Profile Photo

Abdullah JubairOffline

  • abdullahjubair
  • Profile picture of Abdullah Jubair

    Abdullah Jubair

    4 hours, 10 minutes ago

    দুই সন্ধ্যা

    সকালে নুপুরটা ছিঁড়ে গেল।
    ছোট্ট একটা শব্দ হয়েছিল—টুন করে।
    তারপর মেঝের ওপর কয়েকটা রুপালি দানা ছড়িয়ে পড়ল। একটা দানা গড়িয়ে গিয়ে খাটের নিচে ঢুকে গেল। পিঙ্কি হাত বাড়িয়ে বাকি দানাগুলো কুড়িয়ে নিল। তারপর অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
    নুপুর ছিঁড়ে যাওয়ার মতো তুচ্ছ একটা ঘটনায় মানুষের মন এত খারাপ হওয়ার কথা নয়।
    কিন্তু পিঙ্কির হলো।
    কারণ আজকের দিনটা অন্যরকম।
    গত পাঁচ দিন ধরে সে মনে মনে আজকের দিনটা সাজিয়ে রেখেছে। সকালে উঠে নীল শাড়িটা পরবে। চুলটা একটু ভালো করে বাঁধবে। বারান্দার টবে ফুটে থাকা জুঁই ফুল থেকে দুটো ফুল নেবে। আর পায়ে পরবে নুপুরটা।
    আরিফ অফিস থেকে ফিরলে দরজা খুলে দিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবে।
    আরিফ হয়তো বলবে,
    —আজকে এত সাজসজ্জা কেন?
    পিঙ্কি মুখ গম্ভীর করে বলবে,
    —তুমি কিছুই মনে রাখো না।
    আরিফ তখন নিশ্চয়ই ভান করবে যে সে কিছুই জানে না।
    এই ভানটা পিঙ্কির খুব পছন্দ।
    তারপর হয়তো আরিফ হেসে বলবে,
    —আচ্ছা, ভুলে গেছি। তুমি মনে করিয়ে দাও।
    পিঙ্কি তখন বলবে না।
    একটু কষ্ট দেবে।
    তারপর বলবে।
    এই পর্যন্তই পরিকল্পনা ছিল।
    সকালে নুপুরটা ছিঁড়ে যাওয়ায় পরিকল্পনাটার একটা অংশ নষ্ট হয়ে গেল।
    সে নুপুরের দানাগুলো একটা ছোট কৌটায় তুলে রাখল।
    কৌটাটা কোথায় রাখবে ভেবে পেল না।
    শেষ পর্যন্ত চালের কৌটার পাশে রেখে দিল।
    তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকাল।
    নিজেকে আজ একটু অন্যরকম লাগছিল।
    হয়তো সাজগোজের কারণে নয়।
    অপেক্ষার কারণে।

    প্রতিদিনের মতো আরিফ সকালে অফিসে চলে গেল।
    দরজা বন্ধ হওয়ার আগে বলল,
    —দুপুরে খেয়ে নিও।
    পিঙ্কি বলল,
    —হুম।
    —আর ওই গ্যাসের চুলাটা ঠিকমতো বন্ধ করো। গতকাল কিন্তু…
    —জানি।
    —আচ্ছা।
    দরজা বন্ধ হলো।
    পিঙ্কি দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
    আরিফ চলে যাওয়ার পর তার সংসারটা খুব ছোট হয়ে যায়।
    একটা ঘর।
    একটা রান্নাঘর।
    একটা বারান্দা।
    আর একটা ঘড়ি।
    ঘড়িটার টিকটিক শব্দ দুপুরের দিকে অস্বাভাবিক রকম জোরে শোনা যায়।
    সকালটা কোনোভাবে কেটে গেল।
    দুপুর এল।
    দুপুরের পর সময় আর এগোয় না।
    পিঙ্কি একবার ভাত খেল। খাওয়ার সময় মনে হলো, আরিফ থাকলে হয়তো বলত,
    —তুমি একা একা খাও কেন?
    সে নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দিল,
    —তুমি তো থাকো না।
    তারপর একটু হাসল।
    নিজের সঙ্গে কথা বলার অভ্যাসটা তার হয়েছে।
    বিকেল চারটার দিকে সে আলমারি খুলে নীল শাড়িটা বের করল।
    কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার ভাঁজ করে রাখল।
    নুপুর নেই।
    নুপুর ছাড়া সাজলে কেমন যেন অসম্পূর্ণ লাগে।
    সে নিজের মনেই বলল,
    —বোকা মেয়ে।
    তারপর আবার শাড়িটা বের করল।
    এবার পরল।
    আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে জুঁই ফুল গুঁজল।
    একটু পর মনে হলো, জুঁইয়ের গন্ধটা বেশি হয়ে যাচ্ছে।
    একটা ফুল খুলে ফেলল।
    তারপর আবার লাগাল।

