Profile Photo

বিষণ্ন সুমনOffline

  • logolabbd
  • Profile picture of বিষণ্ন সুমন

    বিষণ্ন সুমন

    • 2 months, 1 week ago

    সীমানা পেরিয়ে
    (পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

    অধ্যায়–চৌদ্দ
    মারদেকা দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। আস্তাবলের উঠোনটা প্রায় ফাঁকা। সকালের রোদ এখন অনেকটাই তীব্র হয়ে উঠেছে। কাঠের বেড়ার ওপর পড়ে থাকা আলো চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। দূরে কয়েকটা ঘোড়া মাথা নিচু করে ঘাস খাচ্ছে। বাতাসে শুকনো খড়ের গন্ধ, ঘোড়ার ঘামের গন্ধ আর গরম কাঠের একটা কড়া গন্ধ মিশে আছে।

    কিন্তু সেই মুহূর্তে এসবের কোনোটাই মারদেকার মনে জায়গা করে নিতে পারল না। তার কান এখনও সেই শব্দটা নিয়েই ব্যাস্ত। খুব ক্ষীণ একটা শব্দ। যেন ধাতব কোনো জিনিস কাঠের সঙ্গে ঠেকে আবার সরে গেছে।

    মারদেকা দরজার ফাঁকটা আরেকটু বাড়িয়ে দিল। তার ডান হাত তখনও দরজার কাঠে রাখা। শরীরের বেশির ভাগটা ছায়ার মধ্যে, শুধু মুখের এক পাশ রোদের মধ্যে বেরিয়ে আছে। সে উঠোনের দিকে তাকাল। কেউ নেই। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে সে বাইরে বেরিয়ে এল।

    বুটের তলায় শুকনো মাটি কচমচ করে উঠল। শব্দটা শুনে সে সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। তারপর ধীরে ধীরে চারপাশে তাকাল। বাঁদিকে র‍্যাঞ্চের মূল উঠোন। ডানদিকে পুরোনো কাঠের বেড়া। তার ওপারে নিচু ঝোপঝাড় আর শুকনো ঘাসের বিস্তীর্ণ জমি। আরও দূরে প্রেইরি নেমে গেছে ঢেউ খেলানো বাদামি-সবুজ সমতলের দিকে।

    সকালের বাতাস তখনও পুরোপুরি থেমে যায়নি। ঘাসের মাথাগুলো একসঙ্গে দুলছে। তারপর হঠাৎ ডানদিকে, আস্তাবলের পেছনের দিক থেকে খুব মৃদু একটা ঘর্ষণের শব্দ এল। মারদেকার চোখ সরু হয়ে গেল। সে শব্দের দিকে এগিয়ে গেল।

    আস্তাবলের পেছনে একটা পুরোনো কাঠের গাড়ি রাখা। বহুদিন ব্যবহার না হওয়ায় চাকাগুলোর ওপর ধুলোর মোটা আস্তরণ জমেছে। গাড়ির একপাশে কয়েকটা ভাঙা বস্তা, পুরোনো দড়ি আর একটা মরচেধরা লোহার চাকা পড়ে আছে। মারদেকা গাড়িটার আড়ালে তাকাল।

    কেউ নেই। সে এবার হাঁটু গেড়ে মাটির দিকে তাকাল। ধুলোয় কয়েকটা ছাপ দেখা যাচ্ছে। ঘোড়ার নয়, বুটের। কিন্তু ছাপগুলো খুব পরিষ্কার নয়। কিছুটা পুরোনো, কিছুটা নতুন। তার ওপর বাতাসে উড়ে আসা শুকনো ঘাস আর ধুলো জমে আছে।

    মারদেকা আঙুল দিয়ে একটা ছাপের কিনারা ছুঁয়ে দেখল। তারপর হাত সরিয়ে নিল। এখানে কেউ এসেছিল। কখন এসেছিল, সেটা বোঝা কঠিন।

    ঠিক তখনই দূর থেকে বাড হিগিন্সের গলা শোনা গেল, “মারদেকা!”

    ছেলেটা ঘুরে তাকাল। বাড দ্রুত পায়ে আস্তাবলের দিকে এগিয়ে আসছে। তার হাঁটার ভঙ্গিতে স্বাভাবিক নিশ্চিন্ততা নেই। মুখটাও আগের মতো শান্ত নয়।

    বাড কাছে এসে প্রথমে ছেলেটার মুখের দিকে তাকাল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “তুমি এখানে কী করছ?”

    মারদেকা আস্তাবলের পেছনের দিকে তাকাল। “একটা শব্দ পেয়েছিলাম।”

    “কী শব্দ?”

    “লোহার মতো কিছু কাঠে লেগেছিল।”

    বাড সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে তাকাল। তার চোখ একবার গাড়ির ওপর গেল, তারপর বেড়ার দিকে। সে কোনো কথা না বলে মারদেকার পাশে এসে দাঁড়াল। “কোথায় শুনেছ?”

    মারদেকা হাত তুলে আস্তাবলের পেছনের দিকে দেখাল। বাড সেখানে গিয়ে মাটির দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত কিছু বলল না। তারপর ধীরে হাঁটু গেড়ে বসল।

    মাটির ওপর বুটের ছাপটা সে আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখল। কিছুক্ষণ ছাপটার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর উঠে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি এবার চলে গেল উত্তরের দিকে, সেই দিকেই র‍্যাঞ্চের পুরোনো বেড়া। কয়েক মুহূর্ত সে স্থির দাঁড়িয়ে রইল। “চলো।”

    মারদেকা তার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল।

    র‍্যাঞ্চের উত্তর দিকটা অন্য অংশের তুলনায় অনেক বেশি নির্জন। এখানে মানুষের চলাচল কম। বেড়ার কয়েকটি খুঁটি বেঁকে গেছে, কোথাও কাঠের অংশ পচে গিয়েছে। বেড়ার ওপারে কোমরসমান শুকনো ঘাস। তার মধ্যে ছড়িয়ে আছে ছোট ছোট পাথর, কাঁটাঝোপ আর আগের বছরের শুকনো গাছের ডাল।

