-
যাদের খোঁজ রাখি না কেউ
মনির হোসেন‘বাত্তির নিচে অন্ধকার’ প্রবাদটির কথা আমরা সকলই কমবেশি জানি। ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশান এর ওপারেই রয়েছে কড়াইল বস্তি। মগবাজার/হাতিরঝিলের কাছেই রয়েছে বেগুনবাড়ি বস্তি। এরকম অনেক উদাহরণ আছে আমাদের সমাজে। যাদের যাপিত জীবন-জীবিকা নিয়ে খোঁজ রাখি না কেউ। আজ এরকম-ই দু’এক জন স্যার এবং তাদের প্রজন্ম নিয়ে লিখবো। শ্রদ্ধেয় স্যারদের যাপিত জীবন প্রকাশ্যে আনার জন্য স্যারদের পরিবারসহ সকলের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
উপজেলার ৪৪টি সরকারি এবং ২০ টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪১ নং জয়সিদ্ধি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বরাবরই শীর্ষ তালিকার ১, ২ বা ৩ নম্বরে থাকতো। সেই স্কুলের অবিসংবাদিত জনপ্রিয় শিক্ষিকা শ্যামলী পিসি বা ভয়রার পিসি আমাকে তাঁর ছেলেই ভাবতেন। শাসন ও মায়া-মমতায় অপূর্ব সংমিশ্রণ ছিল উনার আচরণে। আমার মায়ের মতো বাটাভরা পান চিবাতেন তিনি। স্কুল ভরা ছেলে-মেয়ের দায়িত্বের পাশাপাশি উনার ছেলে-মেয়েকেও পরম মমতা আর ভালবাসায় গড়ে তুলছিলেন। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে অকালে প্রাণ দিলেন প্রিয় পিসি। কাল বৈশাখী ঝড়ে বেগুন পাতায় টুনটুনিদের বাসা যেভাবে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়, পিসির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মুকুলেই ঝড়ে পড়লো সাজানো সংসার, ভালবাসাময় স্বপ্নের প্রজন্ম। পিসির মহাপ্রয়ানের দু’তিন বছর পর আমি দেখেছি- তাঁর ছেলেদের, যারা ঝড়ে পড়েছে বিদ্যালয় থেকে, অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেছে যাদের স্বপ্নের শিক্ষা জীবন। আমি দেখেছি-জয়সিদ্ধি হাওরের বুকে শ্রম (কায়িকশ্রম) বিক্রয় করতে। জানি না আজ তাদের অবস্থান কোথায়? তবে নিশ্চিত যে, উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারেনি, পারেনি সামাজিক পজিশনে মা-কে অতিক্রম করতে। অথচ উনার শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরে দেশের সেবা করছে হাজার হাজার সরকারি/বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী।জয়সিদ্ধি উচ্চ বিদ্যালয়ের এক নিভৃতচারী শিক্ষক আনন্দ স্যার। আমি ১৯৯৭ সাল থেকে উনাকে আমৃত্যু দেখেছি। তিনি শারীরিকভাবে কিছুটা দুর্বল প্রকৃতির ছিলেন। এক হাত প্যারালাইজড ছিল। তথাপিও কর্তব্যের কাছে ছিল না কোন অবহেলা। দায়িত্ব পালনে কখনো অসামর্থতা প্রকাশ করেননি। স্কুলে আসা যাওয়া ও ক্লাস চালাতে বেশ কষ্ট-ই হতো। কষ্ট হতো ছাত্রদের শৃঙ্খলায় রাখতে। তারপরও উনি উনার মতো করে ক্লাস চালিয়ে গেছেন। বলতে দ্বিধা নেই যে, আমরা অনেকেই স্যারকে নিয়ে মজা করেছি। স্যারের আদেশ শুনেও শুনিনি। বেয়াদবি করেছি মনের অজান্তে। কখনোই ক্ষমা চাইনি স্যারের কাছে। আজ স্যার নেই, স্বর্গবাসী হয়েছেন অনেক আগেই। এখনো কিন্তু নিজ থেকেই স্যারের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতে পারি। আনন্দ স্যারের হাসি ছিল অমলিন। স্বল্পপ্রাণে হাসতেন। এখনো কানে বাঁজে বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক শ্রদ্ধেয় ঝুনু স্যার ডাকতেন, ‘আনন্দ বাবু’। স্যারের আনন্দ বাবু আজ নেই, আছে তাঁর পরিবার-পরিজন। দু:খের সাথে বলতে হয় এক্ষেত্রেও কিন্তু অমানিশা। স্যারের একমাত্র ছেলে তাপসকে নিয়ে বিধবা কাকি মা’র সংসার। পড়াশোনা খুব একটা করেনি তাপস। ছোট বেলায় দেখেছি মানুষের জমিতে বর্গা দিতে। স্যারের মহাপ্রয়ানের পর থেকেই সংসার চলছে হাওরে শ্রম বিক্রির টাকায়। কিছু দিন আগে জয়সদ্ধি বাজারে একটি টং দোকান দিয়েছিল তাপস। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস। এটাও আগুনে পুড়ে ভষ্ম।
