-
“এটা আমার শেষ নয়”
পর্ব-৩:স্তব্ধ শব্দের প্রতিধ্বনি
“শক্ত থাকার অভিনয়ে আমি নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছি…
কষ্টগুলোকে নীরবে গিলে ফেলেছি,
আর এখন বুঝি—
নীরব যন্ত্রণাই সবচেয়ে ভয়ংকর।”-আয়াজ রহমান
সকাল
আয়াজ দরজা খুলে বাইরে যেতেই সে থামল। নিচে তাকাতেই তার চোখে পড়ল একটি ছোট বক্স।
সে কৌতূহল নিয়ে বক্সটি হাতে তুলে খুলল। ভেতরে একটি কেক, আর একটি ছোট চিরকুট।
চিরকুটে লেখা—
“আমি সব সময় চাই, কেক যেমন মিষ্টি হয়, তোমার জীবনও ঠিক তেমনই মিষ্টিতে ভরে যাক।”
কেকটা দেখে মনে হচ্ছিল, যেন একদম এইমাত্র বেক করা হয়েছে।
আয়াজ একটু সামনে এগিয়ে যেতেই হঠাৎ তার চোখ পড়ল রাস্তায়—
গতকালকের কেকটা এখনো পড়ে আছে। তার পাশেই তানহার ফোন।
এক মুহূর্ত দেরি না করে আয়াজ দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ফোনটা তুলে নিল। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
— “পুরো একটা পাগল…” বিড়বিড় করে বলল সে।
স্কুলে—
ঐশী ভ্রু কুঁচকে তানহার দিকে তাকাল।
— “কিরে তানহা, তুই ঘুমাচ্ছিস কেন? আর একটু পরেই তো ক্লাস শুরু হবে!”
তানহা চোখ না খুলেই বলল,
— “আমাকে একটু ঘুমাতে দে, ঐশী… গতকাল সারারাত ঘুমাতে পারিনি।”
ঐশী অবাক হয়ে বলল,
— “কেন? সারারাত ঘুমাসনি কেন?”
তানহা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
মনে মনে ভাবল—
“ঐশীকে যদি বলি, আয়াজের জন্য চিন্তা করতে করতে আর কেক বানাতে গিয়ে সারারাত জেগেছি, তাহলে তো ও আমাকে মেরেই ফেলবে!”
— “কিরে? কিছু বলছিস না কেন?” আবার জিজ্ঞেস করল ঐশী।
তানহা দ্রুত সামলে নিয়ে বলল,
— “আরে, সামনে পরীক্ষা তো… তাই পড়াশোনা করছিলাম।”
ক্লাসে বসেও তানহার মন পড়ায় নেই।
তার মাথায় বারবার একটাই চিন্তা ঘুরছে—
“আয়াজ এখন কেমন আছে? কেকটা কি ওর পছন্দ হয়েছে?”
এদিকে—
আয়াজ তৃপ্তি নিয়ে তানহার বানানো কেক খাচ্ছে। মুখে অজান্তেই একটা হাসি লেগে আছে।
ঠিক তখনই আয়েশা এসে বলল,
— “কেকটা কি খুব মজার? তুই এত মজা করে খাচ্ছিস আর হাসছিস যে!”
আয়াজ হেসে বলল,
— “হুম, অনেক মজা।”
আয়েশা কেকের একটা টুকরো নিতে যেতেই আয়াজ দ্রুত প্লেটটা সরিয়ে নিল।
— “তোর এটা খাওয়া লাগবে না।”
— “কেন?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল আয়েশা ।
— “তুই তো ডায়েট করছিস। ডায়েট করলে চিনি খাওয়া নিষেধ।”
আয়েশা জেদ করে বলল,
— “জাস্ট একটা টুকরো দে!”
আয়াজ মুচকি হেসে বলল,
— “তোর ভাই হওয়ার সুবাদে আমি তোকে জিমে বাড়তি দুই ঘণ্টা কাটাতে দিতে পারি না।”
হঠাৎ আয়েশা থমকে গেল।
— “ওয়েট আ মিনিট! তুই আজ স্কুলে যাসনি কেন?”
