-
প্রতিবেশী মহিলাদের মাঝে লাল বেনারসি পরিহিত একজন কিশোরী গুটিসুটি হয়ে বসে আছে। আশপাশের নানারকম কথার প্রেক্ষিতে জবাব দেওয়ার ফুরসতটুকুও তাকে দেওয়া হচ্ছে না। কিশোরী বধুটা চাতক পাখির মতো অপেক্ষমান এই পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হতে। ভারি বেনারসি, গহনা, মানুষের ভিড়, নতুন পরিস্থিতি আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে সে প্রচন্ড ক্লান্ত। এমন সময় ঘরে প্রবেশ করে মধ্যবয়স্ক একজন মহিলা। গায়ে ইটরঙা একটা জামদানি শাড়ি। হেটে আসার মধ্যে আভিজাত্যের ছোঁয়া। দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভদ্রমহিলা এই বাড়ির কর্ত্রী। প্রতিবেশী মহিলারা তাকে দেখে ধীরে ধীরে কক্ষ ত্যাগ করল।
“কোই দেখি তো, আমার পুত্রের কার জন্য এতো পাগলামি,” খোঁচা দিয়ে বললেন তিনি। হাত উঠিয়ে সামনে বসে থাকা বধুর লাল ঘোমটা তুলে দিলেন। দৃশ্যমান হলো শ্যামলা বর্ণের গোলগাল চেহারার একটা মুখ। যেখানে ঘাবড়ে যাওয়া স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। থুতনি ধরে মুখটা উপরে তুলে ভালোভাবে অবলোকন করলেন। এরপর পাশে বসে নাম শুধালেন। মেয়েটা বেশ অবাক হলো। নিজের পুত্রবধুর নাম জানেন না, অবাক তো হওয়ারই কথা। মাথা নিচু করে ধরে আসা গলায় বলল মেয়েটা,” আ..মার নাম রত্না..মিহি দেওয়া..ন।”
_______
বুসরা ছোট ভাইয়ের ঘরটা সাজিয়ে বের হতেই যাবে। তখনই সেখানে উপস্থিত হয় বুসরার বড় ভাইয়ের স্ত্রী। আড়চোখে সাজিয়ে রাখা ঘরটা একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। মুখে তার অমাবশ্যার মতো অন্ধকার ছেয়ে আছে। খাটের পাশে দাঁড়িয়ে বুসরাকে জিজ্ঞেস করে নতুন বউয়ের কথা। “আম্মা নিয়ে আসতে গিয়েছেন ভাবি। এক্ষুনি এসে যাবে। তুমি একটু অপেক্ষা করো,” উত্তরে বলল বুসরা। বুসরার কথা শেষ হতেই সেখানে কয়েকজন মহিলা উপস্থিত হয়। বুসরার আম্মা আর নতুন বউও আছে। বুসরার বড় ভাইয়ের স্ত্রী এগিয়ে আসে তাদের দিকে। নতুন বউয়ের দিকে কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে থাকে। চোখ জ্বলজ্বল করছে ক্রোধে। বুসরা এসে তার ছোট ভাবিকে নিয়ে খাটের মাঝখানে সুন্দর করে বসিয়ে দেয়। বুসরা আম্মা সবাইকে কক্ষ থেকে চলে যেতে বলেন এবং নিজেও কক্ষ থেকে বের হয়ে যান।বেশ কিছুক্ষণ পরে বুসরা আসে। ছোট ভাবির পাশে বসে নিচুস্বরে বলল,” ছোট ভাইয়া নাকি কি কাজে শহরে গিয়েছেন। কয়েকদিন পরে ফিরবে। একটু আগেই একজন এসে জানালো। তুমি মন খারাপ করো না ভাবি। ঘুমিয়ে পড়ো।” সামনে থাকা মেয়েটা এতে যেনো স্বস্তি পেলো বেশ। মাথা নাড়িয়ে বোঝালো সে ঘুমিয়ে পড়বে। এরপর বুসরা চলে যায়। সে ভারি শাড়ি আর গহনা খুলে ঘরের সাথে লাগোয়া বাথরুমে গেল। হাতমুখ ধুয়ে সুতির একটা জামা পরে খাটের একপাশে ঘুমিয়ে পড়লো।
_______
পরদিন সকাল।
বুসরার বড় ভাবি চৈতালি রান্নাঘরের মেঝেতে বসে মাংস কাটছে। পাশে আরও কয়েকজন মহিলা আছে। তারাও সবাই কাজে ব্যস্ত। আজকে বাড়িতে কিছু আত্মীয়দের আসার কথা। তাই সকাল সকাল কাজে লেগে পড়েছে। অন্যদিকে বুসরার ছোট ভাইয়ের এমন হঠাৎ করেই শহরে চলে যাওয়ার ব্যাপারে বেশ চিন্তিত সবাই।
