-
“শুধু তোমার জন্য”
দুপুরের রোদটা কাঁচের দেয়াল ভেদ করে বহুতল মার্কেটের ভেতরেও এসে পড়েছে। সাদা টাইলসের উপর ছড়িয়ে থাকা আলোয় মানুষের ছায়াগুলো ক্রমশঃ লম্বা হয়ে যাচ্ছে। কোথাও বাচ্চাদের হাসি, কোথাও দোকানিদের ডাকাডাকি, কোথাও নতুন কাপড়ের গন্ধ। চারতলার খোলা বারান্দা ঘেঁষে দাঁড়ালে নিচের তিনটা তলা একসাথে চোখে পড়ে। মাঝখানটা সম্পূর্ণ ফাঁকা। রেলিংয়ের ওপাশে তাকালে মনে হয় পৃথিবীটা অনেক নিচে নেমে গেছে। সেই রেলিংয়ের পাশ দিয়েই ধীরে ধীরে হাঁটছে মোজাফ্ফর আর সালমা।
মাস কয়েক আগে বিয়ে হয়েছে ওদের। শহরের উপকণ্ঠে টিনের চালওয়ালা ছোট্ট একটা বাসা ভাড়া নিয়েছে মোজাফ্ফর। এক কামরার সেই ঘরে একটা খাট, একটা টেবিল, দুটো প্লাস্টিকের চেয়ার আর রান্নাঘরের কোণে কয়েকটা অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি পাতিল। সংসার বলতে এটুকুই। কিন্তু প্রথম কয়েকটা দিন ওদের কাছে মনে হয়েছিল, এর চেয়ে সুখের জীবন বুঝি আর হয় না।
সকালে অফিসে বের হওয়ার আগে সালমা নিজ হাতে প্লেটে গরম ভাত তুলে দিত। সাথে ডিম ভাজা। রাতে ফিরে এলে গামছা এগিয়ে দিত। ক্লান্ত শরীরে বিছানায় শুয়ে মোজাফ্ফর মাঝে মাঝেই ভাবত, মানুষ আসলে খুব বেশি কিছু চায় না। স্রেফ নিজের একটা ঘর আর সেই ঘরে অপেক্ষা করার একজন মানুষ থাকলেই যথেষ্ট।
মোজাফ্ফর একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির বিক্রয়কর্মী। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ডাক্তারদের চেম্বার, ওষুধের দোকান আর ক্লিনিক ঘুরে বেড়ায়। মাস শেষে বেতন হাতে পায় ঠিকই, কিন্তু সেই টাকার বড় একটা অংশ চলে যায় গ্রামের বাড়িতে। বৃদ্ধ বাবা আর মায়ের ওষুধ, ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা, ছোট বোনের কলেজে যাওয়া। এসবের পর হাতে যা থাকে, তা দিয়ে শহরের সংসার চালানোই কষ্টকর। তারপরও সে কখনো সালমাকে এসব বোঝাতে চায়না। বরং নিজের কষ্টটুকু লুকিয়ে রেখে সবসময় হাসিমুখেই বলে, “আরেকটু সময় দাও। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
যদিও সালমা খুব বেশি কিছু চাইত না। তবে যখনই কিছু চাইত, সেটা মন থেকেই চাইত। কখনো নতুন শাড়ি, কখনো একটা স্যান্ডেল, কখনো পাশের বাসার ভাবির হাতে থাকা মোবাইলের মতো একটা মোবাইল।
মোজাফ্ফর প্রথমে না করত। তারপর সালমা অভিমান করত। সেই অভিমান খুব ভয় পেত সে। মেয়েটা কথা বলা বন্ধ করে দিত। রান্না করত, কিন্তু খেতে ডাকত না। নিজেও খেত না। একই বিছানায় শুয়েও উল্টোদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকত। সেই নীরবতা মোজাফ্ফরের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার ছিল। শেষ পর্যন্ত সে অফিস থেকে অগ্রিম নিয়ে হলেও সালমার ইচ্ছেটা পূরণ করত। তারপর পুরো মাসটা ধার করা টাকার বোঝা মাথায় নিয়ে কাটাত।
