-
পর্ব ১
পদ্মার পাড় ঘেষে সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামটির নাম রসুলপুর। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, কোনো এক নিপুণ চিত্রকর তার তপ্ত দুপুরের খেয়ালে ক্যানভাস জুড়ে ঢেলে দিয়েছেন কাঁচা হলুদের আভা আর গাঢ় সবুজের সমারোহ।
মাঠের পর মাঠ সরষে ফুলের হলদে হাসি আর ধানি জমির সবুজাভ ঢেউ যেন দিগন্তের নীলিমায় গিয়ে মিশেছে। একদিকে প্রমত্তা পদ্মা, আর অন্যদিকে আড়িয়াল খাঁর শান্ত শাখা নদী—এই দুই জলধারার মায়াবী বেষ্টনীতে গ্রামটি যেন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো শান্ত ও সুজলা।গ্রামের মেঠো পথের দুপাশে সারি সারি মহীরুহ ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে, যেন পথচারীকে পরম মমতায় ছায়া বিলিয়ে দেওয়াই তাদের আজন্ম ব্রত। আবার কোথাও কোথাও সূর্যমুখী ফুলের বাগান দেখে মনে হবে সূর্যের দিকে মুখ করে হাসছে, আর নদীর চরে কাশফুলের সাদা শুভ্রতা বাতাসের দোলায় এক অপার্থিব সৌন্দর্যের জানান দেয়। দেখলেই দুচোখ জুড়িয়ে যায়, মনে হয় কোনো কবির শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থের পাতা থেকে উঠে আসা এক জীবন্ত দৃশ্যপট।
তবে এই অপরূপ সৌন্দর্যের আড়ালে রসুলপুরের সমাজ ব্যবস্থা এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত ।রসুলপুর গ্রামের অধিকাংশ মানুষ মাটির সাথে লড়াই করা কৃষক। লাঙলের ফলায় সোনা ফলালেও শিক্ষার আলো তাদের মনের কোণে আর গ্রামে খুব একটা পৌঁছায়নি।এই গ্রামে একটিমাত্র সরকারি প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয় থাকলেও দশম শ্রেণির গণ্ডি পেরোনোর আগেই ঝরে পড়ে অধিকাংশ স্বপ্ন। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে তো শিক্ষার দুয়ার প্রায় রুদ্ধ।
রসুলপুর থেকে কলেজ অনেকটা দূরে হওয়ায় এবং সামাজিক সংকীর্ণতার কারণে ঘরের মেয়েরা অন্দরমহলেই আটকা পড়ে থাকে।এখানকার সরল মানুষগুলোকে কিছু সুবিধাবাদী লোক বুঝিয়ে ছেড়েছে—”মেয়েরা বেশি পড়লে অবাধ্য হয়,চরিত্র নষ্ট হয়ে যায়”
এতে গ্রামে নেমে আসে দুর্যোগ আর মহামারী।পড়াশোনা হচ্ছে বড়লোকদের জন্য। তাদের চোখে ছেলেদের বিয়ের কোনো বয়স নেই, কিন্তু বারো-তেরো পেরোলেই মেয়ের গলায় বিয়ের পিঁড়ি ঝোলানোটা যেন পরম পুণ্য। আঠারো-উনিশ বছরের কোনো মেয়ে অবিবাহিত থাকলে রসুলপুরের বেশিভাগ মানুষ তাকে ‘বাতিল’ বা ‘তুচ্ছ’ বলে গণ্য করে। কুসংস্কারের এই নিগড়েই আটকে আছে এখানকার লোকেরা।এখানকার বেশিভাগ মেয়েরাও তা বিশ্বাস করে।সেই রসুলপুরেই আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘চৌধুরী বাড়ি’।
বছরের দীর্ঘ সময় বাড়িটি খাঁ খাঁ করলেও আজ যেন ইট-পাথরের দেয়ালে প্রাণের স্পন্দন ফিরে এসেছে। ঢাকা থেকে অতিথিদের আগমনে নিস্তব্ধ আঙিনা আজ সরগরম। চৌধুরী বাড়ির প্রাণভোমরা, বাড়ির কর্তা খায়ের চৌধুরীর নয়নের মণি শাহরিয়ার চৌধুরী শান গ্রামে এসেছে একঝাঁক বন্ধুদের সাথে নিয়ে।
