-
স্টেশনের নীরব মানুষটি: বুবির চলে যাওয়া এবং আমাদের হারিয়ে ফেলা মানবিকতা
————————————– পংকজ প্রিয়ম
ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই যে বৃদ্ধা হাতে ঝাড়ু তুলে নিতেন, আজ সেই প্ল্যাটফর্মে নেমেছে অন্যরকম নীরবতা। রেললাইন দুটি আগের মতোই দূরে মিলিয়ে গেছে দিগন্তে, ট্রেনও যথারীতি হুইসেল বাজিয়ে ছুটে চলেছে। শুধু আর নেই সেই ক্ষীণকায় নারী, যাকে সবাই চিনত এক নামে, বুবি।
তার কোনো পদবি ছিল না মানুষের মুখে, কোনো পরিচয়পত্রের পরিচয়ও যেন বড় হয়ে ওঠেনি। তিনি ছিলেন শুধু স্টেশনের মানুষ। যে স্টেশনে হাজারো মানুষ আসে, হাজারো মানুষ চলে যায়, সেখানে একজন মানুষ থেকে গিয়েছিলেন পঁচিশটি দীর্ঘ বছর।
কেউ জানে না তিনি কোথা থেকে এসেছিলেন। হয়তো কোনো একদিন ট্রেনের জানালা দিয়ে হারিয়ে ফেলেছিলেন নিজের পৃথিবী। হয়তো কেউ তাকে খুঁজেছিল, হয়তো কেউ খোঁজেনি। সময় ধীরে ধীরে তার অতীতকে মুছে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত মেথিকান্দা রেলস্টেশনই হয়ে উঠেছিল তার জন্মভূমি, কর্মভূমি, আশ্রয় আর শেষ ঠিকানা।
তিনি কথা বলতে পারতেন না। অথচ প্রতিদিন ঝাড়ুর শব্দেই যেন বলতেন, “এই পৃথিবীটা একটু পরিষ্কার থাকুক।”স্টেশনের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তেই কেটে গেছে জীবনের ঋতুগুলো। মানুষের ফেলে যাওয়া ময়লা সরিয়ে তিনি নিজের জীবনটাকেও গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন।
দোকানদারদের দেওয়া সামান্য পারিশ্রমিক, যাত্রীদের মমতা আর কখনো সখনো ভিক্ষায় পাওয়া কয়েন জমিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন ছোট্ট এক স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের মূল্য ছিল মাত্র চল্লিশ হাজার টাকা।
একজন মানুষের কাছে এটি হয়তো এক মাসের বেতন। কারও কাছে একটি মোবাইল ফোনের দাম। কারও কাছে এক বিকেলের কেনাকাটা। অথচ বুবির কাছে সেটিই ছিল একটি জীবনের সমগ্র সঞ্চয়, অসুস্থ শরীরের ওষুধ, বার্ধক্যের নিরাপত্তা, অনিশ্চিত আগামী দিনের একমাত্র আশ্বাস।
মানুষ বলে, অর্থ মানুষকে বাঁচায়। কিন্তু বুবির ক্ষেত্রে অর্থই তার মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠল। গভীর রাত। চারদিকে নিস্তব্ধতা। ছোট্ট ঘরে নিশ্চয়ই তিনি ভেবেছিলেন, আজও রাত কেটে যাবে অন্য দিনের মতো। কিন্তু সেই রাত ছিল মানুষের মুখোশ ছিঁড়ে ফেলার রাত। কয়েকজন মানুষ তার কাছে টাকা চাইল। তিনি দিতে চাননি, কিংবা হয়তো সারা জীবনের কষ্টের সঞ্চয় ছেড়ে দিতে পারেননি। তারপর শুরু হলো নিষ্ঠুরতা। একজন বাক্প্রতিবন্ধী, অসহায়, সত্তর বছরের বৃদ্ধার ওপর এমন নির্মম আঘাত নেমে এলো, যার অভিঘাত শুধু তার শরীরে নয়, আমাদের বিবেকেও লাগে।
তার কক্ষ থেকে লুট হয়ে গেল চল্লিশ হাজার টাকা।
আর ধীরে ধীরে নিভে যেতে লাগল একটি জীবন।পরদিন খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর মানুষ ছুটে এসেছে। প্রশাসন এসেছে। চিকিৎসক এসেছেন। সহানুভূতির হাতও বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে, আমরা কি সব সময়ই মৃত্যুর পরে মানুষকে ভালোবাসতে শিখি? জীবিত অবস্থায় যে মানুষটি বছরের পর বছর আমাদের পথ পরিষ্কার করে দিয়েছেন, তার নিরাপত্তার কথা কি কখনো ভেবেছিলাম?
