Profile Photo

Ashik MokamiOffline

  • ashikmokami
  • Profile picture of Ashik Mokami

    Ashik Mokami

    4 days, 7 hours ago

    উপকথা
    অনামিকার ভেতরের পৃথিবী

    — এক —
    মিরপুর-১০ এর গলির ভেতরে একটা হোটেল আছে,
    নাম হোটেল রাজমহল।

    নামটা বড় করে লেখা—
    থাকলেও ভেতরে ঢুকলে বোঝা যায়
    রাজা-মহারাজার কিছু নেই সেখানে।

    দেয়ালের রং উঠে গেছে,
    সিলিং ফ্যান ঘোরে কিন্তু শব্দ করে,
    আর বাথরুমের দরজা কখনো—
    ঠিকমতো বন্ধ হয় না।

    তবু এই হোটেলে রাত আসে,
    মানুষ আসে,
    চলে যায়।

    অনামিকা এই হোটেলে আসে প্রতি সন্ধ্যায়।
    সে আসে একটা নীল ব্যাগ কাঁধে নিয়ে।

    ব্যাগের ভেতরে কী থাকে
    সেটা হোটেলের কেউ জিজ্ঞেস করে না।

    ম্যানেজার রতন ভাই শুধু চাবি এগিয়ে দেন,
    আর অনামিকা হাসে।
    একটা সুন্দর হাসি,
    দাঁত দেখা যায়,
    গালে হালকা টোল পড়ে।
    🪷 🪷 🪷
    — দুই —
    অনামিকার বয়স সাতাশ।
    দেখলে মনে হয় চব্বিশ।

    শরীরটা তার টানটান,
    কারণ সে জিম করে।

    মিরপুর-১১ তে মহিলা জিমে
    সে সপ্তাহে পাঁচদিন যায়।
    ট্রেডমিল, ডাম্বেল, স্কোয়াট।
    ঘাম ঝরায়।

    ট্রেনার মিতু আপা বলেছিল,
    “তোমার মতো মেয়ে যদি আরো নিয়মিত আসত
    তাহলে এই জিম ফেমাস হয়ে যেত।”

    অনামিকা সেদিন হেসেছিল।
    ভেতরে ভেতরে ভেবেছিল,
    “শুধু শরীর দেখলেই এই কথা বলতে।
    বাকিটা দেখলে কী বলতে?”
    🪷 🪷 🪷
    — তিন —
    বাকিটা মানে বাম উরুর গোড়া থেকে শুরু হওয়া কালো দাগ।

    জন্মগত না।

    ছোটবেলায়, বছর পাঁচেক বয়সে,
    মায়ের অসাবধানতায় চুলার উপর পড়ে গিয়েছিল।

    মা তখন পাশের বাড়িতে গিয়েছিলেন কী একটা কাজে।
    অনামিকা রান্নাঘরে একা।
    কৌতূহলী শিশু চুলার পাশে গিয়েছিল,
    আর তারপর যা হওয়ার হয়েছিল।

    সেই আগুনের দাগ আজো আছে।
    তিরিশ সেন্টিমিটারের মতো লম্বা,
    চওড়া,
    কুচকানো চামড়া।
    রং কালো থেকে বেগুনি।

    অনামিকা বড় হয়েছে এই দাগ লুকিয়ে।
    🪷 🪷 🪷
    — চার —
    ছোটবেলায় স্কুলে যখন মেয়েরা একসাথে টয়লেটে যেত,
    অনামিকা কখনো যেত না।
    একা যেত।
    কেউ দেখে ফেলবে এই ভয়ে।

    গরমের দিনে যখন অন্য মেয়েরা পুকুরে নামত,
    সে নামত না।
    বলত, “পানি ভালো লাগে না।”

    আসলে পানি ভালো লাগত।
    কিন্তু পানিতে নামলে কাপড় ভেজে,
    ভেজা কাপড়ে দাগটা দেখা যায়।

    একদিন, অনামিকার বয়স যখন বারো,
    পাশের বাড়ির কাকিমা এসেছিলেন।
    কথায় কথায় বলেছিলেন,
    “তোমার মেয়েটা বড় হলে বিয়ে দিতে পারবে তো?
    ওই দাগের কথা তো বর পক্ষ জিজ্ঞেস করবে।”

    মা কিছু বলেননি।

    কিন্তু সেদিন রাতে অনামিকা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়েছিল।
    মা চোখ সরিয়ে নিয়েছিলেন।

    সেই চোখ সরানোটা
    অনামিকা ভুলতে পারেনি।
    🪷 🪷 🪷
    — পাঁচ —
    সাতাশ বছর বয়সে অনামিকার জীবনের একটা ছন্দ আছে।

    সকালে উঠে চা বানায়।
    একা থাকে টিনশেড রুমে, মিরপুর-১২ তে।

    চা খেয়ে ফোন দেখে।
    Facebook-এ ঘুরে।
    Instagram-এ ঘুরে।

    তারপর জিমে যায়।
    জিম থেকে ফিরে গোসল করে,
    রান্না করে,
    খায়।
    তারপর শোয়।

    বিকেলে উঠে তৈরি হয়।

    তৈরি হওয়াটা একটা ritual।

    প্রথমে শরীরে লোশন মাখে।
    সুগন্ধি লোশন, দাম একটু বেশি,
    কিন্তু অনামিকা এটা ছাড়ে না।

    তারপর চুল আঁচড়ায়।
    কাজল দেয়।
    একটু লিপস্টিক।

    কাপড় পরে এমনভাবে
    যেন সবকিছু স্বাভাবিক লাগে।
    🪷 🪷 🪷
    — ছয় —
    স্বাভাবিক।

    এই শব্দটা অনামিকার জীবনের সবচেয়ে বড় শব্দ।

    সে চায় স্বাভাবিক দেখাতে।
    সে চায় মানুষ তাকে স্বাভাবিক ভাবুক।

    এমন একটা মেয়ে
    যে জিম করে,
    হাসে,
    একটু চঞ্চল,
    একটু প্রাণবন্ত।

    হোটেলে যাওয়ার সময় সে নীল ব্যাগটা কাঁধে নেয়।
    হেঁটে যায়।
    মাথা সোজা রাখে।