    মাটিটাও এখানে শক্ত। ঘোড়ার খুরের ছাপ থাকলে সহজেই চোখে পড়ে। বাড হঠাৎ থেমে গেল। মারদেকাও থামল। বাড নিচু হয়ে মাটির দিকে তাকাল। সেখানে সত্যিই কয়েকটি খুরের ছাপ। একটার ওপর আরেকটা পড়েছে। কিছুটা বাতাসে মুছে গেছে। কিন্তু দুটো ঘোড়া যে এখানে দাঁড়িয়েছিল, সেটা বোঝা যায়।

    মারদেকা নিঃশব্দে ছাপগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।

    বাড বলল, “এগুলো আমি রাতেই পেয়েছিলাম।”

    মারদেকা মাথা তুলল। “কেউ ঘোড়ায় করে এখানে এসেছিল?”

    বাড বেড়ার ওপারের দিকে তাকাল। ”এখন সেটাই জানতে হবে।” সে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে বেড়ার একটা খুঁটি পরীক্ষা করল। কাঠের গায়ে নতুন ঘষার দাগ। তার ভ্রু কুঁচকে গেল। “এই দাগটা আগে ছিল না।”

    মারদেকা কাছে এসে তাকাল। দাগটা খুব সামান্য। যেন ধাতব কোনো জিনিস কাঠের সঙ্গে ঘষা খেয়েছে। কাঠের গায়ে নতুন হলদে আঁশ উঠে আছে। সে আঙুল বাড়িয়ে দাগটার ওপর রাখল। তারপর হাত সরিয়ে নিল। “আস্তাবলে যে শব্দটা পেয়েছিলাম…”

    বাড তার দিকে তাকাল। কেউ হয়তো রাতে র‍্যাঞ্চের আশেপাশে ঘোরাফেরা করেছে। কিন্তু কেন? সে ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চোখ এবার বেড়ার ওপারে। সেখানে কোনো মানুষ নেই। কোনো ঘোড়াও নেই। শুধু বাতাসে দুলতে থাকা শুকনো ঘাস।

    দূরে একটা বাজপাখি আকাশে চক্কর দিচ্ছে। বাড নিচু গলায় বলল, “এই কথাটা এখন কাউকে বলবে না।”

    মারদেকা মাথা নাড়ল। সে আবার মাটির দিকে তাকাল। খুরের ছাপগুলো যেন তার চোখে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সে ধীরে ধীরে বলল, “ওরা কি র‍্যাঞ্চটাকে দেখছিল?”

    বাড এবার তার দিকে তাকাল। তারপর বলল, “হতে পারে।” বেড়ার ওপর হাত রাখল। দূরের প্রেইরির দিকে তাকিয়ে তার মুখ আরও কঠিন হয়ে উঠল। কিন্তু কে এসেছে, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, সে কেন এসেছিল। আস্তে করে ঘুরে দাঁড়াল। “চলো।”

    মারদেকা তার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। কয়েক কদম যাওয়ার পর সে আবার থেমে গেল। তার চোখ আস্তাবলের দিকে। সেখানে বাতাসের সঙ্গে একটা ঝুলন্ত লোহার বকল দুলছে। বকলটা কাঠের খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে। টক। টক। খুব ক্ষীণ একটা শব্দ।

    মারদেকা কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে থাকল। তারপর বুঝতে পারল, কিছুক্ষণ আগে যে শব্দ সে শুনেছিল, সেটা হয়তো এই বকলেরও হতে পারে। কিন্তু তার চোখ আবার চলে গেল আস্তাবলের পেছনের সেই জায়গাটার দিকে। কারণ শব্দটা সে শুনেছিল বকলটা থামার আগেই।

    মারদেকা ধীরে ধীরে আবার হাঁটতে শুরু করল। বাড তার পাশে। তারা যখন আস্তাবলের কাছে ফিরে এল, তখন মারদেকা হঠাৎ মাটির দিকে তাকিয়ে থেমে গেল। ধুলোয় একটা সরু দাগ।

    ঘোড়ার খুরের নয়। কোনো ভারী জিনিস টেনে নিয়ে যাওয়ারও নয়। বরং যেন বুটের গোড়ালি ঘুরে যাওয়ার সময় মাটিতে একটা অর্ধচন্দ্রাকার দাগ তৈরি হয়েছে।

    মারদেকা নিচু হয়ে সেটা দেখল। বাডও পাশে এসে দাঁড়াল।

    মারদেকা দাগটার ওপর হাত রাখল না। শুধু তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল, “কেউ এখানে দাঁড়িয়েছিল।”

    বাড তার দিকে তাকাল। “কীভাবে বুঝলে?”

    মারদেকা এবার মাটির দিকে তাকিয়েই বলল, “দাগটা একদিকে নয়।”

    বাড কিছুক্ষণ দাগটার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর তার মুখে ধীরে ধীরে একটা কঠিন ভাব ফুটে উঠল। সে চারপাশে তাকাল। কেউ দেখছে না। কেউ জানে না।

    আর সেই মুহূর্তে বাড প্রথমবারের মতো বুঝতে পারল, রাতের সেই অচেনা ঘোড়ার ছাপ হয়তো কেবল বেড়ার বাইরে এসে থেমে থাকা কোনো পথিকের ব্যাপার নয়।

    কেউ হয়তো র‍্যাঞ্চের ভেতর পর্যন্ত এসেছিল। কতটা কাছে? কেন? আর কী দেখেছে?
    এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর এখনো অন্ধকারে। বাড নিচু গলায় বলল, “এখান থেকে সরে যাও। আমরা জানি না কে কোথা থেকে তাকিয়ে আছে।”