বুবির মৃত্যু আমাদের কেবল কাঁদায় না, লজ্জিতও করে। কারণ সভ্যতা শুধু উঁচু ভবন, দ্রুতগতির ট্রেন কিংবা উন্নয়নের পরিসংখ্যান দিয়ে গড়ে ওঠে না। সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে থাকে, সবচেয়ে দুর্বল মানুষটি কতটা নিরাপদ, তার ভেতরেই।
আজ মেথিকান্দা স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম নিশ্চয়ই আগের মতোই ঝকঝকে থাকবে। অন্য কেউ ঝাড়ু দেবে। ট্রেন থামবে। চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠবে। যাত্রীরা আসবে, চলে যাবে। শুধু এক কোণে আর দেখা যাবে না সেই নীরব মুখটিকে, যে কথা বলতে পারত না, কিন্তু তার শ্রম দিয়ে প্রতিদিন মানবতার একটি ভাষা লিখে যেত।
বুবি চলে গেছেন। তার সঙ্গে চলে গেছে একটি প্রশ্নও।
এই সমাজে সবচেয়ে অসহায় মানুষটির জীবন যদি মাত্র চল্লিশ হাজার টাকার চেয়েও সস্তা হয়ে যায়, তবে আমরা আসলে কী হারাচ্ছি? একজন বৃদ্ধাকে, নাকি আমাদের নিজেদের মানুষ হয়ে থাকার ক্ষমতাকেই?সময়ের কাছে এই প্রশ্ন রেখে বুবি চিরদিনের জন্য চলে গেলেন। কিন্তু তার ঝাড়ু দেওয়া সেই প্ল্যাটফর্ম, ভোরের শিশির, রেললাইনের দীর্ঘশ্বাস আর রাতের নির্জন স্টেশন হয়তো বহুদিন ধরে সাক্ষ্য দেবে, এক নীরব নারী ছিলেন, যিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পৃথিবীকে পরিষ্কার রাখতে চেয়েছিলেন। অথচ পৃথিবী তাকে নিরাপদ রাখতে পারেনি।
—————————– —————————–
প রি চি তি
লেখক : কবি ও গল্পকার। শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন ৷ সম্পাদনা করছেন-‘পলিমাটি’। প্রকাশিত একক গ্রন্থ দুইটি ও যৌথগ্রন্থ- পঞ্চাশের বেশি ৷ মেইল: paulpankaj864@gmail.2 Comments
Friends
faiza adila
@faizaadila
khokon du
@khokondu
মোঃ শাহাব উদ্দিন নয়ন
@shahabuddin1
মোহাম্মদ মিজানুর রহমান (কবি মিজান পঞ্চায়েত/ কবি মিজান বিএসসি)
@mohammedmizanurrahman
proton 69 (asger ahmmed)
@proton69
Mullick Md. A. khaleque
@mullickmd-a-khaleque
MD.MOMTAZUR RAHMAN Munna
@md-momtazurrahmanmunna
Sarker S Islam
@sarkersislam
Jaman Uddin
@jamanuddin

শেষের প্রশ্নটি দীর্ঘ সময় ধরে মনে থেকে যায়—আমরা কি সত্যিই মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছি?