Profile Photo

অয়ন আবদুল্লাহOffline

  • ayoNabdullah140
  • Profile picture of অয়ন আবদুল্লাহ

    অয়ন আবদুল্লাহ

    • 4 months, 1 week ago

    রু মর্গে খুন
    মূল: এডগার এলেন পো
    অনুবাদ: অয়ন আবদুল্লাহ

    পর্ব – ১

    ১৮৪০ সাল, প্যারিস।
    সময়টা ছিল গ্রীষ্মকাল। এখানেই পরিচয় হয় অদ্ভুত সেই যুবক অগাস্ট ডুপিনের সাথে। একটি প্রখ্যাত পরিবারের সন্তান ছিলো সে; পরিবারটি একসময় প্রচুর বিত্তশালী এবং জনপ্রিয় ছিল। যদিও ডুপিনের এসবের ধার ধারতো না। টাকা পয়সার বিষয়ে সে ছিলো উদাসীন; কেবলমাত্র জীবন ধারণের জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় কিছু জিনিষ এবং বই সংগ্রহ ছাড়া তার টাকার দরকার ছিলো না, সম্পত্তির বাকি অংশ নিয়ে সে মাথা ঘামাতো না। শুধুমাত্র বইই ছিলো তার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান।

    আমার সাথে ডুপিনের প্রথম দেখা হয় একটা পুরনো বইয়ের দোকানে। বিশেষ একটি বই, যেটার নাম খুব কম মানুষই জানতো, সেটা সংগ্রহ করার জন্য আমি সেই দোকানে গিয়েছিলাম। সেখানে ডুপিনও এসেছিলো; সেও একই বইয়ের খোঁজ করছিলো। পরবর্তিতে আমাদের আবারো দেখা হলেও কথাবার্তা প্রথম হয় অন্য আরেকটি দোকানে, সেটাও বইয়ের দোকানই ছিলো।

    তার পরিবার নিয়ে আমি খুবই উৎসাহী ছিলাম। তার জ্ঞানের প্রসারতা আর প্রগাঢ়তা দেখে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। সব’চে বড় বিষয় হচ্ছে, তার ক্রিয়াশীল চিন্তাধারা আমার অন্তরের অন্তস্থলে একটা তীব্র আলোর মতো ধাক্কা দিয়ে গিয়েছিলো। আমি এই আশ্চর্য মানুষটির বন্ধু হতে চাইলাম কারণ আমার মনে হচ্ছিলো এইরকম একটি মানুষ আমার জীবনে অনেক দামী কিছুর চাইতেও বেশি কিছু হবে। তাকে আমি আমার অনুভূতির কথা জানালাম এবং অনুরোধ করলাম আমার সঙ্গে থাকার জন্য। সে এই প্রস্তাবে রাজী হলো। আমি চিন্তা করলাম ডুপিন আমার সাথে আসাতে সে আমার বইগুলোর স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে আর আমিও নিঃসঙ্গ জীবন থেকে কিছুটা মুক্তি পাবো।

    আমাদের দিনগুলো বই পড়ে, লেখালেখি করে আর আড্ডাবাজি করে দারুণ কাটছিলো। কিন্তু ডুপিন ছিলো রাতের পুজারী। রাতের বেলা, যদি চাঁদ নাও থাকতো, কেবল তারার আলোয় আমরা দুজন হাঁটতাম প্যারিসের পথে পথে।হাঁটতে হাঁটতে আমরা মাঝে মাঝে কথা বলতাম আবার মাঝে মাঝে চুপ চাপ নিজেরা নিজেদের মতো করে চিন্তা করতাম।

    শীঘ্রই আমি ডুপিনের মধ্যে এক ধরণের যুক্তি- ক্ষমতা লক্ষ্য করলাম, বলা যেতে পারে অসাধারণ যুক্তি- ক্ষমতা। এই ক্ষমতা ব্যবহার করে সে খুব আনন্দ পেত। সে একদিন মুচকি হেসে আমাকে বলেছিলো- বেশিরভাগ মানুষের হৃদয়ে একটা জানালা থাকে, যেটা দিয়ে তারা তাদের আত্মাকে দেখতে পায়।তারপর হঠাৎ আমাকে চমকে দিয়ে সে আমার বিষয়ে বলা শুরু করলো, এমন সব বিষয় যেগুলো আমি ছাড়া আর কেউ জানা তো দূরের কথা আন্দাজই করতে পারবে না। এই সময়গুলোতে সে একদমই শান্ত আর গম্ভীর আচরণ করতো।তার দৃষ্টিতে থাকতো শূন্যতা, মনে হতো যেন অনেক দূরে তাকিয়ে আছে। আর তার কণ্ঠস্বর উচু আর গম্ভীর হয়ে যেত।তখন আমার মনে হতো, একটি নয়, আমি আসলে দুজন ডুপিনকে দেখছি; একজন ধীরস্থিরভাবে সূত্রগুলো জোড়া লাগায় আর অন্যজন ঠিক সেভাবেই সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন করতে থাকে।