“একটাবার শহরে গিয়ে খোঁজ নিলে হয় না? আমার মন কু ডাকছে। চিঠিতে তো কারণ বলল না,” বললেন বুসরার আম্মা, নাজনিন বেগম। স্বামীর দিকে তাকিয়ে দেখলেন, তিনিও বেশ দুশ্চিন্তায় আছেন। আহাদ আলী উঠে দাঁড়াল। ঘর থেকে বের হওয়ার আগে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বললেন,” তুমি চিন্তা করো না। এদিকটা সামলাও। আমি দেখছি কি করা যায়।” নাজনিন বেগম অসহায় দৃষ্টিতে দেখলেন তার প্রস্থান। নতুন বউকে প্রস্তুত করতে হবে আজকের অনুষ্ঠানের জন্য। তাই নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। বিয়ের রাতেই স্বামীর অনুপস্থিতি, না জানি মেয়েটার মনে কতটা দাগ কেটেছে। এসব ভাবতে ভাবতেই ছোট বউমার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।
___________
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলল। আহাদ আলী এখনো বাড়ি ফেরেনি। এজন্য নাজনিন বেগম বড় ছেলে, তালহাকে পাঠিয়েছিলেন তার খোঁজে। সেও এখনো আসেনি। এদিকে আহিরের অনুপস্থিতির খবর শুনে আত্মীয়দের মধ্যে এই নিয়ে ফিসফিস শুরু হয়ে গিয়েছে। রত্নামিহিকে তারা খুব একটা পছন্দ করেনি। মেয়েটা হলো শ্যামলা, খুব বেশি সুন্দর নয়, নিম্নবিত্ত পরিবারের আর সবথেকে বড় কথা, বিয়েতে কোনো যৌতুক দেয়নি তারা। অবশ্য যৌতুক নিতে রাজি ছিল না বাড়ির ছোট ছেলে, আহির। এটা জেনেও তারা রত্নাকে খোঁটা দিতে ছাড়ছে না। রত্না এখান থেকে উঠতেও পারছে না, আবার কিছু বলতেও পারছে না। মা-বাবার নামে বদনাম শুনে তার বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠছে ক্ষণেক্ষণে। ঠোঁট কামড়ে বারবার ঢোক গিলছে, যাতে কান্না করে না ফেলে।কিছুক্ষণ পরে চৈতালি আসল সেখানে। রত্নাকে সবাই হেয় করছে দেখে একটু খারাপ লাগল তার। তবুও সেসব পাত্তা না দিয়ে পাশে গিয়ে বসল। সারাদিন নানান কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে রত্নার সাথে তার দেখা হয়নি। আত্মীয়দের মধ্যে থেকে একজন বৃদ্ধা বলে বসল,” তা চৈতালি মা, তোমার ছোট জা পছন্দ করার সময় তোমার কোনো মতামত নেয়া হয়নি নাকি? এমন নিম্নশ্রেণির একজনকে এরকম বিত্তশালী পরিবারের বউ হিসেবে মানালো না। শুনলাম আহির নাকি গতকাল রাতে বাড়ি ছিল না। ঘটনা কি সত্যি?” পাশ থেকে আরেকজন পান খেতে খেতে বললেন,” বিয়ের রাতেই বর নেই। তা বলি কি, আহির এই বিয়েতে আগেও রাজি ছিল তো? সে নাকি এই কালো মেয়ের জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিল?”
চৈতালি ঠিক কি বলবে বুঝে উঠতে পারল না। তবে পুরাতন কথা ফের উঠাতে বেশ অস্বস্তিবোধ করল সে। “বউ হবে আহিরের। তাহলে চৈতালি কেনো বউ পছন্দ করবে? আর কোথাও লেখা আছে যে, গরীবের মেয়ের বড়লোক বাড়িতে বিয়ে হতে পারবে না? যদি না থাকে, তাহলে এই নিয়ে আর কোনো কথা যেনো না হয়। লোকের বিষয়ে না ভেবে, নিজের কথা ভাবলে বরং অনেক লাভ আছে,” কক্ষে প্রবেশ করতে করতেই বললেন নাজনিন বেগম। মহিলাদের ফিসফিসানি মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে গেল। ঘরটা পিনপতন নীরবতায় ছেয়ে গেল। নাজনিন বেগম এসে বসলেন দেয়ালঘেঁষে রাখা একটা কেদারায়।
_______
টং! দেয়ালঘড়িতে রাত বেজে এগারোটা। আহাদ আলী এবং তালহা সন্ধ্যানাগাদ ফিরেছে। এই বাড়িতে রাত নয়টার মধ্যেই রাতের খাবার খাওয়া শেষ হয়ে যায়। তাই বর্তমানে সবাই নিজেদের ঘরে আছে। তবে চৈতালি রান্নাঘরে। নাজনিন বেগমের নিয়ম, প্রত্যেকবেলা খাওয়ার পরে তখনই প্লেটবাটি ধুয়ে রাখতে হবে। আজকে বাড়িতে আত্মীয় এসেছিল বলে অনেক প্লেটবাটি ধুতে হচ্ছে তাকে।