    রতন ভাই চাবি দেন।
    অনামিকা উপরে যায়।

    কাস্টমার আসে।
    বেশিরভাগ মধ্যবয়সী পুরুষ।
    অফিস ফেরত, ক্লান্ত চেহারা।
    কেউ কেউ তরুণ।
    কেউ কেউ বৃদ্ধ।
    🪷 🪷 🪷
    — সাত —
    অনামিকা শিখে গেছে কীভাবে কথা বলতে হয়।
    একটু হাসি,
    একটু মজা,
    একটু উষ্ণতা।

    কাস্টমাররা টাকা দিতে আসে,
    কিন্তু তারা চায় যেন মনে না হয়
    শুধু টাকার জন্য এসেছে।

    তারা চায় মনে হোক
    অনামিকাও তাদের পছন্দ করছে।

    অনামিকা সেটা দেয়।

    কিন্তু আলো কমানোর সময় সে সাবধান থাকে।
    কাপড় খোলার সময় সে এমনভাবে শোয়
    যেন উরুর ওই অংশটা আড়ালে থাকে।

    কম্বল টানে।
    বালিশ সরায়।
    🪷 🪷 🪷
    — আট —
    একটা মজার বিষয় আছে অনামিকার মধ্যে।

    সে ভাবে সে জানে মানুষকে।
    সে ভাবে সে বোঝে কাস্টমাররা কী চায়।

    কিন্তু সে নিজের ভেতরে যা ঘটছে
    সেটা দেখতে পায় না।

    তার মনে একটা বিশ্বাস তৈরি হয়ে গেছে
    অনেক আগে থেকেই।
    সেই বারো বছর বয়সে
    মায়ের চোখ সরানোর পর থেকে।

    সেই বিশ্বাসটা হলো:

    “আমি স্বাভাবিক না।
    আমাকে কেউ ভালোবাসতে পারবে না।
    আমাকে শুধু ব্যবহার করবে।”

    এই বিশ্বাসটা সে কখনো সরাসরি বলে না।
    নিজেকেও না।

    কিন্তু তার প্রতিটা সিদ্ধান্তে এটা আছে।

    সে জিম করে কারণ শরীর ভালো রাখলে
    লোকে কম প্রশ্ন করবে।

    সে হাসে কারণ হাসলে লোকে মুখের দিকে তাকায়,
    অন্যদিকে না।

    সে চঞ্চল থাকে কারণ চঞ্চল মানুষের দিকে
    লোকে মনোযোগ দিলে
    অন্য কিছু দেখার সময় পায় না।

    সে পারফর্ম করছে।
    প্রতিদিন।
    প্রতিটা মুহূর্তে।

    কিন্তু এই পারফরম্যান্সের ভেতরে
    সে নিজেই আটকা পড়ে আছে।

    সে বাইরের পৃথিবী দেখতে পাচ্ছে না।
    সে শুধু দেখছে নিজের মাথার ভেতরের পৃথিবী।

    যেখানে সে সবসময় অস্বাভাবিক,
    সবসময় কম,
    সবসময় একা।
    🪷 🪷 🪷
    — নয় —
    জিমে মিতু আপার সাথে অনামিকার বন্ধুত্বের মতো একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।

    মিতু আপা অনামিকার বয়সে বড়, পঁয়ত্রিশ হবেন।
    বিয়ে হয়নি।
    জিম চালান,
    ফিটনেস নিয়ে কাজ করেন।
    প্রাণবন্ত মানুষ।

    একদিন ওয়ার্ক আউটের পর মিতু আপা জিজ্ঞেস করেছিলেন,
    “তুমি কী করো, অনামিকা?
    মানে, সারাদিন?”

    অনামিকা হেসেছিল।
    “এটা ওটা।”

    মিতু আপা আর জিজ্ঞেস করেননি।
    কিন্তু পরের সপ্তাহে একদিন বলেছিলেন,
    “তোমাকে দেখলে মনে হয়
    তুমি অনেক কিছু ভেতরে রাখো।”

    অনামিকা ততক্ষণে পানির বোতল নিয়ে উঠে গিয়েছিল।

    এভাবেই সে বন্ধ করে দেয়।
    কেউ কাছে আসতে গেলে সে একটু সরে যায়।

    কারণ কাছে আসলে দেখে ফেলবে।
    🪷 🪷 🪷
    — দশ —
    কাস্টমারদের সাথে অনামিকার একটা অদ্ভুত সম্পর্ক।

    সে চায় তারা তাকে পছন্দ করুক।
    শুধু ব্যবহার না করে,
    সত্যিকার অর্থে পছন্দ করুক।
    ফিরে আসুক।
    জিজ্ঞেস করুক, “কেমন আছ?”

    কিন্তু সে জানে এটা হবে না।
    এই জানাটা তাকে কষ্ট দেয়।
    কিন্তু সে এটাই বিশ্বাস করে।

    একবার একজন কাস্টমার ছিল, নাম বলেছিল রাহাত।
    বয়স ত্রিশের মতো।
    অফিসার গোছের।
    পরিষ্কার জামা পরত,
    ভদ্র কথা বলত।

    রাহাত কয়েকবার এসেছিল।
    একবার বলেছিল,
    “তোমার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে।”

    অনামিকার বুকে কী একটা হয়েছিল সেই মুহূর্তে।
    উষ্ণ কিছু একটা।

    তারপর একদিন রাহাত এসেছিল।
    আলো কম ছিল,
    কিন্তু পুরো অন্ধকার না।
    কোনোভাবে সে দেখে ফেলেছিল দাগটা।

    “এটা কী?”

    অনামিকা আগেই তৈরি ছিল এই প্রশ্নের জন্য।
    “পোড়া দাগ।
    ছোটবেলায়।”

    রাহাত কিছু বলেনি।
    সেদিনের পর সে আর আসেনি।

    সেই রাতে অনামিকা নিজেকে বলেছিল,
    “দেখেছ?
    ভালোবাসা নেই।
    শুধু ব্যবহার।”
    🪷 🪷 🪷
    — এগারো —
    Facebook-এ অনামিকার একটা আলাদা জীবন আছে।

    সে কখনো নিজের আসল ছবি দেয় না।
    দেয় ফিল্টার দেওয়া ছবি,
    বা শুধু চোখের ছবি,
    বা পেছন থেকে তোলা ছবি।

    তার Facebook name “নামী আক্তার”।

    নামী।
    নাম আছে এমন।

    অনামিকা মানে যার কোনো নাম নেই।

    সে নিজেই নিজেকে নাম দিয়েছে নামী।

    এই ছোট বিষয়টায়
    তার পুরো জীবনের দর্শন আছে।
    🪷 🪷 🪷
    — বারো —
    Facebook-এ সে post দেয়।

    কখনো খাবারের ছবি।
    কখনো motivational quote।
    কখনো লেখে, “আজ জিমে দারুণ workout হলো।”
    কখনো লেখে, “মিরপুরের রাস্তায় বৃষ্টি, ভালো লাগছে।”

    সব post-এ সে চঞ্চল,
    প্রাণবন্ত।

    কোথাও দুঃখ নেই।
    কোথাও একাকীত্ব নেই।

    কমেন্টে কেউ কেউ লেখে,
    “কোথায় থাকো?”
    “কী করো?”
    “দেখা হবে?”

