-
এটা আমার শেষ নয়
পর্ব ২:কাঠের দেয়াল
সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। সময়ের মূল্য যারা বোঝে না, কিংবা যাদের আমরা গুরুত্ব দিই না, সময় তাদের আমাদের জীবন থেকে ছিনিয়ে নেয়—সে মানুষ হোক বা কোনো বস্তু।-আয়াজ রহমান
হঠাৎ কানে এলো একটানা ‘বিপ… বিপ… বিপ…’ শব্দ। আয়াজ ধীরস্থিরভাবে চোখ মেলে তাকাল। চারপাশটা ঝাপসা, তবে ধীরে ধীরে দৃশ্যপট স্পষ্ট হয়ে উঠল। বুঝতে পারল, আয়াজ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। জ্ঞান ফিরতে দেখে নার্স দ্রুত ডাক্তারকে ডেকে আনলেন। ডাক্তার এসে আয়াজের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলেন এবং নার্সকে নির্দেশ দিলেন, “তার পরিবারকে খবর দাও।”
ডাক্তার আয়াজ দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বললেন, “এখন কেমন বোধ করছেন মিস্টার আয়াজ? রিপোর্টাররা যা শুরু করেছে, সব জায়গায় এখন শুধু আপনার খবর। হাসপাতালের নিচতলা এখন রিপোর্টারদের ভিড়ে ঠাসা।”
ঠিক সেই মুহূর্তে আয়েশা কেবিনে ঢুকল। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, সে অনেক রাত থেকে ঘুমাতে পারেনি। চোখের নিচে কালি, অবিন্যস্ত চেহারা। ডাক্তার আয়েশাকে আশ্বস্ত করে বললেন, “চিন্তার কিছু নেই, মিস্টার আয়াজ এখন বিপদমুক্ত।”
আয়েশা আয়াজের নিকট এসে বসল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, “তোর যদি কিছু হয়ে যেত, তাহলে আমার কী হতো? একবারও কি আমার কথা চিন্তা করলি না?”
আয়াজ অতিকষ্টে হাতের ইশারায় অক্সিজেন মাস্কটা সামান্য সরিয়ে নিল। অস্ফুট স্বরে কিছু একটা বলতে চাইল। আয়েশা শোনার জন্য তার কান আয়াজের মুখের কাছে নিয়ে এল। আয়াজ দুর্বল কণ্ঠে বলল, “আমাকে কেন বাঁচালে?”
আয়েশা কেঁদে ফেলল, “এসব কেমন কথা? তুই শুধু আমার ভাই না, তুই আমার সন্তানসম! তানহার জন্য তুই মরতে গিয়েছিলি, কিন্তু একবারও কি আমার কথা ভাবলি না?
আয়াজের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।আয়াজ আবারও কিছু বলার চেষ্টা করল। আয়েশা আবারও তার কান এগিয়ে দিল।আয়াজ ফিসফিস করে বলল, “তুমি ঠিকই বলেছিলে আপু, যারা আমাদের যত্ন নেয়, তাদের যত্ন নেওয়া উচিত। যখন প্রায় মরেই যাচ্ছিলাম, তখন তোমার ওই কথাগুলোই বারবার আমার কানে বাজছিল।”
আয়েশা পরম মমতায় আয়াজের মাথায় হাত রাখল। আর্দ্র কণ্ঠে বলল, “বেশি কথা বলিস না, একটু বিশ্রাম নে। তোর বাড়ি থেকে যা যা প্রয়োজন, আমি সব নিয়ে আসবো।”
আয়েশা কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। এর কিছুক্ষণ পরেই আয়াজের সহকারী ঢুকল এবং আয়াজের দেখাশোনা করার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগল। আয়াজ নিজের ভাবনায় ডুবে গেল—অতীতের সেই মুহূর্তগুলো একের পর এক ভেসে উঠতে লাগল আয়াজের চোখের সামনে।
সাল ২০১৬। হাইস্কুলের বারান্দা, টিফিনের সময়ের কোলাহল। আয়াজ তখন স্কুল মাতানো এক নাম। ছ’ফুট লম্বা, সুদর্শন, আর ব্যক্তিত্বে এক শীতলতা—সব মিলিয়ে স্কুলের প্রতিটি মেয়ের ক্রাশ ছিল সে। কিন্তু আয়াজ ছিল প্রচণ্ড রকমের ইন্ট্রোভার্ট। নিজের জগতে থাকতেই সে বেশি পছন্দ করত।
তানহা সবসময় আয়াজের ছায়ার মতো লেগে থাকত। আয়াজের প্রতি তানহার এই অতিরিক্ত যত্ন আর আসক্তি স্কুলের অন্য মেয়েদের চক্ষুশূল ছিল। মেয়েরা প্রায়ই তানহাকে ঘিরে ধরে খোঁচা দিত। একজন জিজ্ঞেস করল, “তানহা, আয়াজ কি তোর বয়ফ্রেন্ড? ও তো তোকে পাত্তাই দেয় না!”
