Profile Photo

বিষণ্ন সুমনOffline

  • logolabbd
  • ক্ষুধার নিবৃত্তি

    মাঝ রাত্তিরে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল ময়নার। সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করলো। এখানে-ওখানে মারের চোটে চামড়া ফেটে কালসিটে পড়ে গেছে। ফাটা জায়গাগুলো খুব জ্বালা করছে। তারপরেও এই ব্যথা তাকে তেমন একটা কাবু করতে পারছে না। সেই ছোট বেলা থেকে এখন পর্যন্ত এই জীবনে কম মার তো খায়নি। তাই এসব এখন গা সওয়া হয়ে গেছে। তার জন্মের চার বছরের মাথায় যখন মা মারা গেল, তখন থেকেই তার মার খাওয়া শুরু।

    মাস ঘুরতে না ঘুরতেই বাবা আবার বিয়ে করে সৎ মা নিয়ে এলো ঘরে ওকে দেখভাল করার জন্য। আর সেই দেখভালের পরিণাম হলো একটাই, উঠতে বসতে মার খাওয়া। শেষটায় কোনদিন মার না জুটলেই বরং সে অবাক হতো। তাই মার সে সহ্য করতে পারে। পারে না শুধু ক্ষুধার জ্বালা সইতে। আর সইতে পারে না বলেই একদিন পাশের বাড়ির খালার হাত ধরে চলে এসেছিল ঢাকা শহরে। সে জেনেছিল, এখানে কাজ করতে জানলে ক্ষুধা কখনো মানুষকে জ্বালায় না। বরং ক্ষুধার্ত মানুষগুলোই একে অন্যের উপর হামলে পড়ে। কথাটার মানে সে সেদিনও বুঝেনি, এখনো বুঝে না। তবে এটুকু বুঝতে পারছে তার পুরো জীবনটাই আজ থমকে আছে এই ক্ষুধার জন্য।

    যেন ক্ষুধার কথা মনে করাতেই পেটের ভেতর কেমন একটা জ্বলুনি অনুভব করলো। আপনা থেকেই হাত চলে গেল পেটের উপর। মনে হলো শুকিয়ে চিমসে হয়ে গেছে। না আর সহ্য করা সম্ভব হচ্ছে না। কিছু একটা করতেই হবে। অনেক কষ্টে শরীরটাকে বিছানা থেকে টেনে তুললো। সহসা মাথাটা দুলে উঠলো। চকিত দেয়ালে হাত ঠেকিয়ে পতন ঠেকালো। ভীষণরকম দুর্বল লাগছে। তবুও আস্তে আস্তে দেয়াল হাতড়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। লাইট জ্বালাতে সাহস পেল না। পাছে সবাই টের পেয়ে যায়। জানালা গলে ঘরে প্রবেশ করা স্ট্রিট লাইটের আবছা আলোয় আবিষ্কার করলো, টেবিলটা ফাঁকা। হতাশায় মনটা ছেয়ে গেল। ঘুরে বারান্দার কোণে নিজের ছোট্ট বিছানায় ফিরে আসতে যাবে, তখনি চোখ পড়লো ফ্রিজের দিকে। বুকের ভেতর অনেক কষ্টে একটু সাহস সঞ্চয় করে সেদিকে এগিয়ে গেল। আস্তে করে হাত রাখলো ফ্রিজের হ্যান্ডেলে। তখনি খুঁট করে সুইচ টেপার শব্দ হলো। ঘর আলো করে জ্বলে উঠলো ডাইনিং রুমের লাইটটা।

    রাতে অফিস থেকে বাসায় ফিরেই মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল রানার। আজো শেলী কাজের মেয়েটাকে মেরেছে। এদ্দুর একটা মেয়েকে মেরে কি যে সুখ পায় ও আল্লাই জানে। কতই বা বয়স হবে ওর। খুব বেশি হলে বারো কি তের। এই বয়সের একটা মেয়ের দিব্ব্যি বেণী দুলিয়ে বুকে বই চেপে স্কুলে যাবার কথা। কিন্তু অবস্থার ফেরে এই মেয়েটা এসেছে কিনা তাদেরই বাসায় কাজ করতে। তাওতো ভালো এই দুর্মূল্যের দিনে ওকে পাওয়া গেছে। তা না হলে কি যে হতো আল্লাই মালুম। কোথায় ওকে একটু আদর যত্ন দিয়ে ম্যানেজ করে রাখবে, তা না উল্টো সারাক্ষণ চর-থাপ্পর, মার-পিট চলছেই। গতকালও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