    অনামিকা মাঝে মাঝে reply করে।
    মাঝে মাঝে করে না।

    কিন্তু reply করলেও
    একটা দূরত্ব রাখে।

    কারণ কাছে আসলে দেখে ফেলবে।
    🪷 🪷 🪷
    — তেরো —
    একদিন সকালে জিম থেকে ফিরে অনামিকা ফোন দেখছিল।
    Facebook notification।
    একজন friend request পাঠিয়েছে।
    নাম: শাহেদ আহমেদ।
    Profile picture-এ পুলিশের উর্দি পরা।

    অনামিকা সাধারণত অচেনা লোকের request accept করে না।
    কিন্তু শাহেদের profile দেখল।
    মিরপুরেরই মানুষ।
    পুলিশ অফিসার।

    সে request accept করল।

    সেদিন বিকেলে message এলো:
    “হ্যালো।
    আপনি কি মিরপুরে থাকেন?”

    অনামিকা কিছু ক্ষণ চুপ থাকল।
    তারপর reply করল,
    “হ্যাঁ।”

    কথা শুরু হলো।
    🪷 🪷 🪷
    — চোদ্দো —
    শাহেদ কথা বলে সরাসরি।

    “কী করেন আপনি?”
    “পার্ট টাইম কাজ।”
    “কী ধরনের?”
    “একটা হোটেলে।”

    শাহেদ আর জিজ্ঞেস করে না।

    এটা অনামিকার ভালো লাগে।

    পুলিশ শুনলে অনেকে একটু সরে যায়।
    কিন্তু শাহেদ সরে যায় না।

    বরং জিজ্ঞেস করে,
    “জিম করেন নাকি?
    Profile-এ দেখলাম।”
    “হ্যাঁ।”
    “আমিও করি। কোথায়?”

    কথা বাড়ে।

    শাহেদ বলে তার কথা।
    মিরপুর-১ এ থাকে।
    বিয়ে হয়নি।
    বাবা মারা গেছেন,
    মা আছেন।

    অনামিকা শোনে।
    বলে কম।

    সে যেন কাউকে দরকার যে শুনবে।

    অনামিকা প্রথমবারের মতো অনুভব করে
    কেউ তার সাথে কথা বলছে
    শুধু কথা বলার জন্য।

    টাকার জন্য না।
    কিছু পাওয়ার জন্য না।

    এই অনুভূতিটা কেমন অস্বস্তিকর।
    🪷 🪷 🪷
    — পনেরো —
    রাত তখন বারোটা।
    অনামিকা হোটেল থেকে ফিরেছে।

    শুয়ে ফোন দেখছে।
    শাহেদ online।

    “এত রাতে জেগে আছেন?”
    “আপনিও তো।”
    “আমার ডিউটি ছিল। আপনার?”
    “এমনি।”

    তারপর কিছু ক্ষণ চুপ।

    শাহেদ লেখে,
    “আপনি কি ঠিক আছেন?
    মানে, আপনাকে দেখে মনে হয় কিছু একটা আছে।”

    অনামিকা চমকে ওঠে।

    “আপনার Facebook-এ অনেক চঞ্চল post।
    কিন্তু কথা বলার সময় আপনি অন্যরকম।”

    অনামিকা কিছু বলে না।
    স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।

    “উত্তর দিতে হবে না,” শাহেদ লেখে।
    “শুধু জানলাম।”

    এই “উত্তর দিতে হবে না” কথাটা
    অনামিকার বুকে লাগে।

    কারণ সারাজীবন সে দিতে দিতে বড় হয়েছে।
    উত্তর দাও,
    সামলাও,
    দেখাও সব ঠিক আছে।

    কিন্তু এই লোক বলছে
    দিতে হবে না।
    🪷 🪷 🪷
    — ষোলো —
    পরের কয়েক সপ্তাহ শাহেদের সাথে কথা হয়।
    রাতে।
    দেরি করে।

    অনামিকা হোটেল থেকে ফিরে শুয়ে পড়ে,
    ফোন নেয়,
    শাহেদ online থাকে।

    শাহেদ বলে তার কথা।
    ডিউটির কথা,
    মায়ের কথা,
    ভবিষ্যতের কথা।

    সে বলে,
    “চাকরি করি কিন্তু মনে হয়
    কোথাও পৌঁছাচ্ছি না।”

    অনামিকা শোনে।
    মাঝে মাঝে বলে,
    “এটা মনে হওয়াটা স্বাভাবিক।”

    “আপনি বোঝেন মনে হয়।”

    অনামিকা হাসে।
    “না বোঝার কী আছে।”

    কিন্তু নিজের কথা বলে না।
    🪷 🪷 🪷
    — সতেরো —
    শাহেদ জিজ্ঞেস করলে সরিয়ে দেয়।

    “আপনার পরিবার কোথায়?”
    “গ্রামে।”
    “যোগাযোগ আছে?”
    “কম।”
    “কেন?”
    “এমনিই।”

    শাহেদ আর টানে না।

    কিন্তু অনামিকা বুঝতে পারে
    সে টানছে না কারণ সে বোঝে
    জোর করে পাওয়া যায় না।

    এই বোঝাটা একটা নতুন জিনিস
    অনামিকার কাছে।
    🪷 🪷 🪷
    — আঠারো —
    একমাস পরে।

    শাহেদ একদিন বলল,
    “দেখা করব?”

