-
আমি একটু অন্যরকম ছিলাম
আমার নাম আদিত্য ভৌমিক।
জন্ম ২২ এপ্রিল ১৯৯৭।
আমার জীবনটা হয়তো অন্য অনেক মানুষের মতো নয়। ছোটবেলা থেকেই আমি একটু অন্যরকম ছিলাম। সবাই যেমন সহজে মানুষের সঙ্গে মিশতে পারে, গল্প করতে পারে, বাইরে যেতে ভালোবাসে আমি তেমন ছিলাম না।
ছোটবেলায় স্কুলে খুব একটা যেতাম না। পড়াশোনাতেও মন বসত না। শেষ পর্যন্ত পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। তারপর ধীরে ধীরে বই-খাতা, স্কুল সবকিছু থেকেই যেন দূরে সরে গেলাম।
আমি ছোটবেলা থেকেই ঘরের ভেতরে থাকতে ভালোবাসতাম। কেন জানি ঘর থেকে বের হতে ইচ্ছে করত না। মানুষের ভিড়ের মধ্যেও নিজেকে অনেক সময় একা মনে হতো। কারও সঙ্গে কথা বলার চেয়ে নীরবে বসে থাকাটাই যেন আমার কাছে বেশি স্বস্তির ছিল।
আজও আমি অনেক সময় চুপ করে থাকি।
অনেক মানুষের সামনে থেকেও কথা বলতে ইচ্ছে করে না।
কেউ হয়তো ভাবতে পারে, আমি অহংকারী।
কেউ হয়তো ভাবতে পারে, আমি মানুষের সঙ্গে মিশতে চাই না।
কিন্তু সত্যিটা হয়তো এত সহজ নয়।
কিছু মানুষ বেশি কথা বলে নিজের কষ্ট ভুলে থাকে, আর কিছু মানুষ চুপ করে থেকে নিজের কষ্টকে বয়ে নিয়ে চলে। আমি হয়তো দ্বিতীয় দলের একজন।
আমার জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্টগুলোর একটি হলো—আমি কুমিল্লায় জন্ম নিয়েও কুমিল্লায় আজীবন থাকতে পারলাম না।
জন্মের জায়গাটা কি শুধু একটা জায়গার নাম?
আমার কাছে নয়।
কুমিল্লার সঙ্গে আমার কাছে মিশে আছে টান, মায়া, আপনজন, পরিচিত মুখ, পুরোনো দিন আর অগণিত অনুভূতি। তাই কুমিল্লা থেকে দূরে থাকাটা আমার কাছে শুধু জায়গা পরিবর্তন নয় মনে হয়, নিজের একটা অংশকে কোথাও রেখে চলে এসেছি।
এর চেয়ে বেশি কষ্টের আর কী হতে পারে জানি না।
আমার মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। আমি মানুষের প্রতি খুব সহজেই মায়া অনুভব করি। কাউকে কষ্ট পেতে দেখলে আমার নিজেরও খারাপ লাগে। কারও সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হলে তাকে ভুলে যাওয়া আমার জন্য সহজ নয়।
আমি জানি, এই পৃথিবীতে কেউ চিরদিন কারও আপন হয়ে থাকে না। মানুষ আসে, সম্পর্ক তৈরি হয়, তারপর সময়ের সঙ্গে কেউ কাছে থাকে, কেউ দূরে চলে যায়।
কিন্তু তাই বলে কি সম্পর্কগুলো মিথ্যা?
না।
আমার কাছে সম্পর্কের মূল্য তার স্থায়িত্বে নয় তার অনুভূতিতে।
যে মানুষটি আজ আমার চোখের সামনে আছে, যে মানুষটির সঙ্গে আজ কথা বলছি, যে মানুষটির সঙ্গে আজ হাসছি সে হয়তো চিরকাল আমার জীবনে থাকবে না। কিন্তু আজ সে আমার জীবনের একটি অংশ। সেই মুহূর্তটুকু কি মিথ্যা?
আমি তা মনে করি না।
তাই আমি মানুষকে ভুলতে পারি না।
সম্পর্ককে হেলায় ফেলে দিতে পারি না।
মায়াকে সহজে অস্বীকার করতে পারি না।
আর সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাই যখন কেউ বলে
“সবকিছু তো একদিন স্মৃতি হয়ে যাবে।”
‘স্মৃতি’ শব্দটিই কখনো কখনো আমার কাছে খুব ভারী লাগে।
কারণ আমি জানি, একদিন আমার বয়স আরও বাড়বে। একদিন হয়তো জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে যাব। তখন ছোটবেলার দিনগুলোর কথা মনে পড়বে।
মনে পড়বে সেই ঘর।
মনে পড়বে পরিচিত মানুষগুলো।
মনে পড়বে হারিয়ে যাওয়া সময়।
মনে পড়বে সেই দিনগুলো, যেগুলো তখন বুঝিনি যে একদিন এতটা মূল্যবান হয়ে উঠবে।
আর হয়তো তখন নীরবে আমার দুই নয়ন বেয়ে অশ্রুজল গড়িয়ে পড়বে।
মনে হবে
“ইশ! সময়টা যদি আরেকবার ফিরে আসত!”