তানহা এক মুহূর্তের জন্য দমে না গিয়ে মাথা উঁচু করে জবাব দিল, “আয়াজ আমাকে পাত্তা দিক বা না দিক, ও আমার সাথে যতটা কথা বলে, তোদের দিকে তো চোখ তুলেও তাকায় না।”
অন্য এক মেয়ে বিদ্রুপ করে বলল, “ওর চামচামি করিস না তো,
তানহা নির্বিকার, “চামচামি করলে করেছি, তাতে তোদের কী?”
তানহা নিজে ছিল প্রচণ্ড রূপবতী। তার চেহারায় এক ধরনের মায়া ছিল, যা খুব কম মানুষের থাকে।”তানহা ছিল ফরসা এবং মাঝারি হাইটের।”
স্কুলের অনেক ছেলেই তাকে পছন্দ করত, কিন্তু তানহা আয়াজের পেছনে এভাবে পড়ে থাকত যে সবাই বুঝে নিত তার মনে শুধু আয়াজই আছে। তাই কেউ তাকে আর প্রস্তাব দেওয়ার সাহস করত না।
স্কুল ছুটির পর। আয়াজ স্কুলের গেট দিয়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। তানহা তার পিছু পিছু হাঁটছিল। তানহা আয়াজকে ডাকল, “আয়াজ, শোন! চল, একসাথেই বাড়ি যাই।”
আয়াজ না থেমে, গম্ভীর গলায় বলল, “আমার কাজ আছে। আমি এখন বাড়ি যাচ্ছি না।”
তানহা নাছোড়বান্দা, “কী কাজ? আমি কি সাথে যেতে পারি না?”
“না।”—এক কথায় উত্তর দিয়ে আয়াজ দ্রুত ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।
সবকিছু আড়াল থেকে দেখছিল ঐশী। সে তানহার এই পাগলামি দেখে তানহা অবহেলা নিতে পারছিল না ।
“ঐশী শ্যামবর্ণ, লম্বা, আর তার নাক ছোট। সে কিউট ,মাথার চুল ছোট রাখতে পছন্দ করে। তার ব্যক্তিত্ব খুবই ক্যারিশম্যাটিক।”
সে তানহার হাত ধরে বলল, “চল, কোথাও বসি। তোর সাথে খুব জরুরি কিছু কথা আছে।”
তানহা ইতস্তত করে বলল, “আয়াজকে নিয়ে কিছু বলবি তো? তাহলে থাক, আমি শুনব না।”
ঐশীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে প্রশ্ন করল, “তোর জীবনে সবচেয়ে বেশি ইমপর্ট্যান্ট কে? আমি, নাকি আয়াজ?”
তানহা মৃদু হেসে শান্ত গলায় বলল, “এ কেমন কথা? তোরা দুজনেই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, আর আয়াজকে আমি ভালোবাসি।”
ঐশী আরও রেগে চিৎকার করে উঠল, “তুই যেকোনো একজনকে বেছে নে।”
তানহা অবাক হয়ে তাকাল, “তোরা দুজনেই আমার খুব কাছের, কাউকে আলাদা করতে পারব না।”
ঐশী এবার তিক্ত সত্যটা সামনে আনল, “একটু লজিক দিয়ে ভাব তো তানহা! আয়াজ তোকে পাত্তাও দেয় না, বরং সবসময় অপমান করে। তুই কেন নিজের আত্মসম্মান এভাবে নষ্ট করছিস? কত ভালো ভালো ছেলে তোকে পছন্দ করে, যারা তোকে যোগ্য সম্মান দেবে। তাদের কথা একবারও ভেবেছিস?”