    অন্যদিকে আরিফের দিনটা শুরু হয়েছিল সকাল আটটা ত্রিশে, কিন্তু শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ ছিল না।
    অফিসে ঢুকেই বস বললেন,
    —এই ফাইলটা নিয়ে ব্যাংকে যাও।
    ব্যাংক থেকে ফিরে এসে শুনল, বসের বাসায় কিছু ডিম দিয়ে আসতে হবে।
    তারপর বাজার থেকে একটা প্যাকেট আনতে হবে।
    তারপর দুপুরে আবার অফিসের বাইরে যেতে হলো।
    বৃষ্টি শুরু হলো।
    আরিফের হাতে ছাতা ছিল না।
    সে একটা দোকানের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে পিঙ্কির কথা ভাবল।
    পিঙ্কি বৃষ্টি খুব পছন্দ করে।
    বৃষ্টি হলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে।
    একবার বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বলেছিল,
    —বৃষ্টি দেখার জন্য আলাদা কোনো টাকা লাগে না। এই জিনিসটাই সবচেয়ে ভালো।
    আরিফ তখন বলেছিল,
    —তুমি চাইলে আমি বৃষ্টি কিনে দিতে পারি।
    পিঙ্কি হেসে বলেছিল,
    —তুমি আগে নিজের জন্য একটা ছাতা কিনো।
    সেই ছাতাটা আজও কেনা হয়নি।
    আরিফ নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।
    পাশের দোকানদার তাকিয়ে বলল,
    —কী ভাই, একা একা হাসেন কেন?
    আরিফ বলল,
    —বউয়ের কথা মনে পড়ছে।
    দোকানদার বলল,
    —ওহ্, তাইলে হাসেন। এইটা ভালো রোগ।
    আরিফও হেসে ফেলল।

    বিকেল পাঁচটার দিকে আরিফের মনে হলো, আজ একটু আগে বের হওয়া যায়।
    আজকের দিনটা তারও মনে আছে।
    তবে পিঙ্কির মতো করে নয়।
    তার মনে ছিল শুধু একটা ছোট্ট কথা—
    আজ পিঙ্কিকে কিছু একটা দিতে হবে।
    কী দিতে হবে জানে না।
    বেতন এখনো হয়নি।
    পকেটে খুব বেশি টাকা নেই।
    অফিস থেকে বের হয়ে সে কিছুক্ষণ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
    বাসস্ট্যান্ডে বাস আসছে।
    মানুষ উঠছে।
    মানুষ নামছে।
    হঠাৎ একটা আইসক্রিমের দোকান চোখে পড়ল।
    বড় একটা আইসক্রিম।
    পিঙ্কির প্রিয়।
    আরিফ পকেট থেকে টাকা বের করল।
    তারপর হিসাব করল।
    বাসভাড়া দিলে বাড়ি পৌঁছাতে সুবিধা হবে।
    আইসক্রিম কিনলে হাঁটতে হবে।
    সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল।
    তারপর আইসক্রিমটা কিনে ফেলল।
    বাসে উঠল না।
    হাঁটতে শুরু করল।