    ঘটনা তেমন আহামরি কিছু না। তার কলেজ পড়ুয়া শ্যালক বিকেলে বাসায় ফিরেই ভাত খেতে চেয়েছিল। শেলী তখন বৈকালিক ঘুমে মশগুল ছিল। ফলে ঘুম থেকে ডেকে তোলায় তার মেজাজটা গেল খিঁচে, উপরোন্তু ভাত দিতে গিয়ে যখন দেখলো পাতিল শূন্য, তখনি তার রাগটা গেল সপ্তমে চড়ে। যথারীতি সে মেয়েটাকে মারতে শুরু করলো। আর তার শ্যালক প্রবল পৈশাচিক আনন্দ নিয়ে তাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলো। মেয়েটা একবার ছুটে এসে তার পা চেপে ধরে এই মার থেকে বাঁচাবার জন্য আকুতি জানিয়েছিল। কিন্তু ভিতু মেরুদণ্ডহীন শালাটা তার আপার ভয়ে কোন উচ্চবাচ্চ্য তো করলোই না, উল্টো দৌড়ে নিজের রুমে ঢুকে খিল লাগিয়ে দিল। ফলে পিচ্চি মেয়েটাকে অমানুষিকভাবে মার খেতে হলো। ফিদার ব্রাশের ডাঁট দিয়ে শেলী তাকে আচ্ছামতো পিটিয়েছে। মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে একসময় নিজেই থেমে গেছে। শুধু মেরেই ক্ষান্ত হয়নি। শাস্তি হিসেবে তার রাতের খাবারও বন্ধ করে দিয়েছে। বাসায় ফিরে শেলীর থমথমে মুখ দেখে যা বুঝার বুঝে নিয়েছিল ও। বাকিটা শ্যালক রবিনের কাছে শুনেছে।

    সেই থেকে মনটা তার খারাপ হয়ে আছে। এতটুকুন একটা মেয়ে না খেয়ে আছে, বিষয়টা তাকে খুব পীড়া দিচ্ছে। তাই রাতে তার নিজেরও তেমন খাওয়া হয়নি। বিছানায় যদিও বা শুয়েছে, তবু ঘুম আসছে না। মেয়েটার জন্য একটা কিছু করতে মন চাইছে। কিন্তু, কি করবে বুঝতে পারছে না। পাশেই শেলী শুয়ে আছে। ওর দিকে পেছন ফিরে থাকলেও নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দে বুঝতে অসুবিধা হলো না, ও এখন পুরোপুরি ঘুমের রাজ্যে। মনেই হয় না এই ঘণ্টা কতক আগে ছোট্ট একটা মেয়ের সাথে ভীষণ অমানবিক আচরণ করেছে ও। অবাক লাগছে রানার এরপরেও তার মাঝে অপরাধবোধের কোন চিহ্ন নেই। শুধু এ কারণেই ও নিজেও শেলীর সাথে কখনো কোনো কারণে রাগ করতে সাহস পায় না। মাঝে মাঝে ভাবে আল্লাহ বোধহয় ওকে ছেলে বানাতে গিয়ে ভুল করে মেয়ে বানিয়ে ফেলেছেন। তাই আদলটা মেয়েদের হলেও মন-মানসিকতা ও আচরণ ছেলেদের মতোই খটখটে। অথচ একজন ছেলে হয়েও সে নিজে সেরকম নয়। তাই তো পারছে না ঘটে যাওয়া নিষ্ঠুর ঘটনাটা আর সব কিছুর মতো স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে। বরং ছোট্ট মেয়েটার কষ্টটা সে অন্তর থেকে বুঝতে পারছে এবং এই বুঝতে পারাটাই তাকে আরো বেশি পীড়া দিচ্ছে।

    সহসা মনস্থির করে ফেলল। মেয়েটাকে কিছু খাবার দিয়ে আসবে। এতে আর কিছু না হোক অন্তত ক্ষুধার জ্বালা থেকে তো ওকে বাঁচানো যাবে। শেলী সম্ভবত সব খাবার ফ্রিজে তালাবন্দি করে রেখেছে। সেক্ষেত্রে তালা খুলেই ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে নিয়ে যাবে। চিন্তাটা সাহসী করে তুললো ওকে। শেলীর ঘুমন্ত দেহের দিকে এক পশলা নজর দিয়েই আস্তে করে বিছানা ছাড়লো। অয়্যারড্রোবের উপর থেকে হাতড়ে ফ্রিজের চাবিটা খুঁজে নিল। তারপর ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে গেল বেডরুমের বদ্ধ দরজার দিকে।