শহুরে যান্ত্রিকতা ছেড়ে গ্রামের এই মুক্ত প্রকৃতিতে এসে শান আর তার বন্ধুরা মুগ্ধ হয়ে গেছে। শান মনে মনে ভাবছে,শহরের কোলাহল ভুলে এই কটা দিন প্রকৃতির এই স্নিগ্ধ কোলে সময়টা মন্দ কাটবে না। শহর জীবনের ক্লাব, পার্টি ছেড়ে এখানে তার আসাটা সার্থক হয়েছে।শানের এই প্রকৃতি প্রেমের অবসরে চলুন পরিচিত হওয়া যাক শান এবং তার পরিবারের সাথে:
শাহরিয়ার চৌধুরী শান, রূপকথার রাজপুত্রের মতো তীক্ষ্ণ নাক, মায়া দুটি চোখ আর ফর্সা গায়ের রঙ। ৫ ফুট ১১ ইঞ্চির দীর্ঘদেহী গড়নে তাকে বেশ মানিয়ে যায়।শান নামকরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ এবং এমবিএ শেষ করেছে মাত্র ছয় মাস হলো। এখনই যান্ত্রিক কর্মজীবনে ঢুকতে চায় না সে;
বন্ধুদের সাথে এই হই-হুল্লোড় আর ভ্রমণের আনন্দটুকু লুফে নিতে চায়। শহরে
শানের দুই বোন আছে ।বাবা,মা,চাচা,ফুফু, চাচাতো দুই ভাই ও দাদাকে নিয়েই তার পরিবার।
তার দাদা (খায়ের চৌধুরী) চৌধুরী পরিবারের প্রধান অভিভাবক, তিনি পেশায় একজন চিকিৎসক।
চৌধুরী বাড়ির আভিজাত্য আর ঐতিহ্যের ধারক তিনি।
এই গ্রামে সবার কাছে পরিচিত এক নাম হচ্ছে —খায়ের চৌধুরী। গ্রামের প্রতিটি ধূলিকণা যেন তাকে চেনে। শানের ও তার চাচা ফুফুর পরিবার ঢাকার বাসিন্দা হলেও,তার দাদাজান এই মাটির মায়া কাটাতে পারেননি।একটা সময় তার শহরে কাটলেও এখন পরিবার বা জরাজীর্ণ বৃদ্ধাশ্রম কিংবা নিঃসঙ্গ অট্টালিকা নয়, বরং গ্রামের অসহায় মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়াতেই তার পরম তৃপ্তি। সাদা পাঞ্জাবি আর কাঁধে একটা পুরনো স্টেথোস্কোপ নিয়ে যখন তিনি মেঠো পথ দিয়ে হাঁটেন, তখন শত শত হাত দোয়ায় ও সম্মানে উপরে উঠে আসে। বিনা পয়সায় চিকিৎসা আর
পরম মমতায় রোগীদের সুস্থ করে তোলা—এটাই তার প্রাত্যহিক জগত।ছেলেরা আর তার মেয়ে কতবার চেয়েছে তাকে শহরে নিয়ে যেতে, কিন্তু শহরের চার দেয়ালের বন্দিত্ব আর কৃত্রিম কোলাহল তাকে কখনোই টানেনি। তিনি এই মাটির সন্তান, মাটির গন্ধেই তার নিশ্বাস চলে।এদিকে শান বরাবরই একটু অন্য ধাঁচের। শহরের নীল আলো আর বন্ধুদের সাথে হই-হুল্লোড়েই তার দিন কাটে। তবে এই উচ্ছলতার মাঝেও একজনের নাম তার হৃদস্পন্দনে মিশে আছে—সে তার শৈশবের খেলার সাথী, বাবার বন্ধুর একমাত্র আদুরে মেয়ে, তার একমাত্র প্রেয়সী।যে কিনা শানের হৃদয়ে রাজ করছে কিছুদিন পর তার জীবনে প্রবেশ করবে।তাই ব্যাচেলর জীবনের শেষ দিনগুলো উপভোগ করতে আর অনেকদিন না দেখা দাদাজানকে একনজর দেখতেই এবার তার রসুলপুরে আসা। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে বন্ধুদের নিয়ে নিজের শিকড় দেখাতে নিয়ে আসাটাই ছিল তার আসল উদ্দেশ্য।
দাদাজানের সাথে কুশল বিনিময় সেরে শান তার বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ল গ্রামে ঘুরতে। এসইউভি গাড়ির স্টিয়ারিং শানের হাতে। চারদিকে দিগন্তজোড়া সরষে আর সূর্যমুখী ফুলের মেলা। বন্ধুদের সেই রূপ দেখাতে দেখাতে প্রিয়সীর কথা ভাবতে গিয়ে শান কিছুটা আনমনা হয়ে পড়েছিল। হঠাৎ একটা অসতর্ক মোড় নিতেই গাড়িটি রাস্তার ধারের সরষে ক্ষেতের ভেতরে ঢুকে পড়ল। চাকার নিচে পিষ্ট হলো সদ্য ফোটা হলদে ফুল আর কাঁচা ডালপালা।