    দরজা খুলতেই পিঙ্কি প্রথমে আরিফের মুখ দেখল।
    তারপর হাতে থাকা আইসক্রিম।
    সে অবাক হয়ে বলল,
    —আজ তো বেতনের তারিখ না।
    আরিফ জুতো খুলতে খুলতে বলল,
    —কী যে বলো!
    —টাকা পেলে কোথায়?
    —আছে।
    —কোথায়?
    —পকেটে।
    পিঙ্কি হাত বাড়িয়ে বলল,
    —দাও দেখি।
    আরিফ হেসে পকেট উল্টে দেখাল।
    কিছু নেই।
    পিঙ্কি এবার বুঝে গেল।
    তার চোখ সরু হয়ে এল।
    —তুমি বাসে আসোনি?
    আরিফ চুপ।
    —আরিফ!
    —হেঁটে আসছি।
    —কতদূর?
    —এই তো।
    —কতদূর?
    আরিফ একটা সংখ্যা বলল।
    পিঙ্কি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
    তারপর বলল,
    —তুমি একটা গাধা।
    আরিফ হাসল।
    পিঙ্কি বলল,
    —হাসছ কেন?
    —তুমি রাগ করলে সুন্দর লাগে।
    —আমি কিন্তু সত্যিই রাগ করছি।
    —জানি।
    —আইসক্রিমটা নিয়ে যাও।
    —কেন?
    —আমি খাব না।
    —কেন?
    —আমি আইসক্রিম খাই না।
    আরিফ খুব গম্ভীর মুখ করে বলল,
    —ঠিক আছে।
    আইসক্রিমটা টেবিলে রেখে সে হাত-মুখ ধুতে গেল।
    পিঙ্কি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
    তার চোখে পানি।
    সে চুপচাপ বলল,
    —পাগল মানুষ।

    রাতে খাওয়ার পর পিঙ্কি আইসক্রিমটা বের করল।
    আরিফ অবাক হয়ে বলল,
    —তুমি তো বলেছিলে খাবে না।
    —আমি খাচ্ছি না।
    —তাহলে?
    —এটা গলছে।
    —গললে?
    —নষ্ট হবে।
    —তাহলে খাও।
    পিঙ্কি একটা চামচ মুখে দিয়ে বলল,
    —চুপ।
    আরিফ হাসল।
    তারপর গল্প শুরু করল।
    আজ নাকি অফিসে একটা বিশাল মিটিং হয়েছে।
    পিঙ্কি বলল,
    —তুমি মিটিংয়ে ছিলে?
    —অবশ্যই।
    —কী নিয়ে?
    —দেশের অর্থনীতি।
    পিঙ্কি তাকিয়ে রইল।
    —তোমার অফিসে?
    —হ্যাঁ।
    —তুমি কী বলেছ?
    —আমি বলেছি, দেশের অর্থনীতি ভালো করতে হলে সবাইকে সময়মতো অফিসে আসতে হবে।
    পিঙ্কি হেসে ফেলল।
    —তুমি নিজেই তো আজ এক ঘণ্টা দেরি করে গেছ।
    আরিফ একটু থেমে বলল,
    —এই তথ্যটা গোপন।
    তারপর সে বলল, বস নাকি তাকে ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।
    পিঙ্কি বলল,
    —তাহলে কাল থেকে তুমি বস হয়ে যেও।
    আরিফ বলল,
    —চেষ্টা করছি।
    তারপর বলল, আজ অফিস থেকে ফেরার পথে একটা কুকুর তাকে দেখে লেজ নেড়েছে।
    পিঙ্কি বলল,
    —কুকুরটা তোমাকে চিনত?
    —অবশ্যই।
    —কীভাবে?
    —আমি প্রতিদিন ওকে দেখি।
    —ওর নাম কী?
    আরিফ একটু ভেবে বলল,
    —সোহাগ ।
    পিঙ্কি হেসে কুটিকুটি।
    —কুকুরের নাম সোহাগ ?
    —হ্যাঁ।
    —কে রেখেছে?
    —আমি।
    —কেন?
    —ওর চেহারা সোহাগের মতো।
    পিঙ্কি এবার আর হাসি থামাতে পারল না।
    আইসক্রিমের শেষটুকু সে চামচ দিয়ে তুলে মুখে দিল।
    তারপর হঠাৎ বলল,
    —আজকের দিনটা মনে ছিল?
    আরিফ একটু চুপ করে থেকে বলল,
    —ছিল।
    —কতদিন ধরে?
    —তিন দিন।
    পিঙ্কি বলল,
    —আমি পাঁচ দিন ধরে ভাবছি।
    —কী ভাবছ?
    —তোমাকে একটা কথা বলব।
    —কী কথা?
    —বলব না।
    আরিফ বলল,
    —ঠিক আছে।
    দুজনেই হাসল।