    মারদেকা আর কোনো প্রশ্ন করল না। সে ধীরে ধীরে আস্তাবলের দিকে ফিরে গেল।

    বাড আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে রইল না। সে ধীরে ধীরে পেছন ফিরে র‍্যাঞ্চের মূল বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। তার বুটের তলায় শুকনো মাটি কচমচ করে উঠছিল, কিন্তু তার মন পড়ে ছিল অনেক পেছনে, উত্তরের বেড়ার কাছে, সেই অচেনা খুরের ছাপ আর কাঠের গায়ে নতুন আঁচড়ের মধ্যে।

    র‍্যাঞ্চের ওপর তখন দুপুরের রোদ নেমে এসেছে। সকালের কোমল আলো অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। আকাশে একটাও মেঘ নেই। সূর্যের তাপে প্রেইরির ঘাসের রং আরও ফিকে, আরও ধূসর দেখাচ্ছে। দূরের পাহাড়গুলো যেন গরম বাতাসের ভেতর সামান্য কাঁপছে।

    উঠোনে আগের মতোই কাজ চলছে। কয়েকজন কাউবয় ঘোড়া প্রস্তুত করছে, কেউ জিন বাঁধছে, কেউ কাঠের বাক্স সরাচ্ছে, কেউ আবার ভাঙা বেড়া মেরামত করছে।

    বাড কাউকে কিছু বলল না। সে প্রথমে নিজের ঘোড়াটার কাছে গেল। ঘোড়াটা মাথা তুলে তার দিকে তাকাল। লাগামের দড়ি খুলে আবার শক্ত করে বাঁধল, তারপর ঘোড়ার পিঠে হাত বুলিয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। তারপর তার চোখ চলে গেল মূল বাড়ির দিকে। লারসেনের ঘরের জানালাগুলো বাইরে থেকে বন্ধ দেখাচ্ছে। বারান্দায় কেউ নেই। সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। লারসেনকে এখনই সবটা জানাতে হবে।

    সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখতেই ভেতর থেকে দরজা খুলে গেল। লারসেন বেরিয়ে এল। তার মুখ আগের মতোই শান্ত, কিন্তু চোখে সেই পরিচিত সতর্কতা। শহর থেকে আসা লোকটার সঙ্গে কথা শেষ হয়েছে। লোকটি এখন ঘরের ভেতরের একপাশে বসে আছে। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে সে একবার বাইরে তাকাল, তারপর আবার চুপ করে বসে রইল।

    লারসেন বাডের দিকে তাকাল। “কীছু হয়েছে?”

    বাড সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে একবার লোকটার দিকে তাকাল। লোকটি তাদের কথা শুনতে পারে এমন দূরত্বে বসে আছে।

    লারসেন সেটা বুঝতে পারল। সে ধীরে বারান্দার একপাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাডও তার পেছনে গেল। “বল।”

    বাড নিচু গলায় বলল, “উত্তরের দিকটা আবার দেখলাম। খুরের ছাপ দুটো ঘোড়ার। সেটা আগের মতোই আছে। কিন্তু বেড়ার একটা খুঁটিতে নতুন আঁচড় পেয়েছি।”

    লারসেনের চোখ সামান্য সরু হলো। “কী ধরনের আঁচড়?”

    “ধাতব কিছু ঘষা লেগেছে মনে হয়।” বাড একটু থামল। “আস্তাবলের পেছনে মাটিতে বুটের দাগ পেয়েছি।”

    লারসেন এবার তার দিকে পুরোপুরি ফিরে তাকাল। “নতুন?”

    “নিশ্চিত করে বলা কঠিন। কিন্তু একটা দাগের মাটি এখনও শক্ত হয়ে বসেনি।”

    লারসেন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল। “মারদেকা সেটা দেখেছে?”

    “হ্যাঁ।”

    “সে কী বলেছে?”

    “আস্তাবলের কাছে শব্দ শুনেছিল।”

    লারসেনের চোখে এবার সামান্য পরিবর্তন দেখা গেল। “কী শব্দ?”

    “লোহার মতো কিছু কাঠে লাগার শব্দ।”

    লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। তার চোখ তখন উঠোনের ওপারে। সেখানে মারদেকা একটা কালো ঘোড়ার লাগাম ঠিক করছে। ছেলেটা মাথা নিচু করে নিজের কাজে ব্যস্ত। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, “ওকে কিছু বলবে না”।

    বাড অবাক হয়ে তাকাল। কিন্তু লারসেনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করার অভ্যাস তার নেই।

    লারসেন আবার বলল, “আজ থেকে উত্তর দিকের বেড়াটা নজরে রাখবে। তবে প্রকাশ্যে নয়।”

    “আবার যদি কেউ আসে?”

    লারসেনের চোখ এবার কঠিন হয়ে উঠল। “তখন তাকে আসতে দেবে।”

    বাড কয়েক মুহূর্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। “আসতে দেব?”

    লারসেন ধীরে বলল, “হ্যা, দেখব সে কী করতে আসে।”

    বাডের ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, লারসেন এখনই বন্দুকের দিকে যেতে চাইছে না।

    বারান্দায় দাঁড়িয়ে লারসেন কিছুক্ষণ মারদেকার দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটা তখন ঘোড়াটার কেশর আঁচড়ে দিচ্ছে। তার ভঙ্গিতে কোনো অস্থিরতা নেই। কিন্তু লারসেন জানে, ছেলেটার চোখ এখন আগের মতো নেই। একবার কোনো অস্বাভাবিক জিনিস চোখে পড়লে সে সেটাকে সহজে ভুলবে না।

    দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতে শুরু করল। সূর্য পশ্চিম আকাশের দিকে একটু একটু করে হেলে পড়েছে। তাপ এখনও কমেনি, কিন্তু আলোয় সেই কঠিন সাদা ঝাঁঝটা নেই।

    র‍্যাঞ্চের কাজও ধীরে ধীরে কমে এসেছে। কেউ ঘোড়াগুলোকে খোঁয়াড়ে ফিরিয়ে নিচ্ছে। কেউ দিনের শেষের সরঞ্জাম গুছিয়ে রাখছে। রান্নাঘরের দিক থেকে সন্ধ্যার খাবারের প্রস্তুতির গন্ধ ভেসে আসতে শুরু করল।

    মারদেকা তখন আস্তাবলের ভেতরে শেষ ঘোড়াটার খুর পরিষ্কার করছিল।

    বাড দরজার কাছে দাঁড়িয়ে তাকে কিছুক্ষণ দেখল। হেসে বলল, “সব কাজ একদিনে শেষ করতে নেই।”

    মারদেকা খুরটা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর দুজনেই আস্তাবলের বাইরে এল।

    বিকেলের আলো তখন উঠোনের ওপর লম্বা হয়ে পড়েছে। ফটকের ওপারে প্রেইরি প্রায় নিস্তব্ধ। মারদেকা একবার উত্তরের দিকে তাকাল। হঠাৎ বলল, “আজ রাতে ওদিকটায় যাবেন?”