    অনামিকার বুকে একটা শীতল অনুভূতি হলো।

    দেখা করব মানে সে দেখবে।
    মানে সামনে থাকবে।
    মানে হয়তো একটু বেশি জানতে চাইবে।

    “ব্যস্ত থাকি।”
    “একদিন না একদিন তো সময় হবে।”
    “হয়তো।”

    রাতে শোয়ার সময় অনামিকা ভাবল।

    শাহেদ কি আসলে কিছু চায়?
    পুলিশ মানুষ,
    হয়তো তার কাজের জায়গা জেনে গেছে।
    হয়তো কিছু একটা…

    না।

    সে এভাবে ভাবছে কেন?

    কারণ সে বিশ্বাস করতে পারছে না
    কেউ শুধু তার সাথে কথা বলতে চাইতে পারে।
    🪷 🪷 🪷
    — উনিশ —
    অনামিকার ডিপ্রেশন এসেছিল আস্তে আস্তে।

    একদিন সকালে উঠে মনে হলো
    জিমে যেতে ইচ্ছে করছে না।

    সে যায়নি।
    পরের দিনও না।

    তারপর একদিন হোটেলে গেল,
    একটা কাস্টমার এলো,
    দেখল দাগটা,
    উঠে গেল।

    “তোমার কিছু হয়েছে নাকি?
    ডাক্তার দেখাও।”

    সেই রাতে অনামিকা হোটেলের রুমে একা বসেছিল।
    আয়নায় নিজেকে দেখল।

    সুন্দর মুখ।
    সুন্দর চোখ।
    ভালো শরীর।

    কিন্তু দাগটা।

    সে আস্তে আস্তে কাপড় তুলে
    দাগটার দিকে তাকাল।

    কালো,
    কুচকানো।
    পুরোনো আগুনের স্মৃতি।

    সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল।

    তারপর কাঁদল।
    একা,
    নিঃশব্দে।

    কারণ সে জানে সে কখনো স্বাভাবিক না।
    সে জানে লোকে তাকে ব্যবহার করে।
    সে জানে রাহাত গেছে,
    আরো অনেকে গেছে।
    সে জানে শাহেদও যাবে।

    সব যাবে।
    🪷 🪷 🪷
    — বিশ —
    জিম বন্ধ।
    হোটেল কম যাচ্ছে।
    ঘরে শুয়ে থাকছে।

    রতন ভাই একদিন ফোন করলেন।
    “কী হলো, আসছ না কেন?”
    “শরীর ভালো না।”
    “বুঝলাম।”

    তিনি আর জিজ্ঞেস করলেন না।

    Facebook-এ post দেওয়া কমে গেছে।
    একটা post দিয়েছে,
    “আজকাল বৃষ্টি বেশি হচ্ছে।”
    পাঁচটা react।

    শাহেদ message করে,
    “কয়েকদিন কথা হচ্ছে না।
    ঠিক আছেন?”

    অনামিকা উত্তর দেয় না।
    পরদিন দেয়,
    “হ্যাঁ।”
    “মনে হলো না।”
    “ঠিক আছি।”
    🪷 🪷 🪷
    — একুশ —
    শাহেদ আর বলে না।

    কিন্তু পরের দিন আবার message করে,

    “আজকে একটা কথা মনে পড়ল।
    আপনি একদিন বলেছিলেন
    এই অনুভূতিটা স্বাভাবিক।
    মনে আছে?”

    “হ্যাঁ।”

    “আপনার কথাটা সেদিন অনেক কাজ দিয়েছিল।”

    অনামিকা ফোনটা বুকের উপর রেখে দিল।
    ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকল।

    কাউকে সাহায্য করতে পেরেছে সে।
    শুধু কথায়।

    কিন্তু নিজেকে সাহায্য করতে পারছে না।
    🪷 🪷 🪷
    — বাইশ —
    এক সপ্তাহ পরে শাহেদ আবার বলল,
    “দেখা করব?”

    এবার অনামিকা অনেকক্ষণ ভাবল।

    তারপর বলল,
    “কোথায়?”

    শনিবার রাতে অনামিকার ঘুম হলো না।

    সে বারবার ভাবল,
    শাহেদ কী চায়?

    রাত তিনটায় সে সিদ্ধান্ত নিল যাবে না।
    রাত চারটায় সিদ্ধান্ত নিল যাবে।
    ভোরবেলা ঘুমাল।

    রবিবার সকালে গেল।

    শাহেদ আগে থেকেই ছিল।
    চায়ের দোকানের কোণার টেবিলে।
    সাদা পাঞ্জাবি পরা।
    উর্দি ছাড়া।

    অনামিকাকে দেখে উঠে দাঁড়াল।
    হাত বাড়াল,
    “আসুন।”
    🪷 🪷 🪷
    — তেইশ —
    অনামিকা বসল।

    সে নিজের অভ্যাসমতো হাসল,
    চঞ্চল ভাব দেখাল,
    বলল,
    “এই দোকানে আগে আসিনি।”

    শাহেদ বলল,
    “চা ভালো এখানে।”

    চা এলো।
    কথা হলো।

    শাহেদ প্রথম কিছু ক্ষণ এটা ওটা বলল।
    কিন্তু সে লক্ষ্য করল শাহেদ তাকে সরাসরি দেখছে।
    মানে, চোখের দিকে তাকাচ্ছে।

    সে সরিয়ে দিল চোখ।

    “কী হয়েছে?” শাহেদ জিজ্ঞেস করল।
    “কিছু না।”
    “না, কিছু একটা হয়েছে।”

    শাহেদ বলল,

    “আমি জিজ্ঞেস করছি না
    আপনি কী করেন।
    জিজ্ঞেস করছি,
    আপনি কেমন আছেন।”

    দুটো বাক্যের পার্থক্য
    অনামিকার বুকে গিয়ে লাগল।

    সে কিছু বলতে পারল না।

    শাহেদ বলল,
    “উত্তর দিতে হবে না।”

    সে আগেও একবার বলেছিল এটা।

    অনামিকার চোখে পানি এলো।
    সে দ্রুত সরিয়ে নিল।

    “চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
    🪷 🪷 🪷
    — চব্বিশ —
    দেখা শেষে ফিরে এসে
    অনামিকা অনেকক্ষণ বসে থাকল ঘরে।

    শাহেদ কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
    শুধু কথা বলেছে।
    শুনেছে।

    চলে যাওয়ার সময় বলেছে,
    “আবার কথা হবে।”

    অনামিকা ভাবল,
    এই লোক কেন এভাবে করে?
    কী পাবে এতে?

