-
রহমত মিয়াদের কাঁদতে নেই
মানুষটা বসে আছে। প্রতিদিনের মতই বসে আছে। মাথাটা সামান্য নুয়ে, দুই হাঁটুর মাঝখানে টিনের পুরোনো বাক্সটা রেখে জুতার সোলের ওপর সুঁই চালিয়ে যাচ্ছে। দেখলেই মনে হবে, এই পৃথিবীতে তার কোনো দুঃখ নেই। কোনো তাড়া নেই। যেন এই ফুটপাথের এক কোণেই তার সমস্ত জীবন থেমে আছে।
কিন্তু ভালো করে তাকালে ভুলটা ভেঙে যায়। লোকটার গায়ের রং কুচকুচে কালো। মুখভরা খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি। চোখের নিচে কালি জমে আছে। কপালের ভাঁজগুলো এত গভীর যে মনে হয় বছরের পর বছর দুঃখ সেখানে বাসা বেঁধে আছে। বয়স পঞ্চান্ন হবে। তবে তাকে দেখে আরো বেশি মনে হয়।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনের এই ফুটপাথেই তার সংসার। এই দেয়ালের গায়েই সে প্রায় পঁচিশ বছর ধরে বসে। একটা ছোট কাঠের পিঁড়ি, একটা টিনের বাক্স, কিছু সুই, সুতা, হাতুড়ি আর পেরেক—এই তার সম্বল।
লোকটার নাম রহমত মিয়া। অবশ্য এই শহরে তাকে ওই নামে কেউ চেনে না। সবাই ডাকে মুচি। এই মুচি, জুতা ঠিক করবা? এই বুড়া, কত লাগব? এত বছর ধরে ডাক শুনতে শুনতে সে নিজেও যেন নিজের নামটা ভুলে গেছে।
তবে তারও তো একটা নাম ছিল। একটা ঘর ছিল। একটা উঠোন ছিল। একটা সংসার ছিল। সেই সংসারে একজন মানুষ ছিল, যে তাকে রহমত বলে ডাকত।
ডাকটা মনে পড়তেই সুঁই চালানো হাতটা হঠাৎ থেমে গেল। আস্তে করে মাথা তুলল সে। রাস্তার ওপাশে মানুষ ছুটছে। রিকশা যাচ্ছে। চায়ের দোকানে ভিড় বাড়ছে। পৃথিবী আগের মতই চলছে। শুধু তার পৃথিবীটা অনেক আগেই থেমে গেছে।
অনেক বছর আগে নদীর পাড়ের একটা গ্রামে তার দুই বিঘা জমি ছিল। বাপ-দাদার ভিটে ছিল। উঠোনের এক পাশে একটা কদম গাছ ছিল। বর্ষার দিনে সেই গাছের নিচে বসে তার বউ আয়েশা ধান শুকাত। সন্ধ্যা নামলে চুলা থেকে ধোঁয়া উঠত। পুকুর থেকে হাঁস ফিরত। আর ছোট্ট মেয়ে সখিনা খালি পায়ে দৌড়ে এসে বাবার গলা জড়িয়ে ধরত।
সুখ খুব বড় কিছু ছিল না। তবু ছিল। গরিব মানুষের সুখগুলো এমনই হয়। খুব ছোট। কিন্তু খুব আপন।
তারপর একদিন নদী রাগ করল। প্রথমে জমির একপাশ ভাঙল। পরের বছর উঠোনের খানিকটা। তারও পরের বছর ঘরটা। শেষে এমন একদিন এল, যেদিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রহমত মিয়া দেখল, তার বাপ-দাদার ভিটেটা কালো পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।
সেদিন আয়েশা অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। রাতে ভাত খেতে খেতে আস্তে করে বলেছিল, চলো শহরে যাই। রহমত মিয়া অবাক হয়ে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। কই যামু? আয়েশা মৃদু হেসে বলেছিল, যেইখানে দুইডা ভাত পাই।
সেই রাতেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল।শহরে আসার পর শুরু হয়েছিল আরেক যুদ্ধ। ফুটপাতে ঘুমানো, স্টেশনে রাত কাটানো, কখনো একবেলা খেয়ে থাকা, কখনো না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়া। আয়েশা লোকের বাসায় কাজ নিল। রহমত মিয়া পুরোনো জুতা সেলাই করা শিখল।
দিনের শেষে তারা বসে হিসাব করত। আজ কয় টাকা হইল? কখনো ত্রিশ, কখনো চল্লিশ, কখনো তারও কম। হিসাব মিলত না। তবু আয়েশা হাসত। বলত, গরিবের জীবন নদীর মত রে। কূল ভাঙে, আবার কূলও গড়ে।
কথাটা শুনে রহমত মিয়া স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত। এত কষ্টের মাঝেও মানুষটা কেমন করে হাসতে পারে! কিন্তু সেই হাসিটাও একদিন ফিকে হয়ে গেল।
প্রথমে শুকনা কাশি। তারপর জ্বর। তারপর কাশি দিতে দিতে মুখ দিয়ে রক্ত বের হলো।
সেদিন রহমত মিয়া ভয়ে কেঁপে উঠেছিল। বলেছিল, চলো, ডাক্তার দেখাই।
আয়েশা তখনো মৃদু হেসেছিল। ডাক্তার কি ফ্রি দেখব? এই টেকা দিয়া আগে চাল কিনো।
কথাটা শুনে রহমত মিয়া আর কিছু বলতে পারেনি। শুধু স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল।
ঠিক তখনই আরেক বিপদ নেমে এল। সখিনা গার্মেন্টস থেকে ফিরে সেদিন চুপচাপ বসে ছিল। চোখ দুটো লাল। রহমত মিয়া কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই মেয়েটা হঠাৎ কেঁদে ফেলল। বলল, আমার চাকরি নাই আব্বা।
রহমত মিয়ার বুকটা ধক করে উঠল। ক্যান?