    বাডের মুখে মৃদু হাসি ফুটল। “তোমার মাথায় এখন অনেক প্রশ্ন ঘুরছে।”

    মারদেকা ধীরে বলল, “হ্যাঁ।”

    দুজনেই ধীরে ধীরে মূল বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। কিন্তু তারা জানত না, উত্তরের বেড়ার ওপারে তখন কেউ দাঁড়িয়ে আছে।

    প্রেইরির শুকনো ঘাসের মধ্যে একজন মানুষ নিচু হয়ে বসে ছিল। তার শরীর প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে আছে। মাথায় চওড়া টুপি, গায়ে ধুলোমাখা কোট। হাতে একটা ছোট দূরবীন। সে র‍্যাঞ্চের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখ প্রথমে আস্তাবলের দিকে গেল।
    তারপর মূল বাড়ির দিকে। শেষে থামল মারদেকার ওপর।

    লোকটি দূরবীন নামিয়ে নিল। তার ঠোঁটে খুব সামান্য একটা হাসি ফুটল। তারপর সে পেছনে তাকাল। দূরে তার ঘোড়া বাঁধা ছিল। ঘোড়াটা এত নিচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে দূর থেকে তাকে শুকনো ঝোপের মতো মনে হয়।

    লোকটি ধীরে উঠে দাঁড়াল। সে বেড়ার দিকে এগিয়ে গেল না। বরং ঘুরে প্রেইরির দিকে হাঁটতে শুরু করল।

    সূর্য তখন পশ্চিম দিগন্তের ওপর রক্তের মতো লাল হয়ে উঠছে। র‍্যাঞ্চের বাড়িগুলোর ছায়া লম্বা হয়ে প্রেইরির দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। আর সেই ছায়ার বাইরে, ঘাসের সমুদ্রের মধ্যে, অচেনা মানুষটি তার ঘোড়ায় চড়ে ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল।

    তার পেছনে পড়ে রইল শুধু খুরের কয়েকটি অস্পষ্ট দাগ। দাগগুলো বাতাসে খুব বেশিক্ষণ থাকবে না। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে সে এসেছিল, সেটার ছাপ এত সহজে মুছে যাওয়ার নয়।

    সন্ধ্যা নামতে নামতে প্রেইরির রং বদলে গেল। পশ্চিম আকাশের রক্তিম আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। দূরের পাহাড়গুলোর মাথা কালো হয়ে উঠেছে, আর তাদের নিচে বিস্তৃত ঘাসের সমুদ্রটা যেন অন্ধকারের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। দিনের গরম এখনও মাটির বুক থেকে বেরোচ্ছে, কিন্তু বাতাসে রাতের ঠান্ডার আভাস এসে গেছে।

    লারসেন র‍্যাঞ্চে সন্ধ্যার কাজ প্রায় শেষ। আস্তাবলের দরজাগুলো একে একে বন্ধ হচ্ছে। ঘোড়াগুলোকে শেষবারের মতো খাবার দেওয়া হয়েছে। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে হলুদ আলো বাইরে পড়ে উঠোনের ধুলোর ওপর একটা ছোট আলোকচত্বর তৈরি করেছে। বাড়ির ভেতর থেকে থালা-বাসনের শব্দ ভেসে আসছে।

    কিন্তু উত্তর দিকের র‍্যাঞ্চটা অন্ধকার। সেখানে কোনো আলো নেই, কোনো মানুষের কণ্ঠ নেই। শুধু বাতাসে শুকনো ঘাসের ঘর্ষণের শব্দ, আর দূরের কোথাও নিশাচর পাখির ক্ষীণ ডাক।

    মারদেকা আস্তাবলের দরজা বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে এল। তার হাতে একটা ছোট লণ্ঠন। দরজায় তালা লাগানোর আগে সে একবার ভেতরের দিকে তাকাল। সারি সারি ঘোড়া অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। কারও চোখে লণ্ঠনের আলো পড়ে ক্ষণিকের জন্য জ্বলে উঠল, তারপর আবার অন্ধকারে হারিয়ে গেল। মারদেকা দরজাটা টেনে বন্ধ করল।

    এক পা এগিয়ে যেতেই থেমে গেল সে। তার মাথা সামান্য কাত হলো। কোথাও একটা শব্দ হয়েছে। খুব ক্ষীণ। মনে হলো শুকনো ঘাসের মধ্যে কোনো কিছু ঘষে গেল।

    মারদেকা লণ্ঠনটা একটু নিচু করে ধরল। চারপাশে তাকাল। উঠোন ফাঁকা। মূল বাড়ির বারান্দায় একটা বাতি জ্বলছে। আলোয় কাঠের সিঁড়িগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তার বাইরে অন্ধকার এত ঘন যে কয়েক গজ দূরের জিনিসও ঠিকমতো বোঝা যায় না। মারদেকা দাঁড়িয়ে রইল।

    তারপর ধীরে ধীরে লণ্ঠনটা নিভিয়ে দিল। অন্ধকার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ঘিরে ফেলল। কিছুক্ষণ সে নড়ল না। তার চোখ ধীরে ধীরে অন্ধকারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করল। আকাশে তখন কয়েকটা তারা দেখা দিয়েছে। উত্তরের দিকে কালো ঘাসের মাথাগুলো বাতাসে দুলছে।