    তারপর ভাবল,
    হয়তো পুলিশ হিসেবে কিছু একটা মাথায় আছে।

    না।

    সে এমনভাবে কথা বলে না
    যেন কিছু জানতে চায়।

    কিন্তু সে তো কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না।

    কারণ সে পারে না।
    🪷 🪷 🪷
    — পঁচিশ —
    এরপর থেকে শাহেদের সাথে কথা একটু বেশি হলো।

    অনামিকা মাঝে মাঝে নিজের কথা একটু বলল।
    বলল, ছোটবেলায় গ্রামে ছিল।
    মা-বাবার সাথে সম্পর্ক ভালো না।
    একা থাকে।

    শাহেদ শুনল।
    জিজ্ঞেস করল না কেন সম্পর্ক ভালো না।

    একদিন অনামিকা বলল,
    “আমি ছোটবেলায়
    একটা দুর্ঘটনায় পড়েছিলাম।”

    “কী ধরনের?”
    “চুলায় পড়ে।
    পুড়ে গিয়েছিলাম।”
    “ওহ। কোথায়?”

    অনামিকা থামল।

    “পায়ে।
    উরুতে।”

    “এখনো দাগ আছে?”
    “হ্যাঁ।”

    শাহেদ বলল,
    “পোড়ার দাগ থাকে।
    এটাই স্বাভাবিক।”

    অনামিকা চুপ থাকল।

    শাহেদ আর কিছু বলল না।

    এই না বলাটা অনামিকার কাছে অদ্ভুত লাগল।

    সে অপেক্ষা করছিল কোনো প্রতিক্রিয়ার জন্য।
    সরে যাওয়ার জন্য।
    বিব্রত হওয়ার জন্য।

    কিন্তু শাহেদ বলল,
    “আপনি কি এখন জিমে যান?”
    🪷 🪷 🪷
    — ছাব্বিশ —
    পরদিন অনামিকা জিমে গেল।

    মিতু আপা দেখলেন,
    “এলে!
    কোথায় ছিলে এতদিন?”

    “শরীর ভালো ছিল না।”
    “এখন ভালো?”
    “হচ্ছে।”

    ওয়ার্ক আউট শেষে মিতু আপা বললেন,
    “জানো, তোমার মতো নিয়মিত কেউ
    হঠাৎ আসা বন্ধ করলে চিন্তা হয়।”

    অনামিকা বলল,
    “আমাকে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।”

    মিতু আপা বললেন,
    “কেন নেই?”

    অনামিকা উত্তর দিল না।

    মিতু আপা বললেন,
    “চিন্তা করা মানে সম্পর্ক।
    সম্পর্ক মানেই চিন্তা।”

    অনামিকা ব্যাগ তুলে বের হয়ে গেল।
    বাইরে এসে দাঁড়াল।

    মিরপুরের রাস্তায় গাড়ির শব্দ।
    মানুষজন যাচ্ছে।

    মিতু আপার কথাটা তার মাথায় ঘুরতে থাকল।

    সম্পর্ক মানেই চিন্তা।

    সে কি কখনো কারো সাথে সম্পর্কে ছিল?
    সত্যিকার সম্পর্কে?
    🪷 🪷 🪷
    — সাতাশ —
    একদিন রাতে সে লিখল,
    “আমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।”

    শাহেদ লিখল,
    “বলুন।”

    অনামিকা টাইপ করতে শুরু করল।
    তারপর থেমে গেল।
    মুছে দিল।

    “পরে বলব।”
    “ঠিক আছে।”

    পরের দিন সকালে উঠে অনামিকা Facebook দেখল।

    একটা post দিল।
    ছবি দিল না।
    শুধু লিখল:

    “মাঝে মাঝে মনে হয়
    নিজের সাথেই সবচেয়ে বেশি অপরিচিত।”

    কয়েক মিনিটে শাহেদ react দিল।
    হার্ট।
    কমেন্ট করল না।

    কিন্তু একটু পরে message করল,
    “post টা দেখলাম।”
    “হ্যাঁ।”
    “সত্যি লিখেছেন।”
    “হ্যাঁ।”

    শাহেদ লিখল,
    “আমিও নিজেকে অনেকদিন চিনতাম না।
    এখনো পুরো চিনি না।”

    অনামিকা লিখল,
    “আপনি সবসময় কীভাবে এত সহজ থাকেন?”

    শাহেদ একটু চুপ থেকে লিখল,

    “সহজ না।
    শুধু লুকাই না।”

    এই বাক্যটা অনামিকার মাথায় থাকল।

    লুকাই না।

    সে লুকায়।
    প্রতিদিন।
    প্রতিটা মুহূর্তে।
    🪷 🪷 🪷
    — আটাশ —
    আরেকদিন দেখা হলো।

    শাহেদ বলল কাজের কথা।
    কীভাবে মাঝে মাঝে মনে হয় কাজটা অর্থহীন।
    মানুষকে সামলাতে সামলাতে ক্লান্ত লাগে।

    অনামিকা বলল,
    “আপনার মনে হয় অর্থহীন?”
    “মাঝে মাঝে। আপনার কাজ কেমন?”

    অনামিকা থামল।
    তারপর বলল,
    “আমার কাজ…
    আমি মানুষদের সামলাই।”
    “কীভাবে?”
    “কথা বলে।
    মনোযোগ দিয়ে।”

    শাহেদ বলল,
    “সেটাও একটা কাজ।”

    অনামিকা বলল,
    “আপনি কি জানেন
    আমি আসলে কী করি?”

    শাহেদ একটু চুপ থাকল।
    তারপর বলল,
    “সরাসরি জিজ্ঞেস করিনি।”
    “কেন?”
    “কারণ আপনি বলতে চাইলে বলতেন।”

    অনামিকা তার চায়ের কাপ ধরে রইল দুহাতে।
    বাইরে রিকশার শব্দ।

    সে বলল,
    “আমি একটা হোটেলে কাজ করি।
    কিন্তু সেটা অফিসের কাজ না।”

    শাহেদ কিছু বলল না।

    অনামিকা তার দিকে তাকাল।

    “বুঝলেন?”
    “হ্যাঁ।”
    “এখন?”