    মনটা ভীষণ চঞ্চল হয়ে আছে রবিনের। অবশ্য এ বয়সে এমনটি হওয়া ব্যতিক্রম নয়। তবুও তার ক্ষেত্রে এটা নিঃসন্দেহে একটা নতুন আবিষ্কার। এমনিতেই মেয়েদের সম্পর্কে তার ধারণা কম। তথাপি কলেজে দু’চার জন ক্লাসমেট যারা আছে তাদের সম্পর্কে তার অনুভূতিটা কখনোই এরূপ হয় না। আসলে পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটেই মানসিকতাটা সেদিকে অগ্রসর হবার পথ পায়নি। কিন্তু, আজ যা ঘটেছে তাতে একজন রক্ত মাংসের মানুষ হয়ে সে কিভাবে তা পাশ কাটাবে। ঘটনাটা তার যতবার মনে হচ্ছে, ততবারই তার শরীর কি এক অজানা চেতনায় শিহরিত হচ্ছে। যার রেশটুকু সে কিছুতেই এড়াতে পারছে না।

    এখনো সে স্পষ্ট দেখতে পারছে, তার আপা এক হাতে ময়নার চুলের মুঠি ধরে অপর হাতে ফিদার ব্রাশের ডাট দিয়ে সারা গায়ে পেটাচ্ছে। মেয়েটা বাবাগো-মাগো বলে সমান তালে চেচাচ্ছে। অকস্মাৎ কেমন করে যেন আপার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। তড়িৎ দৌড়ে চলে এল ওর কাছে। হুমড়ি খেয়ে পড়লো তার পায়ের উপর। শক্ত করে চেপে ধরলো তার পা জোড়া। পিছু পিছু শেলীও ছুটে এল। পেছন থেকে মেয়েটার চুলের মুঠি ধরে ক্রমাগত টানতে লাগলো। কিন্তু, তার আপা যতই টানা-হেচড়া করতে লাগলো, ততই মেয়েটা আরো শক্ত করে ওর পা চেপে ধরে থাকলো। সেই সাথে চিৎকার করে তাকে বাঁচাবার জন্য আকুতি জানাতে লাগলো। ফলশ্রুতিতে রবিনকেও তাকে ছাড়াবার জন্য হাত লাগাতে হলো। আর তাতেই ঘটে গেল যত বিপত্তি।

    যদিও তার মনে কখনোই তেমন কোন ভাবনা ছিল না। তথাপি স্রেফ সহজাত প্রবৃত্তির বশেই মেয়েটোর বুকে হাত রেখে ঠেলতে গিয়েছিল। কিন্তু, যেই না বুকে হাত দিয়েছে, অমনি তার সারা শরীরে বিদ্যুত তরঙ্গের মত কি যেন প্রবাহিত হয়ে গেল। তড়িৎ সে হাতটা সরিয়ে নিতে গিয়েও কি এক অমোঘ আকর্ষণে হাত দুটো আরো শক্ত করে ঠেসে ধরলো। অবাক হয়ে আবিষ্কার করলো তার হাত জোড়া এক দলা কোমল মাংসপিণ্ডের ভেতর দেবে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে তার সারা শরীর কি এক নিষিদ্ধ অনুভূতির ভালোলাগায় নেয়ে উঠছে। সহসা তার আপার দিকে চোখ পড়ায় সম্বিৎ ফিরে এলো। তারপর অনেকটা দৌড়ে নিজের রুমে এসে দরজায় খিল লাগিয়ে দিলো। ততক্ষণে সারা দেহ ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। ফুল স্পিডে ফ্যান ছেড়ে দিয়ে ধপ করে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। ঠাণ্ডা ঝিরঝিরে বাতাসে যদিও একসময় তার শরীরের উষ্ণতা মিইয়ে গেলো, কিন্তু মনের চঞ্চলতা বাড়লো বৈ কমলো না। এরপর তার আর আপার মুখোমুখি হতে সাহস হয়নি। যদিও একবার দুলাভাই এসে খাবার জন্য ডেকে গিয়েছিল, কিন্তু ক্ষুধা নেই বলে তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। কথাটা সে মিথ্যে বলেনি। বাস্তবিকই তার ক্ষিধেটা পুরোপুরি মরে গিয়েছিলো। তার স্থলে জায়গা করে নিয়েছিলো অন্যরকম এক ক্ষুধা যা এর আগে কখনোই তাকে ব্যতিব্যস্ত করেনি।