    আবার শব্দ হলো। এবার একটু পরিষ্কার। টুক। মনে হলো কাঠের সঙ্গে ধাতব কোনো জিনিসের হালকা সংঘর্ষ। মারদেকার বুকের ভেতর ধুক করে উঠল। সকালের সেই শব্দটা তার মনে পড়ে গেল, আস্তাবলের কাছে শোনা সেই অদ্ভুত শব্দ।

    সে নিঃশব্দে এক পা পিছিয়ে গেল। তারপর আরেক পা। কিন্তু এবার সে ভয় পেয়ে পালাল না। লারসেন তাকে শিখিয়েছে, অজানা শব্দ থেকে দূরে সরে যাওয়ার আগে জানতে হয় শব্দটা কোথা থেকে এসেছে।

    মারদেকা মাটির দিকে তাকাল। চাঁদের আলো এখনও ওঠেনি। তবু আকাশের ক্ষীণ আলোয় শুকনো মাটির ওপর কিছু দাগ বোঝা যাচ্ছে। সে হাঁটু গেড়ে বসে হাত দিয়ে মাটি ছুঁল। ঠান্ডা। শুকনো। কিন্তু এক জায়গায় মাটি একটু নরম। আঙুল দিয়ে ছুঁতেই সেটা ভেঙে গেল।

    ঘোড়ার খুর নয়। বুটের ছাপ।

    মারদেকার নিঃশ্বাস যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। সে ধীরে মাথা তুলল। ছাপটা আস্তাবলের পেছনের দিকে গেছে। আর তার পরের ছাপটা অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেছে।

    মারদেকা উঠে দাঁড়াল। তাকে একটা জিনিস জানতে হবে। লোকটা কোথায় গেছে?

    সে ধীরে ধীরে এগোল। লণ্ঠন জ্বালাল না। শুধু হাত দিয়ে সামনে পথ মেপে নিচ্ছে। তার বুটের নিচে শুকনো ঘাস চাপা পড়ে খুব সামান্য শব্দ করছে।

    আস্তাবলের পেছনে পৌঁছে সে থেমে গেল। সেখানে একটা পুরোনো কাঠের বেড়া। বেড়ার ওপারে অন্ধকার প্রেইরি। দিনের আলোয় জায়গাটা খুব সাধারণ মনে হলেও সন্ধ্যার পর সেটাই যেন অন্য এক জগৎ হয়ে উঠেছে। বেড়ার ওপারের ঘাসগুলো বাতাসে দুলছে, আর অন্ধকারের মধ্যে তাদের মাথাগুলো কখনও দেখা যাচ্ছে, কখনও হারিয়ে যাচ্ছে।

    মারদেকা নিচু হয়ে মাটির দিকে তাকাল। দুটি ছাপ। তারপর তিনটি। তারপর আর কিছু নেই। সে মাথা তুলে বেড়ার দিকে তাকাল। একটা খুঁটির গায়ে অদ্ভুত কালচে দাগ। হাত বাড়িয়ে দাগটা ছুঁল। তার আঙুলে কালো গুঁড়ো লেগে গেল। সে সেটা নাকের কাছে নিয়ে গেল। তেলের গন্ধ। ঘোড়ার জিনের চামড়ায় ব্যবহৃত তেলের মতো।

    হঠাৎ তার পেছনে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ হলো। মারদেকা ঘুরে দাঁড়াল। কেউ নেই।
    শুধু আস্তাবলের কালো দেয়াল। তারপর বাম দিকে ঘাসের মধ্যে কিছু একটা নড়ল। সে ধীরে ধীরে এক পা পিছিয়ে এল। ঘাস আবার নড়ল। এবার একটু বেশি।

    মারদেকার চোখ সরু হয়ে গেল। সে বুঝল, বাতাস ওই দিক থেকে আসছে না। তাহলে ঘাস নড়ছে কেন? একটা শুকনো ডাল ভাঙার শব্দ হলো। সে আর দাঁড়িয়ে থাকল না। সে এক ঝটকায় পাশের কাঠের দেওয়ালের আড়ালে সরে গেল। তারপর নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগল। কয়েক সেকেন্ড। তারপর ঘাসের মধ্যে আর কোনো শব্দ নেই।

    হঠাৎ দূরে একটা ঘোড়া হ্রেষাধ্বনি করে উঠল। র‍্যাঞ্চের আস্তাবল থেকে নয়। প্রেইরির দিক থেকে। মারদেকার শরীর শক্ত হয়ে গেল। ঘোড়া আছে বাইরে। তারমানে কেউ আছে ওখানে। সে ধীরে মাথা বাড়িয়ে বেড়ার ফাঁক দিয়ে তাকাল। অন্ধকারের মধ্যে কিছুই দেখা গেল না। কিন্তু তারপর খুব দূরে একটা ক্ষীণ আলো দেখা গেল।

    লণ্ঠনের আলো। এক মুহূর্ত দেখা গেল। তারপর অদৃশ্য।

    মারদেকা চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রইল। আলোটা আবার জ্বলে উঠল। এবার একটু অন্য জায়গায়। কেউ হাঁটছে না। ঘোড়ায় চড়েছে। লণ্ঠনটা ঘোড়ার পাশে দুলছে। বুঝতে পারল, লোকটা চলে যাচ্ছে। কিন্তু কেন? সে এত কাছে এসে আবার ফিরে যাচ্ছে কেন?