    অপুর সংসারেও একসময় এমন সন্ধ্যা ছিল।
    তিন বছর আগে।
    সেই সময় সুরাইয়া অফিস থেকে একটু দেরি করে ফিরলে অপু বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকত।
    দূর থেকে তাকে দেখলেই বলত,
    —এত দেরি কেন?
    সুরাইয়া বলত,
    —তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছিল, তাই দেরি করে এসেছি।
    অপু বলত,
    —এটা আবার কেমন কথা?
    সুরাইয়া হেসে বলত,
    —তোমাকে একটু অপেক্ষা করাতে ভালো লাগে।
    সেই সময় তাদের কথা শেষ হতো না।
    একটা গল্প থেকে আরেকটা গল্প।
    একটা হাসি থেকে আরেকটা হাসি।
    এক কাপ চা ঠান্ডা হয়ে যেত।
    কিন্তু গল্প শেষ হতো না।
    তিন বছর খুব বেশি সময় নয়।
    কিন্তু কিছু মানুষের জীবনে তিন বছর তিনশো বছরের মতো।

    সেদিন অফিস থেকে ফিরেই অপু বুঝল, ঘরটা ফাঁকা।
    ড্রয়িংরুমের আলো জ্বলছে।
    ডাইনিং টেবিলে একটা প্লেট রাখা।
    প্লেটে শুকিয়ে যাওয়া ডালের দাগ।
    এক গ্লাস পানি।
    একটা চেয়ার একটু বাঁকা।
    সুরাইয়া নেই।
    অপু ফোন করল।
    কেউ ধরল না।
    আরেকবার করল।
    তারপরও না।
    এক ঘণ্টা পর ফোন ধরল সুরাইয়া।
    —আমি আলাউদ্দিন স্যারের সঙ্গে বের হয়েছি।
    অপু বলল,
    —কোথায়?
    —এক জায়গায়।
    —কখন আসবে?
    —আজ আসব না। সকালে আসব।
    —আচ্ছা।
    ফোন কেটে গেল।
    অপু অনেকক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
    তারপর ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে দিল।
    কিছুক্ষণ পর আবার তুলে দেখল।
    কোনো মেসেজ নেই।
    সে একটা মেসেজ লিখল—
    “খেয়েছ?”
    অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে মেসেজটা মুছে দিল।

    সকালে সুরাইয়া ফিরল।
    অপু তখন খাটের কিনারায় বসে।
    চোখের সামনে ডাইনিং টেবিল।
    টেবিলটা খুব সাধারণ।
    চারটা চেয়ার।
    একটা টেবিলক্লথ।
    কোণে একটা ছোট ফুলদানি।
    ফুল নেই।
    সুরাইয়া ফোন নিয়ে বসেছে।
    কাউকে ফোন করেছে।
    হাসছে।
    অপু তার দিকে তাকাল না।
    আজ তাদের বিয়ের তিন বছর।
    বিশেষ দিন।
    এই দিনটায় তিন বছর আগে তারা অনেক কেঁদেছিল।
    অনেক হেসেছিল।
    সুরাইয়া বলেছিল,
    —তুমি আমাকে কোনোদিন একা রাখবে না তো?
    অপু বলেছিল,
    —কখনো না।
    মানুষ সবসময় মিথ্যা বলে না।
    কখনো কখনো সত্যি কথাও সময়ের কাছে হেরে যায়।
    অপু জানে না, সুরাইয়া কখন বদলে গেল।
    গত এক বছর ধরে সুরাইয়ার কথায় একজন মানুষের নাম প্রায়ই আসে।
    আলাউদ্দিন স্যার।
    স্যার নাকি খুব cultured মানুষ।
    খুব সুন্দর করে কথা বলেন।
    তার সঙ্গে বসে থাকলে নাকি মনে হয় পৃথিবীটা একটু বড়।
    তার বন্ধুরাও খুব ভালো।
    শিক্ষিত।
    রুচিশীল।
    অপু এসব শুনে চুপ করে থাকে।
    তার আপত্তি নেই সুরাইয়ার বন্ধুদের নিয়ে।
    তার আপত্তি নেই সুরাইয়া আলাউদ্দিন স্যারের সঙ্গে কথা বলে।
    তার আপত্তি একটা অন্য জায়গায়।
    সে বুঝতে পারে না, যে কথাগুলো একসময় সুরাইয়া তাকে বলত, সেগুলো এখন অন্য মানুষদের কেন বলে।
    আর যে গল্পগুলো একসময় তার জন্য জমিয়ে রাখত, সেগুলো এখন কোথায় হারিয়ে যায়।
    সুরাইয়া প্রায়ই স্যারের বাসায় যায়।
    কখনো স্যারের বন্ধুরা আসে।
    কখনো বাইরে কোথাও অনুষ্ঠান।
    বিশেষ দিনগুলোও সেখানেই কেটে যায়।
    স্যার দেশে না থাকলে স্যারের বন্ধুরা থাকে।
    বাসায় থাকলে সুরাইয়া সবসময় ব্যস্ত।
    ফোনটা সবসময় হাতে।
    কখনো কল।
    কখনো চ্যাট।
    কখনো স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি।
    অপু একদিন বলেছিল,
    —কার সঙ্গে এত কথা বলো?
    সুরাইয়া বলেছিল,
    —মানুষের সঙ্গে।
    —কোন মানুষ?
    সুরাইয়া বিরক্ত হয়ে বলেছিল,
    —তুমি খুব সন্দেহপ্রবণ হয়ে যাচ্ছ।
    অপু চুপ করেছিল।
    আরেকদিন সে বলেছিল,
    —তোমার ফোনটা একটু দেখি?
    সুরাইয়া তাকিয়েছিল তার দিকে।
    অনেকক্ষণ।
    তারপর বলেছিল,
    —তুমি খুব নিচু মানসিকতার মানুষ।
    কথাটা অপুর খুব মনে লেগেছিল।
    সে সেদিন কিছু বলেনি।
    কিন্তু রাতে ঘুমানোর আগে অনেকক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিল।
    নিচু মানসিকতা কি সত্যিই তার?
    নাকি সে শুধু পুরোনো একটা মানুষ?
    সে কি এমন একটা পৃথিবীর মানুষ, যেখানে স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের বন্ধু ছিল?
    যেখানে দিনের শেষে একজন আরেকজনকে বলত—
    “আজ তোমার দিন কেমন গেল?”