    সেই ক্ষুধাটাই এখনো তাকে তারিয়ে বেড়াচ্ছে। সে কারণেই সে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছে না। তার মনের অবস্থা এখন যেন ঠিক হঠাৎ নরমাংসের স্বাদ পাওয়া কোন বুনো বাঘের মতো। সে স্পষ্টতই বুঝতে পারছে, সেই অপ্রীতিকর মুহূর্তের ফুরসতে আবিষ্কার করা নতুন স্বাদটুকুই কেবল এখন মেটাতে পারে তার মনের শান্তি। সহসা সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো, না এভাবে আর নয়। একে তো সে ক্ষুধার্ত, ওদিকে লোভনীয় খাবারটাও পড়ে আছে হাতের কাছেই। তবে কেন সে নিজেকে বঞ্চিত রাখবে। যেই ভাবা সেই কাজ। অমনি লাফিয়ে বিছানা ছাড়লো। শিকারী চিতার মতো সাবধানে এগিয়ে গেলো তার রুমের দরজার দিকে।

    শরীরটা রাগে কাঠ হয়ে আছে শেলীর। তাই বিছানায় যাবার পর থেকে এক বিন্দুও নড়েনি। চোখ বন্ধ করে নিজেকে শান্ত করার বৃথাই চেষ্টা চালাচ্ছে। তার মাথায়ই আসছে না এক রত্তি পিচ্চি একটা মেয়ে এত্তো সাহস পায় কোথ্থেকে। সংসারটা তার নিজের। এ সংসারে সব কিছুই তার নিজের ইচ্ছেয় ঘটে। যেখানে রানা পর্যন্ত তাকে কিছু বলার বা করার সাহস পায় না, সেখানে ময়না স্রেফ কাজের মেয়ে হয়ে তার কথার বাইরে যাবার সাহস পেল কোথায়, এটা সে কিছুতেই বুঝে পাচ্ছে না। কত্তো বড় কলিজা তার, ছোট ভাইয়ের জন্য রাখা ভাত কিনা সে নিজেই খেয়ে ফেলল। সে জন্যেই তো আজ দিয়েছে তাকে আচ্ছা করে ধোলাই।

    ছোট্ট বেলার কথা মনে পড়ল, একবার স্কুল থেকে বাসায় ফিরে দেখলো ডাইনিং টেবিলে রাখা তার নাস্তা পাশের বাসার হুলো বেড়ালটা দিব্যি রসিয়ে রসিয়ে খাচ্ছে। দৃশ্যটা তার মেজাজ এমনই খারাপ করে দিয়েছিল যে, সে বিড়ালটাকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে মেরেই ফেলেছিল। আসলে তার স্বভাবটাই এমন, যে কোন কারণেই হোক কারো গায়ে হাত তোলা না পর্যন্ত সে শান্তি পায় না। এ জন্য পাড়ায় এমনকি স্কুল-কলেজে পর্যন্ত তার নাম হয়ে গিয়েছিল মহিলা গুন্ডা। কাউকে কোন কারণে অপছন্দ হলেই হয়েছে, তাকে মারার জন্য হাত নিশপিশ করা শুরু করে। এমনকি কদিন চলে গেলে কাউকে না কাউকে মারার জন্য মনটা আইঢাই করে। সেজন্য বিয়ের পরও স্বভাবটা এতটুকু বদলায়নি তার। ওর এই ভয়ংকর চরিত্রের জন্য রানাও তাকে সমঝে চলে। আহারে বেচারা। ভয় পায়, কবে না আবার বউয়ের হাতে মার খেতে হয়।

    বোধকরি সে কারণেই ময়নাকে আজ এভাবে মেরে রক্তাক্ত করার পরও একটা টু-শব্দ করার সাহস পায়নি ও। এমনকি ভয়ে ঠিকমতো খায়ওনি। ফ্রিজ থেকে কি সব বের করে একটু মুখে দিয়েই শুয়ে পড়েছে। অবশ্য তার এসবের বালা নেই। সে ঠিকই পেট পুড়ে খেয়েছে। তারপর শয়তান মেয়েটা যাতে চুরি করে কিছু খেতে না পারে তারজন্য সব খাবার ফ্রিজে লক করে রেখে তবে শুয়েছে। কিন্তু ঘুম তো আসছে না। কারণ মেজাজটা ঠাণ্ডা হচ্ছে না কিছুতেই। এই সব কিছুর জন্য দায়ী ঐ পুছকে ছেমড়িটা। ইচ্ছে হচ্ছে ওকে আর এক প্রস্ত ধোলাই দিয়ে আসে।