এতদিন ঐশী খুব হাসি-খুশি ছিল, আজ তাকে এতটা রাগী দেখে তানহা ভয় পেয়ে গেল। ঐশী আবার চিৎকার করল, “কী হলো? চুপ করে আছিস কেন? কিছু বলছিস না কেন?”
তানহা কাঁপা গলায় বলল, “কিন্তু… ওই ছেলেগুলো তো আর আয়াজ হবে না।”
ঐশীর ধৈর্যের বাঁধ তখন প্রায় শেষ। সে বুঝতে পারল, তানহার সাথে এতক্ষণ ধরে যুক্তি দিয়ে কথা বলা মানে হলো ‘গরুর সামনে বিন বাজানো’। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিল। সে শীতল কণ্ঠে বলল, “আজকের পর থেকে তুই আমার আর বন্ধু না।”
ঐশী হনহন করে হাঁটতে শুরু করল। তানহা আতঙ্কিত হয়ে পেছনে ডাকতে লাগল, “প্লিজ ঐশী! এমন করিস না, আমার কথা শোন… ঐশী!”
তানহার আর্তনাদ ঐশীর কানে পৌঁছাল না। সে ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল, আর তানহা স্কুলের গেটে একা দাঁড়িয়ে রইল—একদিকে অপূর্ণ ভালোবাসা, অন্যদিকে পরম বন্ধুর অভিমান।
রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসে আছে আয়াজ। চারদিকে মানুষের কোলাহল, সবাই নিজ নিজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছোটাছুটি করছে। স্টেশনের অদূরে কিছু মেয়ে আয়াজের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফিসফিস করছে, “দেখ দেখ, কী সুদর্শন ছেলেটা!”
হঠাৎ পেছন থেকে কেউ একজন আয়াজের চোখ চেপে ধরল। আয়াজ মুচকি হাসল, সে জানে এটা আয়েশা। সে মূলত আয়েশাকে নিতেই স্টেশনে এসেছে। আয়েশাকে দেখে সে জড়িয়ে ধরল। তাকে আয়েশার সাথে দেখে সেই মেয়েগুলো সেখান থেকে চলে গেল, হয়তো ভেবেছে আয়েশা আয়াজের প্রেমিকা। ঠিক তখনই আয়াজ খেয়াল করল, পাশে দাঁড়ানো এক যুবক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে পর্যবেক্ষণ করছে।
আয়াজ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি? আপনাকে তো চিনতে পারছি না।”
আয়েশা হেসে উত্তর দিল, “তুই ভুলে গেছিস? ভুলে যাওয়ারই কথা। ও যখন বিদেশ চলে যায়, তখন তো তুই অনেক ছোট ছিলি।”
আয়াজ তবুও চিনতে পারল না। আয়েশা পরিচয় করিয়ে দিল, “ও তো তামিম, বড় খালামনির ছেলে।”
আয়াজ চমকে উঠে বলল, “ও আচ্ছা! সেই ভাইয়া, যে এখন বিখ্যাত ফটোগ্রাফার? আম্মু প্রায়ই তোমার কথা বলে। আট বছর আগে তোমাকে দেখেছিলাম। কেমন আছো ভাইয়া?”
তামিম হাসিমুখে বলল, “আমি ভালো আছি। আন্টির কথা খুব মনে পড়ছিল, তাই ভাবলাম ঘুরে আসি। কাজেকর্মে খুব ব্যস্ত থাকি তো, এখন একটু সময় পেলাম তাই চলে এলাম।”
পরে তারা তিনজন বাসায় ফিরল। ডিনারের সময় তামিম আয়েশার দিকে তাকিয়ে বলল, “আয়াজ তো দারুণ সুদর্শন হয়েছে। ও চাইলে এখন থেকেই প্রফেশনাল মডেলিং শুরু করতে পারে।”
আয়েশা একটু চিন্তিত হয়ে বলল, “আয়াজ তো এখনো হাইস্কুলে পড়ে। ভার্সিটিতে ভর্তির আগে এসব করলে পড়াশোনায় সমস্যা হতে পারে না?”