আজ সালমার জন্মদিন। এই দিনটার জন্য প্রায় দেড় মাস ধরে একটু একটু করে টাকা জমিয়েছে মোজাফ্ফর। দুপুরে চা খাওয়া কমিয়েছে। নিজের জন্য একটা নতুন শার্ট কেনেনি। কয়েকদিন রিকশার বদলে হেঁটে অফিসে গেছে। সবকিছু করেছে শুধু এই একটা দিনের জন্য। এই দিনটার জন্যই সে আজ অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে।
সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সালমা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কপালে ছোট্ট একটা টিপ পরল। তারপর ঘুরে মোজাফ্ফরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। বললো, “আজ সারাদিন কিন্তু আমারে রাগাইতে পারবা না।”
মোজাফ্ফরও হেসে ফেলল। বললো, “নারে বউ, আজকে তোমার দিন।”
দুজনেই রিকশায় করে মার্কেটে এল। চারতলার একটা রেস্টুরেন্টে বসে দুপুরের খাবার খেল। চিকেনের শেষ টুকরোটা নিজের প্লেট থেকে তুলে সালমার প্লেটে রেখে দিল মোজাফ্ফর। বললো, “তুমি খাও। আমার আর লাগবো না।”
সালমা তখন সত্যিই খুশি ছিল। তার চোখেমুখে সেই আনন্দ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
খাওয়া শেষে তারা একটা শাড়ির দোকানে ঢুকল। দোকানের কর্মচারী একের পর এক শাড়ি খুলে দেখাতে লাগল। লাল, নীল, মেরুন, বেগুনি হরেক রকম শাড়ি। নতুন কাপড়ের গন্ধে পুরো দোকানটা ভরে আছে।
অনেকক্ষণ দেখে মোজাফ্ফর একটা শাড়ি আলাদা করল। তার কাছে সেটাই সবচেয়ে সুন্দর মনে হলো। কারণ সৌন্দর্যের সঙ্গে দামটাও তার নাগালের ভেতর ছিল। শাড়িটা হাতে নিয়ে সালমার দিকে বাড়িয়ে দিল। বললো, “এইডা নাও। তোমারে খুব সুন্দর মানাইবো।”
সালমা শাড়িটার দিকে একবার তাকাল। তারপর মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে সে নিজেই একটা শাড়ি নামিয়ে আনল। গাঢ় লাল রঙের উপর সোনালি জরির কাজ। আলো পড়তেই শাড়িটা ঝিলমিল করে উঠল। বললো, “আমি এইডা নিব।”
মোজাফ্ফর দোকানীর দিকে তাকালো। তার মুখ তেকে দাম শুনে ওর বুকের ভেতরটা ককিয়ে উঠলো। মানিব্যাগে থাকা টাকাগুলো যেন তাকে উপহাস করতে লাগলো। শাড়িটার দাম তার সামর্থ্যের বাইরে।
সে অনেক কষ্টে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল। সালমাকে বললো, “আরেকটা দেখো। এইডার দাম একটু বেশি।”
সালমার কপালে ভাঁজ পড়ল। “কত বেশি?”
মোজাফ্ফর উত্তর দিল না। তার নীরবতাই উত্তর হয়ে দাঁড়াল।
সালমার চোখের দৃষ্টিটা বদলে গেল। একটু রাগত স্বরে বললো, “কেন তোমার কাছে এইডা কেনার মত টাকা নাই?”
মোজাফ্ফর ধীরে মাথা নিচু করল। অনুনয়ের কন্ঠে বললো, “এই মাসে আর পারতেছি না বউ। প্লিজ একটু বুঝনের চেষ্টা কর।” তার বলার ভঙ্গীতে দোকানের ভেতরের বাতাসটাও যেন ভারী হয়ে উঠল।
সালমা ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব নিচু গলায় এমন কিছু কথা বলতে শুরু করল, যেগুলো কেবল মোজাফ্ফরের কানে পৌঁছাল। কিন্তু সেই কথাগুলোর প্রতিটা যেন ধারালো কাঁচের টুকরোর মতো তার বুকের ভেতরে ঢুকে যেতে লাগল।
সালমা বললো, “যখন পারোই না, তখন এত বড় বড় কথা কও ক্যান? বিয়ার পর আমার পথ্থম জন্মদিনে পছন্দের একটা শাড়ি কিনে দিতে পারবা না, তাইলে এহানে নিয়া আইছো কেন?”
