Profile Photo

মোঃ রুবায়েত রহমান রাফিOffline

  • দুই স্রোতের টান |(2)

    আমি রূপকথাকে পাষাণ বলি না—রূপকথা নিজেই নিজেকে পাষাণ করে রাখে ,সে এক অদ্ভুত নারী। রূপকথার চোখ আছে, তবু দেখে না আমার অন্তরের আরাধনা।

    কণ্ঠ আছে, তবু গায় না আমায় ঘিরে ভালোবাসার গীতবিতান।

    আমি তাকে ফুল দিই—সে ফুল ফিরিয়ে দেয় না, কিন্তু শুধু দেখিয়ে দেয় সেসব ফুল কেবলই মরবে। রূপকথা আমায় দেখায় এক অদ্ভুত দর্শন—ভালোবাসা মানে তপস্যা, আর তপস্যা মানে পাথর হয়ে বসে থাকা।

    সে আমায় শেখায়—যেখানে যন্ত্রণা নেই, প্রেম সেখানে পতঙ্গমাত্র।

    আমি যন্ত্রণা নিই, তবু পাষাণ হই না। কারণ জানি, পাষাণেরও গলনাঙ্ক আছে তবে সেটা আমার ভালোবাসার তাপে নয়, কারণ জানি, পাষাণেরও গলনাঙ্ক আছে—তবে সেটা আমার ভালোবাসার তাপে নয়, বাসন্তী নরম পায়রা হয়ে তুমি আমার সম্মুখে উড়ে বেড়াও;তাই একাকিত্ব এলেও আমি সম্পূর্ণ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠি না।

    অথচ বাসন্তী। ওর মন নরম। শিউলি ফুলের পাপড়ির মতো নরম। ও ক্ষমা করতে পারে।

    আমায় বোঝে আমার শুভচিন্তক কিন্তু তারপরও কেন আমি ওকে বুঝতে পারি না? কেন ও আমার চেনা থাকা সত্ত্বেও অচেনা থেকে যায়?

    আমি কেন যা চাই, তা পাই না? কেন যে নিজের জীবনকে রূপকথার পাতায় লিখতে চেয়েছিলাম, আজ আর তার উত্তর পাই না।

    কারণ আমি সেই বিচ্ছিরি যুগে বাঁচি—যেখানে পাষাণ ভালোবাসাকে মহিমা দেয় আর নরম ভালোবাসাকে তুচ্ছ করে।

    উত্তর নেই। শুধু এই স্বীকারোক্তি—আমি অসুস্থ।এই দ্বন্দ্বের নাম পুঁজিবাদ। পাষাণের রূপকথা এক বুর্জোয়া প্রেমের আদর্শ, যে আদর্শ মানুষকে পাথর বানায়।

    আর বাসন্তী এক প্রলেতারিয় মেয়ে, সে গুরুত্ব দেয়, যত্নে রাখে, অবহেলা করে না তবু মানুষ হয়ে থাকে। কিন্তু আমি তার প্রতি শ্রদ্ধার যে ঋণ ছিল, তা আমি শোধ করতে পারিনি।

    আর আমি মাঝরাতে জেগে থাকা শহরের শেষ বাতি।নিভে যাওয়ার আগে যে এখনও অন্ধকারের সঙ্গে কথা বলে।

    এই শহরে প্রেমও শ্রেণিবিভক্ত; কেউ পাষাণ হওয়ার অধিকার পায়, কেউ পায় দ্বন্দ্বের ভেতরেই ভালোবাসার জন্ম।” যাওয়ার নিয়তি।”

    হুমায়ুন ফরিদী বলেছিলেন— “তুমি যখন কাউকে ভালোবাসবে, এক বুক সমুদ্র নিয়ে তাকে ভালোবাসবে।

    তা নাহলে প্রেমের কোন অর্থ নাই।
    সেই সমুদ্রটাকে পাথরের কঠিন ঢেউ দিয়ে বাঁধতে নেই। তাকে খোলা রেখে দিতে হয়, বৃষ্টি নামুক আর নৌকা ভাসুক।

    আমি সেই খোলা সাগরের স্রোত হতেও পারি না, আবার বাঁধ হয়ে বসেও থাকতে পারি না।

    শুধু দাঁড়িয়ে আছি—বাসন্তী ও রূপকথার দুই তীরের মাঝে।

    এই দাঁড়িয়ে থাকাটাই আমার প্রেম, আমার পরিণত বোধ।আমি মরলে তোরা আমায় ভুলবি না রে
    আমার ভালোবাসা ছিল পাগলের মতো
    আর সেটাই ছিল আমার একমাত্র পরিচয়।

    হ্যাঁ,
    আমার পরিচয় এই—
    আমি চেনা বাসন্তীকে চিনতে চাইনি।
    আমি অচেনা রূপকথাকে বারবার ডেকেছি। এখন কে আমার কথা ভাবে?
    বাসন্তী ভাবে
    রূপকথা পাষাণ— ভাবেও না।
    আর আমি বসে আছি—
    দুটো হাতে ওদের দুজনের নাম লিখে
    মুছে ফেলছি নিজের নাম।

    এই আমার শেষ স্বীকারোক্তি।

    চেনা অচেনার মাঝে কেবল এই দোলাচলটুকুই বাকি।
    কেন? প্রশ্নটা আমার নিজের কাছেও ফিরে আসে বারবার।

    আমি ওকে চিনি বলেই কি ও অচেনা? নাকি চিনতে চাই না বলেই ও দূরে সরে যায়? আমি বাসন্তীকে দেখি চোখের সামনে হাঁটতে।

    আর পৃথিবী বদলে যায় সত্যি কিন্তু আমি সেই বদলটাকে চিনতে চাই না।

    কারণ রূপকথা আমায় শিখিয়েছে—যন্ত্রণা ছাড়া প্রেম অর্থহীন। আর বাসন্তী আমার যন্ত্রণা দেয় না, দেয় শুধু আরাম, দেয় হেসে ওঠার মতো চাঁদ।

    একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে, এই পথিকের কী কষ্ট, পথ আছে কিন্তু পা নেই।

    আমার পা আছে বাসন্তী পথ দেখিয়ে দিয়েছে—সহজ সরল ভালোবাসার পথ।

    কিন্তু আমি সেই পথে হাঁটতে চাই না আমি হাঁটতে চাই রূপকথার কাঁটার ওপর।

    যেখানে পা ফুটে রক্ত ঝরে, সেই রক্তকে বলে দিই—এই তো প্রেমের আসল রং।

    —বাসন্তীর অপেক্ষায় দিনরাত, বটবৃক্ষের পাতা ঝরে।
    কলমে: মোঃ রুবায়েত রহমান রাফি।

    3
    2 Comments
Skip to toolbar