-
মায়ের পচা দেহের গন্ধ: গোটা সমাজ ব্যবস্থার পচনের সংকেত
………. স্বপন বিশ্বাস
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন কিছু হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে দেখা গেছে—একজন বৃদ্ধা মা কিংবা বাবা মৃত্যুর পর দিনের পর দিন ঘরের ভেতরে পড়ে আছেন, অথচ তাদের খোঁজ নিতে আসেনি আপনজনেরা। একসময় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবেশীরা জানতে পারেন মৃত্যুর খবর। এমন ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয়; এটি আমাদের সমাজ, শিক্ষা ও মূল্যবোধের গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। ভাবতে অবাক লাগে, যে মা সন্তানের মুখে একমুঠো খাবার তুলে দেওয়ার জন্য নিজের ক্ষুধাকে বিসর্জন দিয়েছেন, রাত জেগে সন্তানের জ্বর দেখেছেন, নিজের স্বপ্নগুলোকে হত্যা করে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়েছেন, সেই মায়ের মৃতদেহ যদি দিনের পর দিন অযত্নে পড়ে থাকে, তাহলে আমাদের সভ্যতার দাবি কতটা সত্য? আজ আমরা শিক্ষার হার বৃদ্ধি নিয়ে গর্ব করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারীর সংখ্যা বেড়েছে, প্রশাসন, চিকিৎসা, প্রকৌশল, ব্যবসা সকল ক্ষেত্রেই সাফল্যের গল্প শুনি। কিন্তু একটি প্রশ্ন ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে-আমরা কি শুধু শিক্ষিত হচ্ছি, নাকি সত্যিকার অর্থে মানুষও হচ্ছি?
সনদ মানুষকে চাকরি দিতে পারে, পদমর্যাদা দিতে পারে, অর্থ ও প্রভাব দিতে পারে; কিন্তু মানবিকতা শেখাতে পারে না। মানবিকতা শেখানো হয় পরিবারে, সমাজে এবং নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে। আজ সেই জায়গা গুলোই যেন ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে আমরা উচ্চশিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়তে দেখছি, কিন্তু মানবিক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে কি না, সে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
একসময় যৌথ পরিবার ছিল আমাদের সমাজের শক্তি। দাদা-দাদি, নানা-নানি, মা-বাবা, সন্তান, সবাই মিলে ছিল এক পারিবারিক বন্ধন। বৃদ্ধরা ছিলেন পরিবারের শ্রদ্ধার কেন্দ্রবিন্দু। আজ নগরায়ণ, ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবন ও ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রভাবে সেই বন্ধন অনেক ক্ষেত্রে আলগা হয়ে গেছে। বাবা-মা যেন অনেকের কাছে দায়িত্ব নয়, বরং বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন।প্রযুক্তির এই যুগে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুহূর্তে যোগাযোগ করা সম্ভব। কিন্তু অনেক সন্তান মাসের পর মাস মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় খুঁজে পায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো বন্ধুর খোঁজ রাখা হয়, অথচ নিজের জন্মদাত্রী মায়ের খবর নেওয়ার প্রয়োজন অনুভূত হয় না। এটি শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন ঘটনাগুলো এখন আর মানুষকে তেমন বিস্মিত করে না। সংবাদপত্রে খবর হয়, সামাজিক মাধ্যমে কিছুদিন আলোচনা হয়, তারপর সবাই ভুলে যায়। যেন এগুলো আমাদের সমাজের স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। এই স্বাভাবিকীকরণই সবচেয়ে ভয়ংকর। একজন মায়ের পচা দেহের গন্ধ আসলে একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজ ব্যবস্থার পচনের গন্ধ। এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, যেখানে পরীক্ষার নম্বর আছে কিন্তু নৈতিকতার মূল্যায়ন নেই। এটি আমাদের রাষ্ট্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, যেখানে প্রবীণ নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। এটি আমাদের সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, যেখানে মানুষ ক্রমশ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। তবে সব দায় শুধু সন্তানদের ওপর চাপিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় মানবিক ও নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব বাড়াতে হবে। পরিবারে ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের শেখাতে হবে—মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব কোনো দয়া নয়, এটি নৈতিক কর্তব্য। ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়েও পারিবারিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিবেশী সমাজকেও আরও সচেতন হতে হবে। একসময় গ্রামে-গঞ্জে কেউ অসুস্থ হলে কিংবা কয়েকদিন দেখা না গেলে প্রতিবেশীরা খোঁজ নিতেন। সেই সামাজিক বন্ধন পুনর্গঠন জরুরি। কারণ মানুষ একা নয়; সমাজের অংশ হিসেবেই তার অস্তিত্ব।
মনে রাখতে হবে, আমরা সবাই একদিন বৃদ্ধ হব। আজ যাকে অবহেলা করছি, কাল হয়তো সেই একই পরিণতি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। জীবনের শেষ সময়ে একজন মানুষ সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটি চান, তা হলো সন্তানের স্নেহ, ভালোবাসা ও উপস্থিতি। অর্থ, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক সম্মান তখন খুব বেশি মূল্য বহন করে না। তাই আজ সময় এসেছে নতুন করে প্রশ্ন করার। আমরা কেমন সমাজ গড়ছি? এমন সমাজ, যেখানে সাফল্যের শিখরে ওঠা সন্তান মায়ের মৃত্যুর খবরও রাখে না? নাকি এমন সমাজ, যেখানে মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসা এখনও মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়?
একজন মায়ের পচা দেহের গন্ধ আমাদের বিবেককে নাড়া দিক। আমাদের মনে করিয়ে দিক, মানুষ হওয়ার শিক্ষা ছাড়া অন্য সব শিক্ষা অসম্পূর্ণ। কারণ ইতিহাস কখনও শুধু বড় পদে থাকা মানুষের কথা মনে রাখে না; ইতিহাস মনে রাখে সেই মানুষদের, যারা তাদের মা-বাবার মুখে শেষ বয়সে একফোঁটা হাসি ফুটিয়ে দিতে পেরেছিলেন। মানবতার সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াই প্রকৃত শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ।
………2 Comments
Friends
ই.ত.মু আদিল
@ispahat
M Abdul Haque
@mabdulhaque
MD. Imjamul Hoque Bhuiyan
@dpimjam
মোঃ আরিফুল ইসলাম
@md-arifulislam
শ.ম.ওয়াহিদুজ্জামান
@sharifmuhammadwahiduzzaman
চিন্তাতরঙ্গিনী
@thoughtwaves
অনুভূতির ডাইরি
@onuvutir-dairi
Abdullah Jubair
@abdullahjubair
abrar
@abrar



“মায়ের পচা দেহের গন্ধ: গোটা সমাজ ব্যবস্থার পচনের সংকেত”
শিরোনামটাই বুকে একটা ধাক্কা দেয়। সার্টিফিকেট আর মানবিকতার মধ্যে যে ফারাকটা দিন দিন বাড়ছে, সেটা লেখক অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেছেন। আমরা ডিগ্রি নিচ্ছি, ক্যারিয়ার গড়ছি, কিন্তু “মানুষ” হওয়ার শিক্ষাটা কোথাও যেন হারিয়ে ফেলছি?