সখিনা মাথা নিচু করে বলল, সুপারভাইজার কইছিল, তারে খুশি করলে বেতন বাড়াইব। অফিসের পরে থাকতে কইছিল। আমি রাজি হই নাই। পরে কইছে, কাল থেইকা আমার আর কাজ নাই। কথাগুলো বলেই মেয়েটা দুই হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগল।
রহমত মিয়া কিছু বলল না। শুধু মেয়ের মাথায় হাত রাখল। তার বুকের ভেতর তখন আগুন জ্বলছে। কিন্তু গরিব মানুষের আগুনের কোনো ধোঁয়া হয় না। কেউ দেখে না। কেউ টের পায় না।
সেই রাতে সখিনা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, আব্বা, আমি কি ভুল করছি?
রহমত মিয়া মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল। না মা। তুই ঠিক করছস।
তাহলে আল্লাহ আমাদের লগে এইরকম করে ক্যান?
প্রশ্নটা শুনে রহমত মিয়া চুপ করে ছিল। তার চোখের কোণ ভিজে উঠেছিল। কিন্তু কোনো উত্তর তার জানা ছিল না।
কয়েকদিন পর আয়েশার অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেল। জ্বর আর কমে না। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। পাড়ার এক মহিলা এসে বলল, হাসপাতালে নিয়ে যাও।
হাসপাতালে নিতে গেলেও টাকা লাগে। রিকশা লাগে। ওষুধ লাগে। তবু শেষ পর্যন্ত এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে ধার করে সে আয়েশাকে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেল। হাসপাতালের বারান্দা ভরা মানুষ। কেউ মেঝেতে শুয়ে আছে, কেউ বেঞ্চে বসে আছে, কেউ কাঁদছে। ডাক্তার অনেকক্ষণ পরে এসে দেখে শুধু বলল, অনেক দেরি কইরা আনছেন। অবস্থা ভালো না।
কথাটা শুনে রহমত মিয়ার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। সারারাত সে হাসপাতালের বারান্দায় বসে রইল। সখিনা মায়ের মাথার কাছে বসে ছিল। ভোরের দিকে আয়েশা চোখ মেলে স্বামীর দিকে তাকাল। খুব আস্তে করে বলল, শোনো।
রহমত মিয়া দ্রুত কাছে এগিয়ে গেল। কও।
আয়েশা কষ্ট করে বলল, সখিনারে দেখবা।
দেখমু।
মাইয়াডারে কোনোদিন কষ্ট দিও না। কথাগুলো বলতে তার খুব কষ্ট হচ্ছিল। তারপর সে অনেক কষ্টে মৃদু হাসল। বলল, তুমি অনেক ভালো মানুষ আছিলা। তোমারে কিছুই দিতে পারলাম না।
রহমত মিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না। কাঁপা গলায় বলল, এইসব কইও না সখিনার মা।
কিন্তু আয়েশা তখন দূরে কোথাও তাকিয়ে আছে। কয়েক মুহূর্ত পর তার হাতটা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে গেল। হাসপাতালের বারান্দায় বসে রহমত মিয়া বুঝতে পারল, তার পঁয়ত্রিশ বছরের সংসার শেষ হয়ে গেছে।
কিন্তু দুঃখেরও আবার নিচতলা থাকে। ডাক্তার চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর একজন লোক এসে বলল, লাশ নিয়া যান।
রহমত মিয়া ফ্যালফ্যাল করে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল। কই নিমু?
লোকটা অবাক হয়ে বলল, দাফন করেন।
রহমত মিয়ার ঠোঁট কেঁপে উঠল। ট্যাকা নাই।
লোকটা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, কবর দেওনেরও টাকা নাই?
