাবী একটা ছেলে। যদি পারেন, নিজের সম্মানটুকু থাকতে থাকতে ওর রাস্তা থেকে আপনারা সরে দাঁড়ান। অন্যথায় এর ফল ভালো হবে না।”

    পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এল। কোনো বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ছাড়াই সেদিনের মতো মেঘ কেটে রোদ হাসল। এরপর থেকে হাঞ্জা আর কখনো সরাসরি রবিনকে হুমকি দেওয়ার বা তার সামনে দাঁড়ানোর সাহস পায়নি।

    তবে কলেজে হেরে গেলেও, শৈলীকে ঘিরে হাঞ্জা তার পারিবারিক কূটচাল ও ষড়যন্ত্র থামাল না। সে বিভিন্নভাবে, শৈলীর ভাইদের কান ভাঙানি দিয়ে ও মিথ্যা রটিয়ে তার চলাফেরায় অদৃশ্য এক দেয়াল তুলে দিল। কোনো পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানে শৈলী একটু সাজগোজ করে বের হতে গেলেও তার ভাইয়েরা কড়া চোখে তাকাত, বিনা কারণে বাধা দিত।

    কিন্তু এসব সংকীর্ণতা আর মানসিক নির্যাতন শৈলীকে দমাতে পারেনি। বরং এই প্রতিকূলতাগুলো তাকে ভেতর থেকে ইস্পাতের মতো শক্ত করে তুলেছিল। ভীরু নবম শ্রেণির সেই মেয়েটি ধীরে ধীরে এক সাহসী ও আত্মপ্রত্যয়ী নারীতে রূপান্তরিত হচ্ছিল। ওদিকে রবিনও দিন দিন হয়ে উঠছিল আরও পরিণত, আরও দায়িত্বশীল।

    চারপাশের সমস্ত বাধা, ভয় আর পারিবারিক চাপের দমবন্ধ করা পরিবেশের মাঝেও তারা নিজেদের জন্য ঠিকই এক চিলতে ভালোবাসার আকাশ বের করে নিত। কখনো দূর থেকে এক ঝলক দেখা, কখনো কোনো উৎসবের ভিড়ে হঠাৎ চোখাচোখি, কিংবা মৃদু একটু মুচকি হাসি—এই ছোট ছোট অবাধ্য মুহূর্তগুলোই ডানা মেলে তাদের ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখছিল, এক বুক আশা নিয়ে আগামী দিনের সুন্দর সকালের অপেক্ষায়।

    গল্প চলমান… (পর্ব ১০ প্রস্তুত হচ্ছে )

    4
    2 Comments
Skip to toolbar