Profile Photo

আসাদুজ্জামান মানিকOffline

  • asadujjamanmanik
  • গল্পঃ দিদি
    -আসাদুজ্জামান মানিক

    কার্তিক মাসের পড়ন্ত বিকেল। উত্তরের হাওয়াটা সবে শিরশির করে বইতে শুরু করেছে। বাঁশবাগানের ঘন পাতার ফাঁক দিয়ে ঠিকরে আসা বিকেলের শেষ সোনালি আলো আর লম্বাটে ছায়ার এক অদ্ভুত খেলা চলছে মাটিতে। আলো-আঁধারির এই মায়াবী চাদরে ঢাকা পড়েছে গোটা তেঁতুলতলা। বাতাসে তখনো ভ্যাপসা স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধ, আর তার সাথে মিশে আছে দূরে ফুটে থাকা ছাতিম আর বুনো ভাঁটফুলের তীব্র, মাদকতাপূর্ণ সুবাস।
    নিতাই, বছর আটেকের এক ছিপছিপে ছেলে। পরনে একটা অনেকবার কাচা, রং-জ্বলে যাওয়া নীল শার্ট, যার নিচের দিকের দুটো বোতাম নেই। উস্কোখুস্কো চুলগুলো হাওয়ায় উড়ছে। ওর কপালে জমে আছে বিন্দু বিন্দু ঘাম, আর চোখের দৃষ্টিতে এমন এক গভীরতা, যা ওর বয়সের সাথে একেবারেই বেমানান। নিতাই’র ডান হাতের মুঠোয় সযত্নে ধরা কয়েকটা সদ্য তোলা সাদা টগর আর বেলি ফুল।
    নিতাই খুব সন্তর্পণে পা ফেলছে। শুকনো পাতায় যেন শব্দ না হয়, সেদিকে ওর কড়া নজর। ওর গন্তব্য গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে, পীর সাহেবের পুরোনো মাজারের পেছনের পোড়াবাড়িটা। গাঁয়ের মানুষ এদিকে বড় একটা আসে না। নিতাই এসে দাঁড়াল ভাঙা ইটের দেয়ালটার পাশে। দেয়ালের ফাটল দিয়ে উঁকি মারছে নাম-না-জানা লতাগুল্ম আর শেকড়।
    “দিদি…” ফিসফিস করে ডাকল নিতাই।
    চারপাশটা নিস্তব্ধ। শুধু একটা কাঠঠোকরা দূরে কোথাও অবিরাম ঠকঠক শব্দ করে চলেছে। নিতাই ইটের স্তূপের ওপর বসল। হাতের মুঠো খুলে টগর আর বেলি ফুলগুলো সাবধানে নামিয়ে রাখল একটা পরিষ্কার পাথরের ওপর।