    একরাতে আমরা প্যারিসের অন্যতম দীর্ঘ আর নোংরা একটি রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। আমরা দুজনেই যে যার চিন্তায় ডুবেছিলাম, প্রায় পনের মিনিট আমরা কেউই কারো সাথে কথা বলিনি। যেন মনে হচ্ছিলো যে আমরা একজন অন্যজনের উপস্থিতি ভুলে বসে আছি। যাই হোক, অবশেষে আমি বুঝলাম ডুপিন আমকে ভুলে যায়নি। হঠাৎ সে বলে উঠলো, তুমি ঠিকই ভাবছ, সে আসলেই ছোট মানুষ, এটা সত্য। সে আরো বেশি সফল হতো যদি সে আরো সাধারণ মানের কোনো নাটকে অভিনয় করতো।
    আমি বললাম, হ্যা, এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

    প্রথমে আমি এই বিষয়টায় তেমন খেয়াল করলাম না। ডুপিন আমার সঠিক চিন্তা ভাবনার সাথে সহমত, এটা আমার কাছে খুবই স্বাভাবিক লাগলো। আমি কয়েক সেকেন্ড আগের মতোই হাঁটতে থাকলাম আর ভাবতে লাগলাম। তারপর হুট করেই খেয়াল হলো বিষয়টা। ডুপিন এমন একটা বিষয়ে সহমত হয়েছে যেটা স্রেফ একটা চিন্তা হয়ে আমার মনের মধ্যে ছিল, আমি সেটা প্রকাশও করিনি। আমি হাঁটা থামিয়ে ওর দিকে তাকালাম।

    – ডুপিন, বন্ধু, এটা আসলেই আমার চিন্তার বাইরে। কী করে তুমি জানলে যে আমি চিন্তা…
    এটুকু বলেই আমি চুপ করে গেলাম আমার বন্ধুবরের উর্বর মস্তিষ্কের ধার পরীক্ষা করার জন্য।
    – আমি কীভাবে জানলাম যে তুমি চিন্তা করছিলে চেনতিল্লির কথা, এই তো? চেনতিল্লি যেসব নাটকের চরিত্রে অভিনয় করে সে তুলনায় সে অনেক বাচ্চা।
    – হ্যাঁ, আমি এটাই চিন্তা করছিলাম। কিন্তু, ঈশ্বরের দোহাই লাগে, আমাকে সেই পদ্ধতি সম্পর্কে বলো যেটা দিয়ে তুমি আমার মনের ভেতরকার চিন্তার নাগাল পেয়ে যাচ্ছো।
    – ফলবিক্রেতা লোকটি আমাকে সাহায্য করেছে।
    – ফল বিক্রেতা! আমি কোনো ফল বিক্রেতাকে চিনি না!
    – আমি বলতে চাচ্ছি আমরা যখন এই রাস্তায় ঢুকছিলাম, তখন লোকটা তোমার সাথে ধাক্কা খেলো, বেশিক্ষণ না, এই দশ পনের মিনিট আগের ঘটনা। কমও হতে পারে।
    – ওহ, হ্যাঁ হ্যাঁ, তাইতো!! মনে পড়েছে, একজন ফলবিক্রেতা একটা বিশাল আপেলের বাক্স মাথায় নিয়ে ছুটে আসছিলো, আমাকে প্রায় ফেলেই দিয়েছিলো। কিন্তু তার সাথে আমার চেনতিল্লির কথা চিন্তা করার যোগসূত্র কী? যদি থাকেও কীভাবে তুমি সেটা বুঝলে?
    – বলছি, মনযোগ দিয়ে শোনো। তোমার চিন্তাধারাটাকে অনুসরণ করা যাক যেটা ফল বিক্রেতা মারফত আমাদের অভিনেতা চেনতিল্লি পর্যন্ত নিয়ে যাবে। চিন্তাগুলো অবশ্যই এই ধারায় এগিয়েছে; ফল বিক্রেতা- ধাক্কা- পাথরের খোয়া- স্টেরেয়োটমি (বর্ণনামূলক জ্যামিতি) – এপিকোরাস (গ্রিক দার্শনিক)- ওরিয়ন (কালপুরুষ) এবং তারপর সবশেষে চেনতিল্লিআমরা যখন এই রাস্তা দিয়ে ঢুকি, সেই ফল বিক্রেতা লোকটি আমাদেরকে খুব দ্রুত পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় তোমাকে ধাক্কা মেরে বসে। ফলে তুমি পথের পাশে অসমান পাথরের খোয়ার উপর পা ফেলতে বাধ্য হও, দেখতেই পাচ্ছি ব্যাথাও পেয়েছো অনেক। তুমি রেগে রেগে বিড়বিড় করে কারো গুষ্টি উদ্ধার করছিলে আর বারে বারে নিচের দিকে ইটের খোয়ার দিকে তাকাতে তাকাতে হাঁটছিলে। বেশ বুঝতে পারছিলাম যে তখনও তুমি ঐ খোয়া নিয়ে চিন্তা করছিলে।এরপর আমরা যখন ছোট্ট একটা রাস্তায় ঢুকলাম; দেখতে পেলাম সেখানে ইটের খোয়া সুন্দর করে বিছানো হচ্ছে যেগুলো সম্পূর্ণ নতুন আর বিশেষ একটা পদ্ধতিতে টুকরো করা হয়েছে। এই সময়ে তোমার মুখ উজ্জ্বল হলো, তোমার ঠোঁট নড়ছিলো। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে তখন তুমি স্টেরেয়োটমি’ শব্দটা উচ্চারণ করেছো যেটা পাথর কাটার এই নতুন পদ্ধতির নাম। শব্দটা খুব অদ্ভুত, আসলেই! কিন্তু তুমি হয়তো ভুলে গেছো, গতকালই আমরা পত্রিকায় এই বিষয়ে সম্পর্কে পড়েছিলাম। আমার মনে হলো এই স্টেরেয়োটমি তোমাকে প্রাচীন গ্রিক লেখক এপিকোরাসের কথা ভাবাচ্ছে, যে এটমের তত্ত্ব নিয়ে বই লিখেছিলো। তার মতে মহাবিশ্বের সমস্ত কিছুই এই এটম দ্বারা সৃষ্ট।
    খুব বেশিক্ষণ হয়নি আমরা এপিকোরাসের কথা আলোচনা করছিলাম। তার এটমিক ধারণা, যা সে লিখে গেছে প্রায় ২০০০ বছর আগে। আমরা আলোচনা করছিলাম যে ঐ সময়ের পৃথিবী এবং নক্ষত্র নিয়ে ধ্যান- ধারণা যুক্তি- নিরীক্ষা কী দারুণভাবে আজকে ঠিকই মিলে যাচ্ছে। আমি জানতাম তুমি আকাশের দিকে তাকাবে; তাকিয়েওছিলে। তখনই আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে আমি তোমার চিন্তাধারার সাথে তাল মিলিয়ে চলছি। তোমার দেখাদেখি আমিও আকাশের দিকে তাকালাম; দেখলাম আজ আকাশে কালপুরুষ অনেক বেশী উজ্জ্বল আর সুস্পষ্ট। আমি জানতাম তুমিও এটা খেয়াল করবে এবং ওরিয়ন নিয়ে ভাববে।
    এখন আমার চিন্তাধারাটা খেয়াল করো মনোযোগ দিয়ে। এইতো গতকালই পত্রিকায় চেনতিল্লিকে নিয়ে একটা আর্টিকেল ছেপেছিলো। সেটা বলতেই হবে, তার জন্য সুখকর কিছু ছিলো না। লেখক আর্টিকেলে একটা বইয়ের কিছু শব্দ ব্যবহার করেছে, আমরা উভয়েই বইটা পড়েছি। লেখকের সেই শব্দগুলো ছিলো ওরিয়ন বিষয়ে। আমি তাই বুঝে গিয়েছিলাম যে তুমি এই ওরিয়ন আর চেনতিল্লির বিষয়দুটোকে একই সমান্তরালে এনে দাঁড় করাবে। আমি খেয়াল করেছি, তুমি আর্টিকেলের কঠিন কঠিন শব্দগুলো মনে করে মুচকি মুচকি হাসছিলে।
    তারপর আমি খেয়াল করলাম, তুমি যতটা সম্ভব ঋজু হয়ে দাঁড়িয়েছিলে। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে তুমি চেনতিল্লির আকার নিয়ে চিন্তা করছিলে, বিশেষ করে তার উচ্চতা নিয়ে। সে ছোট খাট গড়নের মানুষ। তাই আমি তখন বলেছিলাম যে, সে আসলেই একটা বাচ্চা। এবং সে যদি আরো সাধারণ মানের নাটকে অভিনয় করতো, তাহলে সফল হতো।