রহমত মিয়া মাথা নিচু করে বসে রইল। সত্যিই তার কাছে একটা কাফনের কাপড় কেনার টাকাও ছিল না। সখিনা তখন মায়ের মৃতদেহের পাশে বসে কাঁদছে। বারবার বলছে, আব্বা, আম্মারে বাসায় লইয়া যাই।
রহমত মিয়া শুধু মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। কেমনে নিবি মা? কই নিবি? প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর ছিল না।
সন্ধ্যার দিকে হাসপাতালের বারান্দায় আয়েশার লাশটা কাপড়ে ঢাকা অবস্থায় পড়ে ছিল। মানুষজন পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। কেউ একবার তাকাচ্ছে, কেউ তাকাচ্ছেও না। রহমত মিয়া লাশের পাশে বসে ছিল। তার চোখে তখন আর পানি নেই। সব কান্না যেন শুকিয়ে গেছে।
একসময় হাসপাতালের দারোয়ান বের হয়ে এল। এই লাশ কার?
রহমত মিয়া কাঁপা গলায় বলল, আমার বউ।
তাহলে নিয়া যান।
পারুম না।
ক্যান?
কবর দেওনের টেকা নাই।
দারোয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ভেতরে চলে গেল।
একটু পর দুজন লোক নিয়ে ফিরে এল। তারা বলল, বেওয়ারিশ হিসেবে রাখি, পরে ব্যবস্থা হবে।
কথাটা শুনেই রহমত মিয়ার বুকের ভেতরটা যেন ছিঁড়ে গেল।
পঁয়ত্রিশ বছর যার সঙ্গে এক থালায় ভাত খেয়েছে, যার সঙ্গে সুখ-দুঃখের জীবন কেটেছে, যার কোলে তার সন্তান বড় হয়েছে, সেই মানুষটাই আজ বেওয়ারিশ হয়ে গেছে!
লোকগুলো যখন আয়েশার লাশটা স্ট্রেচারে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন রহমত মিয়া হঠাৎ দৌড়ে গিয়ে কাপড়ের ওপর হাত রাখল। আয়েশা… তার গলা ভেঙে গেল। একবার মুখটা দেখি…
কেউ কিছু বলল না। স্ট্রেচারটা ধীরে ধীরে ভেতরে চলে গেল।
রহমত মিয়া অনেকক্ষণ হাসপাতালের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, পৃথিবীতে তার আর কেউ নেই।
পরদিন ভোরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে, সেই পুরোনো দেয়ালের পাশে, রহমত মিয়া আবার এসে বসে পড়ল। পেটের ক্ষুধা মানুষের শোকের চেয়েও বড়। টিনের বাক্সটা খুলল। সুইতে সুতা পরাতে গিয়ে হাত কাঁপছিল।
ঠিক তখন একজন লোক এসে বলল, এই মুচি, জুতাটা সেলাই করে দাও তো।
রহমত মিয়া আস্তে করে মাথা তুলল। তার চোখ দুটো লাল, মুখ শুকনো। সে খুব ধীরে বলল, দেন স্যার।
লোকটা জুতো খুলে তার সামনে রাখল। রহমত মিয়া জুতোটাকে কোলে তুলে নিল। তারপর সুঁইটা চামড়ার ভেতর ঢুকিয়ে দিল। একটা সেলাই। আরেকটা সেলাই। তার মনে হলো, সে জুতো না, নিজের বুকটাই সেলাই করছে।
রাস্তার মানুষ ছুটছে। অফিস খুলছে। চায়ের দোকানে ভিড় বাড়ছে। পৃথিবী আগের মতই চলছে। শুধু রহমত মিয়ার পৃথিবীটা আগের দিন হাসপাতালের সেই দরজার ভেতরে, এক বেওয়ারিশ লাশের সঙ্গে হারিয়ে গেছে। তবু সে বসে আছে। কারণ সে একজন মুচি। আর মুচিদের কাঁদতে নেই। তাতে চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। ঝাপসা চোখে ছেঁড়া জুতো সেলাই করা যায় না।
যদিও নিজের ভাঙা জীবনটাকে সেলাই করার মতো কোনো সুতা তাদের কাছে থাকে না।
(রচনাঃ ২৪ জুন ২০২৬)3 Comments
আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন
ডিজাইনার
স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।
Friends
Shah Fakhrul Islam
@shahfakhrulislam
1 Sen
@1sen
Imamul Islam
@imamul-islam
শায়লা এ্যামিন
@shaylaaemin945gmail-com
saad bin
@saadbin
atif ac
@atifac
আব্দুল্লাহ আল আমিন
@abdullahalamin
Tanvir Ahamed
@tanvirahamed
এইচ আই হামিদ
@h-ihamid



কান্না চাপা রয় বুকে…..🖤