    “মা আজ আবার বকেছে, জানিস? বলেছে আমি নাকি সারাদিন শুধু টো টো করে ঘুরি।”
    নিতাই’র গলাটা ধরে এল। ভাঙা ইটের স্তূপে বসে শূন্যতার দিকে তাকিয়ে ও কথা বলছে। এমন একজন দিদি, যাকে সে কোনোদিন চোখেই দেখেনি। জন্মের ঠিক দু’বছর আগেই সেই দিদি চলে গেছে না-ফেরার দেশে। আর যেদিন নিতাই প্রথম পৃথিবীর আলো দেখল, সেদিন ওকে জন্ম দিতে গিয়ে মা-ও চোখ বুজল চিরতরে। মাতৃস্নেহের বদলে পৃথিবীতে এসেই নিতাই’র কপালে জুটল এক সৎমা, আর তার সাথে এক বুক জমাট বাঁধা অন্ধকার। অভাবের সংসারে পান থেকে চুন খসলেই শুরু হয় গঞ্জনা। সৎমায়ের বাঁকা, ধারালো কথাগুলো যেন বিষমাখানো তীরের মতো এসে বেঁধে ওর ছোট্ট বুকে। সংসারে সে যেন এক অনাকাঙ্ক্ষিত আগাছা, যার বেঁচে থাকাটাই সবার কাছে একটা বোঝা।
    ওর এই নিঃসঙ্গ, কুয়াশামাখা শৈশবের একমাত্র সম্বল দাদির মুখে শোনা গল্পগুলো। শীতের রাতে পুরোনো কাঁথার নিচে শুয়ে দাদির মুখে শোনা সেই না-দেখা দিদিটাই ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে নিতাই’র একাকী পৃথিবীর একমাত্র আশ্রয়। যখন অকারণে বকুনি জোটে, অভিমানে যখন বুকের ভেতরটা দলা পাকিয়ে ওঠে, গলা কাঠ হয়ে আসে—নিতাই এক ছুটে চলে আসে তেঁতুলতলার এই নির্জন পোড়াবাড়িতে। ওর বুকে জমে থাকা পাহাড়সমান অভিমান আর না-বলা কষ্টগুলো শোনার মতো পৃথিবীতে আর তো কেউ নেই, আছে কেবল ওই একজনই।
    নিতাই’র অবুঝ মন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে— দিদি কোথাও হারিয়ে যায়নি। মৃত্যুর কোনো এক অজানা জগৎ থেকে সে ঠিকই নেমে আসে তার ভাইটার কাছে। এই ছাতিম ফুলের গন্ধমাখা আলো-আঁধারির ভেতর, ওই শেকড়-বাকড় গজানো ভাঙা দেয়ালের ওপাশেই সে রোজ চুপটি করে বসে থাকে, কেবল নিতাই’র কথাগুলো শুনবে বলে।

    “এই দেখ, তোর জন্য কতগুলো ফুল এনেছি। তুই তো টগর খুব ভালোবাসিস, তাই না?” নিতাই শূন্যতার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত মায়াবী একটা হাসি হাসল।
    হঠাৎ বাঁশবাগানের ভেতর দিয়ে হুশ করে এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল। নিতাই’র মনে হলো, গাছের ছায়াগুলো যেন একটু কেঁপে উঠল। ইটের দেয়ালের গায়ে পড়ে থাকা একটা দীর্ঘ ছায়া যেন একটু সরে এল ওর দিকে। বাতাসে ছাতিম আর ভাঁটফুলের গন্ধটা হঠাৎ করেই যেন আরও ঘন হয়ে উঠল।
    নিতাই উঠে দাঁড়াল। প্যান্টের ধুলো ঝেড়ে নিয়ে বলল, “আজ যাই রে দিদি। সন্ধে নামছে, এখন বাড়ি না গেলে বাবা পিঠের চামড়া তুলে নেবে। কাল আবার আসব।”
    শিমু বাড়ির পথ ধরল। কয়েক পা গিয়ে কী ভেবে ও একবার থমকে দাঁড়াল। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল পেছনে।
    কুয়াশা ততক্ষণে বেশ গাঢ় হয়ে নেমেছে। আবছা অন্ধকারে নিতাই স্পষ্ট দেখতে পেল, পাথরের ওপর রাখা সাদা টগর ফুলগুলো সেখানে নেই। কেউ যেন পরম মমতায় ফুলগুলো তুলে নিয়েছে। নাকি উত্তরের হাওয়ায় উড়ে গেল ঘাসের ভেতর?

    নিতাই আর দাঁড়াল না। পেছনে তখন গাঢ় অন্ধকারের পেটে ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে পুরোনো পোড়াবাড়িটা। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক তৃপ্তির হাসি নিয়ে ও কুয়াশামাখা মেঠো পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল। বাতাসে তখন উত্তরের শীত-শীত ভাব, রং-জ্বলে যাওয়া পাতলা শার্টের ভেতর দিয়ে শিরশিরে হাওয়া কাঁপন ধরাচ্ছে, তবু ওর একটুও শীত করল না। মনে হলো, কেউ যেন পরম মমতায় অদৃশ্য উষ্ণ এক চাদর জড়িয়ে দিয়েছে ওর গায়ে।

    1
    1 Comment
    • আসাদুজ্জামান মানিক, আপনার লেখা গল্পটা পড়ে নিতাইয়ের জন্য খুব মায়া হচ্ছিল আর শেষের ওই রহস্যময় অংশটা আপনার মনে ঠিক কীসের ইঙ্গিত দেয়?

Skip to toolbar