    অফিসে বসে অপু হিসাব মেলায়।
    তার কাজ হিসাব করা।
    সংখ্যা ভুল হলে সে ধরে ফেলে।
    দশ টাকা কোথায় গেল, পাঁচ টাকা কোথায় কম হলো—সব বের করতে পারে।
    কিন্তু নিজের জীবনের হিসাব করতে বসলে কোথাও একটা সংখ্যা মেলে না।
    সে খাতায় চোখ রাখে।
    সংখ্যাগুলো পরিষ্কার।
    তার জীবনটা নয়।
    সে ভাবে—
    ভালোবাসা কি কমে যায়?
    নাকি মানুষ অন্য কোথাও গিয়ে ভালোবাসার নতুন ভাষা শিখে ফেলে?
    নাকি ভালোবাসা আসলে কমে না, শুধু একজনের জন্য জায়গাটা ছোট হয়ে যায়?
    তারপর নিজের প্রশ্নেই সে বিরক্ত হয়।
    সে জানে না।

    সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে অপু একটা আইসক্রিমের দোকানের সামনে দাঁড়াল।
    একজন ছোট ছেলে আইসক্রিম কিনছে।
    তার মা পাশে দাঁড়িয়ে।
    ছেলেটা বলল,
    —আম্মু, তোমারটা থেকে অর্ধেক খাব।
    মা বলল,
    —না। তুমি নিজেরটা খাও।
    ছেলেটা বলল,
    —তবু তোমারটা অর্ধেক খাব।
    অপু হঠাৎ তিন বছর আগের একটা বিকেলে চলে গেল।
    সুরাইয়া তার হাত থেকে আইসক্রিম কেড়ে নিয়ে বলেছিল,
    —তোমারটার অর্ধেক আমার।
    অপু বলেছিল,
    —তুমি তো নিজেরটা কিনেছ।
    সুরাইয়া বলেছিল,
    —তাতে কী?
    তারপর নিজের আইসক্রিমটা অপুর হাতে দিয়ে বলেছিল,
    —তুমি আমারটা খাও।
    অপু হেসে বলেছিল,
    —তাহলে তুমি?
    —আমি তোমারটা খাব।
    সেই ছিল তাদের সংসারের নিয়ম।
    সবকিছু ভাগাভাগি।
    আইসক্রিমও।
    দুঃখও।
    আনন্দও।
    এখন শুধু সংসারটা আছে।
    ভাগাভাগিটা নেই।
    অপু দোকানটার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
    দোকানদার বলল,
    —ভাই, কী দেব?
    অপু মাথা নাড়ল।
    —কিছু না।
    তারপর হাঁটতে শুরু করল।
    কিছু জিনিস একা খাওয়া যায় না।

    1 Share
    1
Skip to toolbar