___
দূর থেকে এক কিশোরী এই দৃশ্য দেখে স্থির থাকতে পারল না। তার পেছনে একদল কৌতূহলী ছোট বাচ্চার বাহিনী। মেয়েটি যেন রণচণ্ডী মূর্তি ধারণ করে দৌড়ে এল গাড়ির সামনে। তার চোখেমুখে ক্ষোভের আগুন।
গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে এক হাত কোমরে রেখে হুঙ্কার দিয়ে উঠল সে, “এই যে লাট সাহেবেরা! গাড়ি থিকা নামেন দেহি। আলালের ঘরের দুলাল হইছেন বইলা কি আমাদের মানুষ মনে হয় না? চোখে কি ঠুলি পড়ছে?
কিশোরী মেয়ের মুখে এমন তীক্ষ্ণ আর সাহসী কথা শুনে শান এবং তার বন্ধুরা বিস্ময়ে থমকে গেল।অতঃপর রাগে গজগজ করতে করতে তারা গাড়ি থেকে নামল। কিন্তু মেয়েটার মধ্যে ভয়ের লেশমাত্র নেই; সে নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে।শান আর তার বন্ধুরা এবার ভালো করে পরখ করল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে।মেকআপের কৃত্রিমতা ছোঁয়নি তার মুখ, তবুও এক সহজাত লাবণ্য ঠিকরে বেরোচ্ছে। কৈশোরের চপলতা আর তারুণ্যের তেজ যেন তার চোখেমুখে মাখামাখি হয়ে আছে। তার কথা বলার ধরনে গ্রাম্য টান আর শহরের মিশ্রণ থাকলেও, সাহসের দিক থেকে সে যেন এই তল্লাটের নেত্রী।
শান অবাক হয়ে ভাবল, এই অজপাড়াগাঁয়ের এক কিশোরীর এত সাহস যে খোদ শান চৌধুরীর সামনে দাঁড়িয়ে এভাবে চোখে চোখ রেখে কথা বলছে!শহর থেকে আসা শান আর তার বন্ধুদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না মেয়েটি। উল্টো তার টানা টানা চোখে যেন আগ্নেয়গিরির লাভা খেলা করছে। দুই হাত কোমরে রেখে ভ্রু কুঁচকে সে ঝামটে উঠল, “এমনে ড্যাবড্যাব কইরা চাইয়া আছেন ক্যান? এই জন্মে কি মাইয়া মানুষ দেখেন নাই কোনোদিন?”
শানের বন্ধুরা কিছু বলতে গিয়েও থমকে গেল। মেয়েটির তেজ দেখে মনে হচ্ছে সে একাই একশ। ফায়জা আবার হুঙ্কার দিয়ে উঠল, “এই যে মিয়ারা, কথা কন না ক্যান? শহর থিকা আইসা সবটি দেহি এক্কেরে বোবা হইয়া গেছেন!”এতক্ষণ চুপ থাকলেও এবার শানের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। ঢাকার দাপুটে শান চৌধুরীর সামনে দাঁড়িয়ে কেউ এভাবে কথা বলতে পারে, তা শানের কল্পনার বাইরে ছিল। চোয়াল শক্ত করে সে গর্জে উঠল, “এই মেয়ে, তোমার সাহস তো কম নয়! তুমি আমাদের সাথে উল্টাপাল্টা কথা বলছো? তেজ দেখিয়ে কথা বলছো!জানো আমি কে?”শানের উচ্চতা আর গম্ভীর কণ্ঠস্বরকে এক তুড়িতে উড়িয়ে দিয়ে মেয়েটি ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। এরপর বেশ আয়েশ করে বলল, “শুনেন লম্বু সাহেব, এই ফায়জা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কাউরে ডরায় না। আর আপনে কোন লাট সাহেবের নাতি হইছেন যে আপনেরে আমার চেনা লাগব?”শানের অবস্থা তখন কূলহীন সাগরে পড়ার মতো। এই অজপাড়াগাঁয়ের এক কিশোরী তাকে ‘লম্বু সাহেব’ বলে তাচ্ছিল্য করছে! সে কিছু বলার আগেই ফায়জা আবার শুরু করল, “এতো বড় একটা অকাজ কইরা আবার সামনে দাঁড়াইয়া বড় বড় কথা কন? লজ্জা-শরম কি সব ধুইয়া খাইছেন? এই জন্যই মানুষ কয়, শহরের মাইনষের চামড়া একটু বেশিই মোটা হয়!”