গোবিন্দ বাবু: যেহেতু বাজারটি জয়সিদ্ধি স্কুলের অতি সন্নিকটে। তাই বাজারের ব্যবসায়ীসহ অনেকেই সময় হিসেবে করতো স্কুলের ঘন্টা শুনে। আর আমরা যারা ছাত্র-ছাত্রী ছিলাম তাদের কথা নাই বললাম। এই ঘন্টা বাঁজাতেন গোবিন্দ বাবু। আমরা তাকে দপ্তরি বলেই চিনতাম। খুবই স্বল্প বেতনের চাকরি করে সংসার চালাতেন তিনি। যৎ সামান্য মাইনে দিয়েই চলতো সারা মাস। অন্য কোন আয়ের পথ না থাকায় স্ত্রী-পুত্র নিয়ে কোন রকমে দিনানিপাত করতেন গোবিন্দ বাবু। ছেলের পড়াশোনার পিছনে খরচ করতে পারেনি কাড়ি কাড়ি টাকা। শৈলেনকে বাজারে কলা বেচতে দেখেছি। মনে পড়ে সেই গান, ‘কলা বেচো, করলা বেচো বেচো মটর দানা, বুকের জ্বালা বুকেই জ্বলুক, কান্না বেচো না। বেচবে কোথায় থেকে? গোবিন্দ বাবুদের কান্না বেচার জায়গা নেই। শিক্ষার এক মশালের নিচেই কেটেছে যার সারা দিন, অথচ তার সন্তানই পায়নি শিক্ষার আলো। নিশ্চয়ত হয়নি তার ভবিষ্যৎ, স্ত্রী-পুত্র আর সংসারের। আর আমরা যারা আলো নিয়ে এসেছি সেই বাতিঘর থেকে তারা কখনোই পিছন ফিরে তাকাইনি আলোর ফেরিওয়ালাদের দিকে। তাকাবোই বা কিভাবে? সারাক্ষণ আপন ভাবনা, সংসারে টিকে থাকার প্রতিযোগিতা নিয়েই ব্যস্ত থাকি। তবে আমাদের উচিত আলোর সেই সকল বাতিঘর ও ফেরিওয়ালাদের হাল হকিকত জানা এবং সাধ্যমতো কিছু একটা করা। এই কিছু একটা করার মাঝে আছে অনাবিল আনন্দ। সেলক্ষ্যে গড়ে তোলা যেতে পারে জয়সিদ্ধি স্কুল ওয়েলফেয়ার ফাউণ্ডেশন। জয়সিদ্ধি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জয়সিদ্ধি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী যারা চাকরি, ব্যবসা, শিল্প-সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত, হয়েছেন শিল্পপতি, উদ্যোক্তা কিংবা প্রবাসী তাদের অনুদানে চলতে পারে এমন একটি ফাউন্ডেশন।
4 Comments-
মনির হোসেন, আপনার লেখাটি পড়ে অনেক আবেগ কাজ করছে এবং ‘গোবিন্দ বাবুদের কান্না বেচার জায়গা নেই’ লাইনটা সত্যিই খুব গভীর একটা কথা। যারা আমাদের আলোর পথ দেখিয়ে নিজে অন্ধকারে হারিয়ে যান, তাদের কথা এভাবে মনে করার উদ্যোগটি বেশ প্রশংসনীয়। আচ্ছা, আপনার ভাবনায় থাকা সেই ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন গঠনের কাজ শুরু করার জন্য এখন আর কী কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার বলে আপনি মনে করেন?
Friends
মোঃ শহিদুল ইসলাম
@md-shahidulislam
মাহমুদুল হাসান
@mhrigan35gmail-com
আসাদুজ্জামান মানিক
@asadujjamanmanik
মোঃ জাহিদুল ইসলাম জীবন
@jahidulislamjibon
মোঃ নুরুল আফসার ইকবাল
@afsariqbal811gmail-com
Muntasir Maruf
@muntasirmaruf
Gm Rohman
@gmrohman
Tandra Peris
@tandraperis
shah moazzam
@shahmoazzam


হ্যাঁ। ঠিক বলেছেন। স্কুল জীবনের শিক্ষক শিক্ষিকা – উনাদের খোঁজ খবর রাখা উচিৎ ছাত্র ছাত্রীদের তরফ থেকে …