    সহসা হালকা একটা খসখস শব্দে তার চিন্তায় ছেদ পড়লো। টের পেল নিঃশব্দে রানা নেমে যাচ্ছে বিছানা থেকে। টয়লেটে যাচ্ছে বোধহয়। কিন্তু এমন চোরের মতো চুপিচুপি কেন! আস্তে করে এপাশে মাথা ঘুরালো। একি! ও দেখি অয়ারড্রবের দিকে যাচ্ছে। নিমেষেই কান খাড়া হয়ে গেল তার, মৃদু একটা টং আওয়াজের পাশাপাশি হালকা পদশব্দ ধীরে ধীরে অয়ারড্রবের কাছ থেকে দরোজার দিকে সরে যাচ্ছে বুঝতে পেরে। অনুধাবনটা প্রচণ্ড রাগিয়ে দিল তাকে। আচমকা হাতের মুঠি শক্ত হয়ে গেল শেলীর। সটান শোয়া থেকে বিছানায় উঠে বসে পড়লো। টের পেল হিংস্র সরীসৃপের মতো একটা ভয়ংকর ক্ষুধা তার বুকের ভেতর প্রচণ্ড গতিতে স্ফীত হয়ে ক্রমশঃ গলা বেয়ে মাথায় উঠে যাচ্ছে।

    মাঝ রাতে সবাই একটা আর্তচিৎকার শুনতে পেল। আস্তে আস্তে আশেপাশের সবগুলো বাসায় লাইট জ্বলে উঠলো। কেউ কেউ চিৎকারটার উৎসের সন্ধানে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ইতি-উতি তাকাতে লাগলো। কিছুক্ষণ পরেই হুইসেল বাজিয়ে একটা পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়িয়ে গেল বাড়িটার সামনে। ঝটপট ক’জন পুলিশ নেমেই দৌড়ে বাড়িটার ভেতর ঢুকে গেল। ক্ষাণিক বাদেই ওদের সাথে দুইজন পুরুষ ও একজন মহিলার ছোটখাট একটা মিছিল বেড়িয়ে এল ভেতর থেকে। তাদের মধ্যে দু’জন পুলিশকে ধরাধরি করে একটা ছোট মেয়ের রক্তাক্ত নিথর দেহ চ্যাংদোলা করে বয়ে আনতে দেখা গেল। মেয়েটার ডান হাতের মুঠি শক্ত করে আটকানো। অনেক চেষ্টা করেও খোলা যায়নি।

    পরদিন বেশ ক’টি সান্ধ্য দৈনিকে ছোট্ট একটা খবর ছাপা হলো। ‘পরিবারের সদস্যদের নির্যাতনে বাসার কাজের মেয়ে খুন। খুনের অভিযোগে স্বামী-স্ত্রী ও স্ত্রীর কলেজ পড়ুয়া ছোট ভাইকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু, খুনের মোটিভ সম্পর্কে পুলিশ এখন পর্যন্ত কিছুই জানতে পারেনি। অভিযুক্তদের কেউই মুখ খুলছে না। তবে তদন্ত চলছে। আলামত হিসেবে পুলিশ ভিকটিমের হাতের মুঠিতে আটকে থাকা একটি চাবি উদ্ধার করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে ওটা একটা ফ্রিজের চাবি। ধারণা করা হচ্ছে, এর সাথেই জড়িয়ে আছে খুনের প্রকৃত রহস্য।’
    (আমার এই গল্পটা গল্প কবিতা ডট কম এ পুরস্কৃত হয়েছিল এবং বাংলানিউজ২৪ ডট কম এ ছাপা হয়েছিল।)

    4
    3 Comments
    • একই ছাদের নিচে চারজন মানুষ, কিন্তু চারজনের ক্ষুধা চার রকমের…এই গল্পটা অনেকদিন মাথায় ঘুরবে।

    • মুঠোয় আটকা এক জীবন….🤍

    • দারুণ লিখেছেন, শুভকামনা অবিরাম

আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন

ডিজাইনার

স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

Skip to toolbar