তামিম আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, “সমস্যা হবে না। ও শুধু উইকেন্ডে সময় দেবে। ক্যারিয়ারটা আগেভাগে শুরু করা সবসময়ই ভালো।”
আয়েশা কিছু বলতে যাবে, এমন সময় মিসেস রহমান (আয়াজের মা) যোগ করলেন, “তামিম ঠিকই বলেছে। আয়াজের এখন থেকেই ক্যারিয়ারের দিকে নজর দেওয়া উচিত। তামিম, তুমি যা ভালো মনে করো সেটাই করো।”
পরদিন সকালে চলে যাওয়ার সময় তামিম আয়াজের হাতে একটি কার্ড দিয়ে বলল, “উইকেন্ডে ক্যাপিটালে আমার অফিসে যাস। আমার অ্যাসিস্ট্যান্টকে এই কার্ডটা দিলেই হবে, তারপর আমরা ফটোশুট শুরু করব।”
আয়াজ দ্বিধা নিয়ে বলল, “আমি এখনো নিশ্চিত নই ভাইয়া, ভেবে জানাব।”
তামিম হেসে বলল, “আমি জানি তুই নিজের ভালোর জন্যই সিদ্ধান্ত নিবি। আর হ্যাঁ, মডেলিং করলে ভালো পেমেন্টও পাবি।” এই বলেই তামিম চলে গেল।
আয়াজ স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল, তখন তার মা বললেন, “স্কুল শেষ হওয়ার সাথে সাথে বাসায় চলে আসবি। তোদের সাথে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা আছে।” আয়াজ কোনো প্রশ্ন না করেই স্কুল ইউনিফর্ম পরে বেরিয়ে গেল।
স্কুলে
তানহা এসে ধরল, “আমি কাল থেকে তোকে কত কল করেছি! তুই কীভাবে আমাদের বন্ধুত্ব এভাবে নষ্ট করতে পারিস? তুই যদি আমাকে না বুঝিস, তাহলে কে বুঝবে?”
ঐশী বিরক্তি নিয়ে বলল, “কেন, আয়াজ আছে তো বোঝার জন্য!” এই বলেই ঐশী উল্টো দিকে গিয়ে বসল।
তানহার মনটা খারাপ হয়ে গেল। স্কুল শেষ করে সে সোজা বাসায় চলে এল। সে ভাবল, ঐশীকে মানানোর জন্য একটা কেক বানাবে। ঐশী কেক খুব পছন্দ করে। আর এই সুযোগে আয়াজকেও কিছুটা কেক দেবে, সেই বাহানায় তার সাথে কথা বলা যাবে। এই ভেবে তানহা রান্নাঘরে গিয়ে কেক বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
আয়াজের বাসার লিভিং রুমে চারজন বসে আছে—আয়াজ, আয়েশা, মিস্টার রহমান এবং মিসেস রহমান। নিস্তব্ধ ঘরটাতে এক চাপা উত্তেজনা।
মিস্টার রহমান গম্ভীর গলায় শুরু করলেন, “তোমাদের মা আর আমি একটা সিদ্ধান্তে এসেছি। আমরা আলাদা হয়ে যাচ্ছি। আমি বিদেশ চলে যাব। আয়াজ হাইস্কুল শেষ না করা পর্যন্ত ওর মা ওর সাথেই থাকবে।”
আয়েশা নির্বাক হয়ে বসে রইল। কিন্তু আয়াজ হঠাৎ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। সে হাততালি দিয়ে উঠল, যেন কোনো মজার নাটক দেখছে। সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
আয়াজ বলল, “তোমাদের আলাদা তো অনেক আগেই হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। আসলে তোমাদের বিয়েটাই করা উচিত হয়নি। তোমাদের সম্পর্কের কোনো বন্ডিং কি কোথাও আছে? কেউ কি বিশ্বাস করবে এটা লাভ ম্যারেজ ছিল?”