ফায়জার রাগ যেন কমছেই না, তার উপচে পড়া ক্রোধের সামনে শহরের ওই দামি গাড়ি আর সুবেশধারী যুবকদের এক নিমেষে ম্লান মনে হতে লাগল।
ফায়জা শানের ‘ক্লাস’ নিতে ব্যস্ত, চলুন সেই ফাঁকে আমরা চিনে নিই এই ডানপিটে কিশোরীকে।
কিশোরী মেয়েটির নাম হাদিযা রশিদ ফায়জা।তবে এই গ্রামের সবাই তাকে ফায়জা বলেই ডাকেন।রসুলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী সে। ৫ ফুট ২ ইঞ্চির ছিপছিপে গড়ন, দুধে-আলতা গায়ের রঙের সাথে অবাধ্য কালো কেশ যেন তার হাঁটু ছুঁতে চায়। এক জোড়া টানা টানা মায়াবী চোখ আর পান পাতার মতো মুখশ্রী—তাকে দেখলে মনে হয় যেন কোনো পটুয়া যত্ন করে এঁকেছেন। তবে এই মায়াবী রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ইস্পাতকঠিন মনোবল।
রসুলপুরের মানুষ ফায়জাকে চেনে তার অদম্য সাহসের জন্য, কেউ আবার চেনে নিন্দুকের চোখে। গ্রামের মোড়লদের মতে,রূপবতী ফায়জার ‘বিয়ের বয়স’ অনেক আগেই পার হয়ে গেছে।এতো রূপবতী হয়েও কেন বিয়ে হচ্ছে না।তারা বুঝতে পারেন না। গত তিন বছর ধরে রহস্যজনকভাবে বারবার এই মেয়ের বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে।গ্রামের কেউ তো আর জানে না, এই বিয়েগুলো ভাঙতে ফায়জাকে নিজের কতটা জেদ আর বুদ্ধি খরচ করতে হয়েছে। বাল্যবিবাহের শৃঙ্খল ভাঙতে সে একাই এক দুর্গ।
অন্যায়ের প্রতিবাদে ফায়জা সবসময় অগ্রণী। তার চঞ্চল স্বভাব আর তড়িৎ সব উত্তর তাকে গ্রামের অন্য সব মেয়েদের থেকে আলাদা করে তুলেছে। গ্রামের সাধারণ মানুষ যেমন তাকে ভালোবাসে, তেমনি কিছু কুসংস্কারে আচ্ছন্ন মানুষ সুযোগ পেলেই তাকে কটাক্ষ করতে ছাড়ে না।ফায়জার বাবা রশীদ মিয়া, রোদে পোড়া ঘামে ভেজা একজন পরিশ্রমী কৃষক।তার কাছে স্ত্রী সন্তানকে বেশি ভালোবাসা অর্থহীন।আর ফায়জার মা আমেনা বানু, ঘরোয়া সংসারী নারী।সন্তানেরা আর স্বামী তার পৃথিবী।ফায়জার কোনো ভাই নেই, তবে তার ছায়ার মতো সাথে থাকে ছোট দুই বোন—রেখা আর রেশমা।পরিচয় তো হলো,
চলুন গল্পে ফিরে আসি।
শান আর ফায়জার তর্কাতর্কির সেই উত্তপ্ত আবহাওয়ার মাঝেই হুট করে এক বৃদ্ধ কৃষক ধপাস করে বসে পড়লেন কর্দমাক্ত আইলের ওপর। দুহাতে মাথা চেপে ধরে তার বিলাপ যেন রসুলপুরের শান্ত আকাশকে বিদীর্ণ করে দিল। শানের গাড়ির চাকায় পিষ্ট হওয়া হলদে সরষেগুলো এখন কেবল কাদা আর থেঁতলে যাওয়া ডালপালার স্তূপ। বৃদ্ধের চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে সেই নষ্ট হওয়া ফসলের ওপর।