আয়াজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
— “তোর সাথে ক্যাপিটালে যাব। তাই আজ আর স্কুলে যাইনি।”
আয়াজের জন্য দুশ্চিন্তা করতে করতে তানহা ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে ফিরছিল।
আজ আয়াজ স্কুলে আসেনি—কেন জানি তার মনটা একদমই ভালো নেই।
ভাবল, একটা কল করবে…
কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল—
ফোনটা তো ভেঙে পড়ে গিয়েছিল!
তবে অদ্ভুত ব্যাপার, আয়াজের টেনশনে সে ফোনের কথাটাই যেন ভুলে গিয়েছিল।
“তানহার ফোনটা তার বাবা দুই মাস আগে কিনে দিয়েছিল। এখন যদি বাবা জিজ্ঞেস করে, তখন সে কী বলবে?”
মনে হালকা একটা চাপা ভয় কাজ করছিল,
কিন্তু তার থেকেও বড় চিন্তা—
আয়াজ এখন কেমন আছে?
তানহারা প্রতিবেশী হলেও, তানহা খুব একটা আয়াজদের বাসায় যায় না।
কারণ—সে ওদের পরিবারের টক্সিসিটির কথা ভালো করেই জানে।
তবুও সে এমন ভাব করে যেন কিছুই জানে না।
শুধু একটা কারণেই—
আয়াজ যেন কোনোদিন লজ্জা না পায়।
চার দিন হয়ে গেছে আয়াজকে দেখেনি।
এই চার দিনেই তানহার অবস্থা একদম খারাপ হয়ে গেছে।
“একবার কি ওদের বাসায় যাওয়া উচিত?”—নিজের মনেই ভাবল সে।
জানালা দিয়ে আয়াজদের বাসার দিকে তাকিয়ে ছিল তানহা।
হঠাৎ করেই একটা ছোট বল এসে তাকে আঘাত করল।
— “কোন ফাজিল মারল এটা!” রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল সে।
নিচে তাকাতেই সে থমকে গেল—
রাস্তায় দাঁড়িয়ে আয়াজ, আর ইশারায় তাকে নিচে ডাকছে!
তানহার বুক ধক করে উঠল।
অবাক হওয়ার পাশাপাশি ভীষণ খুশি হয়ে গেল সে।
আয়াজ তো কোনোদিন এভাবে ডাকেনি!
নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না তানহা।
এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌড়ে নিচে নেমে গেল।
আয়াজ একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
— “কোথায় হারিয়ে ছিলে তুমি ? কতক্ষণ ধরে ডাকছি!”
তানহা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
— “কোথায় ছিলে এতদিন?”
— “ক্যাপিটালে গিয়েছিলাম।” শান্ত গলায় উত্তর দিল আয়াজ।
তানহার চোখে অভিমান ফুটে উঠল।
— “ক্যাপিটালে কী কাজ ছিল তোমার? তুমি জানো আমি কতটা টেনশন করছিলাম? একবার অন্তত বলে যেতে পারতে! আমি ঠিকমতো ঘুমাতেও পারিনি, খেতেও পারিনি… তোমার জন্য কতটা চিন্তা করেছি, তুমি জানো?”
তানহা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল—
হঠাৎ আয়াজ থামিয়ে দিল।
— “আচ্ছা, হয়েছে… আয়াজ একটু ভাব নিয়ে বলল আমি মডেলিং করতে গিয়েছিলাম।”
তানহা অবাক হয়ে বলল,
— “মডেলিং? কবে থেকে শুরু করলে? আর হঠাৎ কেন?”