মোজাফ্ফর আর দাঁড়াতে পারল না। দোকান থেকে বেরিয়ে এল। সালমাও পেছন পেছন বেরিয়ে এল। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না। তবু দুজনেই পাশাপাশি হাঁটছে।
একসময় এসে দাঁড়াল চারতলার রেলিংয়ের কাছে। মোজাফ্ফর পেছাতে পেছাতে এসে কোমর ঠেকিয়ে দাঁড়াল রেলিংয়ে। সালমা তার ঠিক সামনে।
মার্কেটের কোলাহল তখনও আগের মতোই চলছে। অথচ মোজাফ্ফরের কাছে সব শব্দ ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যেতে লাগল।
সালমা হাত নাড়িয়ে কথা বলেই যাচ্ছে। “তোমার মতো মানুষেরে বিয়া করাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।”
কথাটা শুনে মোজাফ্ফর আর উত্তর দিল না। সে শুধু তাকিয়ে রইল সালমার দিকে। তারপর অদ্ভুত ধীরতায় ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। রেলিংয়ের ওপাশে অনেক নিচে মানুষ হাঁটছে। কেউ হাসছে। কেউ কেনাকাটা করছে। পৃথিবীটা ঠিক আগের মতোই চলছে।
তার হঠাৎ বাবার কথা মনে পড়ল। মায়ের কথা মনে পড়ল। ছোট ভাইটার ভর্তি ফি।
অফিসের হিসাব বিভাগের লোকটার মুখ। নিজের সেই অগণিত প্রতিশ্রুতি। একটা ভালো বাসা নেবে। সালমাকে একটা সোনার চুড়ি কিনে দেবে। মাকে শহরে এনে ডাক্তার দেখাবে। ছোট ভাইকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবে।কিছুই হয়নি। সে শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়েই গেছে। ধীরে ধীরে আবার সামনে তাকাল।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সালমাকে তখন তার হঠাৎ খুব অচেনা মনে হলো। মনে হলো, এই মেয়েটা সেই মানুষ নয়, যার জন্য প্রতিদিন সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করত। এই মুখটা যেন তাকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিচ্ছে, সে ব্যর্থ। সে অক্ষম। সে কারও স্বপ্ন পূরণ করার মতো মানুষ নয়।
এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, এই পৃথিবীতে তার আর কোনো প্রয়োজন নেই। সে খুব ধীরে দুই হাত তুলে রেলিংয়ের ওপর রাখল। তার চোখদুটো আশ্চর্য রকম শান্ত হয়ে এসেছে।
সালমা তখনও বুঝতে পারেনি কী হতে যাচ্ছে। সে বিরক্ত গলায় বললো, “চুপ কইরা আছ কেন? এরকম সংয়ের মত দাঁড়াইয়া থাকলেই কি সব ঠিক হইয়া যাইবো?”
মোজাফ্ফর শেষবারের মতো স্ত্রীর মুখের দিকে তাকাল। তারপর দুই হাতের ভর দিয়ে শরীরটা রেলিংয়ের একটু ওপরে তুলল। কয়েক সেকেন্ড স্থির থাকলো যেন সে ওটার উপর বসতে চাইছে। পরমুহুর্তেই নিজেকে পেছনে ঠেলে দিল।
সালমা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। যখন বুঝল, তখন শুধু দেখল, মোজাফ্ফরের শরীরটা সহসাই তার চোখের সামনে থেকে নেই হয়ে গেল।
সে চিৎকার করে উঠল। দৌড়ে গিয়ে রেলিং আঁকড়ে নিচে তাকাল।
নিচে মানুষের ভিড় জমে গেছে। কেউ ছুটে যাচ্ছে। কেউ চিৎকার করছে। কেউ মোবাইল বের করছে। কিন্তু সালমা কিছুই শুনতে পাচ্ছে না।
তার কানে শুধু বারবার ভেসে আসছে দুপুরের সেই কথাটা। “আজকে তোমার দিন।”
সালমার দুই হাত তখনও রেলিং শক্ত করে ধরে আছে। কিন্তু সে জানেনা, যে হাতটা তার সারাজীবন ধরে রাখার কথা ছিল, সেটাকে সে আর কোনোদিন ধরতে পারবে না।
(সমাপ্ত)2 Comments
আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন
ডিজাইনার
স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।
Friends
H.I Hamid
@h-ihamid
বি.এম.কায়েস খান
@bmkayeskhangmail-com
জিনাত ফয়সাল
@zinatfaisal2gmail-com
Rijoana
@rijoana
mdjibonahmmed Sagor
@mdjibonahmmedsagor
sajjadul ehsan sakib
@sajjadulehsansakib
বিদ্যুৎ চৌধুরী
@bc001
Abdul Motaleb
@abdulmotaleb
আজমাইন ইনকিয়াত
@inqiyad


অনেকদিন পর তুলটে আপনার লেখা পেলাম। ভালো ছিলেন তো?