মিস্টার রহমান চিৎকার করে উঠলেন, “আয়াজ! তুই কি পাগল হয়ে গেছিস? কী সব উল্টোপাল্টা কথা বলছিস!”
আয়াজ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “সুস্থ ছিলাম কবে? তোমাদের মতো বাবা-মা যাদের থাকে, তারা কি আর সুস্থ থাকতে পারে?”
মিস্টার রহমান আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না, সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিলেন আয়াজের গালে। আয়াজের গালটা মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল, ঠোঁট ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ল। আয়েশা দৌড়ে যেতে চাইছিল ওকে আটকাতে, কিন্তু আয়াজ হাত তুলে বাধা দিল।
আয়াজ শান্ত কিন্তু হিমশীতল কণ্ঠে বলল, “আজ আমাকে বাধা দিও না আপু। এই স্বার্থপর মানুষগুলোর আসল চেহারা বের হতে দাও।”
মিস্টার রহমান ক্ষোভে কাঁপছিলেন, “স্বার্থপর? আমরা স্বার্থপর? তোদের এতো সুন্দর লাইফস্টাইল দিয়েছি, এতো টাকা খরচ করেছি—আর তুই বলছিস আমরা স্বার্থপর?”
আয়েশা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “ভাই, প্লিজ… আর কিছু বলিস না।”
আয়াজ বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আজ অন্তত সত্যিটা বলতে দাও বাবা। এতো কিছু দিয়েছো, শুধু ভালোবাসা আর যত্নটাই দিতে পারলে না। ছোটবেলা থেকে আমাদের ওপর কম অত্যাচার করোনি। সামান্য ভুলে অন্ধকার ঘরে বন্দি করে রেখেছো, খাবার বন্ধ করে দিয়েছো, পিটিয়েছো! বৃষ্টির রাতে বাইরে ছেড়ে দিয়েছো—এগুলো কি ভালোবাসা ছিল?”
মিস্টার রহমান রুক্ষ স্বরে বললেন, “ভুল করেছিস বলেই শাস্তি দিয়েছি!”
আয়াজ হাসল, তবে সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল বিষাদ। “এখনও তো ভুল করছি বাবা! কী শাস্তি দেবে বলো? আমি তো তোমার সেই শাস্তির জন্যই অপেক্ষায় আছি।”
সে তার মায়ের দিকে তাকাল, যে সবসময়কার মতো মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে আছে। “মা, তুমি আজও কিছু বললে না?”—বলতে বলতে আয়াজ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আয়েশা তখন কান্নায় ভেঙে পড়েছে।
অন্যদিকে, তানহা নিজের হাতে বানানো কেক নিয়ে সোজা চলে গেল ঐশীর বাসায়। ঐশী তখনও ভীষণ অভিমান করে বসে আছে, কোনো কথা বলছে না।
তানহা কেকের বক্সটা সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “দেখ, তোর জন্য কেক বানিয়ে এনেছি।”
ঐশী তাও চুপ। তানহা এবার কান্নায় ভেঙে পড়ল, “ঐশী, তুই ছাড়া আমাকে কে বুঝবে? বন্ধু বললে ভুল হবে, তুই তো আমার বোন। প্লিজ, আমার সাথে এমন করিস না।”
তানহাকে কাঁদতে দেখে ঐশীর মনটা নরম হয়ে এল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তোর কান্না দেখলে আমার খুব কষ্ট হয়। রাগ করে আছি বলে কি আর বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে গেছে? আমি জানতাম, আমি রাগ করলে তুই আমার জন্য কেক নিয়ে আসবিই।”
ঐশী মুচকি হাসল।
বাসায় ফিরে তানহা আয়াজের জন্য যত্ন করে কেকটা প্যাকেট করল। তার মনটা ছটফট করছিল আয়াজকে দেখার জন্য। সে যখন আয়াজের বাসার সামনে গিয়ে পৌঁছাল, দেখল আয়াজ ধীর পায়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে। সামনে যেতেই তানহা থমকে দাঁড়াল। আয়াজের চোখ দুটো অসম্ভব লাল, গালটাও ফুলে লাল হয়ে আছে, আর ঠোঁটটা একটুখানি কাটা।
তানহা আঁতকে উঠে তার কাছে দৌড়ে গেল, “আয়াজ! তোমার এটা কী হয়েছে? তোমার গাল আর ঠোঁট এমন কেন? কী হয়েছে তোমার?”