    মারদেকা আর অপেক্ষা করল না। সে দৌড় দিল না, বরং যতটা সম্ভব নিঃশব্দে বেড়ার আড়াল থেকে বেরিয়ে র‍্যাঞ্চের মূল বাড়ির দিকে এগোল। কয়েক কদম যাওয়ার পর হঠাৎ থেমে গেল। তার কানে তখন আরেকটা শব্দ এসেছে। খুব দূরে। ঘোড়ার খুরের শব্দ। একটা ঘোড়া নয়। দুটো।

    শব্দ ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। মারদেকা দাঁড়িয়ে শুনতে লাগল। তার মনে পড়ল সকালের কথা। দুটো ঘোড়ার ছাপ। বাডের মুখ। লারসেনের সতর্কতা। আর সেই অচেনা লোক, যে র‍্যাঞ্চের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে এবার স্পষ্টতঃ বুঝতে পারল, লোকটা একা আসেনি।

    মারদেকা দ্রুত মূল বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। বারান্দায় পৌঁছানোর আগেই সে দেখতে পেল বাড সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে রাইফেল। চোখ উত্তরের দিকে। সেও থেমে গেল। কয়েক মুহূর্ত শ্বাস সামলে বলল, “ওরা এসেছে।”

    বাডের মুখের ভাব বদলে গেল। “কারা?”

    মারদেকা উত্তরের অন্ধকারের দিকে তাকাল। “জানি না।”

    বাড সিঁড়ি থেকে নেমে তার কাছে এল। “কতজন?”

    “দেখিনি।”

    “তাহলে কীভাবে জানো?”

    মারদেকা নিচু গলায় বলল, “দুটো ঘোড়া গেছে।”

    বাডের চোখ সরু হয়ে গেল। “কোথা দিয়ে?”

    “উত্তরের বেড়ার ওদিক দিয়ে।”

    বাড আর কোনো কথা বলল না। সে মারদেকার কাঁধে হাত রেখে তাকে নিজের পেছনে সরিয়ে দিল। “ভেতরে যাও।”

    বাডের কণ্ঠ এবার কঠিন। মারদেকা বুঝল, আর কথা বলা যাবে না। সে ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে এগোল।

    কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে আবার থেমে গেল। তার চোখ উত্তরের অন্ধকারে। বাড তখন রাইফেল তুলে ধরেছে।

    “বাড…”

    “কী?”

    মারদেকা খুব নিচু গলায় বলল, “ওরা চলে যায়নি।”

    বাড তার দিকে তাকাল। “কী বললে?”

    মারদেকা উত্তর দিল না। তার চোখ র‍্যাঞ্চের উত্তর-পশ্চিম কোণের দিকে স্থির।
    সেখানে একটা শুকনো গাছ। গাছটার নিচে অন্ধকারের মধ্যে একটা মানুষের অবয়ব।
    একেবারে স্থির।

    বাডও এবার সেটা দেখতে পেল। তার আঙুল রাইফেলের ট্রিগারের কাছে শক্ত হয়ে গেল। লোকটা নড়ল না। শুধু কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে মাথাটা সামান্য তুলল।
    তারপর হাত উঠাল। তার হাতে কিছু একটা আছে। মারদেকার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।

    বাড ফিসফিস করে বলল, “নিচু হও!”

    দুজনেই একই সঙ্গে ঝুঁকে পড়ল। পরের মুহূর্তে অন্ধকার চিরে একটা তীক্ষ্ণ সো সো শব্দ ছুটে এল। গুলি নয়। একটা তীর। তীরটা এসে বাড়ির বারান্দার কাঠের খুঁটিতে গেঁথে গেল।

    মারদেকা স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। বাড ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে এবার বিস্ময়ের চেয়ে বেশি ছিল ক্রোধ। সে তীরটার দিকে তাকাল। তারপর অন্ধকারের দিকে। কিন্তু শুকনো গাছটার নিচে আর কেউ নেই। মানুষটা অদৃশ্য হয়ে গেছে।

    বাড দাঁড়িয়ে পড়ল। কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছানোর আগেই বাড়ির ভেতর থেকে লারসেনের কণ্ঠ ভেসে এল। সে ঘুরে তাকাল।

    লারসেন দরজার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে রিভলভার। চোখ উত্তরের অন্ধকারে। সে ধীরে ধীরে বাইরে এসে বারান্দায় দাঁড়াল। কাঠের খুঁটিতে গেঁথে থাকা তীরটার দিকে তাকিয়ে তার মুখ এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল।

    তারপর তীরটা টেনে বের করল। তীরের মাথায় ছোট একটা কাপড় বাঁধা। লারসেন কাপড়টা খুলল। ভেতরে ভাঁজ করা একটা কাগজ। বাডের চোখ কাগজটার ওপর স্থির হয়ে গেল। মারদেকাও তাকিয়ে আছে।

    লারসেন কাগজটা খুলল। মাত্র কয়েকটি শব্দ। সে পড়ল। তারপর আবার পড়ল। তার মুখে কোনো পরিবর্তন নেই। কিন্তু এবার তার চোখে যে ঠান্ডা কঠোরতা ফুটে উঠল, সেটা বাড আগে বহুবার দেখেছে। সেই কঠোরতা দেখা দিলে সাধারণত পশ্চিমের কোনো মানুষ খুব বেশি সময় নিরাপদ থাকে না।

    বাড নিচু গলায় বলল, “কী লেখা আছে?”

    লারসেন কাগজটা ভাঁজ করল। কয়েক মুহূর্ত কোনো উত্তর দিল না।

    মারদেকার বুকের ভেতর যেন হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল। বাডের মুখও শক্ত হয়ে উঠল।

    লারসেন বারান্দার কিনারায় দাঁড়িয়ে রইল। তার হাতে তখনও ভাঁজ করা কাগজটা। উত্তরের প্রেইরির দিকে তাকিয়ে তার চোখ এতটাই স্থির যেন মনে হচ্ছিল, অন্ধকারের পর্দা ভেদ করে সে সেই অদৃশ্য মানুষটাকে দেখতে পাচ্ছে।

    বাড রাইফেলটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার আঙুল ট্রিগারের ওপর নয়, কিন্তু খুব কাছেই।

    মারদেকা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। তার বুক দ্রুত উঠানামা করছে, কিন্তু সে কোনো শব্দ করছে না। তার চোখ উত্তরের অন্ধকারে। সেই অন্ধকারের মধ্যে আবার ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল। তারপর থেমে গেল।

    বাড ধীরে মাথা ঘুরিয়ে লারসেনের দিকে তাকাল। “ওরা র‍্যাঞ্চের বাইরে থেমেছে।”

    লারসেন মাথা নাড়ল। “জানি।”

    “তীরটা কি শুধু ভয় দেখানোর জন্য?”