“ও আল্লাহ! আমার এ কী সর্বনাশ হইলো রে! মহাজনের থিকা চড়া সুদে বীজের টাকা আনছিলাম, অহন সেই দেনা শোধ করুম কেমনে? না খাইয়া মরণ ছাড়া যে আর পথ নাই!”—বৃদ্ধের এই আর্তনাদ শানদের কানে পৌঁছালেও তাদের পাথুরে মনে খুব একটা আঁচড় পড়ল না।কিন্তু তা দেখে ফায়জা স্থির থাকতে পারল না। সে দ্রুত গিয়ে বৃদ্ধের কাঁধে হাত রাখল। তার কণ্ঠে তখন বজ্রের দৃঢ়তা, “আহারে চাচা, কান্দো ক্যান? তোমার ঘাম ঝরানো ফসল যারা নষ্ট করছে, তাদের থিকা কড়ায়-গণ্ডায় উশুল না নিয়া আমি এক পা-ও নড়ুম না। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো বাপু,আমি থাকতে তোমার লোকসান হইতে দিমু না।”
ফায়জার এই আশ্বাসে বৃদ্ধের কান্নার বেগ কিছুটা কমল, তিনি যেন অন্ধকারের মাঝে এক চিলতে আলোর দেখা পেলেন।ওদিকে শানের মেজাজ তখন সপ্তমে। নিজের আভিজাত্যে আঘাত লাগায় সে দাঁত কিড়মিড় করে বলে উঠল, “এই মেয়ে, তোমার সাহস তো কম নয়! আমাদের সাথে পাঙ্গা নিতে চাইছো?
সামান্য কয়েকটা সরষে গাছ নষ্ট হয়েছে বলে একটা সাধারণ মেয়ে হয়ে আমাদের সাথে বেয়াদবি করছো?
জানো আমি কে?”
ফায়জা এক মুহূর্তের জন্য শানের চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন উপহাসের ঝিলিক। “আবার হেই একই কথা! আপনি কি লাট সাহেবের নাতি হইছেন নাকি যে আপনেরে কিচ্ছু কওন যাইব না?
আর শুনেন লম্বু সাহেব, আপনি লাট সাহেবের নাতি হইলেও ফায়জার কিচ্ছু যায় আসে না!”ফায়জার এই তড়িৎ উত্তর শুনে শানের ইচ্ছে করছিল মেয়েটার দম্ভ এক নিমেষে গুঁড়িয়ে দিতে। কিন্তু ফায়জা তাকে কথা বলার সুযোগই দিল না। সে তর্জনী উঁচিয়ে গর্জে উঠল, “শুনেন সাহেব, আপনের কাছে যেটা ‘সামান্য ফসল’, আমাগো কাছে হেইডা জীবন বাঁচানোর সম্বল। রোদে পুইড়া, মাথার ঘাম পায়ে ফেলাইয়া চাচা এই ফসল ফলাইছে—হেইডা বোঝার ক্ষমতা আপনের নাই।
হয় ফসলের ক্ষতিপূরণ দিয়া এখান থিকা বিদেয় হন, নাইলে এক পা-ও নড়তে দিমু না!”বলেই ফায়জা ক্ষিপ্র হাতে চাচার পাশ থেকে ধারালো কাঁচিটা তুলে নিল। সূর্যের আলোয় কাঁচির ফলাটা চিকচিক করে উঠল শানের নাকের ডগায়। ফায়জার চোখের ভাষা বলে দিচ্ছিল—সে রসিকতা করছে না।শান আর তার বন্ধু রাফাত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। রাফাত বাঁকা হেসে বলল, “এই মেয়ে, আমরা পাঁচজন আর তুমি একা!
বয়সে, শক্তিতে আমরা তোমার চেয়ে কত বড় দেখছো?
আমাদের ভয় দেখাচ্ছো? আমরা যদি টাকা না দিই, তোমার মতো এক পিচ্চি মেয়ে আমাদের কী করবে শুনি?”
