-
অদৃশ্য সুতোর টান
রাজধানী থেকে অনেক দূরের একটি জেলা। মানচিত্রে ছোট্ট একটি বিন্দু, কিন্তু সেখানে লুকিয়ে ছিল হাজার কোটি টাকার এক অন্ধকার সাম্রাজ্য।
সাম্রাজ্যের কোনো রাজা ছিল না, কোনো সিংহাসনও ছিল না। ছিল শুধু কিছু ফাইল, কিছু সিলমোহর, কিছু স্বাক্ষর, আর কয়েকজন মানুষ, যারা রাষ্ট্রের পোশাক পরে রাষ্ট্রকেই নিঃস্ব করছিল।
বছরের পর বছর ধরে তারা একই কৌশলে কাজ করেছে।
একজন তালিকা তৈরি করে, আরেকজন অনুমোদন দেয়, তৃতীয়জন বিল ছাড় করে, চতুর্থজন কমিশন ভাগ করে নেয়। বাইরে থেকে সবাই আলাদা মানুষ, কিন্তু ভেতরে তারা ছিল একই জালের গিঁট।
তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল টাকা নয়।
সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল পৃষ্ঠপোষকতা।
প্রতিটি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার পেছনে ছিল আরও শক্তিশালী কেউ। কোনো রাজনৈতিক প্রভাবশালী, কোনো ক্ষমতাধর আমলা, কোনো অদৃশ্য গডফাদার, যার নাম সাধারণ মানুষ জানে না কিন্তু যার একটি ফোনেই বদলি, পদোন্নতি কিংবা শাস্তির সিদ্ধান্ত বদলে যায়।
এই ব্যবস্থার মধ্যেই একদিন যোগ দিলেন একজন নারী কর্মকর্তা।
তিনি ভেবেছিলেন, আইনই হবে তার ঢাল।
কিন্তু অল্পদিনেই বুঝলেন, আইনের বই আর বাস্তবতার বই এক নয়।
ফাইল খুলতেই তিনি দেখলেন অদ্ভুত সব হিসাব। মৃত মানুষের নামে ক্ষতিপূরণ, অস্তিত্বহীন জমির জন্য অর্থ বরাদ্দ, একই সম্পত্তির জন্য একাধিক দাবি।
তিনি তালিকা বাতিল করলেন।
সেদিনই প্রথম সিন্ডিকেটের মধ্যে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে।
কারণ তারা জানত, একজন সৎ কর্মকর্তা শুধু একটি ফাইল আটকে দেন না; তিনি পুরো ব্যবস্থার মুখোশ খুলে দেন।
প্রথমে আসে অনুরোধ।
তারপর আসে তদবির।
তারপর আসে সতর্কবার্তা।
আর শেষে আসে হুমকি।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল না এসবের কোনোটি।
সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল সেই মানুষগুলো, যারা কখনো সামনে আসে না।
যারা কোনো সভায় বক্তৃতা দেয় না, কোনো সংবাদে নাম আসে না, কিন্তু পর্দার আড়াল থেকে সুতো টানে।
তারা জানে কাকে কোথায় বদলি করতে হবে।
কোন তদন্তকে ধীর করতে হবে।
কোন ফাইলকে হারিয়ে ফেলতে হবে।
কোন সৎ কর্মকর্তাকে একঘরে করতে হবে।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হলো, দুর্নীতিবাজরা সবসময় দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করে না; অনেক সময় তাদের রক্ষা করে সম্মানিত মুখোশ পরা মানুষরা।
দিনের বেলায় তারা নৈতিকতার কথা বলে।
রাতের বেলায় তারা ভাগাভাগির হিসাব মেলায়।
তারা চোর নয়, কিন্তু চোরের প্রহরী।
তারা লুটেরা নয়, কিন্তু লুটেরাদের ছাতা।
তাদের হাত কখনো নোংরা হয় না, কারণ নোংরা কাজ করার জন্য নিচে অসংখ্য লোক থাকে।
একদিন সেই নারী কর্মকর্তা বুঝতে পারলেন, তার বিরুদ্ধে লড়ছে কোনো একক ব্যক্তি নয়।
লড়ছে একটি ব্যবস্থা।
একটি সংস্কৃতি।
একটি অদৃশ্য প্রজাতন্ত্র, যেখানে সততা অপরাধ আর আপস হলো যোগ্যতার প্রমাণ।
বারবার বদলির আদেশ আসছিল।
সহকর্মীরা বলছিলেন, “এভাবে লড়াই করে লাভ কী?”
তিনি মৃদু হেসে বলেছিলেন,
“লাভের জন্য তো লড়ছি না।”
জানালার বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে।
দূরে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে।
তার মনে হলো, দুর্নীতির সবচেয়ে বড় শক্তি টাকা নয়, মানুষের নীরবতা।
আর সততার সবচেয়ে বড় শক্তি ক্ষমতা নয়, বিবেক।
সেদিন তিনি বুঝলেন, দুর্নীতিবাজদের হারানো কঠিন।
কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় ভয়ও একজন সৎ মানুষ।
কারণ হাজার দুর্নীতিবাজ মিলে কোটি কোটি টাকা লুট করতে পারে, কিন্তু একজন সৎ কর্মকর্তা একটি স্বাক্ষর না করেই তাদের সাম্রাজ্য কাঁপিয়ে দিতে পারেন।
আর সেই কারণেই ইতিহাসে দুর্নীতিবাজদের নাম খুব কম মানুষ মনে রাখে।
মানুষ মনে রাখে তাদের, যারা ক্ষমতার সামনে মাথা নত করেনি। যারা অদৃশ্য সুতোর টানে নাচেনি। যারা জানত, বদলি হওয়া পরাজয় নয়, বরং কখনো কখনো সেটিই সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মূল্য।
2 Comments
Friends
শিপন সরকার
@shepon
Md shohag rana
@shohag9011
Syed Farah
@syedfarah
BONI AMIN
@boniamin
সাবিত রিজওয়ান
@rejon
অভিমানী মন
@ovimanimon
মো: নাজমুল আখতার
@faith
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
শ.ম.ওয়াহিদুজ্জামান
@sharifmuhammadwahiduzzaman



স্বাক্ষরহীন কলমেই সাম্রাজ্য কাঁপে…..🤍