-
পর্ব–২: Stockholm Syndrome নাকি Trauma Bonding?—পার্থক্য কোথায়?
গত পোস্টে আমরা একটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু করেছিলাম—
“সে কেন সম্পর্ক ছাড়তে পারে না?”
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেকেই একটি শব্দ ব্যবহার করেন—Stockholm Syndrome।
কিন্তু বর্তমান মনোবিজ্ঞানের আলোচনায় আরেকটি ধারণা ক্রমশ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে—Trauma Bonding (ট্রমা বন্ডিং)।
দুটি কি একই?
না, পুরোপুরি নয়।
Stockholm Syndrome কী?
এই ধারণার উৎপত্তি ১৯৭৩ সালে সুইডেনের স্টকহোমে ঘটা একটি ব্যাংক ডাকাতি থেকে। সেখানে ডাকাতরা ৪ জন ব্যাংক কর্মীকে ৫ দিন জিম্মি করে রেখেছিল। কিন্তু মুক্তির পর দেখা গেল, জিম্মিরা ডাকাতদের বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং উল্টো তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করে!
এভাবে যদি বলি- যখন কোনো ভুক্তভোগী (Victim) তাকে বন্দি বা জিম্মি করে রাখা নির্যাতনকারীর প্রতি এক ধরণের সহানুভূতি, ভক্তি বা মানসিক টান অনুভব করতে শুরু করে, তখন তাকে স্টকহোম সিন্ড্রোম বলে। তীব্র ভয়ের মুহূর্তে নির্যাতনকারী যখন হঠাৎ একটু দয়া দেখায় (যেমন: ক্ষতি না করা), তখন ভুক্তভোগীর অবচেতন মন তাকেই “রক্ষাকর্তা” ভাবতে শুরু করে। আমি পাচার থেকে ফিরে আসা কারো কারো মধ্যে এই বিষয় টা পেয়েছি।
একজনকে পেয়েছিলাম, সে অপেক্ষা করে ছিলো যে- পাচারকারী এসে তাকে বিয়ে করবে এবং তারা একসাথে একটা সুখের সংসার করবে।তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—
Stockholm Syndrome কোনো আনুষ্ঠানিক মানসিক রোগের নির্ণয় নয়। এটি DSM-5-TR বা ICD-11-এ স্বতন্ত্র রোগ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত নয়। একইভাবে Trauma Bonding-ও কোনো আনুষ্ঠানিক রোগনির্ণয় নয়, বরং এটি ট্রমা ও সম্পর্কের গতিশীলতা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ মনোবৈজ্ঞানিক ধারণা।
Trauma Bonding কী?
আমাদের পরিচিত বা ভালোবাসার সম্পর্কের মধ্যে (যেমন: সঙ্গী, পরিবার বা কর্মক্ষেত্রে) যখন নির্যাতন ও ভালোবাসার একটি চক্র তৈরি হয়, তখন তাকে ট্রমা বন্ডিং বলে। এটি মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক ও রাসায়নিক ফাঁদ।
কেন এই ফাঁদ থেকে বের হওয়া এত কঠিন:–অবিরাম নির্যাতনের চক্র (The Cycle of Abuse): সম্পর্কটা শুরু হয় “লাভ বম্বিং” (Love Bombing) বা অতিরিক্ত ভালোবাসা ও মনোযোগ দিয়ে। এরপর ধীরে ধীরে শুরু হয় অবহেলা, মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন। আর সবশেষে আসে নির্যাতনকারীর মিথ্যা অনুশোচনা ও ক্ষণিকের ভালোবাসা।
মস্তিষ্কের রাসায়নিক আসক্তি (Chemical Addiction): সম্পর্কের এই চরম ভালো আর চরম খারাপের রোলারকোস্টার রাইড আমাদের মস্তিষ্কে কর্টিসল (মানসিক চাপের হরমোন) এবং ডোপামিন ও অক্সিটোসিনের (আনন্দের হরমোন) এক অদ্ভুত মিশ্রণ ঘটায়। ভুক্তভোগী তখন ড্রাগসের মতো ওই ক্ষণিকের ভালোবাসার নেশায় আটকে যান।
কগনিটিভ ডিসোনেন্স (Cognitive Dissonance): ভুক্তভোগীর মাথায় একই সাথে দুটি বিপরীত চিন্তা চলে। সে জানে মানুষটা তার ক্ষতি করছে (বাস্তবতা), আবার সে বিশ্বাস করে মানুষটা তাকে ভালোবাসে (আবেগ)। এই দ্বন্দ্বে ক্লান্ত হয়ে মন একসময় নির্যাতনকারীর মিথ্যা সান্ত্বনাকেই সত্য বলে মেনে নেয়।