    আমি অবশ্যই বলব না যে সেদিন আমি অবাক হয়েছিলাম; বরং বলব যে আমি অনেক বেশি অবাক হয়েছিলাম। আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ডুপিন একদম সঠিক ছিলো, পুরোপুরি সঠিক। এগুলো আদতে আমার চিন্তা ছিল, আমার না বলা চিন্তা, যেগুলো একটা আরেকটার সাথে সংযুক্ত হয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু, এটার চেয়েও বড় চমক আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো, অনেক বড় আর বিস্ময়কর এক চমক।

    এক সকালে এই অদ্ভুত বিস্ময়কর মানুষটি আমাকে আবার তার সেই অভিনব যুক্তিক্ষমতা দেখালো। আমরা শুনলাম, এক বৃদ্ধা আততায়ীর হাতে খুন হয়েছেন। খুনি অথবা খুনিরা তার গলা কেটে ফেলে রাতের আঁধারে পালিয়ে গেছে। কে এই খুনি? কে এই হত্যাকারী? পুলিশের কাছে কোনো জবাব নেই। তারা সবখানে খুঁজে দেখলো কিন্তু তাদের এই কেসে সাহায্যে আসে এমন কিছুই উদ্ধার করতে পারলো না। তারা বুঝতেই পারছে না, কী করবে। হতাশ হয়ে তারা হাত গুটিয়ে বসে রইলো।

    কিন্তু ডুপিন! সে জানে কী করা দরকার!!

    2
    3 Comments
Skip to toolbar