আয়াজ একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
— “তুমি এত প্রশ্ন করো কেন? তোমার আর কিছু জানার দরকার নেই।”
এইটুকু বলেই সে তানহার হাতে একটা ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল।
বাসায় ফিরে তানহা ধীরে ধীরে ব্যাগটা খুলল।
ভেতরে দুটি বক্স।
প্রথম বক্সটা খুলতেই সে থমকে গেল—
একটি নতুন ফোন…
আর তার ভেতরে আগের সেই সিম কার্ড আর মেমোরি কার্ড লাগানো।
দ্বিতীয় বক্স খুলতেই দেখা গেল—
অনেকগুলো চকলেট।
তানহার চোখ ভিজে উঠল।
মুখে অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠল।
আয়াজের ওপর যত রাগ ছিল, সব এক মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
খুশি আর অনুভূতির মিশ্রণে
সে নীরবে কেঁদে ফেলল।
মডেলিংয়ের প্রথম অ্যাসাইনমেন্টটা আয়াজ দুই দিন আগেই করেছিল।
সেখান থেকেই সে ভালো পারিশ্রমিক পেয়েছিল।
তামিম খুশি হয়ে বলল,
— “খুব ভালো কাজ করেছিস আয়াজ। আগামী উইকেন্ডে নতুন প্রজেক্টের জন্য আবার আসিস।”
টাকা হাতে পেয়ে আয়াজের মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
দেরি না করে সে সরাসরি মার্কেটে চলে গেল তানহার জন্য একটি নতুন ফোন কিনতে।
বাসায় ফিরে সে খুব যত্ন করে তানহার পুরনো সিম কার্ড আর মেমোরি কার্ড নতুন ফোনে সেট করল।
গ্যালারি ওপেন করতেই তার চোখ থেমে গেল।
তানহার গ্যালারি জুড়ে শুধু তারই ছবি…
আয়াজ মৃদু হাসল।
আপনমনে বিড়বিড় করে বলল,
— “মেয়েটা সত্যিই আস্ত একটা পাগল…”
২০২৫ সাল
আয়েশা আয়াজের বাসায় এসেছে হাসপাতালের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিতে।
ওয়ারড্রোব খুলে কাপড় খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল একটি ডায়েরিতে।
কৌতূহল দমাতে না পেরে সে ডায়েরিটা হাতে নিল।
কভারের দিকে তাকাতেই সে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
তানহা আর আয়াজের ছোটবেলার একটি ছবি সেখানে লাগানো।
ধীরে ধীরে পাতাগুলো উল্টাতে লাগল আয়েশা ।
ভেতরে একের পর এক তানহার ছবি…
আয়াজ যেগুলো যত্ন করে রেখেছিল।
একটি ছবি ছিল সম্ভবত হাই স্কুলের।
ছবির নিচে লেখা ছিল—
“ছবিটা আমি ইচ্ছাকৃতভাবে তোমাকে না জানিয়েই তুলেছিলাম, তানহা। তোমাকে সেদিন ভীষণ সুন্দর লাগছিল… ছবিটা না তুলে পারলাম না।”
আয়েশা আরেকটি পাতা উল্টাল।
২০১৪ – বসন্তের দিন
সেদিন আমি সাইকেল নিয়ে বের হয়েছিলাম।
হঠাৎই চোখে পড়ল—তুমি সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলে।
আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ব্রেক চাপতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারালাম। মুহূর্তেই আমরা দুজনেই মাটিতে পড়ে গেলাম।
উঠে দাঁড়িয়ে তোমাকে কিছু বলতে যাব, ঠিক তখনই চারপাশের গাছগুলো যেন আরও জীবন্ত হয়ে উঠল—ফুলগুলো একে একে ঝরে পড়তে শুরু করল তোমার ওপর।
বসন্তের হালকা বাতাসে তোমার চুলগুলো মুখজুড়ে উড়ছিল।
তুমি ভয় মেশানো চোখে আমার দিকে তাকালে।