    শাহেদ বলল,
    “এখন চা শেষ হয়ে গেছে।
    আরেক কাপ নেব?”
    🪷 🪷 🪷
    — উনত্রিশ —
    ফেরার পথে অনামিকার মাথায় শুধু একটা চিন্তা।

    সে জানে।
    কিছু বলেনি।
    কিন্তু সে জানে।

    এরপর সে চলে যাবে।
    নিশ্চয়ই।

    কারণ সবাই যায়।
    কারণ সে স্বাভাবিক না।
    কারণ দাগটা আছে,
    কারণ কাজটা আছে।

    সে অপেক্ষা করতে থাকল।

    রাতে message করল,
    “আজকে কথা বলার জন্য ধন্যবাদ।”

    শাহেদ লিখল,
    “ধন্যবাদ দিচ্ছেন কেন?”
    “কারণ আপনি… কিছু বলেননি।”
    “কী বলার ছিল?”

    অনামিকা লিখল,
    “অনেক কিছু।”

    শাহেদ লিখল,
    “আপনি যা বলেছেন
    সেটা আপনার জীবনের একটা অংশ।
    সেটা নিয়ে আমার কিছু বলার অধিকার নেই।”

    অনামিকা ফোন নামিয়ে রাখল।

    সে কাঁদছে।

    কিন্তু এবার অন্য রকম কান্না।

    এবার কষ্টের জন্য না।
    এবার অবাকের জন্য।
    🪷 🪷 🪷
    — ত্রিশ —
    Facebook-এ সে scroll করতে করতে দেখল কিছু post।

    কারো বিয়ের ছবি।
    কারো বাচ্চার ছবি।
    কারো ভ্রমণের ছবি।

    সবাই স্বাভাবিক।

    সে তাকিয়ে থাকল।

    এই মানুষগুলো কি জানে কত ভাগ্যবান তারা?
    কত স্বাভাবিকভাবে বেঁচে আছে?

    তারপর ভাবল,
    আমি কি কখনো এভাবে বাঁচতে পারব?

    উত্তর জানা নেই।
    🪷 🪷 🪷
    — একত্রিশ —
    শাহেদ একদিন বলল,
    “আপনি কি কখনো এই কাজ ছেড়ে দিতে চেয়েছেন?”

    অনামিকা থামল।
    সত্যি কথা বলল,
    “চেয়েছি।”

    “কিন্তু?”
    “কিন্তু কোথায় যাব?
    কী করব?”

    শাহেদ বলল,
    “এই প্রশ্নের উত্তর এখনই জানতে হবে না।”

    “না জানলে কীভাবে ছাড়ব?”

    “প্রথমে ছাড়তে চাওয়াটা থাকুক।
    উত্তর পরে আসবে।”

    অনামিকা হাসল।
    “আপনি খুব সহজ করে বলেন।”

    “সহজ না। শুধু সরল।”
    “একই কথা।”

    “না।
    সহজ মানে কঠিন জিনিস নেই।
    সরল মানে কঠিন জিনিসকে
    সরলভাবে দেখার চেষ্টা।”

    অনামিকা এই কথাটা মনে রাখল।
    🪷 🪷 🪷
    — বত্রিশ —
    কয়েক মাস পরে।

    অনামিকার জীবনে এখনো হোটেল আছে।
    এখনো কাস্টমার আছে।
    এখনো দাগটা আছে।

    কিন্তু কিছু একটা বদলেছে।

    সে এখন মাঝে মাঝে দাগটার দিকে তাকায়।
    আয়নায়।

    তাকিয়ে বলে না,
    “এটাই সমস্যা।”

    বলে,

    “এটা আমার।”

    এই বলাটা তৈরি হতে সময় লেগেছে।
    🪷 🪷 🪷
    — তেত্রিশ —
    জিমে মিতু আপার সাথে একদিন কথা হলো একটু বেশি।

    মিতু আপা বললেন,
    “তুমি কি ঠিক আছ?”

    এবার অনামিকা বলল,
    “হচ্ছে।”

    মিতু আপা বললেন,
    “এটাই যথেষ্ট।”

    অনামিকা তাকাল।
    “মানে?”

    “মানে, ‘হচ্ছে’ মানে তুমি চেষ্টা করছ।
    এটাই যথেষ্ট।”
    🪷 🪷 🪷
    — চৌত্রিশ —
    একদিন রাতে শাহেদ বলল,
    “আমি একটা কথা বলতে চাই।”
    “বলুন।”

    “আমি আপনার সাথে কথা বলতে চাই
    কারণ আপনি আমার কথা শোনেন।
    এটা সত্যি।
    কিন্তু আরেকটা কারণও আছে।”

    অনামিকা থামল।
    বুকের ভেতরে সেই পুরোনো ভয়।

    “কী কারণ?”

    “আমি মনে করি আপনি ভালো মানুষ।”

    অনামিকা কিছু বলল না।

    শাহেদ বলল,
    “আপনি হয়তো বিশ্বাস করেন না।
    কিন্তু এটা সত্যি।”

    অনামিকা অনেকক্ষণ চুপ থাকল।

    তারপর লিখল,
    “আমি নিজেকে ভালো মানুষ মনে করি না।”

    “কেন?”

    “কারণ আমি যা করি সেটা…”

    “সেটা আপনার পরিস্থিতি।
    আপনি কে,
    সেটা শুধু আপনার কাজ না।”

    “মানুষ তো কাজ দিয়েই বিচার করে।”

    “কিছু মানুষ করে।
    কিন্তু সবাই না।”

    অনামিকা লিখল,
    “আপনি পুলিশ।
    আপনার তো…”

    “আমি পুলিশ হওয়ার আগে মানুষ।”
    🪷 🪷 🪷
    — পঁয়ত্রিশ —
    এই কথাগুলো লেখায় লিখে রাখা সম্ভব না।

    অনামিকা রাতে শোয়ার সময় এগুলো মনে করে।

    সে পুরো বিশ্বাস করে না।
    এখনো।

    মাঝে মাঝে রাতে ভাবে,
    শাহেদ একদিন জানবে সব।
    তারপর চলে যাবে।
    এটাই হবে।

    কিন্তু এই ভাবনাটা আগের মতো অন্ধকার না।

    কারণ সে বুঝতে পারছে,
    এই ভাবনাটা তার মাথার ভেতরের পৃথিবী থেকে আসছে।

    সেই পৃথিবী
    যেখানে সে বারো বছর বয়স থেকে আটকে আছে।

    বাইরের পৃথিবীতে হয়তো অন্যরকম।
    🪷 🪷 🪷
    — ছত্রিশ —
    Facebook-এ একদিন সে একটা post দিল।

    ছবি সহ।
    নিজের ছবি।
    মুখের ছবি, সরাসরি।

    ফিল্টার নেই।

    লিখল,
    “আজকে একটু ভালো আছি।”

    শাহেদ প্রথম react করল।

    মিতু আপা কমেন্ট করলেন,
    “এই হাসিটা দেখতে চেয়েছিলাম।”

    অনামিকা কমেন্ট পড়ল।
    কাউকে reply করল না।

    কিন্তু হাসল।

    একা ঘরে,
    বিকেলের আলোয়,
    সে হাসল।

    এই হাসিটা পারফর্মেন্স না।
    🪷 🪷 🪷
    — সাতত্রিশ —
    হোটেলে একদিন একটা কাস্টমার এলো।
    বয়স্ক, ভদ্র চেহারা।

    তারপর সেই মুহূর্তে দাগটা দেখে ফেলল।

    “এটা কী?”