ফায়জা এবার শব্দ করে হাসল না, শুধু ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে রাখল। তারপর তার সাথে আসা ছোট ছোট বাচ্চাদের দিকে ইশারা করে চিৎকার করে উঠল, “এই আমার সেনারা! তোদের কামাল দেখা তো দেখি!
এই গুন্ডাগুলারে চারপাশ থিকা ঘেরাও কর। একটাও যেন সীমানা পার হইতে না পারে! আজকে এই শহর থিকা আসা লাট সাহেবদের বুঝায়া দে—বাচ্চা পার্টি আসলে কী চিজ!
“মুহূর্তের মধ্যেই একদল ডানপিটে বাচ্চারা চারপাশ থেকে শানদের গাড়ি আর বন্ধুদের ব্যুহ তৈরি করে ফেলল। তাদের হাতে ছোট ছোট লাঠি আর পাথর। শানরা বুঝতে পারল—রসুলপুরের এই ছোট সেনারা তাদের ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়।
এতক্ষণ যারা হাঁ করে শানের চকচকে গাড়িটা দেখছিল, ফায়জার এক ইশারায় সেই ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পঙ্গপালের মতো গাড়িটিকে ঘিরে ধরল। তাদের হাতে থাকা লাঠি আর শক্ত অবস্থান দেখে মনে হচ্ছিল, তারা যেন কোনো দুর্ভেদ্য দুর্গ গড়ে তুলেছে।
শানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল।ফায়জার এই আক্রমণাত্মক ভঙ্গি দেখে সে তর্জনী উঁচিয়ে গর্জে উঠল, “এই মেয়ে, তুমি কিন্তু বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করছ! এই রসুলপুরে বাস করে চৌধুরী বাড়ির নাতির সাথে বেয়াদবি করার সাহস কোত্থেকে পাও? আমার দাদাজান যদি জানতে পারেন তোমরা আমার সাথে এমন ব্যবহার করেছ, তবে এই গ্রাম থেকে তোমাদের গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে ছাড়বেন!”
শান ভেবেছিল ‘চৌধুরী বাড়ি’র নাম শুনলে ফায়জা হয়তো ভয়ে সিঁটিয়ে যাবে।
কিন্তু ফায়জার ঠোঁটের কোণে উপহাসের এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে আরও এক পা এগিয়ে এসে বলল, “ওহ্! তার মানে আপনিই আমাদের চৌধুরী দাদুর সেই শহর থিকা আসা বজ্জাত নাতি! ভালোই হইলো নিজের পরিচয় দিলেন।”
ফায়জা এবার বৃদ্ধ কৃষকের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বলল, “চাচা, চল তো এই লম্বু সাহেবরে ধইরা এক্কেরে চৌধুরী দাদুর দরবারে নিয়া যাই।
দাদু নিজের নাতির কীর্তি দেখলে এরে তো আচ্ছা করিয়া শাস্তি দিবই, সাথে তোমার ক্ষতিপূরণও কড়ায়-গণ্ডায় উশুল কইরা দিব। তখন দেখুম নে কারে গ্রাম থিকা বের করে!”ফায়জার এমন পাল্টাহুমকিতে শানের বন্ধুরা—জিসান, নিয়াজ,রাফাত আর নিখিল কিছুটা ঘাবড়ে গেল। তারা ফিসফিস করে শানের কানে কানে বলল, “দোস্ত, এই মেয়ের সাথে ঝামেলা বাড়ানো ঠিক হবে না। দেখছিস কেমন বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে? এমনিতেও ভুলটা তো আমাদেরই। ইজ্জত থাকতে ক্ষতিপূরণ দিয়ে কেটে পড়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।”
শান বন্ধুদের কথা শুনে মুহূর্তকাল ভাবল। তার দাদাজান ন্যায়ের ব্যাপারে পাহাড়ের মতো অটল। শানের এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কথা শুনলে তিনি ভরা মজলিশে তাকেই শাসন করবেন, যা এই ‘ফাজিল’ মেয়ে আর ওর সাঙ্গপাঙ্গদের সামনে চরম অপমানের হবে। তার চেয়ে এখন টাকা দিয়ে বিদেয় হওয়াই শ্রেয়। তবে মনে মনে সে শপথ নিল—এই অপমানের শোধ সে তুলবেই।
শান পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে রাগী স্বরে বৃদ্ধের দিকে এগিয়ে গেল, “বলুন, আপনার কত টাকার ক্ষতি হয়েছে? এখনই মিটিয়ে দিচ্ছি।”
বৃদ্ধ লোকটা আমতা আমতা করে বলল, “বাবা, তিন হাজার টাকা হইলেই আমার বীজ আর সারের দেনাটা মিটত।”
শান ঝটপট পাঁচটা হাজার টাকার নোট লোকটার হাতে গুঁজে দিল।তা দেখে ফায়জা বৃদ্ধা চাচার কাছে থেকে দুটো নোট ফেরত দিল।
শান গাড়িতে উঠতে উঠতে ফায়জার দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “আমার সাথে বেয়াদবির ফল কিন্তু তোমাকে ভোগ করতেই হবে মেয়ে । তোমাকে আমি দেখে নেব!”