চৈতালির মনে হলো তার পিছনে কেউ আছে। পিছনে ফেরার আগেই কেউ একজন তার কোমড় আঁকড়ে ধরল। তার আর বুঝতে বাকি রইল না ব্যক্তিটি কে। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না সে। নির্লিপ্তভাবে নিজের কাজ করতে লাগল। তালহা বাঁধন আরও শক্ত করল। চৈতালির কাধে থুতনি রেখে আদুরে স্বরে শুধালো,” কি হয়েছে আমার চড়ুইটার? এমন মুখভার কেন?” চৈতালি কোনো উত্তর দিল না। বরং নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে রান্নাঘরের আলো নিভিয়ে সিঁড়ির দিকে অগ্রসর হলো। তালহা অবাক হলো বেশ। চৈতালি শান্ত স্বভাবের মেয়ে। সে এমন রাগ দেখায় না সহজে। তাহলে কি এমন হলো তার? তালহা আকাশপাতাল ভাবতে ভাবতে চৈতালির পিছু পিছু ঘরে গেল।”আরেহ কি হয়েছে, না বললে বুঝব কিভাবে হ্যাঁ? কেউ কিছু বলেছে আজকে? মানুষের কাজই তো অন্যের পিছনে কাঠি দেওয়া। এসব নিয়ে মন খারাপ করো না। এইবার তো একটু..” আর কিছু বলার আগেই চৈতালি কঠোরভাবে বলে উঠল,” তোমরা সবাই আমাকে পাগল পেয়েছ, তাই না? যে যা বলবে আমাকে সেটাই মাথা পেতে গ্রহণ করতে হবে। আম্মার কোন কথাটা আমি শুনিনা? আজ পর্যন্ত কখনো তার অবাধ্য হয়েছি? এই বাড়ির বড় বউ হিসেবে আমার কোনো সম্মান, মর্যাদা নেই?” তালহা কি বলবে বুঝতে পারছে না। সে বাড়ির ভেতরকার কোনো খবর তেমন একটা জানে না। উঠে গিয়ে সে চৈতালির পাশে দাঁড়াল। জানালা দিয়ে মৃদু হাওয়া আসছে। চৈতালি চোখ বন্ধ করে সেই হাওয়া যেন অনুভব করার চেষ্টা করছে। তালহা চৈতালিকে একহাত দিয়ে জড়িয়ে নিলো নিজের সাথে। চৈতালি একটু আশ্বাস পেয়ে শান্ত হলো।“পরশুদিন আহিরের জন্য আমার বোনের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু, আম্মা সেটা ভালোভাবে নাকচ না করে, বরং ভরা মজলিসে আমাকে অপমান করেছেন। বিকালে যখন প্রতিবেশী কয়েকজন মহিলা আসে, তখন আহিরের বিয়ের কথা ওঠে। আম্মা তখন আমার দেওয়া প্রস্তাবের কথা তোলেন। আমি ভেবেছিলাম আম্মা বোধহয় রাজি হবে। কিন্তু না, তিনি সবার সামনে বললেন যে, একই পরিবারের দুই মেয়েকে বাড়ির বউ করবেন না। এটা নাকি উচিত না। এই পর্যন্ত বললেও আমি কিছু মনে করতাম না। অথচ তিনি আরও বলেছিলেন যে, ‘একজনকে বউ করে এখন বিপদে পড়েছি, তাই আরেকজনকে নিয়ে এসে এই ভিত্তি শক্ত করতে পারি না। অন্যথায় পরবর্তী প্রজন্ম আর দেখা হবে না। দুই অলক্ষীকে নিয়ে বংশের শেষ হবে এখানেই।’ একটু থামল চৈতালি। তালহা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,” আমাকে আগে কেন বলোনি? আর আম্মা..আম্মা সত্যিই এমনটা বলেছেন?” চৈতালি উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝালো। “বিশ্বাস করো, তখন আমার মনে হচ্ছিল ওখান থেকে দৌড়ে চলে আসি। কিন্তু আমি পারিনি। রত্নাকে আমার একটুও পছন্দ হয়নি। ওকে দেখলেই আমার ওইদিনের অপমানের কথাগুলো মনে পরে যায়। আমি রত্নার মতো মেয়ের জন্য অপমানিত হয়েছি,” বলতে বলতেই চৈতালির গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
চলবে..
#ভোর_হবেই
#নওশিন_জাহান_রিতিকা
#পর্ব_০১2 Comments
Friends
Md Rahmat Ali
@mdrahmatali
Selim Rahman
@selimrahman
ABM Sohel Rashid
@abmsohelrashid
Mohammad Raisuddin
@mohammadraisuddin
Tamjid hassan Al Rakib
@tamjidhassanalrakib
এস এম পলাশ
@smpalash
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor

দারুণ লিখছেন। পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।