    অনামিকা বলল,
    “পোড়ার দাগ।”

    লোকটা বলল,
    “ওহ।”

    থামল একটু।

    তারপর বলল,
    “ছোটবেলায় হয়েছিল?”
    “হ্যাঁ।”

    লোকটা আর কিছু বলল না।
    চলে যাওয়ার সময় বলল,
    “পরের বার আসব।”

    এল কিনা সেটা গুরুত্বপূর্ণ না।

    গুরুত্বপূর্ণ হলো
    অনামিকা এবার কাঁপেনি।

    এবার সে বলেছে সরাসরি,
    পোড়ার দাগ।

    কোনো ব্যাখ্যা নেই,
    কোনো লুকানো নেই।

    ছোট একটা পরিবর্তন।
    🪷 🪷 🪷
    — আটত্রিশ —
    শাহেদের সাথে এখন মাঝে মাঝে দেখা হয়।
    চায়ের দোকানে।
    কখনো পার্কে।
    কথা হয়।

    একদিন হাঁটতে হাঁটতে শাহেদ বলল,
    “আপনি কি কখনো ভেবেছেন কী করতে চান?”

    “মানে ভবিষ্যতে?”
    “হ্যাঁ।”
    “ভাবিনি।”
    “ভাবুন।”

    অনামিকা হাঁটতে হাঁটতে বলল,
    “আমি মানুষের কথা শুনতে পারি।
    এটা জানি।”
    “হ্যাঁ, পারেন।”
    “কিন্তু এটা দিয়ে কী হয়?”

    শাহেদ বলল,
    “অনেক কিছু হয়।”

    অনামিকা বলল,
    “আপনি কি চান আমি কাজ ছেড়ে দিই?”

    শাহেদ থামল।
    সত্যি কথা বলল,
    “চাই।
    কিন্তু আমার চাওয়াটা বিষয় না।
    আপনি কী চান?”

    অনামিকা উত্তর দিল না সেদিন।

    কিন্তু রাতে ঘরে এসে ভাবল।

    আমি কী চাই?

    প্রশ্নটা নতুন।

    সে যা চেয়েছে সারাজীবন সেটা হলো,
    স্বাভাবিক থাকতে।
    মানুষ যেন তাকে স্বাভাবিক ভাবুক।

    কিন্তু এই চাওয়াটা আসলে ভয় থেকে।
    দেখে ফেলবে এই ভয় থেকে।

    সত্যিকারের চাওয়া কী?

    সে জানে না।

    কিন্তু এই না জানাটাও
    এখন আগের মতো অন্ধকার না।
    🪷 🪷 🪷
    — উনচল্লিশ —
    একদিন মিতু আপা বললেন,
    “তুমি কি কাউন্সেলিং করেছ কখনো?”
    “না।”
    “একবার করো। একটু ভালো লাগতে পারে।”

    অনামিকা বলল,
    “আমার কী সমস্যা আছে নাকি?”

    মিতু আপা বললেন,
    “সমস্যা থাকলেই কাউন্সেলিং করতে হয় না।
    নিজেকে বুঝতেও কাজ করে।”

    অনামিকা ভাবল।
    তারপর বলল,
    “ঠিক আছে।”

    মিতু আপা একটা নম্বর দিলেন।
    “এখানে ফোন করো।
    আমার পরিচিত।”
    🪷 🪷 🪷
    — চল্লিশ —
    কাউন্সেলরের কাছে প্রথমদিন অনামিকা কিছু বলতে পারেনি।

    মহিলা, বয়স পঞ্চাশের মতো,
    নরম গলায় কথা বলেন।

    “কী নিয়ে কথা বলতে চান?”

    অনামিকা বলল,
    “জানি না।”

    “ঠিক আছে।
    তাহলে শুরু করি
    আপনি কেমন আছেন সেটা দিয়ে।”

    এক ঘণ্টা কথা হলো।
    অনামিকা বেশি বলল না।
    কিন্তু শুনল।

    কাউন্সেলর বললেন,
    “আপনার মধ্যে একটা বিশ্বাস আছে
    যে আপনি যথেষ্ট না।
    এটা কোথা থেকে এসেছে জানেন?”

    অনামিকা বলল,
    “ছোটবেলা থেকে।”
    “কোনো ঘটনা?”
    “অনেক।”
    “একটা বলুন।”

    অনামিকা মায়ের চোখ সরানোর কথা বলল।

    কাউন্সেলর শুনলেন।
    কিছু বললেন না প্রথমে।

    তারপর বললেন,
    “সেই মুহূর্তে আপনি কী বুঝেছিলেন?”

    “বুঝেছিলাম আমি সমস্যা।”

    “আপনি ছিলেন না।
    পরিস্থিতিটা ছিল।”

    অনামিকা চুপ থাকল।

    “এই দুটো জিনিস আলাদা।”
    🪷 🪷 🪷
    — একচল্লিশ —
    বাড়ি ফেরার পথে অনামিকার চোখ ভেজা।

    সে কাঁদছে না।
    চোখ শুধু ভেজা।

    পরিস্থিতি আর মানুষ আলাদা।

    সে সারাজীবন ভেবেছে সে সমস্যা।

    কিন্তু হয়তো পরিস্থিতিটা সমস্যা ছিল।

    হয়তো দাগটা,
    কাজটা,
    একাকীত্বটা
    সবই পরিস্থিতি।

    সে কে সেটা এখনো পুরোপুরি জানে না।

    কিন্তু হয়তো জানার চেষ্টা করা যায়।

    রাতে শাহেদকে বলল,
    “আজকে কাউন্সেলরের কাছে গিয়েছিলাম।”
    “কেমন গেল?”
    “অদ্ভুত। কিন্তু ভালো।”
    “আবার যাবেন?”
    “হ্যাঁ।”

    শাহেদ বলল,
    “ভালো করলেন।”

    অনামিকা লিখল,
    “আপনি কি জানতেন আমার এটা দরকার ছিল?”