ফায়জা হাত নেড়ে তাচ্ছিল্যের সাথে বলল, “আরে যান যান! এই ফায়জা ওসব ‘দেখে নেব’ মার্কা হুমকিতে ডরায় না।”গাড়ি স্টার্ট দিয়ে শান যখন ধুলো উড়িয়ে চলে যাচ্ছিল, তার মনের ভেতরে তখন অপমানের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে। শাহরিয়ার চৌধুরী শানকে আজ এক পাড়াগাঁয়ের কিশোরীর কাছে হার মানতে হলো!তা সে মানতে পারছে না, বন্ধুদের মধ্যে নিখিল আবার একটু রসিক। সে শানের পিঠে চাপড় দিয়ে চোখ টিপে বলল, “দোস্ত, একটা পিচ্চি মেয়ে আমাদের যা নাকানিচুবানি খাওয়াল না—ভাবতেই কেমন লাগছে!”
নিখিল আরও যোগ করল, “জানিস শান, এমন মেয়ের সাথেই কিন্তু প্রেম জমে ক্ষীর হয়! ইস, মেয়েটা যদি আর একটু বড় হতো, আমিই ওর প্রেমে পড়ে যেতাম রে।”
শানের পিত্তি জ্বলে উঠল। সে কড়া গলায় ধমকে উঠল, “চুপ কর শালা! ফালতু কথা বলবি না একদম।”
নিখিল দমল না। সে হাসতে হাসতে বলল, “আরে দোস্ত, তুই বুঝতে পারছিস না—এখনই মেয়ের যে রূপ আর তেজ, বড় হলে তো এ এক্কেবারে জ্যান্ত আগুন হবে!”
নিখিলের প্রতিটি কথা শানের কানে তপ্ত সিসার মতো বিঁধছিল। রসুলপুরের সরষে ক্ষেতে আজ এক অদ্ভুত যুদ্ধের সূচনা হলো, যার রেশ সহজে কাটার নয়।
#চলবে
#ফায়জা
নদীর নাম জায়গার দৃশ্যপট সত্যি হলেও গ্রামের নাম কাল্পনিক।
হাদিযা রশিদ ফায়জা এই নামের অর্থের সাথেই সম্পূর্ণ গল্পের মূল অংশের মিল থাকবে।
এটা যেহেতু 2019-20 সালের আমার লেখা গল্পগুলোর মধ্যে একটা গল্প। এটা নতুন করে লেখছি কিছু কিছু পরিবর্তন থাকবে তবে আগের মতোই শহরে আর গ্রামের আলাদা পরিবেশ, শিক্ষা, কুসংস্কার এবং 90 দশকের পেক্ষাপট আগের মতোই থাকবে।
যেমন নীরব বন্ধনের ক্ষেত্রে ছিল।বিঃদ্রঃগল্পটা বেশি বেশি লাইক ও কমেন্টস করলে পরের পর্ব তাড়াতাড়ি পাবেন।
3 Comments

Saifun nesa Shima
Housewife
Friends
শাহ্ সাকিরুল ইসলাম
@shahsakirulislam
মোহাম্মদ আফজাল হোসেন মাসুম
@afjalhossain
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
মাহীম খান
@meho
মামুনুর রশিদ
@mamun01722525933gmail-com
এফ. আর. মাহদী
@frmahedi
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Poly Alam
@butterflywords
Mubarra Ayesha Chowdhury
@mubarra45



ফায়জা এখানে শুধু এক কিশোরী নয়, সমগ্র রসুলপুরের প্রতিবাদী কণ্ঠ….🖤