    লারসেন কাগজটার দিকে তাকাল। “হতে পারে।”

    বাড আর কিছু বলল না।

    লারসেন ধীরে ধীরে কাগজটা খুলল। লণ্ঠনের হলুদ আলোয় কাগজের ওপর লেখা কয়েকটি শব্দ আবার দেখা গেল। অক্ষরগুলো বড় নয়, কিন্তু লেখার ভঙ্গিতে এমন এক ধরনের আত্মবিশ্বাস ছিল, যেন যে লোক লিখেছে সে জানে, এই কাগজ পড়ার পর যার হাতে পড়বে, সে তার কথাকে হালকা করে দেখবে না।

    মারদেকা অনিচ্ছায় এক পা এগিয়ে এল। “কী লেখা আছে?”

    লারসেন কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কাগজটা ভাঁজ করে কোটের ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। “সেটা তোমার এখনই জানার দরকার নেই।”

    মারদেকা আর প্রশ্ন করল না। কিন্তু তার চোখে যে প্রশ্নটা রয়ে গেল, সেটা লারসেন বুঝতে পারল। সে উত্তরের দিকে তাকিয়েই বলল, “কারণ ওরা আমাদের ভয় দেখিয়ে জানিয়ে দিয়েছে যে ওরা এখানে আছে।”

    লারসেন এবার বারান্দার কাঠের খুঁটির দিকে তাকাল, যেখানে কয়েক মুহূর্ত আগেও তীরটা গেঁথে ছিল। “যে মানুষ সত্যিই কাউকে মারতে আসে, সে আগে থেকে খবর দিয়ে জানায় না।”

    বাড ধীরে মাথা নাড়ল। কথাটা সত্যি। পশ্চিমে সে বহুবার দেখেছে, সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষগুলো কখনও নিজেদের উপস্থিতি ঘোষণা করে না। তারা ছায়ার মতো আসে, কাজ শেষ করে চলে যায়। যারা গুলি চালানোর আগে কথা বলে, তাদের ভয়ংকর বলা যায়, কিন্তু যারা কথা না বলে গুলি চালায়, তাদের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগই থাকে না।

    হঠাৎ র‍্যাঞ্চের পশ্চিম দিক থেকে একটা ঘোড়া চেঁচিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে আরও দুটো ঘোড়া আস্তাবলের ভেতর অস্থির হয়ে নড়েচড়ে উঠল। খুরের শব্দ কাঠের মেঝেতে দ্রুত আঘাত করতে লাগল।

    মারদেকার মাথা ঘুরে গেল। “ওরা ঘোড়াগুলোকে ভয় দেখাচ্ছে,” সে ফিসফিস করে বলল।

    লারসেন তার দিকে তাকাল।

    মারদেকা একটু থেমে বলল, “ওরা কাছাকাছি আছে।”

    লারসেনের চোখে ক্ষীণ আলো জ্বলে উঠল। “কেন বলছ?”

    “ঘোড়াগুলো একসঙ্গে ভয় পায়নি। একটা আগে চেঁচিয়েছে। তারপর অন্যগুলো।”

    বাড এবার ছেলেটার দিকে তাকাল। তার মুখে অল্প বিস্ময় ফুটে উঠেছে।

    লারসেন ধীরে বলল, “ভালো।”

    তারপর সে বাডের দিকে ফিরল। “তুমি উত্তর দিকটা দেখো।”

    “আর পশ্চিম?”

    “আমি দেখছি।”

    বাড সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল। লারসেন মারদেকার দিকে তাকাল। “তুমি আমার সঙ্গে থাকবে।” মারদেকা মাথা নাড়ল।

    তারা দুজন বাড়ির পশ্চিম পাশ দিয়ে এগিয়ে গেল। লারসেনের হাতে রিভলভার। মারদেকার হাতে একটা ছোট লণ্ঠন। সলতেটা কমানো। পায়ের কাছে ছোট্ট আলো ফেলছে। তার হাঁটার ভঙ্গিতে আগের সেই কিশোরসুলভ অস্থিরতা নেই। প্রতিটি পা ফেলার আগে সে মাটি অনুভব করছে। শুকনো ঘাস কোথায় বেশি, কোথায় কম, কোথায় মাটি শক্ত, কোথায় বুটের পুরোনো ছাপ, তার চোখ সবকিছু ধরছে।

    বাড়ির পশ্চিম পাশটা অন্য জায়গার তুলনায় অনেক অন্ধকার। মূল উঠোনের আলো এখানে এসে পৌঁছায় না। একটা পুরোনো কাঠের শেডের ছায়া প্রায় পুরো জায়গাটাকে ঢেকে রেখেছে। শেডের পেছনে কয়েকটা মরচে ধরা কৃষি-সরঞ্জাম পড়ে আছে। বহুদিন ব্যবহার না হওয়া একটা লোহার চাকা মাটিতে কাত হয়ে পড়ে আছে। তার ওপর শুকনো লতাগুল্ম উঠে গেছে।

    লারসেন হঠাৎ হাত তুলে থামার ইশারা করল। সে নিচু হয়ে ঝোপের সামনে মাটি পরীক্ষা করল। কিছুক্ষণ পর তার আঙুল একটা চিহ্নের ওপর থেমে গেল। বুটের ছাপ। খুব নতুন। ছাপটার দিকে সে তাকিয়ে থাকল।

    মারদেকা কাছে এসে নিচু হলো। লন্ঠনের সলতেটা একটু বাড়িয়ে দিল।

    লারসেন বলল, “একজন এখানে দাঁড়িয়েছিল।” একটু দূরের মাটির দিকে তাকাল। আরেকটা ছাপ। তারপর আরেকটা। ছাপগুলো পশ্চিম দিকে গেছে।

    মারদেকা মাথা তুলল। “সে আমাদের দেখছিল।”

    লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। “সম্ভবত।”

    “তাহলে এখন সে কোথায়?”