    “না।
    কিন্তু মনে হয়েছিল
    আপনার নিজের সাথে কথা বলা দরকার।”

    “নিজের সাথে কথা বলা মানে?”

    “নিজেকে জানা।”
    🪷 🪷 🪷
    — বিয়াল্লিশ —
    অনামিকা ফোন নামিয়ে রাখল।

    বাইরে রাত।
    মিরপুরের শব্দ কমে আসছে।
    কুকুর ডাকছে দূরে।

    সে চোখ বন্ধ করল।

    নিজেকে জানা।

    সে কে?

    উত্তর একদিনে আসে না।
    🪷 🪷 🪷
    — তেতাল্লিশ —
    কয়েক মাস পরেও অনামিকার জীবনে হোটেল আছে।

    কিন্তু সে এখন ভাবছে কতদিন থাকবে।

    কাউন্সেলরের সাথে নিয়মিত কথা হচ্ছে।
    ধীরে ধীরে বলছে।

    মায়ের কথা,
    দাগের কথা,
    ভয়ের কথা।

    কাউন্সেলর একদিন বললেন,
    “আপনি মানুষের সাথে ভালো কথা বলতে পারেন।
    এটা কাজে লাগানো যায়।”

    “কীভাবে?”

    “পরে ভাবা যাবে।
    এখন শুধু নিজেকে একটু বেশি জানুন।”
    🪷 🪷 🪷
    — চৌচল্লিশ —
    শাহেদের সাথে সম্পর্কটা কী
    সেটা অনামিকা জানে না।

    বন্ধু?
    বেশি কিছু?
    কম কিছু?

    সে সরাসরি জিজ্ঞেস করেনি।
    শাহেদও বলেনি।

    কিন্তু একদিন শাহেদ বলল,
    “আমি চাই আপনি ভালো থাকুন।”

    “কেন?”

    “কারণ আপনি গুরুত্বপূর্ণ।”

    “কার কাছে?”

    শাহেদ বলল,
    “নিজের কাছে হওয়াটা দরকার।
    সেটাই আগে।”

    অনামিকা বলল,
    “নিজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কীভাবে হয়?”

    শাহেদ হাসল।

    “আমিও পুরো জানি না।
    কিন্তু আপনি শুরু করেছেন।
    এটাই যথেষ্ট।”
    🪷 🪷 🪷
    — পঁয়তাল্লিশ —
    একদিন সন্ধ্যায় হোটেলে যাওয়ার আগে
    অনামিকা দাঁড়াল।

    নীল ব্যাগ কাঁধে।
    সামনে রাস্তা।

    সে একটু থামল।

    ভাবল,
    আরেকটু সময় লাগবে।

    কিন্তু একদিন এই পথে আর আসব না।

    এই ভাবনাটা নতুন।

    আগে ভাবত,
    “এই পথেই থাকব
    কারণ আর কোথাও যাওয়ার নেই।”

    কারণ সে স্বাভাবিক না,
    কারণ দাগটা আছে।

    কিন্তু এখন ভাবছে,

    “একদিন যাব না।”

    এই পার্থক্যেটা ছোট মনে হয়।

    কিন্তু পুরো পৃথিবীর তফাৎ।
    🪷 🪷 🪷
    — ছেচল্লিশ —
    রাতে ফিরে ফোন দেখল।
    শাহেদের message,
    “ক্লান্ত?”

    সে লিখল,
    “একটু।”
    “বিশ্রাম নিন।”

    তারপর লিখল,

    “শাহেদ ভাই।”
    “বলুন।”

    “আমি একদিন এই কাজ ছেড়ে দেব।”

    শাহেদ কিছু ক্ষণ চুপ থাকল।

    তারপর লিখল,
    “জানি।”

    “কীভাবে জানেন?”

    “কারণ আপনি এখন
    নিজেকে একটু দেখতে পাচ্ছেন।”

    অনামিকা লিখল,
    “খুব কম।”

    “কমই শুরু।”
    🪷 🪷 🪷
    — উপসংহার —

    এটাই অনামিকার গল্প।

    শেষ হয়নি।
    শেষ হওয়ার কথা না।

    সে এখনো মিরপুরের টিনশেড ঘরে থাকে।
    এখনো জিম করে।
    এখনো হোটেলে যায়।

    কিন্তু এখন সে মাঝে মাঝে থামে।
    নিজেকে দেখে।
    ভাবে।

    দাগটা এখনো আছে।
    কালো,
    কুচকানো।
    পুরোনো আগুনের স্মৃতি।

    কিন্তু সেই দাগটা এখন
    আর তার পুরো পরিচয় না।

    সে অনামিকা।

    নাম আছে।

    বারো বছর বয়সে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল,
    কিন্তু এখন খুঁজছে।

    খোঁজাটা শুরু হয়েছে।

    এটাই যথেষ্ট।
    🪷 🪷 🪷

    Facebook-এ আজকে সে একটা post দিল।

    নিজের ছবি।
    মুখের ছবি।
    হাসছে।

    সত্যিকারের হাসি।

    লিখল,

    “নামী আক্তার।
    কাজ হচ্ছে।”

    শাহেদ react দিল।
    মিতু আপা কমেন্ট করলেন,
    “ভালোবাসা।”

    অনামিকা ফোন রেখে জানালার পাশে দাঁড়াল।

    মিরপুরের আকাশে রাতের আলো।
    রিকশার শব্দ।
    কোথাও কেউ হাসছে।

    সে জানে না সামনে কী হবে।

    কিন্তু এই মুহূর্তে সে আছে।

    এটাই সত্যি।
    🪷 🪷 🪷

    অনামিকা মানে যার কোনো নাম নেই।
    কিন্তু সে নিজেই নিজেকে নাম দিয়েছে নামী।
    নাম আছে এমন।

    — ৬ জানুয়ারী

    3
    2 Comments
Skip to toolbar