আয়াজ বিরক্ত স্বরে বলল, “আমাকে একা থাকতে দাও।”
তানহা সহজে দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে জেদ করে আয়াজের হাত চেপে ধরল। আয়াজ এবার চরম বিরক্তি নিয়ে ঝাড়ি দিল, “এই মেয়ে! তোমার আর কোনো কাজ নেই? সারাদিন আমার পিছু পিছু কেন ঘুর?”
আয়াজের ঝাড়ি শুনে তানহা হাত ছেড়ে দিল।
তানহা শান্ত গলায় বলল, “আমি তোমার বন্ধু, তাই তোমার যত্ন নেওয়াটা আমার দায়িত্ব।”
আয়াজ তিক্ত হাসল। কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল, “বন্ধু আছ, বন্ধুর মতো থাক! আমার এত যত্ন নেওয়ার দরকার নেই। কিছু হলেই যত্ন করতে চলে আসো ? আমার কারো যত্ন লাগবে না, তোমারও না!”
এই কথাগুলো বলতে বলতে আয়াজের চোখে পানি জমে উঠল।
তানহা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝল—
এই কথাগুলো রাগ থেকে না, কষ্ট থেকে বলা।
তানহা আবার তার হাত ধরে কিছু বলতে যাচ্ছিল—
কিন্তু আয়াজ হাত ছাড়ানোর জন্য তাকে ধাক্কা দিল।
তানহা ভারসাম্য রাখতে না পেরে পড়ে গেল।
তার এক হাতে থাকা ফোনটা মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল।
কেকটাও পড়ে গেল… সব নষ্ট হয়ে গেল।
আয়াজ সবকিছু দেখল—
কিন্তু কিছু না বলেই বাসার ভেতরে চলে গেল।
ভেতরে ঢুকে দরজাটা জোরে বন্ধ করে দিল।
দরজার সাথে হেলান দিয়ে নিচে বসে পড়ল।
দরজার ওপাশে—
তানহা ধীরে ধীরে উঠে দরজার সামনে এসে বসে পড়ল।
দরজায় হাত রেখে বলল—
তানহা (কাঁপা গলায়): আয়াজ… আমি তোমার কষ্ট বুঝি।
আমি শুধু তোমার খারাপ সময়ে তোমার পাশে থাকতে চাই।
আমি তোমাকে একা ছেড়ে দিতে পারি না…
দরজার এপাশে আয়াজ দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে। তানহার কথাগুলো তার হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধছে। সে নিজের হাতটা দরজার ওপর রাখল, ঠিক যেন তানহার হাতের বিপরীতে। দরজার এপাশে তানহা আর ওপাশে আয়াজ—মাঝখানে শুধু একটা কাঠের দেয়াল, কিন্তু দুজনেই একে অপরের উপস্থিতি অনুভব করছে। দরজার দুই পাশে বসে থাকা দুটি মানুষ নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলছে। মাঝখানের এই দূরত্বটুকু যেন কোনো অদৃশ্য দেয়াল, যা তারা চাইলেই ভাঙতে পারছে না।
(চলবে…)3 Comments
Friends
আজিজুর রহমান
@azizurrahman
Syed Farah
@syedfarah
সৈয়দ তানভীর আহমেদ তালহা
@syedtanvirahamedtalha
Munker Tarannum (Nirjor)
@munkertarannum
Kaoser Ahmed
@kaoserahmed
Nahida Khanam
@nahidakhanam
Puja Chakrabartty
@pujachakrabartty
Md Babul Hossain
@mdbabulhossain
Drako Shajib
@drako


অভিমানী বন্ধুর নীরব বিদায়….🖤