    লারসেন উত্তর দিল না। দূরে আবার ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল। এইবার শব্দটা অনেক স্পষ্ট। দুটো ঘোড়া। কিন্তু তারা র‍্যাঞ্চের দিকে আসছে না। পশ্চিমের দিকে যাচ্ছে। লারসেন কয়েক মুহূর্ত শুনে বলল, “চলো।”

    তারা দ্রুত বাড়ির পেছনে ফিরে এল। বাড তখন উত্তর দিক থেকে ফিরে আসছে। তার মুখ গম্ভীর।

    “কী পেয়েছ?” লারসেন জানতে চাইল।

    বাড মাথা নাড়ল। “কেউ নেই। কিন্তু বেড়ার ওপারে নতুন ছাপ আছে। আগের গুলোর চেয়ে তাজা।”

    লারসেন কিছু বলল না। বাড এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আর একটা জিনিস পেয়েছি।” সে হাত বাড়িয়ে ছোট একটা বস্তু দেখাল। চামড়ার সরু ফালি। কালো চামড়া। এক প্রান্ত ছেঁড়া।

    লারসেন সেটা হাতে নিল। চামড়ার ওপর খুব ক্ষীণ একটা দাগ ছিল। যেন কোনো চিহ্ন একসময় খোদাই করা হয়েছিল, পরে ইচ্ছা করে ঘষে মুছে ফেলা হয়েছে। লারসেনের চোখ সেই দাগের ওপর স্থির হয়ে গেল।

    বাড জিজ্ঞেস করল, “চেনেন?”

    লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। চামড়ার টুকরোটা মুঠোয় বন্ধ করে ফেলল। “না,” সে ধীরে বলল।

    বাড তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, লারসেন সত্যি বলছে না। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রশ্ন করে কোনো লাভ নেই। হঠাৎ বাড়ির ভেতর থেকে দরজা খোলার শব্দ হলো।

    শহর থেকে আসা সেই লোকটি বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। তার হাতে একটা কাপ। কিন্তু মুখে কোনো স্বাভাবিক ভাব নেই। বাইরের অস্থিরতা সেও টের পেয়েছে। সে নিচু গলায় বলল, “আমার ঘোড়াটা কোথায়?”

    বাড ঘুরে তাকাল। “আস্তাবলে।”

    লোকটা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আমাকে এখন যেতে হবে।”

    তিনজনই একসঙ্গে তার দিকে তাকাল। লারসেনের মুখ শক্ত হয়ে গেল। “তুমি নিশ্চিত?”

    লোকটা একবার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লো।

    বাড আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। সে আস্তাবলের দিকে হাঁটা দিল। ফিরে এলো তার লাল-সাদা ঘোড়াটা নিয়ে। বিদায় নিয়ে লোকটা সন্ধ্যের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

    লারসেন তার পেছনে তাকিয়ে রইল। তারপর মারদেকার দিকে ফিরে বলল, “তুমি এখানে থাকবে।” তারপর আবার ঘরে ঢুকে গেল।

    মারদেকা মাথা নাড়ল। কিন্তু সেখানে দাঁড়িয়ে রইল না। সে উঠোনে নেমে এল। ততক্ষণে লন্ঠনের সলতেটা আবার নামিয়ে দিয়েছে। ধীরে আস্তাবলের দিকে এগিয়ে গেল। তার চোখ তখন মাটিতে। নিচে ধুলোর ওপর ভারী কিছু টেনে নেবার দাগ। সে আস্তে করে হাঁটু গেড়ে বসে দাগটা পরীক্ষা করল। সহসা তার চোখে এমন এক পরিবর্তন এল, যা কয়েক মাস আগেও তার মধ্যে দেখা যেত না।

    সে ধীরে মাথা তুলল। দূরে উত্তরের অন্ধকারে একটা ছায়া নড়ল। মাত্র এক মুহূর্ত। তারপর অদৃশ্য।

    মারদেকার বুকের ভেতর আবার সেই ধক করে ওঠা অনুভূতি হলো। কিন্তু এবার সে ভয় পেল না। সে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। সে বুঝে গেছে, এই পথ দিয়ে একটা ঘোড়া গেছে। ঘোড়াতে কোন সওয়ারী ছিল না। কেউ একজন ঘোড়াটাকে হাঁটিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু, সেই ছাপ মুছবার জন্য ঘোড়ার পিছে বস্তায় ভারী কিছু ভরে টেনে নিয়ে গেছে।

    তার চোখ তখন উত্তরের বেড়ার দিকে। অন্ধকারের মধ্যে যেন কেউ তাকে দেখছে। স্রে দ্রুত ঘরে ফিরে এলো। লারসেনের দরজায় টোকা দিল।

    আর সেই মুহূর্তেই দূরে কোথাও ঘোড়ার ক্ষীণ হ্রেষাধ্বনি শোনা গেল। একবার। তারপর আরেকবার।
    (চলবে)

    3
    3 Comments
    • ক্লাইম্যাক্স তৈরিতে আপনার দক্ষতা দেখেছি ছোট গল্পগুলোতে, এই পর্বে দেখলাম অসাধারন সাসপেন্স বিল্ডিং। সাথে খুব সাধারন ভাষা ব্যবহার করে গল্প বলার অসাধারন ভংগী। আপনার জন্য শুভকামনা রইলো।

    • দীর্ঘ এই শব্দের মিছিলে মন হারালেও, ভাবনার গভীরতা চমৎকার। এই আঙিনায় আপনার অক্ষরের আলো ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিনিয়ত। অন্তহীন শুভেচ্ছা!

    • আশা করি এই মঞ্চে আপনার আরও দারুণ সব লেখা দেখতে পাব। ভালো থাকবেন!

আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন

ডিজাইনার

স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

Skip to toolbar