আমার মধ্যে রাগও অনেক বেশি। অনেক সময় নিজের রাগকে আমি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। রাগের মুহূর্তে হয়তো এমন কিছু বলে ফেলি বা এমন আচরণ করি, যা পরে মনে হলে নিজের কাছেই খারাপ লাগে।
আমার মা আমাকে একসময় ভারতে নিয়ে গিয়ে ডাক্তারও দেখিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি।
আজও কখনো কখনো মনে হয়
ছোটবেলায় যদি আমাকে একটু অন্যভাবে বোঝা হতো,
যদি আমার নীরবতাকে অবহেলা না করে তার ভেতরের কথাগুলো শোনার চেষ্টা করা হতো,
যদি আমার রাগের পেছনের কারণগুলো বুঝে আমাকে ধীরে ধীরে সামলাতে শেখানো হতো
তাহলে হয়তো আমার জীবনটা কিছুটা অন্যরকম হতে পারত।
আমি কাউকে দোষ দিতে চাই না।
আমি শুধু মাঝে মাঝে ভাবি
একটা শিশুকে যদি তার মতো করে বোঝা যায়, তাহলে হয়তো তার বড় হয়ে ওঠার গল্পটাও বদলে যেতে পারে।
আজ আমি আমার অতীতকে বদলাতে পারব না।
পঞ্চম শ্রেণির পর থেমে যাওয়া পড়াশোনাকে ফিরিয়ে আনতে পারব না।
শৈশবের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো ফিরিয়ে আনতে পারব না।
যে সময় চলে গেছে, তাকে ধরে রাখতে পারব না।
আর কুমিল্লায় জন্ম নিয়েও সেখানে সারাজীবন থাকতে না পারার কষ্টটাও হয়তো পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারব না।
তবুও আমি একটা জিনিস বুঝেছি
মানুষের জীবন শুধু তার না-পাওয়ার গল্প নয়।
জীবনে যতটুকু মায়া পেয়েছি, যত মানুষকে ভালোবেসেছি, যত সম্পর্ক আমার জীবনে এসেছে সেগুলোকেও তো সঙ্গে নিয়ে বাঁচতে হবে।
আমি হয়তো খুব বেশি কথা বলতে পারি না।
আমি হয়তো সবার মতো নই।
আমি হয়তো অনেক কিছুই করতে পারিনি।
আমার জীবনে ভুল আছে, অপূর্ণতা আছে, রাগ আছে, অভিমান আছে।
কিন্তু আমার হৃদয়ের ভেতরেও অনুভূতি আছে।
আমি মানুষকে ভালোবাসি।
আমি সম্পর্ককে মূল্য দিই।
আমি স্মৃতিকে ভয় পাই, কারণ স্মৃতির সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া মানুষ আর সময়ের গন্ধ লেগে থাকে।
আর সবচেয়ে বড় কথা
আমি এখনও আমার জীবনটাকে নতুন করে বুঝতে শিখছি।
হয়তো একদিন আমি আমার রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখব।
হয়তো একদিন নিজের নীরবতার ভাষা খুঁজে পাব।
হয়তো একদিন অতীতকে কাঁদতে কাঁদতে নয়, মুচকি হেসে মনে করতে পারব।
আর যদি কোনোদিন আমার জীবনের গল্প পড়ে কেউ নিজের জীবনের কোনো নীরব মানুষটিকে একটু বেশি বুঝতে শেখে—তাহলেই আমার এই গল্প বলা সার্থক।
কারণ সব মানুষ চিৎকার করে নিজের কষ্টের কথা বলতে পারে না।
কিছু মানুষ শুধু চুপ করে থাকে।
আর সেই নীরবতার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে একটি সম্পূর্ণ জীবন।
আদিত্য ভৌমিক
২১ আগস্ট ২০২৬3 Comments
Friends
দেবাঞ্জলি সেন
@sendev
sayed sajib
@sayedsajib
Hussain Entazie
@hussainentazie
MAHMUD HAYAT
@mahmudhayat
মোঃ ইফতেখার আহমেদ তাজিম
@tazim
Sayeed Patwary
@sayeedp
himel ishaq
@himelishaq
Moin Uddin
@moinuddin1
মোস্তফা কামাল সাকি
@mostofakamal

আদিত্য ভৌমিক, আপনার মনের এই গভীর অনুভূতি এবং শৈশবের স্মৃতিচারণগুলো পড়তে গিয়ে মনে হলো যেন কোনো এক শান্ত নদী বা বৃষ্টির দিনের একান্ত ভাবনার সাথে পরিচিত হচ্ছি। মানুষের নীরবতা আর স্মৃতির ভার যে কতটা গভীর হতে পারে তা আপনার লেখায় খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে, তাই আপনার লেখার এই সততা ও সংবেদনশীলতা ধরে রেখে আরও বেশি করে নিজের কথাগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করতে পারেন।