আর সেই এক মুহূর্তে, সূর্যের আলোয় তোমাকে এমন লাগছিল—যেন পৃথিবীর সব সৌন্দর্য একসাথে তোমার মাঝে এসে থেমে গেছে।
আমার বুকের ভেতর এক কাঁপন শুরু হলো।
হার্টবিট বেড়ে গেল, অথচ আশ্চর্যভাবে গরম না থাকা সত্ত্বেও আমি ঘেমে গিয়েছিলাম।
তুমি কিছু বলতে যাচ্ছিলে…
কিন্তু আমি কোনো উত্তর না দিয়ে, প্রায় তাড়াহুড়ো করেই সাইকেল নিয়ে চলে এলাম।
পিছনে রয়ে গেল তোমার কণ্ঠস্বর—
“আয়াজ, আমি সরি…”
আজও সেই শব্দটা কানে বাজে।
বাসায় ফিরে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলাম।
তখনই প্রথম বুঝেছিলাম—এই অনুভূতিটা সাধারণ কিছু নয়।
সেদিন সারাটা দিন শুধু তোমার কথাই ভেবেছিলাম, তানহা।
হাই স্কুলের প্রথম দিন
আজ আমাদের হাই স্কুলের প্রথম দিন।
নীল রঙের ইউনিফর্ম পরে তানহাকে যখন আমার দিকে দৌড়ে আসতে দেখলাম, মনে হলো চারপাশের সবকিছু যেন থমকে গেছে।
তানহাকে সেদিন অসম্ভব সুন্দর লাগছিল।
আমরা একই স্কুলে ভর্তি হয়েছি—এই আনন্দে আমি নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না।
কিছু না বলেই আমি ক্লাসরুমের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম, আর তানহা আমার পিছু পিছু আসছিল।
তানহার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে খুব ইচ্ছে করছিল…
কিন্তু সেই সংকোচ আমাকে থামিয়ে দিল।
ডায়েরির পরের পৃষ্ঠা:
আজ তানহা আমার জন্য পার্কে অপেক্ষা করছিল।
আমি পার্কে পৌঁছাতেই চোখ অচিরেই ওকে খুঁজে নিল।
দূরেই ওকে দেখতে পেলাম।
কিন্তু ওর কাছে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে দেখলাম—
একটা ছেলে ওকে প্রপোজ করছে।
দৃশ্যটা দেখেই ভেতরটা রাগে জ্বলে উঠল।
কিছু না ভেবেই আমি সেখান থেকে সোজা বাসায় ফিরে এলাম।
তানহা আমাকে বারবার কল করছিল…
আমি ফোন রিসিভ করিনি, এমনকি বন্ধও করে দিলাম।
তানহাকে অন্য কারো সাথে সহ্য করা আমার পক্ষে অসম্ভব।
রাগে আমার বুক ভার হয়ে আসছিল, কিন্তু কখনোই ওকে সেটা বুঝতে দিইনি।
ডায়েরির শেষ পাতা
তানহাকে আমি কোনোদিন আমার মনের কথা খুলে বলতে পারিনি।
ভয় হয়…
যদি বলি, আমাদের সম্পর্কটাও কি আমার বাবা-মায়ের সম্পর্কের মতো ভেঙে যাবে?
তানহা যখনই সামনে আসে, আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না…
তাই সবসময় ওকে ইগনোর করার চেষ্টা করি।
কিন্তু আজ মনে হচ্ছে… সব বলে দিই।
আমি বিশ্বাস করি, সে আমাকে ছেড়ে যাবে না।
কিন্তু সে যদি আমার বিশ্বাসটা ভেঙে ফেলে…
সবকিছু যখন ঠিকঠাক চলছিল… ঠিক তখনই আমার জীবনে কিছু একটা নড়েচড়ে উঠল।
শান্তিটা যেন হঠাৎই ভেঙে গেল—এক অদৃশ্য অশান্তির ছায়া পড়ে গেল আমার জীবনে।
আর সেই অশান্তির নাম—
এশান খান।
(চলবে…)3 Comments
Friends
আজিজুর রহমান
@azizurrahman
Syed Farah
@syedfarah
সৈয়দ তানভীর আহমেদ তালহা
@syedtanvirahamedtalha
Munker Tarannum (Nirjor)
@munkertarannum
Kaoser Ahmed
@kaoserahmed
Nahida Khanam
@nahidakhanam
Puja Chakrabartty
@pujachakrabartty
Md Babul Hossain
@mdbabulhossain
Drako Shajib
@drako


কষ্টগুলোকে নীরবে গিলে ফেলেছি,