আইসোলেশন ও নিয়ন্ত্রণ: নির্যাতনকারী, ভুক্তভোগীকে তার পরিবার, বন্ধু ও সাপোর্ট সিস্টেম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, যাতে সে নিজের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
ট্রমা বন্ডিংয়ের কিছু বাস্তব লক্ষণ (Red Flags):
১. নির্যাতনকারীর খারাপ আচরণকে অন্যের সামনে আড়াল করা বা যুক্তি দেওয়া (“ও আসলে মানুষ খারাপ না, ও একটু রেগী” )।
২. সবকিছুর জন্য নিজেকেই দোষী ভাবা (“আমি বোধহয় একটু বেশি কথা বলে ফেলেছিলাম, তাই ও রেগে গেছে” )।
৩. সবসময় আতঙ্কে থাকা (Hypervigilance), যেন সঙ্গী কখন রেগে যায় সেই ভয়ে তটস্থ থাকা।
৪. পরিবর্তনের মিথ্যা আশা করা যে, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।এই দুটোর পার্থক্য কোথায়?
সংক্ষেপে বলা যায়—
Stockholm Syndrome সাধারণত জিম্মি বা অপহরণের মতো পরিস্থিতি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে Trauma Bonding বেশি দেখা যায়-
নির্যাতনমূলক দাম্পত্য সম্পর্কে,
পারিবারিক সহিংসতায়,
শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে,
মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে,
এবং এমন সম্পর্কগুলোতে, যেখানে ভালোবাসা ও নির্যাতন বারবার একই সম্পর্কে ফিরে আসে বা চলতে থাকেসিনেমা কি আমাদের কিছু শেখায়?
Highway সিনেমাটি দেখলে অনেক দর্শক বলেন, “এটি তো Stockholm Syndrome।”
আবার অনেক ট্রমা বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ভীরার অভিজ্ঞতাকে শুধু Stockholm Syndrome দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। সেখানে ট্রমা, নিরাপত্তার অনুভূতি, শৈশবের নির্যাতনের প্রভাব এবং জটিল আবেগীয় সম্পর্ক—সব মিলিয়ে একটি গভীর মানসিক যাত্রা রয়েছে।
অর্থাৎ, বাস্তব জীবন এবং মানুষের মন—দুটিই সিনেমার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা
আমরা যেন কোনো ভুক্তভোগীকে দেখে সহজে কোনো “লেবেল” না দিই।
কারণ একজন মানুষের আচরণ বোঝার জন্য শুধু একটি শব্দ নয়, তার জীবন, তার ট্রমা, তার সম্পর্ক এবং তার বেঁচে থাকার লড়াই—সবকিছুই বিবেচনা করতে হয়।
একজন মানুষকে বিচার করার আগে, তার গল্পটি শোনার চেষ্টা করি।
হয়তো তখন বুঝতে পারব—যা বাইরে থেকে দুর্বলতা মনে হয়, সেটিই ছিল তার বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়।
পরিশেষে –
মানুষকে বিচার করার আগে, তার গল্পটি শোনার চেষ্টা করি।কারণ অনেক সময় যে আচরণ আমাদের কাছে অযৌক্তিক মনে হয়, সেটিই ছিল তার বেঁচে থাকার মানসিক কৌশল।
মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসার শুরু হয়—
বিচার নয়, বোঝাপড়া থেকে।— ড. রাহেনা বেগম
মনোবিজ্ঞানী , TA & EMDR Practitioner2 Comments
Friends
নাঈম অরণ্য
@aronnonaim
Hafizur Rahman shakil
@shakilahamed72gmail-com
naznin shamim
@nazninshamim
Md Mofiz
@mdmofiz
MAHMUD HAYAT
@mahmudhayat
wajibad
@wajibad
MAHAJABIN AFROZE
@mahajabinafroze
সুবহা জাহান
@subhajahan
Intisar Jabed
@intisarjabed


অনেক কিছু জানলাম।